ঢাকা, সোমবার 21 November 2016 ৭ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ২০ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ভূমিকম্প : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

আখতার হামিদ খান : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
ভূমিকম্প ঝুঁকি হ্রাস পরিকল্পনায় প্রত্যেকটি সংস্থার প্রয়োজনীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দায়িত্ব প্রদানের কোনো বিকল্প নেই। উদাহরণস্বরূপ কয়েকটি সংস্থার দায়িত্ব নিম্নরূপ প্রস্তাব করা যায় যেমন-
১। ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর :
- বর্তমান শহর এলাকা ও ভবিষ্যতের পরিকল্পিত শহর এলাকার জিওলজিক হেজার্ড ও ইঞ্জিনিয়ারিং জিওলজিক্যাল হ্যাজার্ড ম্যাপ প্রণয়ন।
- ভূমিকম্প ঝুঁকিহ্রাসে সকল কর্মসূচিকে তথ্য ও উপাত্ত সরবরাহকরণ।
- প্রাপ্ত ম্যাপসমূহের আপডেটিং।
- সকল প্রকাশনা ও কাজ সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থা ও ব্যক্তির সাথে Share করার জন্য প্রতিনিয়ত সেমিনার ও ওয়ার্কশপের ব্যবস্থা চালু রাখা ইত্যাদি।
২। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যুরো :
- ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর এবং অন্যান্য সকল সংস্থা থেকে প্রাপ্ত সকল ম্যাপ ও তথ্য উপাত্ত সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট পৌছানোর জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও ওয়ার্কশপের আয়োজন।
- দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপনের মাধ্যমে সকল স্তরের (পলিসি লেভেল থেকে শুরু করে নির্মাণ শ্রমিক পর্যন্ত) জনসাধারণের জন্য প্রশিক্ষণ নিশ্চিতকরণ।
- আবশ্যক (Life line) সরবরাহসমূহ যেমন- বিদ্যুৎ, গ্যাস ইত্যাদির নির বিচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ।
- দুর্যোগের সময় নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ।
- সঠিক ও যুগোপযোগী পরিকল্পনার মাধ্যমে ভূমিকম্প ঝুঁকি হ্রাস ও সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমানো।
- নিরাপদ ভবন নির্মাণ ও শহর পরিকল্পনায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহকে সহযোগিতা প্রদান।
- ঐতিহাসিক ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও অন্যান্য কাঠামো সংরক্ষণে এবং রেট্রোফিটিং ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহকে সহযোগিতা করা।
- ভূমিকম্প ঝুঁকিহ্রাসে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় সাধন করা।
- রেট্রোকিট ও রিপ্লেসমেন্ট-এর বিষয়ে প্রয়োজনীয় পুরস্কার ও তিরস্কারের ব্যবস্থা প্রদান।
- দুর্যোগ মোকাবেলা তহবিল গঠন করা।
- ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় নিম্নলিখিত বিষয়গুলো সংযোজন করা-
* জিও সাইন্স    * ভূমি ব্যবহার
* জরুরি সাড়া    * রিকভারি
* বর্তমান ভবনসমূহ    * নতুন কনস্ট্রাকশন
* জরুরি সেবাসমূহ    * রাস্তাঘাট ও ব্রিজ
* পূর্ব প্রস্তুতি
অনুরূপভাবে সকল সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের দায়িত্ববণ্টনসহ একটি কার্যকরী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু না হলে বিভিন্ন সংস্থার কাজে এবং অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো বাদ পড়বে এবং অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ কাজে অনেক মূল্যবান সময় ক্ষেপণ হবে।
বাংলাদেশ ভূমিকম্প : গুরুত্বপূর্ণ তিন প্রসঙ্গ :
