ঢাকা, মঙ্গলবার 08 November 2016 ২৪ কার্তিক ১৪২৩, ৭ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জন বর্ণ : ক্রস ফায়ার কোন্ বর্ণ

জিবলু রহমান : [সাত]
প্রকৃতপক্ষে নিহতের পরিবার দাবি করেছে তাকে পুলিশ আটকের ৯ দিন পর ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করে ক্ষতবিক্ষত লাশটি হরিণাকুণ্ডু-ঝিনাইদহ সড়ক থেকে উদ্ধার করার নাটক সাজিয়েছে। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন। নিহত ইদ্রিস আলী হরিণাকুণ্ডু উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামের কওসার আলীর ছেলে। এর আগে ৯ আগস্ট নিহত ইদ্রিস আলীর স্ত্রী মমতাজ বেগম ঝিনাইদহ প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন করে সাংবাদিকসহ দেশবাসীকে জানান, তার স্বামীকে ৪ আগস্ট শৈলকুপা উপজেলার রামচন্দ্রপুর বাজার থেকে ফেরার সময় রাত ৮টার দিকে সাদা পোশাকধারী লোকজন মোটরসাইকেলসহ তুলে নিয়ে যায়। এরপর থানায় অভিযোগ দিতে গেলে অভিযোগ নেয়া হয়নি।
৩০ সেপ্টেম্বর রাতে সাভারে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে পৌর যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহ আলম নয়ন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। পুলিশ জানায়, তিনি হত্যাসহ একাধিক মামলা আসামী। নিহতের স্বজনদের দাবি, নয়ন বিএনপি করেন এবং পুলিশের দাবিকৃত টাকা দিতে না পারায় বন্দুকযুদ্ধের নাম করে তাকে পরিকল্পিতভাবে মেরে ফেলা হয়েছে। নিহত নয়ন সাভার পৌর এলাকার মালঞ্চ মহল্লার শহিদুল ইসলামের ছেলে। পুলিশের দাবি, সাভার মডেল থানায় মাদক, অস্ত্র ও ডাকাতি মামলাসহ ডজনখানেক মামলার আসামী শাহ্ আলম নয়নকে মোহাম্মদপুর থেকে আটক করা হয়। এরপর সাভার মডেল থানা পুলিশ তাকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারের অভিযানে বের হয়। ভোররাতে বিরুলিয়া ইউনিয়নের কৃষিবিদ নামক এলাকায় পৌঁছলে পুলিশকে লক্ষ্য করে সন্ত্রাসীরা গুলী চালায়। এ সময় নয়ন সুযোগ বুঝে পালানোর চেষ্টা চালান। পরে পুলিশ পেছন থেকে গুলী ছুঁড়লে নয়ন গুলীবিদ্ধ হন। পরে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় গ্রেফতার করার প্রায় ২৬ ঘণ্টা পর পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মানিক মিয়া (৩৬) নামের সন্দেহভাজন এক ডাকাত নিহত হয়। পুলিশ বলছে, মানিক মিয়া আন্তজেলা ডাকাত দলের সর্দার ছিলেন। তিনি ‘হাতভাঙ্গা মাইনকা’ নামে পরিচিত ছিলেন। ১৩ অক্টোবর দিবাগত রাত একটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। মানিকের বাড়ি উপজেলার চুন্টা ইউনিয়নে।
১৭ অক্টোবর রাতে লক্ষ্মীপুরের রামগতির চর রমিজ ইউনিয়নে দস্যু ফকির বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মজনু বাহিনীর প্রধান মজনু নিহত হয়। নিহত মজনু উপজেলার চর আফজাল গ্রামের মৃত জাহাঙ্গীরের ছেলে। তার বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, অস্ত্র ও অপহরণসহ ১৪টি মামলা রয়েছে।
চুয়াডাঙ্গার স্কুলছাত্র সজীবকে অপহরণের পর হত্যা ও গুম মামলার আসামী সবুজ (২৮) ও শাকিল (২৪) র‌্যাব’র সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। ২২ অক্টোবর ভোর রাত পৌনে ৩টার দিকে দামুড়হুদা উপজেলার পরানপুর বেলেমাঠপাড়ার পাকা রাস্তার পুকুরের পাড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় র‌্যাবের ২ সদস্য আহত হয়েছেন। ঘটনাস্থল থেকে একটা দেশী শার্টারগান, একটি রিভলবার, চার রাউন্ড গুলী ও দু’টি ধারালো হাসুয়া উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত সবুজ দামুড়হুদা উপজেলা শহরের মৃত হামিদুল ইসলামের ও শাকিল একই এলাকার আব্দুল কাদের মন্ডলের ছেলে।
