ঢাকা, শুক্রবার 11 November 2016 ২৭ কার্তিক ১৪২৩, ১০ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিশ্ব কবি নজরুলের মহাসমুদ্রের গান

শফি চাকলাদার : মহাসমুদ্রের আবার সঙ্গীত আছে নাকি? আছে তো-। ওর ঢেউয়ের গর্জন। কখনো শান্ত নীরব। কখনো বাতাস আর ঢেউয়ের কানাকানি। কখনো তরঙ্গমালার ছোট বড় অসংখ্য বৈচিত্রীয় কান্না কিম্বা হাসি। কখনো রৌদ্রকরোজ্জ্বল মিশে সমুদ্রের দীপ্ত প্রকাশ। কখনো ভয়াল-তা-বলীলা। কখনো সৈকতের সাথে মেলামেশা। কি বলে  সমুদ্র ঐ সৈকতে এসে? ‘কেউ বোঝে, বোঝে না কেহ’? এই সবগুলো প্রশ্ন’র উত্তর নজরুল তাঁর সঙ্গীতে দিয়ে গেছেন- ঐ যে ‘কেউ বোঝে, বোঝে না কেহ’? নজরুল বুঝেছিলেন মহাসমুদ্রের এই কলতান। এই কলতান বুঝেই নজরুল আর এক মহাসমুদ্র তৈরি করে রাখলেন। একের পর এক অসাধারণ সেই সঙ্গীত। সেই সুর। সেই বাণী। শ্রুতি হয়ে ওঠে ধন্য সেই সব শুনে। অবাক এবং বিস্ময় শব্দ দুটো একাকার হয়ে মিশে যায় ‘হতবাক’ শব্দের প্রকাশে। মনে পড়ে গেল নজরুল মহাসমুদ্র সঙ্গীতের একখানা গানের অন্তরা-
চুপ করে চাঁদ সুদূর গগনে
মহাসাগরের ক্রন্দন শোনে
ভ্রমর কাঁদিয়া ভাঙ্গিতে পারে না
কুসুমের নীরবতা॥
এই উল্লেখিত অন্তরাটি ‘তুমি শুনিতে চেয়োনা আমার মনের কথা’ গানটির দুটি অন্তরার প্রথমটি। গানটির এই মুখরার দ্বিতীয় লাইনটি ‘দখিনা বাতাস ইঙ্গিতে বোঝে/কহে যাহা বনলতা’ লাইনটি বলে দেয় গানটির মূল বক্তব্য। এই দ্বিতীয় লাইনটি ভালো করে পড়লে বুঝতে কষ্ট হয় না কবি কি বলতে চান। উপমা’র রাজা নজরুল। তাই দ্বিতীয় লাইনটিকে বাণীতে ফুটিয়ে তুলতে কবি চাঁদ, মহাসাগর, ভ্রমর, কুসুমকে চয়ন করেছেন। দ্বিতীয় অন্তরাও যেন সঙ্গীতের এই মহাসমুদ্র নজরুল আরো সুন্দর কথা’র জাল বুনে উপমা’র অলঙ্করণ যুক্ত করেছেন। সুর ও বাণীর মহাসমুদ্র নজরুল বলেন-
পাখায় পাখায় বাঁধা যবে রয়
বিহগ-মিথুন কথা নাহি কয়,
মধুকর যবে ফুলে মধু পায়
রহে না চঞ্চলতা॥
গানের শুরুটায় নজরুল ‘প্রেম’কে আড়াল করে বলেন ‘তুমি শুনিতে চেয়োনা আমার মনের কথা’- ‘অভিমান’কে কেন্দ্র করেছেন নাকি আর কিছু। স্পষ্ট হয়ে যেতে কবি বাণী বাঁধেন- পাখায় পাখায়, বিহগ-মিথুন- তেমনি মধুকর যখন মধুপায় তখন তার ভেতর যে শান্তি ফিরে আসে, তখন তার চঞ্চল স্বভাব দূর হয়ে যায়। এদুটো অন্তরার মধ্যে সুরের ক্ষেত্রেও আলাদা প্রকাশ ফুটে উঠেছে। দুটো অন্তরার ভাব যেমন তারতম্য রয়েছে সুরেও পর্দার ভিন্নতা রয়েছে, কিন্তু দুটি অন্তরার গন্তব্য যেমন এক ÑÑ সুরও তেমনি এক-পর্দা ভিন্নতা থাক না। শিল্পীর কণ্ঠও