বাংলাদেশ বড় মাত্রার ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে এমন আশংকার কথা দেশি বিদেশি ভূমিকম্প-বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে নিকট বছরগুলোতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বার বার এসেছে। আজকের বাংলাদেশের সীমানায় ভূমিকম্প ঘটার ইতিহাস মোটেই সুখকর নয়। গত ১৫০ বছরে রিখটার স্কেলে ৭.০ থেকে ৮.৭ মাত্রার যে সাতটি ভূমিকম্প দ্বারা আজকের বাংলাদেশের ভূখ- কম্পিত হয় তার মধ্যে ১২ জুন ১৮৯৭ সালে আসাম বেসিনে ঘটা ৮.৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি ছিল পৃথিবীতে এ পর্যন্ত ঘটা একটি অন্যতম মহাপ্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প। ভূগর্ভস্থ টেকটনিক প্লেটের বৈশিষ্ট্যে এটাই লক্ষণীয় যেখানে একবর ভূমিকম্প ঘটে সেখানে কোনো এক রিটার্ন পিরিয়ডে আবারও ওই একই মাত্রার ভূমিকম্প ঘটতে পারে। তাছাড়া (১) বাংলাদেশ ও আশপাশ ঘিরে চারটি সক্রিয় চ্যুতির উৎস অঞ্চল অবস্থান করছে, (২) নব্বই দশকের শেষের দিকে সিলেট, চট্টগ্রাম ও মহেশখালীতে তিনটি নি¤œ-মধ্য মাত্রার ভূমিকম্প ঘটে ভবন বিধ্বস্ত ও প্রাণবিয়োগের মতো ঘটনা ঘটেছে, (৩) আন্তর্জাতিক ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় পার্শ্ববর্তী দেশের সাথে বাংলাদেশেও বড় মাত্রায় কম্পিত হবার আশংকা পাওয়া গেছে, এবং (৪) ইদানীং বারবার ছোট মাত্রার কম্পন হয়ে চলছে, যাকে বড় মাপের ভূমিকম্পের আগাম বার্তাও বলা যেতে পারে।
গত দশ বছরে বাংলাদেশ ছোট বা মধ্য মাত্রার ভূমিকম্পে প্রায় ৩০০ বার কেঁপেছে। বাংলাদেশও যে একটি ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ, এই বাস্তবতার উপলব্ধি আমাদের মধ্যে অনুপস্থিত থাকার সবচেয়ে বড় কারণ হল- বর্তমানে যাদের বয়স ৭৫ বছর তারা পর্যন্ত এ দেশে বড় মাত্রার ভূমিকম্প এখনও প্রত্যক্ষ করেনি। অথচ বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা যেখানে কোটি লোকের বাস সেই ঢাকাকে (১) ভূমিকম্প হবার সম্ভাবনা বা এক্সপোজার, (২) ভূমিকম্পের দুর্যোগ বা হ্যাজার্ড, (৩) ভূমিকম্পের ঝুঁকি বা ভালনারেবিলিটি এবং (৪) ভূমিকম্প ঘটার পরে উদ্ধারকাজ বা রেসকিউ এই চারটি সূচক-এর ওপর ভিত্তি করে পৃথিবীর ২০টি শহরের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ শহর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জাপানের-টোকিও শহরে ভূমিকম্প হবার সম্ভাবনা ঢাকার চেয়ে অনেক বেশি কিন্তু টোকিও শহর ওই বিশটি শহরের মধ্যে নেই। তার কারণ টোকিওর প্রস্তুতি ও সচেতনতা অতি উচ্চমানের। ব্যাপারটি এরকম- কোনো এক ধনীর বাড়িতে ডাকাতি হবার সমূহ সম্ভাবনা সবাই থাকলেন সচেতন। ফলে ওই বাড়িতে ডাকাত এলেও ডাকাতি করার সুযোগ পাবে না। অন্য একজন মধ্যবিত্তের বাড়িতে ডাকাতি হবার সম্ভাবনা তেমন নেই মনে করে বাড়ির মালিক আত্মরক্ষামূলক কোনো ব্যবস্থা নিলেন না। ফলে ওই বাড়িতে সহজেই ডাকাতি হতে পারে।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থানটা হচ্ছে শেষোক্ত উদাহরণটির মতো। বাংলাদেশের অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় না এ দেশে সাধারণ জনগণ, এমনকি অনেক প্রকৌশলী এবং রিয়াল স্টেট ডেভলপারের মধ্যেও ভূমিকম্প বিষয়ে সচেতনতা আছে। যেমন আবাসিক ভবনগুলোর সবচেয়ে নিচের তলায় কার পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে গিয়ে ওই তলার বাইরের কলামগুলোকে আরসিসির শেয়ার ওয়াল বা ব্রেসিং দ্বারা যুক্ত করতে দেখা যায় না। যার ফলে ওই তলাগুলো দুর্বল তলার (সফট স্টোরি) ত্রুটি নিয়ে নির্মিত হচ্ছে। আবার আরসিসির বিম ছাড়া শুধু স্লব (ফ্লাট প্লেট) দ্বারা এখনও অনেক আবাসিক ভবন নির্মিত হতে দেখা যায় না ভূমিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশে ১৯৯৩ সালে তৈরি হওয়া বিল্ডিং কোডে আমেরিকার ইউনিফর্ম বিল্ডিং কোড অনুসরণ করে সাইজমিক ডিজাইনের গাইডলাইন দেয়া হয়েছে। এদেশের ডিজাইনাররা খুব বেশি হলে এই গাইডলাইনের ওপর ভিত্তি করে সাইজমিক ডিজাইন করছেন। কিন্তু বেশির ভাগ আবাসিক ভবন ভূমিকম্পের দৃষ্টিকোণ থেকে উল্লিখিত দুটি ত্রুটিসহ নির্মাণ করতে দেখা যায়। তাই বিল্ডিং কোড সঠিকভাবে মেনে চলার আগে কোডকে আত্মস্থ করা অত্যন্ত জরুরি কাজ।