২৫ অক্টোবর ২০১৬ ভোর ৪টার দিকে ঝিনাইদহ শহরের বাইপাস এলাকার শহীদ নজির উদ্দিন সড়কের ভুটিয়ারগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ঝিনাইদহ পৌর আমীর প্রভাষক মোঃ জহুরুল ইসলাম (৩২) ও ঢাকা মহানগরী ছাত্রশিবের সাবেক সেক্রেটারিয়েট সদস্য ডা. তারিক হাসান সজিব (৩০) নিহত হয়েছেন।
৭ সেপ্টেম্বর দুপুর দুইটার দিকে ঝিনাইদহ শহরের হামদহস্থ দিশারী প্রি-ক্যাডেট স্কুল থেকে এসআই আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল সাদা পোশাকধারী পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে জহুরুল ইসলামের কোন খবর পাচ্ছিল না তার পরিবারের সদস্যরা। পুলিশ ৪৮ দিন আটক রেখে নির্যাতনের পর ঠাণ্ডা মাথায় গুলী করে হত্যা করে বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়েছে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছে।
ঝিনাইদহ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হরেন্দ্রনাথ সরকার বলেছেন, ভোর সাড়ে ৪টার দিকে শহরের নাজির উদ্দিন সড়কে পুলিশের একটি দল ডিউটিতে ছিল। এ সময় তিনটি মোটরসাইকেলে ছয় যুবক যাচ্ছিল। পুলিশ থামার সংকেত দিলে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলী ও ককটেল ছোঁড়ে। আত্মরক্ষায় পুলিশও পাল্টা গুলী ছেঁড়ে। একপর্যায়ে দু’জন গুলীবিদ্ধ হয়। এ সময় অন্যরা পালিয়ে যায়। তাদের উদ্ধার করে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। বন্দুকযুদ্ধের সময় কনস্টেবল বুলবুল, আলমগীর ও নাসিম হোসেন আহত হন। ওসি আরো বলেন, ঘটনাস্থল থেকে দু’টি শাটারগান, দু’টি গুলী, পাঁচটি ককটেল, দু’টি রামদা, একটি চায়নিজ কুড়াল ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, পরে নিহতদের পরিচয় পাওয়া যায়। নিহতরা হলেন-ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ড আবাসিক ভবনের সমশের আলী মোল্যার ছেলে ও পৌর জামায়াতের আমীর জহুরুল ইসলাম ও আরাপপুর গ্রামের মৃত মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ মিয়ার ছেলে ও ঢাকা মহানগর পশ্চিমের ছাত্রশিবিরের সাবেক দায়িত্বশীল তারিক হাসান সজীব। আহত পুলিশ সদস্যরা হলেন, সদর থানার কনস্টেবল বুলবুল হোসেন, আজিম উদ্দিন ও নাসিম আহম্মেদ।
এদিকে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঝিনাইদহ পৌর জামায়াতের আমীর জহুরুল ইসলাম ৭ সেপ্টেম্বর দুপুর দুইটার দিকে ঝিনাইদহ শহরের হামদহস্থ দিশারী প্রি-ক্যাডেট স্কুলে যায়। সাথে সাথেই পূর্ব থেকে ওঁৎ পেতে থাকা ঝিনাইদহ পুলিশের এসআই আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল সাদা পোশাক পরিহিত পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে একটি সাদা মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। তারপর ওই স্থানে লটকানো সিসি ক্যামেরাটি বাজেয়াপ্ত করা হয়। এরপর তাকে চোখ বেঁধে মাইক্রোবাসে তুলে অজানা স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা তাকে গ্রেফতারের কথা সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে।
নিহত জহুরুল ইসলাম কালীগঞ্জ আসাদুজ্জামান হোসনেয়ারা কেয়া বাগান কলেজের ইসলামের ইতিহাসের প্রভাষক। তিনি কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাসে অনার্স ও মাস্টার্স করেন। এ ছাড়া ঝিনাইদহ সিদ্দিকীয়া কামিল মাদরাসা থেকে কামিল পাস করেছেন। তিনি একাধিকবার ঝিনাইদহ জেলা ও পৌর ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি তিনি কেয়াবাগান কলেজ এলাকায় বিয়ে করেন। জহুরুল ইসলামকে পুলিশ আটক করে নিয়ে যাবার পর থেকে তার স্ত্রী শোভা অসুস্থ হয়ে পড়েন।
