ঢাকা, বৃহস্পতিবার 10 November 2016 ২৬ কার্তিক ১৪২৩, ৯ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রাষ্ট্রায়ত্ত ৪ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ

এই সত্য অনেক আগেই অনস্বীকার্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, বর্তমান সরকারের আমলে বিশেষ করে ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির ক্রমাগত মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণই শুধু আশংকাজনক পর্যায়ে চলে যায়নি, বেড়েছে ঋণখেলাপিদের সংখ্যাও। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী এক লাখের বেশি ব্যক্তি ঋণ খেলাপির খাতায় নাম লিখিয়েছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণও চমকে ওঠার মতো। চলতি বছরের শুরুর দিকে সরকারি ও বেসরকারি ৫৬টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫৪ হাজার ৬৫৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। তথ্যটি জাতীয় সংসদে জানিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অর্থমন্ত্রীর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নিজেও বিভিন্ন উপলক্ষে ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরার ঘোষণাও শুনিয়েছেন কর্তা ব্যক্তিরা।
অন্যদিকে বাস্তব পরিস্থিতিতে কিন্তু উন্নতির লক্ষণ পর্যন্ত দেখা যায়নি। এখনো তেমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বিশেষ করে সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী- রাষ্ট্রায়ত্ত এই চার ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানোই যাচ্ছে না। ব্যাংক চারটি লাভজনকও হতে পারছে না। জানা গেছে, কমার পরিবর্তে বিগত মাত্র ছয় মাসে চার ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ বরং প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা বেড়ে গেছে। অথচ বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে ব্যাংক চারটিকে জুন মাসের মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আড়াই হাজার কোটি টাকা কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো রকম।
এমন অবস্থার কারণ জানাতে গিয়ে রিপোর্টে আর্থিক কেলেংকারি এবং কোনোরকম যাচাই-বাছাই না করে রাজনৈতিক বিবেচনায় ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের প্রাধান্য দিয়ে ঋণ দেয়ার মতো কিছু বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, খেলাপি ঋণের ব্যাপারে শুধু নয়, অন্য কোনো একটি প্রশ্নেও ব্যাংক চারটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মানেনি। জানা গেছে, ২০০৭ সাল থেকে সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আদায়, ঋণ প্রবৃদ্ধি যথাযথ রাখা, লোকসানী শাখা ও পরিচালনা ব্যয় কমানো এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির উন্নয়ন করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক তাগিদ দিয়ে এসেছে। এসব বিষয়ে পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে তিন মাস পরপর ব্যাংক চারটির সঙ্গে নিয়মিত বৈঠকও করা হচ্ছে। এ ধরনের এক বৈঠকেই জুন মাসের মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আড়াই হাজার কোটি টাকা কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল। চার ব্যাংক তা মেনেও নিয়েছিল। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে কমার পরিবর্তে ঠিক আড়াই হাজার কোটি টাকাই উল্টো বেড়ে গেছে। বিষয়টিকে যথেষ্ট রহস্যপূর্ণ ও প্রশ্নসাপেক্ষ মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক সাবেক গবর্নরসহ অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, শুধু সমঝোতা চুক্তি করে কিংবা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিলেই পরিস্থিতিতে উন্নতি ঘটবে না। বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া কেমন হবে সে কথা যেমন বলে দিতে হবে, তেমনি দায়ী ও ব্যর্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিতে হবে। কারণ, অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঋণ দেয়ার সমগ্র প্রক্রিয়াতেই অসততার আশ্রয় নেয়া হয়। টাকার বিনিময়ে দুর্নীতিও করেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। ঋণ গ্রহীতার রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়টিকেও তারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন, যাতে সরকারকে খুশি রাখা যায় এবং তাদের বিরুদ্ধে যাতে কোনো ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব না হয়।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারণ করে দেয়া লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আড়াই হাজার কোটি টাকা কমিয়ে আনার পরিবর্তে গুণে গুণে ঠিক ওই পরিমাণ টাকার খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার তথ্যটি আশংকাজনক শুধু নয়, আপত্তিকরও বটে। কারণ, এই সত্য প্রাথমিক দিনগুলো থেকেই প্রকাশিত হয়ে পড়েছে যে, খেলাপি ঋণের প্রতিটি ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা সরাসরি জড়িত রয়েছেন। এই নেতারা প্রভাব খাটিয়ে ঋণের ব্যবস্থা যেমন করেন তেমনি আবার শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কবল থেকেও খেলাপিদের বাঁচিয়ে দেন। মূলত সে কারণে একদিকে ঋণের অর্থ না দিয়েও পার পেয়ে যাচ্ছে ব্যবসায়ী নামের টাউট লোকজন, অন্যদিকে লাফিয়ে বেড়ে চলেছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তারাও থেকে যান বহাল তবিয়তে। একই কারণে কর্মকর্তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করতেও সাহসী হয়ে ওঠেন। বাস্তবেও সাহসী হয়ে উঠেছেন বলেই রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ঠিক সেই পরিমাণে বেড়েছে যে পরিমাণ কমিয়ে আনার নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল।
আমরা মনে করি, বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখার বা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, ক্ষমতাসীনদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রশ্রয়ে রয়েছেন বলেই রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের কর্মকর্তারা যথেচ্ছভাবে কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ পেয়েছেন। সেজন্যই খেলাপি ঋণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিপুল পরিমাণের মন্দ বা কুঋণ, যা কখনো আদায় করা যাবে না বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। এভাবে চলতে থাকলে দেশের ব্যাংকিং খাত তথা সমগ্র অর্থনীতিও মুখ থুবড়ে পড়বে। এজন্যই বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে সরকারের উচিত বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া, যাতে বেসরকারি কোনো ব্যাংকের পক্ষে এ ধরনের কার্যক্রম চালানো সম্ভব না হয়।  সব মিলিয়ে আমরা এমন ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাই, যাতে শিল্প স্থাপন বা ব্যবসা-বাণিজ্যের নামে টাউট লোকজন ব্যাংক ঋণ না পেতে পারে এবং যাতে প্রকৃত শিল্প মালিক ও সৎ ব্যবসায়ীরা ঋণের অভাবে বাধাগ্রস্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত না হন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