ঢাকা, সোমবার 07 November 2016 ২৩ কার্তিক ১৪২৩, ৬ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অদম্য জাকিরুল ॥ গন্তব্য বিসিএস ক্যাডার

সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি সে তো অপরূপ সৌন্দর্য। মানুষকে সকল অবয়ব দিয়ে আল্লাহ তা-আলা সৃষ্টি করে থাকলেও একটি পা ছাড়া জাকিরুলকে সৃষ্টি করে আল্লাহ তা-আলা তার কুদরতের লীলা যেন কিছুটা দেখিয়েছেন। সব অবয়ব দিয়ে সৃষ্টি করেও অনেককে তিনি অন্তঃসার করে ফেলে রাখেন। সেখানে জাকিরুল প্রতিবন্ধী হয়েও অদম্য মেধাবী। প্রচণ্ড ইচ্ছা শক্তি, পিতা-মাতা, বন্ধু-বান্ধবের নিত্য সহযোগিতা তাকে নিয়ে চলেছে কাক্সিক্ষত গন্তব্যে। ছোট বেলায় চাচাত ভাই শিকলু ও মামা সোহেলের দেখানো স্বপ্ন বিশ্ববিদ্যালয় পড়তে হবে। সেই স্বপ্নই যেন তাকে ঘুমাতে দিত না ঠিকঠাক মত। সেই থেকে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। কষ্ট করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে এবার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণের সময়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে প্রথমবার ব্যর্থ হয় জাকিরুল। তবে থামেনি প্রচেষ্টা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হয়ে স্বপ্ন পূরণের অদম্য ইচ্ছায় দ্বিতীয় বারেরমত ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া। প্রাণান্তকর সেই প্রচেষ্টা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হল। কথাগুলো এভাবে বলছিলেন ইসলমামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যা- ব্যাংকিং বিভাগে ভর্তি হওয়া অদম্য মেধাবী জাকিরুল ইসলাম।

আজন্ম শারীরিক প্রতিবন্ধী জাকিরুলের জন্ম বগুড়া শিবগঞ্জ থানার নাগরবন্দর গ্রামে। বাবা ইউসুফ শেখ, মা মোছাঃ জাকিয়া বেগম। তিন ভাইয়ের মধ্যে জাকিরুল প্রথম। ছোটবেলা থেকেই তুখোর মেধা ও কঠোর পরিশ্রমী জাকিরুল। লেখাপড়ার হাতেখড়ি বগুড়ার শিবগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সহপাঠীরা যখন দৌঁড়ঝাঁপ করে সবার আগে স্কুলে চলে গেলেও প্রতিবন্ধী জাকিরের একমাত্র অবলম্বন ছিলো “লাঠি”। লাঠিতে ভর করে প্রায় দুই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যেত সে। প্রতিবন্ধী হলেও কখনো স্কুল কামাইয়ের রেকর্ড ছিল না তার। পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ দেখে বাবা-মার ইচ্ছা বেড়ে যায় তাকে নিয়ে। সন্তানকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে তারাও পেরেশানিতে পড়ে। জাকিরুলের মা জাকিয়া বেগম বলেন, “ছোট থেকে ওর গুণ ছিল পড়া ছাড়া কিছু বোঝে না। আমরা চেষ্টা করেছি তাকে পড়ালেখা শেখাতে।” প্রাথমিক স্কুলে প্রথম পাঁচ জনের মধ্যে থাকত তার অবস্থান। একটি পা না থাকলেও ছোট থেকেই সে ছিল চঞ্চল প্রকৃতির। অন্যসব সহপাঠীরমত আনন্দে প্রাথমিক বিদ্যালয় কাটিয়েছে। সহপাঠীরা যখন সুস্থ দেহ নিয়ে খেলা ধুলায় মত্ত থাকতো জাকির তখন তার অযোগ্যতাকে বই পড়ে কাটিয়ে দিত। আর তা দেখে শিক্ষক, বাবা-মা, প্রতিবেশীরা উৎসাহ প্রেরণা জুগিয়েছে তার লেখাপড়ায়। প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষে ভর্তি হয় বগুড়া শহরের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। দেড়শতাধিক শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রথম দশে তার স্থান। শিক্ষকদের ভালবাসা, সহপাঠীদের সহযোগিতা ছিল অকৃত্রিম। ২০০৮ সালে মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৪৪ পেয়ে কৃতিত্বের সাথে পাশ করে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে ভর্তি হয় বগুড়া আর্মড পুলিশ ব্যাটেলিয়ান স্কুল এ- কলেজের বাণিজ্য বিভাগে। ইচ্ছানুযায়ী বদলি হয়ে চলে যায় বগুড়া আজিজুল হক কলেজে। অসুস্থতা সত্ত্বেও ২০১০ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় বণিজ্য বিভাগ থেকে ৩.৭০ পেয়ে পাশ করে। শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির মিশন। প্রতিবন্ধকতাকে ঝেড়ে ফেলে ভর্তি হয় বগুড়া শহরে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিংয়ে। প্রথমবার সফল হতে না পারলেও হাল ছাড়েনি সে। ঝুঁকি নেয় দ্বিতীয়বারের জন্য। পরের বছর ২০১১ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে “জি ও এইচ” ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে দুই ইউনিটেই চান্স পায়। ভর্তি যুদ্ধে জয়লাভ করে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে জাকির ও তার মা-বাবা। মেধাবী এ জাকির ভর্তি হয় মেধা তালিকা থেকে। মিষ্টভাষী, মেধাবী, প্রতিবন্ধী জাকির এখন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ফিন্যন্স অ্যা- ব্যাংকিং বিভাগের ছাত্র। বিভাগীয় সভাপতি মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন, “আমরা তাকে প্রতিবন্ধী ভাবিনা। সে আমাদের মতই একজন। তার অদম্য প্রচেষ্টা সত্যই প্রশংসাযোগ্য। সে যেমনি মেধাবী তেমনি মিষ্টভাষী। তার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে অনেক কষ্ট হয়। তারপরও সে নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে। ওর কথা বিবেচনা করে নিচ তলায় একটি ক্লাস রুমের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছি। আমরা তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি”।