শিল্পী তেমনি কারুকাজে ভরে তুলবেন। শ্রুতি তখন মোহিত হতে বাধ্য। যেমন এই গানটির সঞ্চারীটি Ñ দুটো অন্তরার মধ্যে সুর ধরে রেখে যেমন সঞ্চারীত হয় তেমনি এর কাজ। অবশ্য যে সকল গানে দুটো অন্তরা ও সঞ্চারী রয়েছে। সাধারণত সকল সুরকার দুটো অন্তরার সুর একই পর্দায় রাখেন- একটি অন্তরার সুর হয়ে গেলে অপর অন্তরার সুরও হয়ে যায়। কিন্তু এ-তো নজরুল- সুরের মহাসমুদ্র- যেখানে তরঙ্গমালায় পূর্ণ থাকে বড় বড় ঢেউ থেকে শুরু করে ছোট ছোট ঢেউ মহাসমুদ্রের রূপকে ফুটিয়ে তোলে Ñ নজরুলও তাঁর সুরকে তেমনি একই মহাসমুদ্রে ঢেউ-এর কা- মানুষের মনেও যেমন বৈচিত্র্য ধারার ছবি ঘিরে রাখে নজরুল সুরও তারই মতো প্রকাশ ঘটায়। গানটির সঞ্চারীটি সমস্ত ‘ভালোবাসা’র কথোপকথনকে প্রকাশ করেছে। ইংরেজি শব্দ ‘স্মাইল’ বাংলায় উপমা- এই উপমা’র মহারাজা তাই কি বুনেছেন লক্ষ্য করা যাক-
মনের কথা কি মুখে সব বলা যায়?
রাতের আঁধারে যত তারা ফোটে
আঁখি কি দেখিতে পায়?
সব তারা যেমন চোখ দেখতে পায় না তেমনি মনের সব কথাও বলা যায় না। কবি এ জন্য উপমায় ‘রাতের অন্ধকারকে যুক্ত করেছেন। দাদরা তালে নিবদ্ধ গানটিতে কোন কঠিন শব্দ নেই যা বুঝতে কষ্ট দেয়। বাণী হয়ে উঠেছে কাব্য আর কাব্যকে বেঁধে রেখেছে উপমা আর উপমা। গানটি নিয়ে বিভিন্ন রকম স্কোপ রয়েছে গবেষণা’র। শিল্পীরা সুর নিয়ে গবেষণা করতে পারেন- কতটুকু কণ্ঠালঙ্করণ গানটিকে শ্রুতি আকর্ষণে ধরে রাখতে সুর-পথ তৈরি করা যায়। এই গানটিকে ইচ্ছে করলে তেমন রেওয়াজী কণ্ঠ অন্তত পনের মিনিট পর্যন্ত সঙ্গীত মন্ত্রকে মাতিয়ে রাখতে পারে। শ্রোতা তার শ্রুতিকে অন্য কোন প্রান্তে নিতেই পারবে না। গানটিতে রয়েছে এমনি সুর-রসদ। নজরুল-সুর-মহাসমুদ্রের রয়েছে এমন হাজার গান। উল্লেখিত গানটি প্রখ্যাত শিল্পী সন্তোষ সেন গুপ্তর কণ্ঠে রেকর্ড হয়েছে। তবে গানটি রয়েছে বুলবুল ২য় খ-ে। যে গ্রন্থটি প্রকাশ পায় বঙ্গাব্দ ১৩৫৯-এর ১১ জ্যেষ্ঠ। নজরুল অসুস্থ হওয়ার দশ বছর পর। আমার ভাবনায় মনে হয় গানটি ১৯৪২ সনে রেকর্ড হয়। বুলবুল ২য় খ-ে এ গানখানিও রয়েছে- ‘আমার নহে গো ভালোবাস শুধু ভালোবাস মোর গান’। এটি ১৯৪২ সনেই একই শিল্পীর কণ্ঠে রেকর্ড হয়। এবারের আলোচনায় এই গানখানি চয়ন করেছি। উপমার মহারাজা নজরুল এই গানখানিতেও  উপমার পর উপমা দিয়ে উপমা-মালা তৈরি করেছেন। বাংলা সঙ্গীত-সাহিত্য ভা-ার আর কারো মাধ্যমে এমন উপমা-সমৃদ্ধ সঙ্গীত পেয়েছে। এ গানখানিও অবশ্যই নজরুলের সুরে অলঙ্কৃত। নজরুল উদার ছিলেন তাই বলে তিনি তার সুর করা গান