ঢাকা, সোমবার 07 November 2016 ২৩ কার্তিক ১৪২৩, ৬ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মংলা বন্দর অচল করে দেয়ার হুমকি

খুলনা অফিস : মংলা বন্দরে আমদানি-রফতানি কাজে দীর্ঘসূত্রিতা, আমদানিকৃত পণ্য খালাসে অতিরিক্ত শুল্ক আদায়, কায়িক পরীক্ষার নামে মামলা ও অতিরিক্ত জরিমানা আদায় এবং আদালতের আদেশ উপেক্ষা করে পণ্য খালাসে অনুমতি না দেয়াসহ বিভিন্ন কারণে গত কয়েক মাস ধরে মংলা কাস্টমের সাথে বন্দর ব্যবহারকারীদের দুরত্ব বেড়েছে। একদিকে যেমন- সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যবসায়ীরা কাস্টমের দ্বারস্থ হচ্ছেন, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের দাবি অনৈতিক বলে কাস্টম ব্যবসায়ীদের ফিরিয়ে দিচ্ছে। ফলে বন্দর ব্যবহারকারীরা উৎসাহ হারিয়ে এ বন্দর থেকে অন্য বন্দরে চলে যাচ্ছেন। সম্প্রতি মংলা বন্দর দিয়ে চীন থেকে এলসির মাধ্যমে আমদানিকৃত ২ হাজার ১০৫টি কম্পিউটর মনিটর ছাড় করণের নির্দেশ দেয়া হলেও আপিলেট ট্রাইব্যুনালের আদেশ না মেনে মংলা কাস্টমের কমিশনার পণ্য ছাড়ের অনুমতি না দেয়ায় ব্যবসায়ীরা আন্দোলনে নেমেছেন। গতকাল রোববার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সকল ব্যবসায়ী সংগঠনের সভায় বলা হয়েছে শীঘ্রই মংলা শুল্ক ভবনের অন্তহীন সমস্যার সমাধান না হলে মংলা বন্দর অচল করে দেয়া হবে। সভায় খুলনার দশ জেলার চেম্বার অব কমার্সের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। আগামীকাল মঙ্গলবার খুলনা প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা মংলা কাস্টমকে তিন দিন অথবা সাত দিনের আল্টিমেটাম দেবে। এ সময়ের মধ্যে চলমান সংকট নিরসন না হলে সরাসরি আন্দোলনে যাবে ব্যবসায়ীরা। গতকাল রোবার বেলা সাড়ে ১১টায় খুলনা চেম্বার ভবনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় বক্তারা বলেন, মংলা কাস্টমসের বর্তমান কমিশনার যোগদানের পর থেকে আমদানিকারক এবং সংশ্লিষ্টদের বিভিন্ন রকমের হয়রানি এবং নাজেহাল করছেন। বিভিন্ন অজুহাতে মাত্রাতিরিক্ত উৎকোচ দাবি এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই পণ্য চালানে বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে একাধিকবার কায়িক পরীক্ষা করছেন, এমনকি শুল্ক করাদী পরিশোধ করার পর ডেলিভারির প্রাক্কালেও পণ্য চালান বিল লক করে বিভিন্ন এজেন্সিকে দিয়ে কায়িক পরীক্ষা করাচ্ছেন। এ ব্যাপারে সিএন্ডএফ এজেন্টস এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বার বার অনুরোধ করা সত্ত্বেও তিনি তা উপেক্ষা করছেন, সবিশেষ সকল এজেন্সির সমন্বয়ে একবার পরীক্ষা কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য লিখিতভাবে অনুরোধের তোয়াক্কাও তিনি করেননি। বর্তমানে Asycuda World++ এর Data Base এর ভিত্তিতে বাংলাদেশের সকল কাষ্টমস্ হাউস এ শুল্কায়ন প্রথা চালু থাকলেও তিনি তা অগ্রাহ্য করছেন, যেমনঃ Non Oven PVC Fabrics চট্টগ্রাম বন্দরে ৫৬০৩.