১২ মে ২০০৮ চায়নার সিচুয়ান প্রদেশে রিখটার স্কেলে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্পটি প্রায় এক লাখ জীবন কেড়ে নিয়েছে। অনেক স্কুলভবন ধ্বংস হয়ে হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী মারা গেছে। অকে পরিবার সন্তানহারা হয়েছে।
ভেঙে পড়া সেই সব স্কুলভনগুলোর নির্মাণে নিম্নমানের কংক্রিট এবং রডের পরিমাণ অনেককম ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ভবন নির্মাণে বড় ধরনের কারচুপির অভিযোগ এসেছে: ভূমিকম্পটি না ঘটলে এই কারচুপির বিষয়টি জনসমক্ষে আসত না। এমনিভাবে ভূমিকম্পের পরে ভবন নির্মাণে কারচুপি ছিল, ডিজাইনে ভুল ছিল, নির্মাণকালে কাজ ঠিকমতো হয়নি-সহ অনেক বিষয় যদিও বেরিয়ে এসেছে কিন্তু ক্ষতি যা হবার তা তো হয়েই গেছে।
বাংলাদেশে সর্বসাধারণের মাঝে ভূমিকম্প বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য বছরের একটি দিন ভূমিকম্প দিবস ঘোষণা করা দরকার। দিবসটি হতে পারে ১২ জুন। অন্য কোনো দিনও হতে পারতো। তবে যতদূর জানা যায় ১৮৯৭ সালের ১২ জুনের ভূমিকম্পে এ দেশ বা অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দি গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক নামে পরিচিত এ ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ২৩০ কিমি দূরে সিলেটের কাছে আসামে। ভূমিকম্পটি ঘটেছিল বিকেল ৫ টা ১১ মিনিটে। উৎপত্তি হয়েছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ৩২ কিমি গভীরে। প্রায় চার লাখ বর্গ-কিমি জুড়ে প্রলয়ঙ্করী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। প্রাণ হারায় ১৫৪২ জন লোক। আসাম, ত্রিপুরা, ধুবরি, শিলং, পূর্ববঙ্গ ইত্যাদি অঞ্চল বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন বিশেষ করে লন্ডন টাইমস ১৪ জুন থেকে ১০ আগস্টের মধ্যে ৭টি সংখ্যা এবং নিউইয়র্ক টাইমস ১৪ জুন এই ভূমিকম্পটির বিষয়ে রিপোর্ট করেছিল। মডিফাইড মার্কারি ইন্টেনসিটি স্কেলে যে রোমান বারোটি স্কেল আছে, ঢাকা শহর কেঁপেছিল তার অষ্টমতম স্কেলে। ঢাকার থেকে বেশি মাত্রায় কেঁপেছিল সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর এবং এসব শহর বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দিনাজপুরের কাস্তজির মন্দির, নাটোরের রাজবাড়ির একাংশ, ত্রিপুরার রাজবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছিল এই কাঠামো ডিজাইনের বিষয়টিতে হেরফের হতে পারে। বাংলাদেশে এমন কিছু নিয়ম-কানুন নিয়ে একটি নির্দেশিকা বা বিল্ডিং কোড ১৯৯৩ সালে তৈরি হয়েছিল। কাঠামো ডিজাইনে ভূমিকম্পের পার্শ্বশক্তি সম্পৃক্ত করতে মূলত আমেরিকার কোড অনুসরণ করে তৈরি হওয়া বাংলাদেশের বিল্ডিং কোডটি অনেক কাঠামো-প্রকৌশলীই অনুসরণ করছেন বলে মনে হয়। তবে কোড সঠিক নির্দেশনা দিলেও কোডকে সঠিকভাবে আত্মস্থ না করার কারণে ত্রুটিপূর্ণ ভবন নির্মাণ হয়েই চলেছে। ৭-৮ ইঞ্চি পুরু আরসিসির ফ্লাট প্লেট দ্বারা নিচুতলা ভবন (যেমন ছয় তলা) নির্মাণ এর একটি বড় উদাহরণ।
এই সব নিচুতলা ভবনের কলামগুলোর আকার কমবেশি ১০’ ২৫ বর্গ-ইঞ্চি। ভূমিকম্পের সময় এই কলামগুলো বিশাল আকারের প্লেট দ্বারা কর্তনীয় ও বক্রনীয় উভয় পীড়নে আক্রান্ত হবে। ভূমিকম্পের মুহূর্তে পুরু প্লেটের বেশি মাত্রার ভর বেশি মাত্রার পার্শ্ব শক্তি সঞ্চালন করে পুরো ভবনই কর্তনীয় পীড়ন দ্বারা ধরাশায়ী করতে চাইবে। আবার বিম না থাকার ফলে ভূমিকম্পের মুহূর্তে বিশাল আকারের ফ্লাট প্লেটের শতকরা ৭০ ভাগ যেহেতু বিমের ন্যায় কাজ করবে সেহেতু উহার বক্রনীয় পীড়ন কলামের বক্রনীয় পীড়নের চেয়ে অনেক বেশি হবে। অথচ বিমের চেয়ে কলামের বক্রনীয় পীড়ন শতকরা ২০ ভাগ বেশি থাকতে হবে বলে