অন্যের নামে দিয়ে দেবেন এটা কখনোই বিশ্বাসযোগ্য নয়। আমি তো বারে বারেই বলে চলেছি, যাদের নাম রয়েছে তাদের অন্য কারো গানের সুর মিলিয়ে দেখুন-গবেষণা করুন। যারা নজরুল অসুস্থ হবার পর এমন দুষ্কর্মের সাথে যুক্ত হয়েছেন তারা সকলেই নজরুলের অসীম আকাশতুল্য উদারতা লক্ষ্য করেই নজরুলের পাশে স্বার্থ-উদ্ধারে জড়ো হয়েছিল এবং স্বার্থ উদ্ধারের অলঙ্কৃত সহযোগিতা কারুকাজ নজরুল সান্নিধ্যের সকলেই করেছেন এবং সফলও হয়েছেন। নজরুল-সুরতানে যাদের ইনফিউশন ক্ষমতা একেবারেই নেই এবং নজরুলতানে দুর্বল এবং পদাধিকার বলে প্রশাসক-বিদগ্ধ বুদ্ধিজীবী (যারা নজরুল নাম উচ্চারণই করেন না তারা এ কাজে মন্তব্য সহায়তা করে)। যারা  নজরুল চিন্তাই করেন না তারা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুযোগ পেয়ে এই বিভ্রান্তিকে সমাদর করছে। এই নজরুল দুর্বল চিত্ত মানুষদের সাহস হবার নয়।
যাই হোক, ‘আমায় নহে গো ভালবাস শুধু’র আলোচনায় আসছি। গানটি কাহারবা তালে নিবদ্ধ। মনকে উতলা করে রাখে এমন উপমা-রাজিতে সমৃদ্ধ। ‘তুমি শুনিতে চেয়োনা’ এবং এই গানটি গীতি-চিত্র অতনুর দেশ’-এর। এই দুটি গান ছাড়াও ‘অতনুর দেশ’-এ আরো ছয়টি বিখ্যাত গান রয়েছে। ওগো সুন্দর তুমি আসিবে বলিয়া, আমার কথা লুকিয়ে থাকে, চাঁদের মতো নীরবে এসো প্রিয় নিশীথ রাতে, কথা কও, কও কথা, থাকিও না চুপ করে, আমি জানি তব মন, আমি বুঝি তব ভাষা এবং যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই- এই গীতিনাট্যটি কোলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে ১৯৪০ সালের ৮ জুন প্রচারিত হয়েছিল। নজরুল স্বয়ং যে ‘গীতিনাট্য’তে উপস্থিত ছিলেন সেসব গানের পরবর্তী রেকর্ডে অন্যের সুর-নাম হল কি করে। কনট্রাডিকশন, কনফিউশন দূর করতে অন্য বেহুদা নামগুলো অহেতুক যুক্ত করার দরকার আছে কি? ‘আমায় নহে গো’তেও দুটি অন্তরা ও সঞ্চারি রয়েছে। দুটো অন্তরাতেই নাজরুলিক সুর বৈচিত্রতায় পর্দারও ভিন্নতা রয়েছে যা নজরুল ছাড়া ভাবাই যায় না। আর সুরই বলে দেয় এই সুর নজরুলের অবশ্যই নজরুলের। গানটির মুখরাতেই একটি বাস্তব উপমা শ্রুতিকে সারাজীবন ধরে রাখে- ‘বনের পাখিরে কে চিনে রাখে গান হলে অবসান’- প্রথম লাইনটিও তদ্রƒপ ‘আমায় নহে গো ভালোবাস শুধু ভালোবাসো মোর গান’-। এই অপূর্ব সহজ শব্দ চয়ন গেঁথে রাখেন এক অবিস্মরীয় সঙ্গীত-মুখরা। প্রথম অন্তরাটি অনন্তকালের জন্যই যেন নজরুল রচনা করেন- ‘উপমা’ শব্দটিও ম্লান হয়ে যায় এখানে-
চাঁদের কে চায়- জোছনা সবাই যাচে,