১১.৯০ এইচ,এস কোডে শুল্কায়ন হয় যার ডিউটি সর্বমোট ৬২% এবং ভ্যালু টঝ$ ১.৪০/কেজি। কিন্তু মংলা বন্দরে একই পণ্য ৩৯২১.৯০.৯৯ এইচ,এস কোডে শুল্কায়ন হয় যার ডিউটি ৯২% এবং ভ্যালু প্রতি কেজি টঝ$ ২/কেজি। এ ছাড়া ডকুমেন্টসের সামান্য ত্রুটি, বিচ্যুতিকে তিনি জটিল করে পণ্য চালানের মূল্যের উপর ১০০% ও মাত্রা ভেদে ২০০% জরিমানা আরোপ করে শুল্কায়ন করছেন। অথচ বাংলাদেশে অপরাপর কাষ্টমস হাউস এ রাজস্ব হানির ঝুঁকির উপর ২০% থেকে ৩০% জরিমানা আরোপ করে পণ্য চালান খালাস অব্যাহত রয়েছে। এ ক্ষেত্রে তিনি আমাদের অনুরোধ অনুযোগ সত্ত্বেও অন্যান্য শুল্কভবনের ন্যায় জরিমানার সমতা বজায় রাখছেন না।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের স্থায়ী আদেশ ৪৭/৯৮ অনুযায়ী ত্বরিত খালাস পদ্ধতিতে পণ্য চালানের নির্দেশনা থাকলেও মংলা কাস্টম হাউসে তা প্রতিপালন হচ্ছে না। এ ছাড়াও বিভিন্ন Industry Ges Project এর আমদানিকৃত মালামালে বিভিন্নভাবে উচ্চহারে শুল্কায়ন, হয়রানি ও সময়ক্ষেপণ করছেন, বিভিন্ন পণ্যের এইচ,এস কোড এর ভুল ব্যাখ্যা করে উচ্চ হারে শুল্ক করাদী আদায় করছেন। এতদাঞ্চলের সুপ্রতিষ্ঠিত BRB Cable Industry Ges Power Plant সমূহে উল্লেখিত স্থায়ী আদেশ উপেক্ষা করে শুল্কায়নে অযথা জটিলতা সৃষ্টি করায় ওই সমস্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ মংলা বন্দর ব্যবহারে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে। ব্যবসায়ীদের এসব সমস্যা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হলে প্রধান মন্ত্রীর দফতর কর্তৃক উক্ত নির্দেশনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় তরিৎ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মাননীয় অর্থ উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান ডিও নং ২৪.৩৯.১৬.০০.০০.০১.২০১৬-৯৩৯ তাং ২৪/০৮/২০১৬ অর্থ মন্ত্রীকে পত্র প্রেরণ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, মংলা কাস্টম হাউসসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুলিপি প্রেরণ করেন। উক্ত ডিও’র কপি মংলা কাস্টম হাউসে গৃহীত হওয়ার পর কমিশনার কর্তৃক এর আলোকে কোনো ব্যবস্থা তো গ্রহণ করা হয়ইনি বরং অজ্ঞাত কারণে তা গোপন রেখে সিএন্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারকগণের উপর নিপীড়ণের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছেন। মংলা কাষ্টম কমিশনারের স্বেচ্ছাচারিতা এমন পর্যায়ে পৌচেছে যে, M/s. R.K International নামক একজন আমদানিকারক ফেব্রুয়ারি-২০১৬ তে Computer Monitor & Remote এর একটি