কোড নির্দেশ করে। তা সত্ত্বেও ফ্লাট প্লেট দ্বারা ভবন নির্মাণ করা এবং এ ধরনের ভবন জনপ্রিয়তা পাবার বড় কারণ (ক) বাড়ির কক্ষগুলো ইচ্ছে মতো বিন্যাস করা যায়, (খ) বিম না থাকাতে দেখতে ভালো লাগে এবং (গ) নির্মাণ সময় কম লাগে যেহেতু ফ্লাট প্লেটের ফর্মওয়ার্ক করা বা আরসিসির ঢালাই দেয়া সহজ হয়। এসব ইউটিলিটির দৃষ্টিকোণ থেকে জনপ্রিয়তা পেলেও ভূমিকম্পের দৃষ্টিকোণ থেকে এমন ভবন ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশে আবাসিক ভবনে গাড়ি রাখার তলাটি সাধারণত দুর্বল তলা হিসেবে নির্মিত হতে দেখা যায়। কারণ এই তলাটিতে পার্শ্ববর্তী দুটি কলাম একটি আর একটির সাথে গুণ চিহ্ন আকারের ব্রেসিং বা শেয়ার ওয়াল দ্বারা সংযুক্ত করতে খো যায় না। অথচ ভূমিকম্পের মুহূর্তে ভবনের সর্বনিম্ন তলাটি অন্য সব তলার চেয়ে বেশি মাত্রার কর্তনীয় ও বক্রনীয় উভয় পীড়ন দ্বারা আক্রান্ত হয়।
এমন সব ত্রুটি নিয়ে ক্রমগাত ভবন নির্মাণ করার যে ধারা সেটা অব্যাহতভাবে চলতে পারে না। যেগুলো নির্মিত হয়েছে সেগুলোতে থাকা দুর্বল দিকগুলোকে রেট্রফিটিং এর মাধ্যমে ঠিকঠাক করা সম্ভব। রেট্রফিটিং করতে অতিরিক্ত কলাম তৈরি করা, নির্মিত কলামকে শক্তিশালী করা, পার্শ্ববর্তী দুটি কলামকে গুণ চিহ্ন আকারের আরসিসির ব্রেসিং বা শেয়ার-ওয়াল দ্বারা সংযুক্ত করার মধ্য দিয়ে ত্রুটিগুলো সমাধান করা যেতে পারে। জাপানের কোবে শহরে ১৯৯৫ সালে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পের পর সে দেশের দুর্বল স্থাপনাগুলো রেট্রফিটিং করা হয়েছে। ভূমিকম্প সহনশীল কাঠামো নির্মাণ শুধু জাপান, মেক্সিকো, আমেরিকা, তাইওয়ান বা চায়নার বিষয়ই নয় বাংলাদেশেরও বিষয়। বাংলাদেশিদের মধ্যে এই উপলব্ধি যত তাড়াতাড়ি গড়ে উঠবে ততই মঙ্গল।
তিন
২০০১ সালে গুজরাটের ভূমিকম্প, ২০০৪ সালে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায় ভূমিকম্প-সুনামি এবং ২০০৫ সালে কাশ্মিরে ভূমিকম্পের পর বাংলাদেশে ভূমিকম্পের বিষয়টি নিয়ে গবেষলদের মধ্যে কিছুটা আগ্রহ বাড়লেও সচেতনতা মোটেই বাড়েনি। অথচ ভূমিকম্পে প্রস্তুতি আর সচেতনতা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে মানুষ ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি বহুলাংশে কমিয়ে আনতে পারে।
ঢাকাসহ যে শহরগুলোতে মিটার ছাড়া গ্যাসের লাইন আছে সেখানেই অকারণে গ্যাসের চুলা সর্বক্ষণ জ্বালিয়ে রাখা হয় বলে তিতাস গ্যাস সূত্রে জানা যায়। বাংলাদেশিদের অনেক নেতিবাচক ঐতিহ্যের মধ্যে এটি একটি গ্যাস পানি বিদ্যুৎ ইত্যাদি সাশ্রয় করে খরচ করা আদর্শের প্রতীক, কৃপণতা নয়। অথচ গ্যাসের চুলা সর্বক্ষণ জ্বালিয়ে রাখে কেমন দেশপ্রেম।
কিন্তু সমস্যা বা আশঙ্কা অন্যখানে। একটি বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ফলে বড় মাত্রার ঝাঁকুনি হলে ওই মুহূর্তে যদি একটি বাড়ির গ্যাসের চুলা জ্বালানো অবস্থায় থাকে তবে মুহূর্তে বাড়িটিতে আগুন লেগে যেতে পারে। তা হলে শুধু ঢাকাতেই তিতাসের দেয়া সাড়ে সাত লাখ গ্যাসের লাইনের অর্ধেক যদি জ্বালানো অবস্থা থাকে; তাহলে কী অবস্থার সৃষ্টি হতে সেটা ভাবতে গেলেও স্তম্ভিত হতে হবে। কাজেই ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা যেহেতু অসম্ভব, তাই সব ধরনের সতর্কতামূলক কর্ম-পরিকল্পনাই পারে আমাদের জান-মালের ক্ষয়-ক্ষতি কমিয়ে রাখতে।
ক. আপনি যদি ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাস করেন তাহলে নি¤েœর নির্দেশাবলী মেনে চলুন :
১. ভূমিকম্প কিভাবে এবং কেন হয় জানুন। ভূমিকম্প পরিণতি কী হবে জানুন।
২. আপনি যে বিল্ডিং অথবা বাসায় বসবাসরত আছেন তা ভূমিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কিনা জেনে নিন। এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার/ স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারের সহায়তা নিন।
৩. আপনার ছেলে/ মেয়েকে যে স্কুল পাঠাছেন, ঐ বিল্ডিং এর ভূমিকম্প-রোধ ক্ষমতা আছে কিনা খোঁজ নিন।   
৪. যদি ভূমিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়, তাহলে ঐ বিল্ডিং অথবা বাসা ত্যাগ করুন।
৫. ভূমিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিল্ডিং এর মেরামত অথবা কাঠামোগত শক্তিবৃদ্ধি করুন। এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার/ স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারের পরামর্শ নিন।
৬. অতি ঝুঁকিপূর্ণ বিল্ডিং অথবা স্থাপনাসমূহ ভেঙে ফেলুন।
৭. টর্চলাইট ও রেডিও এমন একস্থানে রাখুন যাতে সহজেই ভূমিকম্প দুর্যোগের সময় পাওয়া যায়।
৮. ঘরের ফার্নিচার নির্দিষ্ট জায়গায় গুছিয়ে রাখুন। চলাচলের জায়গায় ফার্নিচার রাখবেন না।
৯. মূল্যবান জিনিসপত্র যেমন: টেলিভিশন, কম্পিউটার, গ্যাস সিলিন্ডার, ফাইল কেবিনেট, বুককেইস ভালোভাবে শক্ত জিনিসের সাথে বেঁধে রাখুন।
১০. পরিবারের সবাইকে বৈদ্যুতিক মেইন সুইচ ও গ্যাসের সুইচ কিভাবে বন্ধ করতে হয় জানিয়ে রাখুন।
১১. যদি সম্ভব হয়, আগুন নেভানোর যন্ত্র প্রতি ঘরে একটি করে রাখুন।
১২. প্রতি ঘরে প্রয়োজনমতো মাথায় পরার হেলমেট নির্দিষ্ট জায়গায় রাখুন।
১৩. ঘরে একটি ৪ ফুট ´ ৬ ফুট লোহার টেবিল রাখুন। ভূমিকম্পের সময় পরিবারের সবাই উক্ত টেবিলের নিচে আশ্রয় নিন।
খ. ভূমিকম্পের সময় কী করবেন :
১. শান্ত থাকুন ও অন্যদের শান্ত রাখুন।
২. দরজার দিকে দৌড় দিবেন না।
৩. লিফট ব্যবহার করবেন না।
৪. শান্তভাবে হাঁটুন।
৫. বিদ্যুৎ চলে যেতে পারে, টর্চ ব্যবহার করুন।
৬. যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হতে পারে, সজাগ থাকুন।
৭. মাথায় হেলমেট দিয়ে দরজার নিচে অথবা লোহার টেবিলের নিচে আশ্রয় নিন।
৮. মাটির বাড়ি থেকে যত সম্ভব দূরে থাকুন।
গ. রাস্তায় থাকলে কি করবেন :
১. খালি জায়গায় হাঁটুন, শান্ত থাকুন এবং সজাগ থাকুন।
২. দৌড় দেবেন না।
৩. ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িঘর থেকে দূরে থাকুন।
৪. মাটির বাড়ির থেকে নিরাপদ জায়গায় চলে আসুন।
৫. পুরাতন বিল্ডিং থেকে দূরে থাকুন।
৬. বৈদ্যুতিক তার থেকে দূরে থাকুন।
৭. ঢালু জায়গা বা দেওয়াল থেকে দূরে থাকুন।
ঘ. চলন্ত গাড়ি বা গাড়ি চালানোর সময় কী করবেন :
১. চলন্ত গাড়ি বন্ধ করে রাখবেন।
২. খোলা জায়গায় গাড়ি বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকুন।
৩. বৈদ্যুতিক তার থেকে দূরে গাড়ি পার্কিং করুন।
৪. দেয়ালের পাশে বা গাছের নিচে গাড়ি পার্কিং করবেন না।
ঙ. ভূমিকম্পের পরে কী করবেন:
১. শান্ত থাকুন, রেডিও খোলা রাখুন এবং যদি মোবাইল থাকে তাহলে নিকটস্থ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ করুন ও রেডিওর নির্দেশ মেনে চলুন।
২. সাগর অথবা নদীর পারে থাকবেন না। সাগর অথবা নদীর পানিতে বন্যা (সুনামি হতে পারে)।
৩. মনে রাখবেন ভূমিকম্প একবার আসে না। পরপর অনেকবার ভূমিকম্প হতে পারে এবং কয়েকদিন পর্যন্ত।
৪. গ্যাস লাইন ও ইলেকট্রিক লাইন বন্ধ রাখুন।
৫. সিগারেটের আগুন অথবা কোনো ধরনের লাইটার জ্বালাবেন না। গ্যাস অথবা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের জন্য আগুন লেগে যেতে পারে।
৬. যদি আগুন লেগে যায়, তাহরে তা নিবারণের ব্যবস্থা নিন।
৭. যদি কোনো লোক মারাত্মকভাবে আহত হয়, তাহলে নিকটস্থ হাসপাতালে পাঠাবার ব্যবস্থা নিন।
৮. জরুরিভিত্তিতে ধ্বংসাত্মক দাহ্য জিনিসপত্র পরিষ্কার করুন।
৯. যদি আপনি জানেন যে, কোনো লোক বিল্ডিং অথবা জিনিসের নিচো চাপা পড়েছে তাহলে উদ্ধারকর্মীদের সহায়তা নিন। দৌড়াদৌড়ি করবেন না। তাতে আপনি ও আহত ব্যক্তির অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে।
১০. ছেঁড়া বৈদ্যুতিক তার থেকে দূরে থাকুন।
