ঢাকা, বুধবার 09 November 2016 ২৫ কার্তিক ১৪২৩, ৮ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র সোনাদিয়া

এম এস শহিদ : বাংলাদেশের এমন অনেক স্থান বা জায়গা রয়েছে যেখানে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তুললে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের দৃষ্টি আকৃষ্ট করা সম্ভব। বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত এমনই একটি দ্বীপ সোনাদিয়া। স্রষ্টার নিপুন হাতে গড়া প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য ঘেরা দ্বীপ সোনাদিয়া বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের সীমান্তবর্তী জেলা কক্সবাজারের দ্বীপাঞ্চলীয় জনপদ মহেশখালী কুতুবজোম ইউনিয়নের একটি দ্বীপ। তবে প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের মতো এখানে তেমন জনবসতি গড়ে ওঠেনি। তারপরও চারদিকে সাগর আর মাঝখানে চিরহরিৎ ঝাউ-কেউড়ার বনে ঘেরা সোনাদিয়া দেখেলে প্রাণটা জুড়িয়ে যায়। এক হাজার ২১৫ প্রজাতির বৈচিত্র্যময় জীবের বসবাস রয়েছে এ দ্বীপে। তন্মধ্যে শামুক ১৬২টি, কাঁকড়া ২১টি, উদ্ভিদ ৫৬৭টি, চিংড়ি ১৯টি, লবস্টার দুটি, মাছ ২০৭টি, উভচর ১২টি, সরীসৃপ ১৯টি এবং পাখির প্রজাতি আছে ২০৬টি। জলাবায়ুর বিরূপ প্রভাব ও পরিববেশগত বিপর্যয়ের কারণে এসব জীববৈচিত্র্য ক্রমশ বিলুপ্ত হতে চলেছে। এ দ্বীপে চামচঠুটো কাদাখোঁচা পাখির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শীতকালে দেখা যায়। ৪ হাজার ৯২৮ হেক্টর জমির ওপর পূর্ব-পশ্চিম লম্বালম্বি বঙ্গোপসাগরের উত্তাল তরঙ্গমালার মধ্যে অপরূপ সৌন্দর্যঘেরা দ্বীপ সোনাদিয়ার অবস্থান। সোনাদিয়ায় ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির পাশাপাশি শুঁটকি মহাল, চিংড়ি চাষ ছাড়াও প্রাকৃতিক বনায়ন ও বালুময় চরাঞ্চল রয়েছে। এখানে রয়েছে নয়নাভিরাম প্যারাবন এবং কোলাহলমুক্ত সৈকত। লাল কাঁকড়া, নানা প্রজাতির সামুদ্রিক কাছিম দ্বীপটির সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। হজরত মারহা আওলিয়ার মাজার ও তার আদি ইতিহাস, সাগরবক্ষে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য, সূর্যাস্তের দৃশ্য, প্যারাবন বেষ্টিত আঁকাবাঁকা নদীপথে নৌকা ভ্রমণ ও স্পিডবোটে চড়ে মহেশখালী চ্যানেল হয়ে সাগরের মাঝপথে বঙ্গোপসাগরের দৃশ্য অবলোকন পর্যটকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ।
চামচঠুঁটো কাদাখোঁচা পাখিদের আবসস্থল সোনাদিয়ার অদূরে নিঝুম দ্বীপে। বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনাল বিলুপ্ত প্রায় এ প্রজাতিকে রক্ষার জন্য সোনদিয়াকে পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। সোনাদিয়া দ্বীপ বাংলাদেশে পাখির ২০ তম গুরুত্বপূর্ণ অভয়ারণ্য বলে বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনালের ঘোষণায় বলা হয়। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এ প্রজাতির মোট পাখির ১০ শতাংশ সোনাদিয়ায় রয়েছে এবং বর্তমানে চামচঁঠুটো পাখি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
মৎস্য শিকার সোনাদিয়ার অধিবাসীদের প্রধান পেশা। কিছু পরিবার চিংড়ি ও লবণ উৎপাদন করে জীবিকা নির্বাহ করে। পুরুষদের মতো এখানকার নারীরাও খুব পরিশ্রমী। বাংলাদেশ সরকার সোনাদিয়া দ্বীপকে পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী এ দ্বীপের পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে এমন কর্মকান্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এখানে পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইতিবাচক অনেক দিক রয়েছে। দ্বীপবাসীর সহায়তায় এখানে কমিউনিটিভিত্তিক ইকোট্যুরিজমের যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। এটি দ্বীপবাসীকে বিকল্প আয়ের সুযোগ করে দেবে এবং দ্বীপবাসীর অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। সোনাদিয়া