চালান আমদানি করেছেন, সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকের সিএন্ডএফ এজেন্ট সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ করলেও ঈড়সঢ়ঁঃবৎ গড়হরঃড়ৎ এর ঝরুব এর ভিন্নতার অজুহাতে আজ প্রায় ১০ মাস অতিবাহিত হতে চলল অথচ পণ্য চালানটি খালাস প্রদান করা হয়নি। কাষ্টমস কমিশনার এ ব্যাপারে আমদানিকারককে অধিক উচ্চমূল্যে শুল্ক নির্ধারণসহ অস্বাভাবিক হারে জরিমানা আরোপ করার পর পণ্য চালান খালাসের নির্দেশনা প্রদান করেন। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক কাষ্টম কমিশনারের এ আদেশের বিরুদ্ধে কাস্টমস্ এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইবুনাল, ঢাকা এর নিকট আপিল করলে আপিলাত ট্রাইবুনাল আরোপিত শুল্ক করাদী নগদে পরিশোধ এবং জরিমানার ৩৫ লাখ টাকা ব্যাংক গ্যারান্টি প্রদান স্বাপেক্ষে ৭ (সাত) কার্যদিবসের মধ্যে পণ্য চালানটি খালাসের নির্দেশনা প্রদান করেন। উক্ত নির্দেশের প্রেক্ষিতে মংলা কাস্টম হাউসের রাজস্ব কর্মকর্তা মিঃ কানু কুমার মিত্র আমদানিকারককে উক্ত মালামাল কাস্টম এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালে অন্তবর্তীকালীন আদেশ মোতাবেক পণ্য চালানটি খালাসের জন্য পত্র নং এস/৩৮৮৮/গ্রুপ-৪/এ্যাঃ/মোংলা/১৫-১৬/৫৭৫৭(১) তারিখ ১৭/১০/২০১৬ইং এর মাধ্যমে মালামাল খালাসের অনুরোধ করেন। এর ঠিক একদিন পরে অজ্ঞাত কারণে একই দফতরের একই ব্যক্তি কর্তৃক স্বাক্ষরিত পত্র নং এস/৩৮৮৮/গ্রুপ-৪/এ্যাঃ/মোংলা/১৫-১৬/৫৭৯২(১) তারিখ ১৮/১০/২০১৬ইং এর মাধ্যমে ১৭/১০/২০১৬ইং তারিখের পত্রটি বাতিল করেন। পরবর্তীতে মংলা শুল্ক ভবনের কমিশনার উক্ত নির্দেশনার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের বিজ্ঞ এ্যাটর্নি জেনারেলের বরাবরে উক্ত আদেশটি রদ ও রহিত করণের লক্ষ্যে হাইকোর্টে আপিল মামলা দায়ের এর জন্য অনুরোধ করেন। এর প্রেক্ষিতে বিজ্ঞ ডেপুটি এ্যাটর্নি জেনারেল এস. এম. মনিরুজ্জামান প্রেরিত পত্রের উপরে “Appeal is not maintainable against the interim order of the Tribunal and as such the Customs Authorities may take step as per order of the Tribunal” লিখে মতামত ব্যক্ত করেন। ২৭ অক্টোবর মংলা কাস্টমস্ এর সংশ্লিষ্ট শাখা, রাজস্ব কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার, যুগ্ম কমিশনার উক্ত চালানটি ছাড় করণের মতামত ব্যক্ত করে কমিশনারের নিকট নথি উপস্থাপন করেন কিন্তু কমিশনার এখনও পর্যন্ত উক্ত বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। দীর্ঘ ১০/১১ মাস ঈড়সঢ়ঁঃবৎ গড়হরঃড়ৎ এর মতো স্পর্শকাতর পণ্যের চালান ঈড়হঃধরহবৎ এ আবদ্ধ থাকলে ঈড়সঢ়ঁঃবৎ গড়হরঃড়ৎ এর কোনো গুণগত মান থাকবে কি-না? তা ছাড়া এ পণ্য চালানটি ওসঢ়ড়ৎঃবৎ কর্তৃক বাজারজাতকরণ সম্ভব হবে কি-না ?