গীত শেষে বীণা পড়ে থাকে ধূলি মাঝে;
তুমি বুঝিবে না- বুঝিবে না-
আলো দিতে পোড়ে কত প্রদীপের প্রাণ॥

অপূর্ব অসাধারণ অতুলনীয় অন্তরাটি বাণী সমৃদ্ধ। সুর সমৃদ্ধ। এ এক অপূর্ব সুর গাঁথা। তবলার কাজ সুরকে আরো খেলিয়ে নিতে পারেÑ গানটিতে সে সুযোগ রয়েছেÑ দ্বিতীয় অন্তরাও অসাধারণ উপমা-কাজে সমৃদ্ধÑ সুর যেন বাণীকে আরো প্রকটভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। মিশ্র মুলতানী কাহারবা নিবদ্ধÑ
সবাই তৃষ্ণা মেটায় নদীর জলে,
কী তৃষা জাগে সে নদীর হিয়া তলে
বেদনার মহাসাগরের কাছে কর সন্ধান
সুরের মহাসাগর নজরুল এই দুটি গানের বাণীতে বলেন “মহাসাগরের ক্রন্দন শোনে’ বেদনার মহাসাগরের কাছে কর সন্ধান।” সন্ধান কর এই সুরের বাণীর মহাসমুদ্র কোথায় আছে? কোথায় বিরাজে এ মহা-মানুষটি। গানটির সঞ্চারীতে সুরের সাথে সঞ্চারীত হয় গানটির হৃদয়-নিঙড়ানো সুর মাধুর্যÑ
যে কাঁটা-লাতার আঁখ-জল, হায়, ফুল হয়ে ওঠে ফুটেÑ
ফুল নিয়ে তায় নিয়েছ কি কিছু শূন্য পত্র পুটে
    ফুল হয়ে ওঠে ফুটে।
অসাধারণ বাণীর অপূর্ব সুর মাধুর্য একবার শুনলে শ্রুতি অবশ্যই তৃপ্ত হবে না, হতেও পারে না। এসব অসাধারণ সৃষ্টি যখন চৌর্য বৃত্তির কবলে ভ্রান্তি সৃষ্টিতে মশগুল তখন বলতেই হবে নজরুল প্রতিষ্ঠানসমূহ পদক্ষেপ গ্রহণ করুন -- নজরুলের সুর আর কারো নাম ছাপানো হবে না। ‘অতনুর দেশ’ ১৯৪০ সালে প্রচারিত হয় নজরুল তখন প্রচার পাশে উপবিষ্ট। সমস্ত কিছু অবশ্যই নজরুলের।
ইদানীং অনেকেই প্রশ্ন করেন নজরুলের প্রথম ইসলামী গান কোনটি? ‘বাজল কিরে ভোরের সানাই’ নাকি ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে’ নাকি ‘আসিলে কে গো অতিথি ওড়ায়ে নিশান সোনালী নাকি নবজীবনের নব উত্থান আজান ফুকারি এসো নকীব। এই চারটি গানের মধ্যে প্রথম ইসলামি গান কোনটি। এখানেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক এবং হয়েছেও। প্রথম ইসলামি গান রচিত হয় ‘নকীব’ শিরোনামে। গানটির প্রথম লাইন ‘নবজীবনের নব উত্থানে আজান ফুকারি এসো নকীব’। গানটি নজরুল হুগলিতে রচনা করেন, তারিখ ছিল ১৩৩২ সালের ১৩ অগ্রহায়ন ২৯ নবেম্বর ১৯২৫ সাল। পরবর্তীতে ১৩৩২ এর মাঘ মাসে বরিশালের পাক্ষিক ‘নকীব’ পত্রিকায় প্রকাশ পায়। পত্রিকার ওটা ছিল বিশেষ সংখ্যা। এই গানটিই বাংলার সঙ্গীত ভান্ডারে প্রথম ইসলামি গানÑ
নব জীবনের নব-উত্থান-আজান ফুকারি এস নকিব
জাগাও জড়! জাগাও জীব ॥
জাগে দুর্বল, জাগে ক্ষুধা-ক্ষীণ,
জাগিছে কৃষাণ ধূলায় মলিন,
জাগে গৃহহীন, জাগে পরাধীন
জাগে মজলুম বদ-নসিব!