দ্বীপটির নামকরণে সঠিক কোনো তথ্য নেই। তবে অনেকদিন আগে থেকে এখানে সোনাতুল্য দামি পণ্য মৎস্য সম্পদ আহরিত হতে থাকে বলে এটিকে সোনার দ্বীপ বা সোনদিয়া বলা হয়। বর্তমানে বই পুস্তকে দ্বীপটি সোনাদিয়া নামে স্থান পাচ্ছে। তবে সোনাদিয়া দ্বীপটির নামকরণে এমন জনশ্রুতি আছে, একদা চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে কিছু জেলে সাময়িকভাবে মাছ শিকারের জন্য সোনাদিয়ায় আসেন। হঠাৎ একজন জেলে সেখানে একটি শিলাখন্ড দেখেতে পান। এটি তার কাছে খুবই আকর্ষণীয় ও দামী মনে হয়। এ কারণে তিনি এটিকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পা ধোয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করতে থাকেন। কিছুদিন পর জেলেটি ওই শিলাখন্ডে দা শান দিতে গিয়ে বুঝতে পারেন আসলে এটি একটি স্বর্ণখন্ড। শতবর্ষীদের কেউ কেউ এ ঘটনার কারণে দ্বীপটির নামকরণ সোনাদিয়া হয়েছে বলে মনে করেন।
তথ্যমতে, প্রাচীনকালে মানুষের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম ছিল নদীপথ। তাই তখনকার দিনে মানুষের জীবিকা আয়ের অন্যতম উৎস ছিল মাছ শিকার। উভয় কারণে বহুদিন আগে থেকে সোনাদিয়ার সাথে মানুষের পরিচয় ঘটে। স্থানীয়দের মতে, যথেষ্ট সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ায় এখানে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। সংশ্লিষ্টদের মতে, যথাযথ পদক্ষেপ এবং এর বাস্তবায়ন করা গেলে এ দ্বীপে পর্যটন বাণিজ্যের প্রসার ঘটানো সম্ভব যা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সেই সাথে দ্বীপবাসীর বিকল্প আয়ের পথ সৃষ্টি হবে। বর্তমানে ৮১০ জন মানুষ এ দ্বীপে বসবাস করে। এ দ্বীপের মোট জমির পরিমাণ ২ হাজার ৯৬৫ দশমিক ৩৫ একর।
এর মধ্য থেকে সরকার ১ হাজার ৪৭ দশমিক ৮৪ একর জমির ওপর পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার জন্য ২০১২ সালের ১৩ নভেম্বর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। কিন্তু সরকারি উদ্যোগের সাড়ে তিন বৎসর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এটির বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়নি। এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মোঃ আলী হোসেন বলেন, সরকারের রূপরেখা অনুযায়ী, প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্র-বন্দরের সাথে মিলিয়ে সোনাদিয়া দ্বীপে সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ইকো-রিসোর্ট গড়ে তোলা হবে। তবে এমন একটা প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন, তাই কিছুটা সময় তো লাগবেই। জেলা প্রশাসক সূত্রে জানা যায়, সরকার প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্র-বন্দরের সাথে মিলিয়ে সোনাদিয়া দ্বীপ ঘিরে পরিবেশ-বান্ধব পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এরই প্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ৬ জানুয়ারী পর্যটন সচিব খোরশেদ আলী চৌধুরী সোনাদিয়া দ্বীপে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা যায় কিনা তা খতিয়ে দেখেতে ওই দ্বীপ পরিদর্শন করে। পরিদর্শন শেষে কক্সবাজার বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে জেলা প্রশাসককে সোনাদিয়া দ্বীপের কোনো জমি কাউকে লিজ না দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। সেই সাথে এ দ্বীপে নতুনভাবে বসতি স্থাপন না করতে এবং দ্বীপে বসবাসকারীদের অনত্র পুনর্বাসনের বিষয়েও একটি রূপরেখা প্রণয়ন করারও নির্দেশ দেন পর্যটন সচিব। তাছাড়া নিরাপত্তার বিষয়টিও খতিয়ে দেখতে বলা হয়। তারপর কিছুদিন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কর্মতৎপরতা লক্ষ্য করা গেলেও পরবর্তীতে তা আর দেখা যায়নি। সোনাদিয়া দ্বীপে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার সরকারি উদ্যোগ এখন ফাইলবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