অপরদিকে নিহত তারিক হাসান সজিবের গ্রামের বাড়ি শৈলকুপা উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামে। তিনি আরাপপুর সেবা ক্লিনিকের পাশে বসবাস করেন। পেশায় তিনি একজন ডাক্তার। তিনি বেশ কিছুদিন ঝিনাইদহ ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। এরপর তিনি ঢাকায় চলে যান। তিনি দুই বছর আগে একই এলাকার লুৎফর রহমানের এক মেয়েকে বিয়ে করেন। কয়েকদিন আগে তার জমজ দু’টি মেয়ে সন্তান হয়েছে। যাদের মুখ তিনি মারা যাওয়ার আগে আর দেখতে পারলেন না। ছাত্রজীবনে তিনি ঢাকা মহানগরী, উত্তর ও পশ্চিমে অফিস সম্পাদক ও স্কুল কার্যক্রম সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। নিহত সজীব ঝিনাইদহ ব্যাপারীপাড়ার মৃত খন্দকার আব্দুল লতিফের ছেলে। তিনি ঝিনাইদহ জেলা জামায়াতের সাবেক আমীর লুৎফর রহমানের জামাতা। সজীবের বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।
নিহত সজিবের মা মাহফুজা খাতুন বলেছেন, ‘আমার ছেলে কোনো দল করতো না। সে এমবিবিএস ডাক্তার। ঈদের পরের দিন ১৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে ঝিনাইদহ শহরের বাড়ির পাশে হাটের রাস্তা থেকে সাদা পোশাকে পুলিশ পরিচয়ে তাকে তুলে নিয়ে যায় একদল লোক। এরপর থেকে সে নিখোঁজ ছিল। এ ব্যাপারে ১৪ সেপ্টেম্বর ঝিনাইদহ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল।’
সন্ত্রাস দমন করতে গিয়ে ক্রসফায়ারে অনেক অভিযুক্ত সন্ত্রাসীর মৃত্যুর ব্যাপারেও জনমনে সন্দেহ বাড়ছিল, তথাপি গোড়ার দিকে এই ক্রসফায়ারে সন্ত্রাসীদের মৃত্যুর খবর দেশের মানুষ এজন্যই মেনে নিয়েছিল যে, সন্ত্রাস এখন দেশে সত্যি সত্যিই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিল।
তারপর দিনের পর দিন যতই ক্রসফায়ারে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে ততই জনমনে এ খবরের সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহও বাড়তে থাকে এবং দেশের অনেক বিশিষ্টজনসহ বিভিন্ন মানবাধিকার ও আইনি সংস্থা একে বিচারবহির্ভূত হত্যা আখ্যা দিয়ে তা বন্ধ করার দাবি জানায়। কেউ কেউ র‌্যাব বিলোপের দাবিও তোলেন। তবে দাবিটি জনমতের ব্যাপক আনুকূল্য লাভ করেনি এবং সরকারও এই দাবি পূরণের আগ্রহ দেখায়নি।
পুলিশের বিরুদ্ধে যেমন ঘুষ, দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন রাজনীতিকরা, তেমনি দেশের রাজনৈতিক কালচারেরও সংস্কার প্রয়োজন।
দেশের রাজনীতিকে সন্ত্রাস ও দুর্নীতির কালচার থেকে মুক্ত করা না গেলে পুলিশ কিংবা প্রশাসনের কোনো স্তরকেই দুর্নীতিমুক্ত করা যাবে না। প্রশ্ন, বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? আমাদের দেশের রাজনীতির বিড়াল আবার ঘুমন্ত বিড়ালও নয়।
সব কাজেরই একটা জবাবদিহিতা থাকা আবশ্যক। জবাবদিহিতা না থাকলে দেশে বা সমাজে স্বৈরাচার মাথা তোলে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যায় না। প্রতিটি উন্নত গণতান্ত্রিক দেশেই সামরিক বাহিনীরও জবাবদিহিতা থাকে সিভিল অথরিটি বা সরকারের কাছে। বাংলাদেশেও র‌্যাবের জবাবদিহিতা থাকবে সিভিল সরকারের কাছে। কোনো কারণেই আইনের ঊর্ধ্বে যাতে সংস্থাটি উঠতে না পারে সেদিকে সিভিল ও লিগ্যাল অথরিটিকে কড়া নজর রাখতে হবে। সরকারকে মনে রাখতে হবে, দেশে ব্যক্তি-সন্ত্রাস বন্ধ করার জন্য রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের জন্ম দেয়া হলে তা আরও বিপজ্জনক।
আমরা আইনের শাসন চাই। আইনের দ্বারা গঠিত পুলিশ আইন প্রয়োগ করবে, এটাই চাই। সে গন্ডির বাইরে তারাও যেতে পারে না। [সমাপ্ত]
[email protected]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