ঢাকা, মঙ্গলবার 08 November 2016 ২৪ কার্তিক ১৪২৩, ৭ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনের ঘোষণা, আওয়ামী লীগের হিসাব ও নাসিরনগরের আগুন

কিছু দিন আগে অত্যন্ত জাঁকজমক, বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দেশী-বিদেশী অতিথিদের নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দল দেশব্যাপী হাজার হাজার তোরণ, আলোকসজ্জা ও ভুরি ভোজের মাধ্যমে তাদের কাউন্সিল অধিবেশন সম্পন্ন করেছে। কাউন্সিলের ফলোআপ হিসেবে তারা তাদের জাতীয় ও স্থানীয় নেতৃত্বে পরিবর্তন এনে অনেকটা চমকও সৃষ্টি করেছেন। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং সকল পর্যায়ের দলীয় নেতৃবৃন্দকে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। তার এই নির্দেশ সরকারি ও বিরোধী উভয় মহলেই ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং সর্বত্র নির্বাচনী হাওয়া বইতেও শুরু করেছে। এই নির্বাচনটি কি ধরনের হবে তা যদিও পরিষ্কার নয় তথাপিও বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে নানা কথাবার্তা চলছে। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ প্রকাশ্যে বলাবলি করছেন যে, ক্ষমতার ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে নিশ্চিতভাবে আগামী নির্বাচনেও তাদের ক্ষমতায় আসতে হবে। যদিও কিভাবে আসবেন সেটা তারা পরিষ্কার করে বলছেন না। বিগত নির্বাচন ছিল ভোটারবিহীন; সংসদের ৩০০ আসনের ১৫৪ আসনে (ক্ষমতায় যাবার জন্য প্রয়োজনীয় আসনের চেয়ে ৩টি বেশি) বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অর্থাৎ ভোটার ছাড়া ক্ষমতাসীন দল ও জোটের প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। অবশিষ্ট আসনে নামকাওয়াস্তে নির্বাচন হলেও ভোটার টার্ন আউট ছিল ৪ থেকে ৫ শতাংশ, কোন কোন পর্যবেক্ষকের মতে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ। এর সবগুলো ভোট সারা দেশের ৩০০ আসনে বণ্টন করা হলে ভোটার টার্ন আউটের পরিমাণ হয় দেড় থেকে আড়াই পার্সেন্ট, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও মূল্যবোধের প্রতি পদাঘাতের চেয়েও নিকৃষ্ট। সরকার যদি দলীয় ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি করে ক্ষমতায় যাবার ধারাবাহিকতার কথা চিন্তা করে থাকেন তাহলে এ ধরনের নির্বাচনের কোনও প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না, দেশের নাম পরিবর্তন করে রাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র রেখে সংবিধানের গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার সংক্রান্ত ধারাগুলো বিলুপ্ত করলেই চলে। দেশ পরিচালনার জন্য  নিষ্ঠুরতামূলক যতো বিধান আছে সেগুলোও তাতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কত কাল? ২০ দলীয় জোটের প্রধান শরিক বিএনপি নির্দলীয় সরকারের অধীনে ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণে অনীহা প্রকাশ করেছে। আবার দু’দিন আগে একটি পত্রিকায় দেখলাম, বাংলাদেশের আগামী সাধারণ নির্বাচন জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে হবে বলে তারা রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। কোনও সূত্রের বরাত তারা দেননি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ক্ষমতাসীন বর্তমান সরকার তার অধীনে ছাড়া কি নির্বাচন হতে দিবে? বেগম জিয়া আন্দোলনে নামার ডাক দিয়েছেন। এই ডাকের প্রতিক্রিয়া কি হয় অনেকে তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন।
শুরু করেছিলাম আওয়ামী লীগের জাঁকজমকপূর্ণ কাউন্সিল অনুষ্ঠান দিয়ে। এই অনুষ্ঠানের আগে-পরে ও অনুষ্ঠান চলাকালীন সময়ে রাস্তাঘাট বন্ধ ও ব্যারিকেড দেয়ার ফলে যানজটে লাখ লাখ লোকের চরম ভোগান্তি হলেও কেউ কিছু মনে করেছে বলে হয় না। তারা তা মেনে নিয়েছে গণতন্ত্রের স্বার্থে। আজ যখন কলামটি লিখছি তখন ৭ নভেম্বর। এ দিবসটি বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে দেশবাসী উদযাপন করে। এই দিন বিএনপি সমাবেশ করতে চেয়েছিল। কিন্তু সরকার তাদের সেই অনুমতি দেয়নি। নিজেরা সমাবেশ করলেন অনুমতির দরকার হলো না। কিন্তু বিরোধী দলকে অনুমতি দিলেন না। এটা কোন্্ গণতন্ত্র? একদলীয় গণতন্ত্র? এক দল দিয়ে গণতন্ত্র হয় না।