জাকিরুলের মা জাকিয়া বেগম বলেন,“ওর আন্তরিক চেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যেতে পেরেছে। ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক ভাবি। আল্লাহ যেহুত ওর একটি পা ছাড়াই সৃষ্টি করেছে তার উপর ভরসা করি। ও তো বসে থাকা ছাড়া কোন কাজ করতে পারবে না। সেজন্য একটা চাকরি পেলে ওর ভবিষ্যৎ যেমন ভাল হবে আমরাও একটু চিন্তমুক্ত হব।”

বন্ধুদের সাথে আনন্দে দিন কাটে তার। তাকে ছাড়া যেন বন্ধুদের আড্ডা পরিপূর্ণ হয় না। এক পা না থাকলেও তার যেন কোন আক্ষেপ নেই। জাকির বলেন “বন্ধুরাই আমার পূর্ণাঙ্গ।’ তার বন্ধু মোঃ ইমদাদুল হক বলেন, “সহপাঠী হিসেবে আমরা তাকে আমাদের মতই মনে করি। প্রথম থেকেই আমার সাথে তার অনেক বেশি সম্পর্ক।  আমাদের সাথে সে আড্ডায় অংশ নেয়। লেখাপড়ায় সকল সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। ওর মত বন্ধু পেয়ে আমরা অনেক খুশি।”

অদম্য মেধাবী জাকিরুলের স্বপ্ন এখন বিসিএস ক্যাডার হওয়ার। সেই লক্ষ্যে ছুটে চলা তার অবিরাম। তবে জন্ম প্রতিবন্ধী জাকিরুলের কণ্ঠে রয়েছে নানাবিধ সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত হওয়ার আক্ষেপ। জাকিরুল বলেন,“বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার মত আরও অনেক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী রয়েছে। আমরা সমতল ভূমিতে ঠিকমত চলতে পারিনা অথচ পায়ে হেঁটে চতুর্থ তলায় ক্লাস-পরীক্ষা দিতে হয় আমাদেরকে। যেটা আমাদের জন্য খুবই কষ্টসাধ্য। এছাড়া খাওয়া, গোসল, টয়লেট ইত্যাদি স্বাভাবিক কাজগুলোতে আমাদের কোন সুযোগ-সুবিধা নেই। 

তবে শারীরিক প্রতিবন্ধী জাকিরুল বলেন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ে দেশের বোঝা হতে চাইনা। সম্পদে পরিণত হতে চাই। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সু-নজরই পারে আমাদের ভবিষ্যৎ জীবনের আশা আকাক্সক্ষাকে প্রস্ফুটিত করতে। 

 তবিবুর রহমান আকাশ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