মিনারে মিনারে বাজে আহ্বানÑ
আজ জীবনের নব উত্থান!
শঙ্কাহরণ জাগিছে জোয়ান
জাগে বলহীন জাগিছে ক্লীব,
নব জীবনের নব উত্থানÑ
আজান ফুকারি এস নকীব ॥
‘জিঞ্জীর’ কাব্য গ্রন্থে গানটি রয়েছে। তবে গানটি এখানে ওখানে গাওয়া হলেও তখনো রেকর্ডে গৃহীত হয়নি। দ্বিতীয় ইসলামি গানটি
‘পদ্মা’ নদীবক্ষে ১৯২৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রচিত হয়, ‘খোশ আমদেদ’ দিনটি ছিল রবিবার রচিত হল ইসলামী সঙ্গীত। যুক্ত হল বাংলা সঙ্গীত ভান্ডারে। ঢাকায় মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রথম বার্ষিক সম্মেলনে কবি স্বয়ং গানটি গেয়েছিরেন অনুষ্ঠানে। ভৈরবী রাগে নির্মিত কাহারবা তালে গানটিÑ
আসিলে কেগো অতিথি উড়ায়ে নিশান সোনালি!
ও চরণ ছুঁই কেমনে দুই হাতে মোর মাথা যে কালি ॥
দখিনের হালকা হাওয়ায় আসলে ভেসে সুদূর বরাতী!
শবে’রাত আজ উজালা গো আঙিনায় জ্বলল দীপালি ॥
তালি-নব ঝুমকি বাজায় গায় ‘মোবারক বাছ’ কোয়েলা।
উলসি’ উপচে প’ল পলাশ অশোক ডালের ঐ ডালি ॥
প্রাচীন ঐ বটের ঝুরির দোলনাতে হায় দুলিছে শিশু।
ভাঙা এই দেউল চূড়ে উঠল বুঝি নৌ-চাঁদের ফালি ॥
এলো কি অলখ-আকাশ বেয়ে তরুণ হারুন-আল-রশীদ।
এলো কি আল-বেরুনী, হাফিজ, খৈয়াম, কায়েস, গাঞ্জালী ॥
সানইয়াঁ ভয়রোঁ বাজায়, নিদমহলায় জাগল শাহজাদী ॥
কারুনের রূপার পুরে নূপুর পায়ে আসল রূপ-ওয়ালী ॥
খুশির এ বুলবুলিস্তানে মিলেছে ফরহাদ ও শিরি।
লাল এ লায়লি - লোকে মজনু হর্দম চালায় পেয়ালী ॥
বাসিফুল কুড়িয়ে মালা না-ই গাঁথিলি রে ফুল-মালি।
নবীনের আসার পথে উজাড় করে দে ফুল-ডালি ॥
এই গানটি ১৩৩৩ এর চৈত্র সংখ্যা মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্র প্রথম বার্ষিক ‘শিখা’তে প্রকাশ পায়। গানটি রচনার বাংলা তারিখ ফালগুন ১৫/১৩৩২ সন।
তৃতীয় যে গানটির প্রসঙ্গ আসে সেটিরও রচনা কাল ১৩৩৫ এর অগ্রহায়নে ১৯২৮ এর নবেম্বর-ডিসেম্বর এর কোন দিন। এটিও একটি ইসলামি বিখ্যাত গান। শ্রীহট্টে অনুষ্ঠিত মুসলিম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন সম্মেলন ১৯২৮ সেপ্টেম্বর পাওয়া যায়। অন্যত্র অর্থাৎ কবিতাটির পাদটীকায় লেখা আছে “নিখিল বঙ্গ মুসলিম যুবক সম্মিলনের উদ্বোধন সঙ্গীত।’ গানটি ১৩৩৫ এর অগ্রহায়ণ সংখ্যা সওগাতে প্রকাশ পায়। গানটির শিরোনাম ‘ভোরের সানাই’। এই সম্মেলনে এ.কে ফজলুল হক এবং ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধনী সঙ্গীত হিসেবে নজরুল সদ্যরচিত গান ‘বাজল কি ভোরের সানাই’ গেয়ে শোনান। পাঁচটি অন্তরাতে গাঁথা এবং কাহারবা তালে নিবদ্ধ গানটি-
বাজল কি রে ভোরের সানাই    নিদ মহলার আঁধার পুরে।
শুনছি আজান গগন তলে    অতীত রাতের মিনার চূড়ে ॥
সরাইখানার যাত্রীরা কি     ‘বন্ধু জাগো’ উঠল হাঁকি?
