ঢাকা, বুধবার 09 November 2016 ২৫ কার্তিক ১৪২৩, ৮ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কাশ্মীরে ভারতীয় গণহত্যা কি চলতেই থাকবে?

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী : কাশ্মীরের জনগণের ভাগ্যের বিড়ম্বনা শুরু হয় সেই ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির সময় থেকেই। স্বাধীনতার প্রাক্কালে ভারতের মুসলমান প্রধান প্রদেশগুলোর প্রায় সবাই পাকিস্তানে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও কাশ্মীরের হিন্দু প্রশাসক ভারতের অন্তর্ভুক্ত থাকার সিদ্ধান্ত নেন। আর এ রকম সিদ্ধান্ত নেন হায়দরাবাদের নিজাম। নিজাম ভেবেছিলেন, হায়দরাবাদের স্বাধীন মর্যাদা থাকবে। কিন্তু তা আর থাকেনি। ভারত হায়দরাবাদের স্বাধীন অস্তিত্ব কেড়ে নিয়ে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করেছে। তারপর থেকেই শুরু হয়েছে কাশ্মীরীদের ভাগ্যের বিড়ম্বনা। ভারতীয় বাহিনীর অত্যাচার নির্যাতনের ফলে কাশ্মীরীদের অবস্থা প্যালেস্টাইনীদের চেয়ে কম বিপন্ন হয়ে পড়েনি। কিন্তু বিশ্ব মিডিয়া যেমন কাশ্মীরীদের দিকে খুব একটা নজর ফেরাচ্ছে না, তেমনি জাতিসংঘও আছে নিশ্চুপ। ফলে ভারতীয় নিগ্রহ তাদের ওপর দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। এখন বিশ্বের মিডিয়া বা জাতিসংঘ শুধু সিরিয়া নিয়েই যেন ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, তেমনটা দেখা যাচ্ছে না কাশ্মীরীদের নিয়ে। ফলে দৃশ্যপটের আড়ালে সেখানে চলছে ভারতীয় বাহিনীর গণহত্যা।
আবার ভারত বিভক্তির পর থেকেই এই কাশ্মীর নিয়ে দু’দেশের মধ্যে সংঘর্ষ, এমনকি যুদ্ধ পর্যন্ত বেধে যায়। তবু এর মীমাংসা হয়নি। এখানে জাতিসংঘও মনে হয় একেবারে অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছে। সিরিয়ায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিসমূহ প্রতিদিন নারী-শিশুসহ ডজন ডজন মানুষকে হত্যা করছে। আর এই হত্যাকাণ্ডের জন্য পরস্পরকে দায়ী করছে। কাশ্মীরেও ঘটছে একই ধরনের ঘটনা। ভারত ও পাকিস্তান সেখানকার হত্যাযজ্ঞের জন্য পরস্পরকে দায়ী করছে। সেখানে কার্যত ঘটছে যুদ্ধাপরাধের ঘটনা। আর এর ফলে বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। এখন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের দায়িত্ব হচ্ছে কাশ্মীর ইস্যুতে অধিকতর মনোযোগী হওয়া, যাতে ভারত বুঝতে পারে যে, সারা বিশ্ব কাশ্মীর ইস্যুতে তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে। ভারতের দখলকৃত জম্মু ও কাশ্মীরে এখন কারফিউ চলছে। সেখানে সকল কর্মকাণ্ড বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে চলছে গ্রেফতার, নির্যাতন আর নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ। সরকারের সামরিক ও বেসামরিক বাহিনী ধারাবাহিকভাবে হামলা চালাচ্ছে। যুদ্ধবিরতি রেখা অবিরাম লঙ্ঘন করা হচ্ছে। সীমান্তবর্তী জনসাধারণ এক দুঃস্বপ্নের ভেতর দিয়ে দিনাতিপাত করছে।
কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, সিরিয়ার সংঘাতের ব্যাপারে জাতিসংঘ বা শক্তিধর দেশসমূহ যত কথা বলছে এবং বিশ্ব মিডিয়া যে মাত্রায় তৎপর তার কিছুই দেখা যাচ্ছে না কাশ্মীর নিয়ে। কাশ্মীরে ভারতীয় বর্বরতা সম্পর্কে বিশ্ব মিডিয়া খুব কমই তৎপর। আবার বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোও কাশ্মীর সীমান্তে সংঘাতের ব্যাপারে তেমন তৎপর বলে মনে হয় না। কাশ্মীরে নতুন করে যে সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছে, তার কারণ অবশ্য ভিন্ন। ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী কাশ্মীরের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা বোরহান ওয়ানীকে হত্যা করার প্রতিবাদে এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। কিন্তু যা কিছু প্রচারিত হচ্ছে, তার সবটুকুই ভারত-পাকিস্তানের সীমান্ত সংঘাতের খবর। তার কোনো গুরুত্ব নেই, সে কথা বলছি না। কারণ এই দুই পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর তিনবার বড় ধরনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে এই সংঘাত নতুন মাত্রা লাভ করে। ভারত দাবি করে যে, তারা পাকিস্তানের অধীনস্থ আজাদ কাশ্মীরের ভেতরে প্রবেশ করে ‘সার্জিক্যাল হামলা’ চালিয়ে সেখানে লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসীদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছে। পাকিস্তান ভারতের এই দাবি অস্বীকার করেছে। তারাও সীমান্তে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে আর দাবি করছে যে, তারা শুধুমাত্র ভারতীয় হামলার প্রতিশোধ নিচ্ছে। রাজনৈতিক বা সামরিকভাবে এই পরিস্থিতি অব্যাহতভাবে চলতেই থাকবে বলে মনে হয়। তবে এখনও ঐ সীমান্তে ব্যাপক সৈন্য বা সামরিক সাজসরঞ্জামের সমাবেশ ঘটেনি। সুতরাং এখনই এখানে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপ দরকার। এছাড়া ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কিত জাতিসংঘের সামরিক পরিদর্শক দলও (ইউএনএমওজিআইপি) কাশ্মীরের পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক অবহিত নয়। কারণ ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে ভারত সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের জন্য কোনো জাতিসংঘ বাহিনীকে সেখানে আসতে দেবে না। একই বছর ২ জুলাই দু’দেশের মধ্যে সম্পাদিত সিমলা চুক্তি অনুযায়ী সে সিদ্ধান্ত বহাল থাকে।
১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর দু’দেশের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। তাতে ১৯৪৯ সালে সম্পাদিত চুক্তির বলে যেসব এলাকা দু’দেশের দখলে ছিল, তার কিছু কিছু হাতবদল হয়ে যায়। ১৯৭১ সালের ১২ ও ২১ ডিসেম্বর ভারত-পাকিস্তান ইস্যুতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত ঐ বৈঠকে জাতিসংঘের ৩০৭ নম্বর প্রস্তাব গৃহীত হয়। সে প্রস্তাবে বলা হয়, যতোদিন উভয় দেশের সেনাবাহিনীকে তাদের স্ব স্ব এলাকায় ফেরত না নেওয়া হবে, ততোদিন সেখানে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি বহাল থাকবে। তাছাড়া তারা জম্মু ও কাশ্মীরের যুদ্ধবিরতি রেখা মেনে চলবে। আর ভারত ও পাকিস্তান বিষয়ক জাতিসংঘের সামরিক পরিদর্শক দল সেটা পর্যবেক্ষণ করবে। ঐ পরিদর্শক দল বিলুপ্ত হয়নি। কিন্তু তারা তাদের দায়িত্ব পালন করছে না। কিংবা বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোও তাদের সে দায়িত্ব পালন করতে বলছে না। আর সে কারণেই ঐ পরিদর্শক দল কাশ্মীর বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদের কাছে কোনো রিপোর্ট পেশ করছে না। জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে এ ধরনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপ বাধ্যতামূলক। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদ আশু তদন্ত ও উত্তেজনা প্রশমনে মধ্যস্থতা করার জন্য একটি বিশেষ প্রতিনিধি দল নিয়োগ করতে পারে কিংবা তা করার জন্য মহাসচিবকে অনুরোধ করতে পারে।
এ ছাড়া বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি সৃষ্টি হলে অভিযোগ পাওয়ার ভিত্তিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে এক বা একাধিক প্রস্তাবও দিতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো এই যে, নিরাপত্তা পরিষদ বা ভারত কাশ্মীর বিষয়ে কিছুই করছে না। আবার ভারত সিমলা চুক্তির অজুহাত দেখাচ্ছে। তাদের বক্তব্য কাশ্মীরের বিরোধ নিষ্পত্তিতে ঐ চুক্তিতে দ্বিপক্ষীয় আলাপ-আলোচনার কথা বলা আছে, তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার প্রয়োজন নেই। সিমলা চুক্তি অনুযায়ী জাতিসংঘ সনদ মোতাবেক দু’দেশের সম্পর্ক পরিচালিত হবে; দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ভিত্তিতে উভয় দেশ উদ্ভূত সমস্যার সমাধান করবে; ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বরের চুক্তি অনুযায়ী, জম্মু ও কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর সীমানা মেনে নেবে এবং কেউই তা লঙ্ঘন করবে না। কোনো পক্ষই ঐ নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর কোনো হুমকি সৃষ্টি করবে না।