[দুই]
ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনী প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং প্রধানমন্ত্রীর এ সংক্রান্ত নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে পৌঁছে গেছে। ইতোপূর্বে আমি এই স্তম্ভে নির্বাচনের ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দল কর্তৃক গোয়েন্দাদের দ্বারা পরিচালিত একটি সমীক্ষার কথা বলেছিলাম। এই রিপোর্টে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান নির্ণয় করে বলা হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশ উন্নয়নে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চললেও ভোটের রাজনীতিতে দলটি বর্তমানে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। গোয়েন্দাদের রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমান প্রেক্ষাপটে নির্বাচন হলে দলীয়ভিত্তিক ফলাফল হবে নিম্নরূপ :
দল            সম্ভাব্য আসন সংখ্যা
আওয়ামী লীগ    ৫৯
বিএনপি         ১৫৭
জাতীয় পার্টি        ৭
জামায়াত         ২৬
ভাসমান          ৫১
আওয়ামী লীগের ফলাফল বিপর্যয়ের যে কারণগুলো সমীক্ষায় চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে :
১. দলীয় ইমেজ সংকট
২. অভ্যন্তরীণ কোন্দল
৩. জঙ্গিবাদ
৪. ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের নিকট দলকে ইসলাম বিদ্বেষী হিসেবে উপস্থাপন
৫. দলের বিরুদ্ধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অপপ্রচার।
প্রতিবেদন অনুযায়ী- জঙ্গিবাদ নির্মূলে সুদৃঢ় পদক্ষেপ অব্যাহত রাখা, দলীয় ইমেজ পুনরুদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ, অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন ও দলীয় ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা, দলীয় প্রার্থী পরিবর্তন, ধর্মীয় ভাবাদর্শের ভোটারগণের আস্থা অর্জন, জামায়াতকে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করে বিএনপি জোট হতে বের করা, শক্তিশালী সংস্কারবাদী জামায়াত সৃষ্টি করে ৩০০ আসনে তাদের একক প্রার্থী দেয়া, সংস্কারবাদী বিএনপি সৃষ্টি করে সকল আসনে তাদের প্রার্থিতা নিশ্চিত করা, বিকল্পধারা, বিজেপি ও এলডিপিকে বিএনপির সাথে জোট হতে না দেয়া, কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগ ও জাকের পার্টিকে মহাজোটে অন্তর্ভুক্ত করা এবং বিএনপি ও জামায়াতের নিশ্চিত আসনগুলো চিহ্নিত করে সেখানে শক্তিশালী সংস্কারবাদী প্রার্থী নিশ্চিত করতে পারলে ভোটের হিসাব পাল্টিয়ে দিয়ে আওয়ামী লীগ ১৭৯টি আসন দখল করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিএনপি ৫২, জাতীয় পার্টি ১৭ ও জামায়াত ৯টি আসন পাবে। আর ভাসমান থাকবে ৪৩ আসন।
দলীয় ইমেজ সংকটের কারণ চিহ্নিত করতে গিয়ে রিপোর্টে দুর্নীতি, সুশাসনের অভাব, দলীয় নেতাকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক সাধারণ নাগরিকদের সাথে অসংযত আচরণ, গ্রেফতার বাণিজ্য ও অযথা হয়রানি করার বিষয়গুলো উঠে এসেছে এবং স্পর্শকাতর কিছু মৃত্যু ও হত্যার ঘটনা তদন্ত ও বিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। রিপোর্টের সুপারিশ অনুযায়ী রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিশেষ করে ২০ দলীয় জোটের প্রধান শরিক বিএনপি এবং জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন দলটি নির্যাতনের মাত্রা শুধু অব্যাহতই রাখেনি বরং জুলুম-নির্যাতন এবং হত্যা-গুমের মাত্রাও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে নির্বাচনে জিতার জন্য সমীক্ষার সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তাদের কেউ কেউ মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন বলে মনে হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের ঘটনা মাত্রাজ্ঞান হারানোর একটি অনুপম দৃষ্টান্ত বলে মনে হয়। একথা সত্য যে, ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে আওয়ামী লীগ সরকার গত কয়েক বছরে তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মুসলিমবিদ্বেষী সরকার হিসেবে যে নেতিবাচক ইমেজ সংকটে পড়েছে তা থেকে নিজেদের উদ্ধার করা একটি কঠিন কাজ। আবার এই ইমেজ উদ্ধার করতে গিয়ে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার, তাদের বাড়িঘর, পূজা ম-প প্রভৃতিতে অগ্নিসংযোগ, সহায়-সম্পদ ধ্বংস এবং বিরোধী দলের উপর তার দোষ চাপিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা তাদের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপর অত্যাচার করে মুসলিম বিদ্বেষের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায় না, যায় বলে যাদের ধারণা তারা মোটা মাথার মানুষ। মুসলিম বিশ্বের প্রাণকেন্দ্র পবিত্র কা’বা শরিফের ছবির উপর শিবমূর্তি সুপার ইম্পোজ করে দেয়া জনৈক ব্যক্তির ফেসবুক স্ট্যাটাসের মূল নায়ককে চিহ্নিত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই তাৎক্ষণিকভাবে সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। চিহ্নিত করার প্রযুক্তিও সরকারের কাছে রয়েছে। কিন্তু সেটা না করে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিকে উস্কিয়ে দিয়ে এবং হিন্দুদের গালাগালি করে মুসলমানদের প্রিয়ভাজন হবার যে কু-মতলব ক্ষমতাসীনরা গ্রহণ করেছিলেন তা ইতোমধ্যে ফাঁস হয়ে গেছে। কোনওরকম তদন্ত না করেই সরকারের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ এ ঘটনার জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দোষারোপ করলেন। পরক্ষণেই দেখা গেল তাদের নিজেদের লোকেরাই এর সাথে জড়িত এবং বেসামরিক ও পুলিশ প্রশাসন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের প্রধানদের সরকার প্রত্যাহার করলেন। একজন মন্ত্রী (যিনি ঐ এলাকার এমপিও) গিয়ে সেখানে তিনদিন থাকলেন, কিন্তু সংখ্যালঘুদের জান-মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা দিতে পারলেন না। নাসিরনগরের আগুন নেত্রকোনা, সিরাজগঞ্জ, ঝালকাঠিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়লো। অভিযোগ উঠেছে মন্ত্রী হিন্দুদের গালি দিয়েছেন, কিন্তু তিনি তা অস্বীকার করলেন। বললেন, প্রমাণ করতে পারলে মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেবেন। আরো একটা নতুন তথ্য দিলেন সেটা হচ্ছে ফেসবুকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে যে ব্যক্তি স্ট্যাটাস দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে আসলে সে তা করেনি, স্ট্যাটাসটি দিয়েছে ঢাকা থেকে কোনও এক ব্যক্তি। মন্ত্রী যদি এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে থাকেন তাহলে তাকে ধরছেন না কেন? তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন? নাসিরনগর এখন বাংলাদেশে নেই, দিল্লীতে চলে গেছে। ভারত সরকার হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় হাই কমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলাকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলতে বলেছেন। তিনি হয়তো প্রধানমন্ত্রীর কাছে ব্যাখ্যা তলব করতে পারেন। আর এর সবগুলোই হচ্ছে কমলি কি ওয়াস্তে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর শহীদ মতিউর রহমান নিজামীর একটি উক্তি দিয়ে আজকের আলোচনা শেষ করতে চাই, তিনি বলেছিলেন- “যদি ভারতের সবগুলো মুসলিমকে হত্যা করা হয় এবং সবগুলো মসজিদ ভেঙ্গে দেয়া হয় তারপরও এই বাংলার জমিনে একজন হিন্দুর দিকে একটা ঢিল ছুঁড়ে মারা কিংবা একটা মন্দির থেকে একটা ইট খুলে নেয়ার অধিকার ইসলাম মুসলমানদের দেয়নি।”

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