নীড় ছেড়ে ঐ প্রভাত পাখি    গুলিস্তানে চলল উড়ে ॥
আজ কি আবার কাবার পথে    ভিড় জমেছে প্রভাত হতে।
নামল কি ফের হাজার ¯্রােতে    হেরার জ্যোতি জগৎ জুড়ে ॥
আবার খালিদ তারিক মূসা    আনল কি খুন-রঙিন ভূষা
আসল ছুটে হাসিন উষা    নও- বেলালের শিরিন সুরে ॥
তীর্থ পথিক দেশ বিদেশের     আরফাতে আজ জুটল কি ফের,
‘লা-শরিক আল্লাহ’ মন্ত্রের     নামল কি বান পহাড় ‘তুরে’ ॥
আঁজলা ভরে আনল কি প্রাণ    কারাবালাতে বীর শহীদান
আজকে রওশন জমিন আসমান    নও জোয়ানির সুখ-নূরে ॥
উল্লেখিত ইসলামি তিনটি গানই ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে’ এবং ‘ইসলামের ঐ সওদালয়ে’র আগে রচিত এবং বিভিন্ন স্থান অনুষ্ঠানে গীত। কিন্তু রেকর্ড বদ্ধ হয়নি। অপরদিকে ‘ওমর রমজানের ওই’ এবং ‘ইসলামের ঐ সওদালয়ে’ গান দুটি প্রথম ইসলামী গান হিসেবে রেকর্ডভুক্ত। এতে অনেকের মনেই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। রেকর্ড প্রকাশ হওয়াতে ‘ওমন রমজানের ওই রোজার শেষে’ এবং ‘ইসলামের ঐ সওদা লয়ে’ গান দুটি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে বিরাজ করছিল। আর প্রথম তিনটি গান আগে রচিত হলেও রেকর্ড না হওয়াতে ঘরে ঘরে পৌঁছতে না পারায় এ দুটো গানের মত কৌতুহল সে সময় সৃষ্টি হয়নি। এছাড়াও ‘খুশিলয়ে খোশ রোজের’  (১৩৩৮ মাঘ-চৈত্র), তোমারি মহিমা সব বিশ্বপালক কর তার (১৩৩৯ বৈশাখ), আয় মরু পারের হাওয়া (১৩৩৯ আশ্বিন) ঐ  সময়ে রচনা। আর নজরুলের রচনা সমূহ’র রেকর্ড রাখার বিশ্বস্ত কেউ ছিল না। কবির চারপাশের বেশিরভাগ মানুষগুলো যতটা স্বার্থপর ছিল ততটা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করেনি। লক্ষণীয় কি করে এই উদার মানুষটির রচনা থেকে নিজ নামে নিয়ে নেয়া যায় সেদিকের চিন্তাধারাও নজরুলের জন্য ক্ষতিকর ছিল। যার দরুণ আজও নজরুলের রচনা এটা পাওয়া যায় তো তারিখ নেই, ওটা পাওয়া যায় তো কোন গ্রন্থে রয়েছে সে খবর নেই। আজও তো সিনসিয়ার দায়িত্ববান নজরুলের কেউ তো লক্ষণীয় নয়। নিজে কি করে প্রোগ্রাম দখল করবে সেদিকেই দৃষ্টি। আমি ছাড়া কেউ যেন প্রোগ্রাম না পায়। আর চ্যানেল সমূহের নজরুল বিষয়ের নিষ্ঠাবান মানুষ কোথায়? যারা ‘নজরুল’কে নানান আঙ্গিকে তুলে ধরতে ক’টা গান-অনুষ্ঠান ছাড়া?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