ঢাকা, শুক্রবার 11 November 2016 ২৭ কার্তিক ১৪২৩, ১০ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

চোর

দেলোয়ার হোসেন : জিনাত আরা বেগম। বয়স চল্লিশ পার হয়ে গেছে। তবু বয়সের স্বাভাবিক সৌন্দর্যের মধ্যে রয়েছে বাড়াবাড়ি রকমের আকর্ষণ। তিনি নাম করা একটি কোম্পানীর অফিস ইনচার্জ।
লাঞ্চ শেষ করে টেবিলে বসলেন তিনি। গুর গুর শব্দে একবার ডেকে উঠলো মেঘ, তারপরই শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। বেশ গরমও পড়ছিলো। জানালার পর্দা সরিয়ে আকাশের দিকে তাকালেন জিনাত আরা বেগম। দু’টি কাক উড়ে এসে পাশের বিল্ডিং এর সানসেটে বসলো।  ওরা একে-অপরের শরীর চুলকে দিচ্ছে ঘনিষ্ট হয়ে। ঠোঁটে ঠোঁট ঘষছে। অকৃত্রিম ভালোবাসার দৃশ্য জিনাত আরার মনটাকে আন্দোলিত করলো। কিছু ভালোলাগা মুহূর্ত ভেসে উঠলো মনের মধ্যে। সেই সাথে প্রিয় মানুষ জিকুর মুখটাও।
জিকু একসময় নিজের অফিস ফেলে চলে আসতো আমার অফিসে। বসে থাকতো আমাকে সঙ্গে নিয়ে বাসায় ফিরবে বলে। দু’হাতে টাকা উড়াতো চাইনিজে অথবা শপিংমলে। আমার অফিসের সবাই মুখটিপে হাসতো। আমার খুব লজ্জা লাগতো। সে দিনের সেই লজ্জা সারা শরীর জুড়ে ফুটাতো ভালোবাসার ফুল। সেই জিকু এখন কতো বদলে গেছে। রাত দশটার পর বাসায় ফেরে। ভালোলাগা আর ভালোবাসার একটি কথাও সে বলে না কখনো। কতই বা বয়স আমাদের। মানুষ বুড়ো হয়ে যায় কিন্তু মনতো কখনো বুড়ো হয় না।
শুভ্র মায়াবী মুখটা জুড়ে ফুটলো পরাজয়ের ছাপ। লুকিয়ে রাখা অভিমানও উঠলো প্রকট হয়ে। জিনাত আরার ভাবনার মধ্যে হঠাৎ কারো পায়ের শব্দে দৃষ্টি ঘুরালেন তিনি। আয়শা, সুনিতা আর দিলারা রুমে ঢুকলেন।
কী ব্যাপার একেবারে দলবেঁধে! প্রশ্ন করলেন জিনাত আরা।
আয়শা বললেন, গল্প করতে এলাম।
সুনিতা বললেন, রোদ আর বৃষ্টির মধ্যে গাছের পাতারা কেমন হাসছে। ঠাস ঠাস শব্দে যখন বৃষ্টি ঝরে পাতারা তখন থির থির করে কাঁপে। তখন আমার খুব ভালো লাগে। আর একটু ঝড়ো বাতাস হলে তো কথাই নেই। বলেই ফিক ফিক করে হেসে উঠলেন সুনিতা।
দিলারা বললেন, ধুম বৃষ্টির মধ্যে ভিজতেও খুব মজা। কিন্তু আজ আমার সঙ্গের সাথী হারিয়ে গেছে। জিনাত আরা ম্যাডাম কপালে ভাজ টেনে বললেন, সঙ্গের সাথী মানে?
- ছাতা।
- ছাতা?
খিল খিল শব্দে হেসে উঠলো সবাই।
- হ্যাঁ আপা। বাস থেকে।
- ভুলে ফেলে এসেছেন। ঐ একটা জিনিসের প্রতি মানুষ উদাসীন, শুধু ঘোরতর প্রয়োজনে হাতে তুল নেয়। Ñমালিক ছাড়া পড়ে থাকতে দেখলেও হাত বাড়ায় সবাই।
সুনিতা বললেন, ম্যাডাম ছাতার মালিক কাছে থাকলেও মানুষ হাত বাড়ায়। ধরা পড়লে একটা হাসি দিয়ে বলবে, সরি, ছাতাটা আপনার! যা বৃষ্টি হচ্ছে- আমি ভেবে ছিলাম... তখন আর কিছুই বলার থাকে না। তবে ছাতা চুরি হলেও চুরির কথা না বলে, বলে ছাতা হারিয়ে ফেলেছি। তবে চুরি তো চুরিই। ছোট বেলা পড়েছি- না বলিয়া কাহারো কিছু লইলে তাকে চুরি করা বলা হয়। চুরি করা বড় দোষ।
আয়শা হঠাৎ বলে উঠলেন, চুরির প্রসঙ্গ যখন উঠলো তখন একটা মজার ঘটনা তো আমাকে বলতেই হয়। আমার এক আত্মীয়ের মেয়ে গ্রাম থেকে ঢাকা এলো কলেজে পড়তে। তখন আমাদের বাসায় একটা নিজের মানুষের খুব প্রয়োজনও ছিলো। মেয়েটি লক্ষ্মী, তবে দোষের মধ্যে এই টুকুই যে, সে চুরি করে। অংকটা বড় নয়- দশ বিশ টাকা। প্রথমে কেউ বুঝতে না পারলেও সবাই বুঝতে পারি বিন্দু বিন্দু করে টাকা গায়েব হয়ে যাচ্ছে কোথাও। সে ছিলো আসলেই সিয়ানা চোর। একদিন ধরাও পড়লো। হাটে হাঁড়িও ভাঙলো কিন্তু তারপরও চুরি।