কিন্তু ভারত বা পাকিস্তান কোনো পক্ষই সে চুক্তি মানছে না। ফলে তৃতীয় কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপ জরুরি ও অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। আর জাতিসংঘ বা অন্য কারও মধ্যস্থতার ব্যাপারটি নির্ভর করছে সম্পূর্ণরূপে ভারতের ওপর। ১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারত ও পাকিস্তান যখন স্বাধীনতা লাভ করে, তখন কাশ্মীরকে ভারত বা পাকিস্তান যেকোনো একটি দেশে যোগদানের জন্য স্বাধীনতা দেয়া হয়। কিন্তু স্বাধীনতা লাভের পরপরই মুসলিম প্রধান কাশ্মীরীদের সে অধিকার অস্বীকার করে বসে ভারত। আর তার ফলে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ভারত-পাকিস্তান প্রথম যুদ্ধ বেধে যায়। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ৪৯ নম্বর প্রস্তাব গৃহীত হয়। এই প্রস্তাবের বলেই পরিস্থিতির তদন্ত ও বিরোধ নিষ্পত্তিতে মধ্যস্থতা করার জন্য গঠিত হয় ভারত ও পাকিস্তানের জন্য জাতিসংঘ কমিশন (ইউএনসিআইপি)। ১৯৪৮ সালের এপ্রিলে নিরাপত্তা পরিষদে ৪৭ নম্বর প্রস্তার গৃহীত হয়। তাতে ইউএনসিআইপি আকার বাড়ানো হয়। তারা যুদ্ধ বন্ধের জন্য পর্যবেক্ষক পাঠানোসহ বেশ কিছু পদক্ষেপের সুপারিশ করে।
এই ইউএনসিআইপি’র সুপারিশ অনুসারে জাতিসংঘ মহাসচিব কমিশনকে সহায়তা করার জন্য একজন সামরিক উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। আর তাকে সহায়তা করার জন্য নিয়োগ দেন এক দল সামরিক পর্যবেক্ষক। নিরস্ত্র প্রথম সামরিক দলটি যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের জন্য ১৯৪৯ সালের জানুয়ারিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছেন। এই দলই পরে ভারত ও পাকিস্তানে জাতিসংঘ সামরিক পর্যবেক্ষক দলে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু ১৯৭২ সাল থেকেই ভারত জাতিসংঘ পর্যবেক্ষক দলকে সেখানে যেতে বাধা দিচ্ছে। ভারতের এই অবস্থান ১৯৪৯ সালের ২৭ জুলাই দুদেশের মধ্যে সম্পাদিত করাচি চুক্তিরও ব্যত্যয়। তাতে যুদ্ধবিরতি রেখা বরাবর পর্যবেক্ষণের জন্য জাতিসংঘ সামরিক পর্যবেক্ষক দলের বিষয়টা বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু ভারত ১৯৭২ সাল থেকে তাও মানছে না। সে চুক্তিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল যে, ইউএনসিইপি যেখানেই প্রয়োজন মনে করবে সেখানেই পর্যবেক্ষক মোতায়েন করতে পারবে। আর উভয় পক্ষের স্থানীয় কমান্ডাররা জাতিসংঘ পর্যবেক্ষক দলের সহায়তায় যুদ্ধবিরতি রেখা বরাবর পর্যবেক্ষণ করবে। এক্ষেত্রে কোনো বিরোধ দেখা দিলে তা ইউএনসিআইপি’র সামরিক পর্যবেক্ষকের কাছে উপস্থাপন করা হবে এবং তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। তবে ১৯৫১ সালের ৩০ মার্চ ইউএনসিআইপি বিলুপ্ত হয়ে যায়। আর ঐ বছরই গঠন করা হয় ইউএনএমওজিআইপি। আর জম্মু ও কাশ্মীরের যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেয়া হয়।
জাতিসংঘ অবহিত থাকুক বা না থাকুক, দুটি বিষয় এখন খুবই জরুরি। (১). হয় ভারতকে ইউএনএমওজিআইপিকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন পর্যবেক্ষণ করতে দিতে হবে, নয়তো (২). পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের আর একবার যুদ্ধ করতে হবে। তাতে পাকিস্তান প্রথম ভারতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে। আর তার ফলে গোটা অঞ্চল তথা গোটা বিশ্বেই বিপর্যয় নেমে আসবে। বিষয়টি দিল্লী আর জাতিসংঘকেই ভেবে দেখতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