১১. খোলা বোতল থেকে অথবা ছাঁকুনি ছাড়া পানি পান করবেন না।
১২. আপনার বাড়ি যদি মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঐ বাড়িতে আর ঢুকবে না।
১৩. বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য ও সাধারণ ঔষধ সাথে রাখুন।
১৪. কখনও ক্ষতিগ্রস্ত ঝুঁকিপূর্ণ বিল্ডিং এ ঢুকবেন না।
১৫. আশেপাশে কী হয়েছে দেখার জন্য রাস্তায় হাঁটবেন না।
১৬. উদ্ধারকর্মীদের গাড়ি/ যন্ত্রপাতি চলাচলের জন্য আপনার পাশের রাস্তা পরিষ্কার রাখুন।
চ. এ মুহূর্তে সরকারের করণীয় কী :
১. প্রতি গ্রাম, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে একটি ভূমিকম্প দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের শাখা খুলতে হবে।
২. অনতিবিলম্বে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে ভূমিকম্প-পরবর্তী তাৎক্ষণিক চিকিৎসার জন্য সক্রিয় করতে হবে।
৩. প্রধান হাসপাতালগুলোতে ভূমিকম্প-পরবর্তী চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৪. প্রতি গ্রাম, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে আগাম পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রীর ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. ঝুঁকিপূর্ণ বিল্ডিংগুলো থেকে জনসাধারণের বসবাস ও আনাগোনা বন্ধ রাখতে হবে। সম্ভব হলে ঐ বিল্ডিংগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করে সীল করে দিতে হবে।
৬. কর্ণফুলি ও হালদা নদীর উপর ৩টি সেতু মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। ভূমিকম্পের ফলে যদি  ঐসব সেতু ভেঙে যায়, তাহলে বিকল্প পর্যাপ্ত পরিমাণ ফেরি দিয়ে ভূমিকম্প-পরবর্তীতে আহত লোকজন আনা-নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
৭. প্রতি গ্রামে, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধারকাজের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধারকর্মী ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আগাম মজুদ রাখতে হবে।
৮. প্রতি উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৯. রেডিও, টেলিভিশন ও দৈনিক পত্রিকাতে ভূমিকম্পের আগে ও পরে করণীয় তথ্যাদি প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে।
১০. তৈলশোধনাগারগুলোকে অনতিবিলম্বে ভূমিকম্পরোধক নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
১১. চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরে অবস্থিত অবকাঠামো যেমন: জিনিসপত্র উঠানামার ক্রেন, কনটেইনার হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতি, গোডাউন ইত্যাদির ভূমিকম্পরোধক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
১২. বিমান-বন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ার ও নিয়ন্ত্রণকক্ষ ভূমিকম্পরোধক করতে হবে।
১৩. দেশের প্রায় ব্যাংকের প্রধান ও শাখাগুলো ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ বিল্ডিং-এর মধ্যে অবস্থিত। অনতিবিলম্বে প্রত্যেক ব্যাংকের প্রধান অফিস ও শাখাগুলোর সকল তথ্যাদি, দলিলাদি, রেকর্ডসমূহের এক কপি নিরাপদে সংরক্ষণের নির্দেশ দিতে হবে যেন কোনো ধরনের মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন না হয়।
১৪. দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইনের নিয়ন্ত্রণগুলোতে সার্বক্ষণিক সতর্কতা বজায় রাখার নির্দেশ দিতে হবে।
১৫. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের সার্বক্ষণিক সতর্কতা অবলম্বন করার নির্দেশ দিতে হবে।
১৬. ভূমিকম্প থেকে বাঁচার জন্য গ্রামে, মহল্লায়, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে নির্দেশনাবলী সম্বলিত পোস্টার ও পুস্তিকা প্রকাশের ব্যবস্থা নিতে হবে।
১৭. পর্যায়ক্রমে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের ভূমিকম্প দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করতে হবে।
১৮. ভূমিকম্প-পরবর্তী দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে।
১৯. দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের ঠিকানা, টেলিফোন নম্বর ইত্যাদি আগাম জনসাধারণের কাছে জানাতে হবে।
২০. চট্টগ্রাম শহর ও তার আশেপাশের স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা ভবনগুলো অত্যন্ত ভূমিকম্প-নিরাপদ ভবন তৈরির ব্যবস্থা নিতে হবে।
২১. যে সব হাসপাতাল ও ক্লিনিক ভবনগুলোর ভূমিকম্প-প্রতিরোধক ব্যবস্থা নেই অনতিবিলম্বে উক্ত ভবনগুলোর ভূমিকম্প-প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
২২. শিল্পকারখানাগুলো বিশেষ করে যে ভবনগুলোতে গার্মেন্টস শিল্প অবস্থিত, সে গুলো মোটেও ভূমিকম্প  প্রতিরোধ পরিকল্পনা ও ডিজাইন অনুযায়ী করা হয় নাই। অনতিবিলম্বে উক্ত ভবনগুলো থেকে শিল্পকারখানা সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
২৩. সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে বসবাসরত লোকদের নিরাপদ আবাসের ব্যবস্থা করা। যাতে করে ভূমিকম্প-সুনামি সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা হ্রাস পায়।
২৪. গ্রাম অঞ্চলে মাটির বাড়ি, ইটের বাড়ি তৈরির প্রবণতা বেশি। ঐ সব বাড়ি তৈরিতে প্রকৌশলগত নকসা প্রণয়ন করে বাংলাভাষায় প্রচার ও বিলির ব্যবস্থা নেওয়া।
ছ. ভূমিকম্প বিষয়ক পরামর্শ :
১. বাড়িঘরের ভিত ও কাঠামো শক্ত করে তৈরি করুন এবং তৈরির সাথে মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করুন।
২. বিল্ডিং কোড মেনে চলুন এবং ভবন তৈরির সময় পুর প্রকৌশলীর পরামর্শ নিন।
৩. ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য একাধিক পথ রাখুন।
৪. ভূমিকম্পের সময় ঘরের দরজা খুলে দিন।
৫. নরম মাটি বা গর্তের উপর ভবন নির্মাণ করতে হলে পুরপ্রকৌশলীর পরামর্শ মোতাবেক করবেন।
৬. ভূমিকম্পের সময় দ্রুত বৈদ্যুতিক সুইচ, গ্যাসের চুলা বন্ধ করুন।
৭. হেলমেট কিনে রাখুন ও ভূমিকম্পের সময় মাথায় দিন।
৮. ভূমিকম্পের সময় ঘরে না থেকে পার্শ্ববর্তী খোলা মাঠে আশ্রয় নিন।
৯. ভূমিকম্পের সময় ঘরে থাকলে শক্ত খাট, লোহার টেবিল ইত্যাদির নিচে আশ্রয় নিন।
১০. ভূমিকম্পের সময় গাছের নিচে আশ্রয় নেবেন না।
১১. ভূমিকম্পের সময় দেয়ালনির্ভর ঘরের কোণে আশ্রয় নিন এবং কলামনির্ভর ঘরে কলামের গোড়ায় আশ্রয় নিন।
১২. ভূমিকম্পের সময় সাহস ও মনোবল অটুট রাখুন।
১৩. মনে রাখবেন, ভূমিকম্প মানুষ মারে না কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ ভবনই মানুষের মৃত্যু ঘটায়।
নতুন বিল্ডিং বা কাঠামো নির্মাণ করার ক্ষেত্রে :
১. যে কোনো বিল্ডিং এর নকশা তৈরি করার পূর্বেই স্ট্রাকচারাল নকসার দিকগুলোর নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে সঠিক স্ট্রাকচারাল নকসা না হলে ভূমিকম্পরোধক বিল্ডিং হবে না।
২. বিল্ডিং ডিজাইনের আগেই অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা মাটির গুণাগুণ বিশ্লেষণ ও মাটির ধারণাক্ষমতা নির্ভুলভাবে নির্ণয়পূর্বক রিপোর্ট তৈরি করতে হবে।
৩. বিল্ডিং নির্মাণের সময় অভিজ্ঞ সিভিল পুর ইঞ্জিনিয়ারদের তদারকি রাখতে হবে যাতে গুণগতমান ঠিক থাকে।
৪. সঠিক মানের সিমেন্ট, রড, বালি ইত্যাদি ব্যবহার হচ্ছে কিনা দেখতে হবে। যেন কংক্রিটের মিকসার কোনো অবস্থাতেই ৩০০০ পিএসআই-এর নিচে না আসে। তার জন্য সার্বক্ষণিকভাবে সাইটে নিযুক্ত সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের দ্বারা কিউব অথবা সিলিন্ডার টেস্ট করাতে হবে।
৫. উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন রড পরীক্ষা করে ব্যবহার করতে হবে, যাতে করে রডের ক্ষমতা ৬০,০০০ পিএসআই-এর কাছাকাছি থাকে।