সভায় আরো বলা হয়, কিছুদিন আগে বি/ই নং- সি ৯৮৮২ তারিখ ২২/০৫/২০১৬ইং এর মাধ্যমে হিমায়িত মাছের একটি আমদানি চালানে সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের পর যখন ডেলিভারি হচ্ছিল তখন মনগড়া গোপন সংবাদের ভিত্তিতে প্রাপ্ত মিথ্যা অভিযোগের অজুহাতে আমদানিকৃত মাছের চালানটি পুনঃ কায়িক পরীক্ষার নামে সমস্ত কার্টুন খুলে তছনছ করে প্রায় ১০ লাখ টাকার মাছ সম্পূর্ণ নষ্ট করে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারককে নাজেহাল করেন। অথচ উক্ত চালানে অবৈধ বা ঘোষণা বহির্ভূত কিছুই পায়নি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে, এখন মংলা বন্দরের নাম শুনলেই আমদানিকারকগণ আতঙ্কে শিউরে উঠেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন, মংলা বন্দর ব্যবহারকারী সমন্বয় কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব সৈয়দ মোস্তাহেদ আলী।
সভায় খুলনা বিভাগীয় অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব, খুলনা সদর থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি এডভোকেট মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, কাস্টম কমিশনারের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে এনবিআরের চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ করেছি। এক ব্যক্তির কারণে একটি বন্দর ধ্বংস হতে পারে না। তার কারণে এ বন্দরের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন, তার অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে।
মংলা কাষ্টমস ক্লিয়ারিং এন্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্টস এসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সুলতান হোসেন খান বলেন, এই কমিশনারের আচরণের কারণে, এ বন্দরে এখন আর আগের মতো জাহাজ আসছে না। গত সপ্তাহে এ বন্দরে চারটি জাহাজ আসলেও অস্বাভাবিক শুল্ক আদায়ের কথা শুনে পণ্য খালাস না করেই জাহাজগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে চলে যায়। এ অবস্থা চলতে থাকলে বন্দর অচল হয়ে পড়বে।
খুলনা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি কাজী আমিনুল হক বলেন, ব্যবসায়ীদের সমস্যা নিয়ে কয়েকবার কাস্টম অফিসে গিয়েছি কিন্তু কমিশনার ব্যবসায়ীদের কথা শোনেন না, ব্যবসায়ীদের কথার গুরুত্ব দেন না, এমনকি তিনি প্রধানমন্ত্রীর কথাও শোনেন না। এই কমিশনার এতো পরিমাণ জরিমানা করে যে ব্যবসায়ীর পূঁজি বাচানো দায় হয়ে পড়ে। এই কমিশনারকে দ্রুত প্রত্যাহার ও ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি জানান।
খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মিজানুর রহমান মিজান প্রধান অতিথির বক্তৃতায় বলেন, আমরা খুলনাবাসী সব সময়ই বঞ্চিত। আমরা কোনো না কোনোভাবে কেবলই পিছিয়ে যাচ্ছি। কিছু কিছু সরকারি কর্মকর্তার কারণে উন্নয়ন কর্মকা- বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের সমস্যার ব্যাপারে গত শনিবার কাস্টম কমিশনারের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছি, কিন্তু তিনি আমার ফোন ধরেননি। তিনি বলেন, যারা এ বন্দরটি ধ্বংস করে দিতে চায় তারাই ষড়যন্ত্র করছে। আর সেই দিকেই এগোচ্ছে বলে আমার ধারণা।
এদিকে সম্প্রতি মংলা কাস্টম কমিশনার আল-আমিন প্রমাণিক অতিরিক্ত শুল্কায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব পণ্যে অতিরিক্ত শুল্কায়ন নেয়া হয় না। তবে ব্যবসায়ীদের আন্দোলন সর্ম্পকে জানতে গতকাল তার মোবাইল ফোনে (০১৭১১১১২৮১৪) একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