৬. বর্তমানে যে হাবে H, L, T, Y, U সাইজের বিল্ডিং এর নকসা করে দালান তৈরি হচ্ছে এতে ভূমিকম্পের ফলে দুর্ঘটনার প্রবল ঝুঁকি থাকবে। আপনার বিল্ডিং যতই সোজা ও সরল হবে যেমন মোটামুটি বর্গাকার, আয়তাকার নকসা, ততই ভূমিকম্পরোধ শক্তি বেশি হবে। যদি আপনার বিল্ডিং এর জায়গামতো নকসা সরল বা সোজা না হয়, তাহলে ত্রি-মাত্রিক ডাইনামিক বিশ্লেষণ করে বিল্ডিং ডিজাইন করতে হবে।
৭. বিল্ডিং এর প্লান ও এলিভেশানে দুইদিকই সমতা থাকতে হবে।
৮. বেশি লম্বা প্লানের বিল্ডিং করবেন না। দরকার হলে এক্সপানশান ফাঁক রাখতে হবে।
৯. বেশ চিকন ও উঁচু বিল্ডিং এর পাশ হঠাৎ করে কমাবেন না। যদি কমাতে হয় তাহলে ত্রিমাত্রিক ডাইনামিক বিশ্লেষণ করে ডিজাইন করতে হবে।
১০. বিল্ডিং এর উচ্চতা/ পাশের মাপ ৪ গুণের অধিক করলেই ত্রি-মাত্রিক ডাইনামিক বিশ্লেষণ করে ডিজাইন করতে হবে।
১১. ‘সেটব্যাক’ বা হঠাৎ করে বিল্ডিং এর পাশের মাপ কমাবেন না। যদি করতেই হয় তাহলে ত্রি-মাত্রিক বিশ্লেষণ করে ডিজাইন করতে হবে।
১২. জঠিল কাঠামোগত প্লানের জন্য অবশ্যই ত্রি-মাত্রিক ভূমিকম্প বিশ্লেষণ করে ডিজাইন করতে হবে।
১৩. ‘শেয়ার ওয়াল’ বা কংক্রিটের দেয়াল সঠিক স্থানে বসিয়ে ভূমিকম্পরোধ শক্তির পরিমাণ বাড়াতে হবে।
১৪. সাম্প্রতিক সময়ে যে হারে Flat Plate Building System (বিম ছাড়া কলাম ও স্লাব) বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে, তা মাঝারি ধরনের ভূমিকম্প হলেই তার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হবে। সুতরাং বিম, কলাম ও ছাদবিশিষ্ট বিল্ডিং তৈরি করতে হবে।
১৫. প্রত্যেক ইঞ্জিনিয়াকে “বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড- ১৯৯৩” অনুসরণ করে বিল্ডিং এর প্লান/ ডিজাইন করে ভূমিকম্পরোধক বিল্ডিং তৈরি করতে হবে।
১৬. নিচের তলায় পার্কিং এর জন্য খালি রাখতে হলে, ঐ তলার পিলারগুলো বিশেষভাবে ডিজাইন করতে  হবে। প্রয়োজনমতো কংক্রিটের দেয়াল দিয়ে পিলারগুলোতে বেষ্টনী করতে হবে।
১৭. বিল্ডিং এর ‘বিমের’ থেকে ‘পিলারের’ শক্তি বেশি করে ডিজাইন করতে হবে। কমপক্ষে ২০% বেশি করতে হবে।
১৮. মাটির গুণাগুণের ওপর ভিত্তি করে যথাযথ ফাউন্ডেশান প্রকৌশলগতভাবে যাচাই/ বাছাই করে ডিজাইন করতে হবে।
১৯. ৫ ইঞ্চি ইটের দেয়ালগুলো ভূমিকম্পের জন্য আদৌ নিরাপদ নয়। তাই এই দেয়ালগুলো ছিদ্রযুক্ত ইটের ভিতরে চিকন রড দিয়ে আড়াআড়ি ও লম্বালম্বিভাবে তৈরি করে ‘লিন্টেলের’ সাথে যুক্ত করে দিতে হবে। সর্বদিকে ‘লিন্টেল’ দিতে হবে। বিশেষ করে দরজা/ জানালার খোলা জায়গায় চিকন রড দিয়ে ৫ ইঞ্চি ইটের দেয়াল যুক্ত করতে হবে।
২০. মনে রাখতে হবে নতুন বিল্ডিং নির্মাণে ভূমিকম্প প্রতিরোধ নিয়মাবলী প্রয়োগ করলে, শুধুমাত্র ২-৩% নির্মাণ খরচ বৃদ্ধি পায়।
পুরাতন বিল্ডিং/ ভূমিকম্পের জন্য ডিজাইন ছাড়া বিল্ডিং এর ক্ষেত্রে :
১. অভিজ্ঞ প্রকৌশলী দ্বারা বিল্ডিংগুলোর ভূমিকম্প-প্রতিরোধ ক্ষমতা পরীক্ষা করতে হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে আসল নির্মাণ খরচের অতিরিক্ত ৫০-৬০% খরচ লাগতে পারে।
২. অভিজ্ঞ প্রকৌশলীর পরামর্শে প্রয়োজনমতো প্রকৌশলগতভাবে ব্যবহারযোগ্য বিল্ডিং এর শক্তি বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে ভূমিকম্পের সময় ভেঙে না পড়ে।
৩. ব্যবহার-অযোগ্য/ ঝুঁকিপূর্ণ বিল্ডিংগুলো অনতিবিলম্বে খালি করে ভেঙে ফেলতে হবে।
৪. অনতিবিলম্বে যেসব স্থানে প্রচুর লোকের সমাগম ও অতিপ্রয়োজনীয় যেমন- হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়, ধর্মীয় স্থান, ড্যাম, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন কেন্দ্র, পেট্রোলিয়ামজাত আধার, গুরুত্বপূর্ণ ব্রীজগুলোর প্রকৌশলগত কাঠামোর শক্তি পরীক্ষা করে ভবিষ্যতে ভূমিকম্পের জন্য শক্তি বৃদ্ধি করার প্রকল্প হাতে নিতে হবে। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