মাঝখানে সুনিতা বললেন, আপা, চোর হলো তিন প্রকার। কেউ প্রয়োজনে চুরি করে। কেউ মজা করার জন্য আবার কারো অভ্যাসই চুরি করা। সে চুরি না করে থাকতে পারে না। এটা তার চুরি রোগ।
সুনিতার কথায় হেসে উঠলেন সবাই। হাসলেন না শুধু জিনাত আরা ম্যাডাম। তাঁর চোখে মুখে কেমন বিরক্তির ছায়া। কিন্তু এমন মজার প্রসঙ্গ এখানেই থেমে যেতে পারে না। দিলারা খুব রসিক আর ঠোঁট কাটাও। সে বললো, ম্যাডাম, আমার দুই খালার এমন হাত সাফাই ছিলো যে, মার্কেটে ঢুকলে হাতের কাছে যা কিছু পেতো তাই চুরি করতো। বাচ্চাদের জামা কাপড় থেকে শুরু করে কানের জিনিস, গলার মালা, লিপিস্টিক, দামি সাবান ইত্যাদি।
আয়শা বললো, বলেন কি, সত্যি না আপনি বানায়ে বলছেন।
- একটুও না। অবশ্য একদিন ধরাও পড়েছিলো। ঐ যে কথায় বলে না, “দশদিন চোরের একদিন গৃহস্থের”।
Ñধরা পড়েছিলো? কী লজ্জার কথা। তারপর কি হলো।
- কি আর হবে। খালা নিজেই রেগে অস্থির। দোকানিকে বললেন, চুরি করা বলছেন কেনো? কাপড়টা পছন্দ হয়েছে তাই ব্যাগে রেখেছি, বলতে খেয়াল নেই। আপনি খেয়াল করেছেন সে জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। এবার উচিত মূল্য বলুন দিয়ে দিচ্ছি।
তারপর বেশ লোকজনও জড়ো হলো সেখানে। কেউ তামাশা দেখছে কেউ মজা লুটছে। কেউ আবার পিছন থেকে ধাক্কাও মারছে। হঠাৎ টহল পুলিশ এসে হাজির। পুলিশ হয় তো খালামনিদের চিনে থাকবে অথবা ভদ্রতার খাতিরেই সে বললো, এতো বাড়তি কথার প্রয়োজন আছে কি! জিনিসের মূল্য নিয়ে নিলেই তো লেঠা চুকে যায়।
দোকানের অন্য একটি ছেলে বললো, স্যার উনি আসলেই ফ্রগ দু’টো চুরি করেছিলেন। আমি দেখেও ভাবছিলাম দেখি না কি করে। পুলিশ বললো, দেখলে কিন্তু বললে না কেনো ? মানুষের ভুল হতেই পারে। খদ্দের লক্ষ্মীর সম্মানের উপর যে আঘাত হেনেছো তার জন্য কি হতে পারে সে কথা একবার ভেবেছো?
একথার পর দোকানের মালিক উল্টা ক্ষমা চাইলো খালাদের কাছে।
গল্প শুনে সবাই হো হো শব্দে হাসতে শুরু করলো। আয়শা বললেন, “চোরের মার বড় গলা” কথাটা মিথ্যা নয়।
সেই মুহূর্তে জিনাত আরা ম্যাডাম কেমন অস্বস্তিবোধ করতে লাগলেন। তিনি বললেন, আর গল্প নয়। এবার যার যার কাজে ফিরে গেলে খুশি হবো। আমি আর সময় দিতে পারছি না। আয়শা মুখটা দুখি মানুষের মতো করে বললেন, ম্যাডাম বড় আশা নিয়ে এসেছিলাম একটু কফি খাবো বলে। ম্যাডাম কৃত্রিম হেসে পিওনকে কফি দিতে বললেন।
জিনাত আরা ম্যাডামের মাথার মধ্যে চোর শব্দটা ঝালো পোকার মতো তিড়িং বিড়িং করে লাফাচ্ছে তখন। চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকলেন তিনি। শরীরটা কেমন জ্বলে যাচ্ছে। ভিতরে প্রচ- রাগ ফুসে উঠলো। সেদিন পিয়নটা যদি আমার চায়ের কাপটা না ভাঙতো তাহলে... প্রচ- অনুসূচনার মধ্যে তিনি ভাবতে লাগলেন সেদিনের সেই ঘটনা।
সামান্য একটা প্লাস্টিকের কাপ। কাপের গায়ে সিঙ্গাপুরের সুন্দর একটা ছবি। দেখেই ভালো লেগে গেলো ম্যাডামের। দরদাম করেও কিনতে ইচ্ছে করলো না। আবার ভাবলেন প্লাস্টিকের কাপÑ দোকানদার ছেলেটা কী ভাববে! তাই সুযোগ বুঝে কাপটা ব্যাগে রেখে দিলাম। ছেলেটা দেখেনি।
 বিষয়টা নিয়ে কারো সাথে শেয়ারও করিনি। তবে কেনো সারাক্ষণ অপবাদের গন্ধ, চুরির ছি ছি ভাবটা সারা শরীর জুড়ে কালো পিঁপড়ের মতো বেয়ে বেড়াচ্ছে। ছোট বেলা এমন ঘটনা তো কতই ঘটেছে। বান্ধবীদের টাকা-পয়সা সোনা-দানা নয়-কোন একটা হাতে গড়া মাটির পুতুল, চুলের কাঁটা অথবা ছোট্ট গোলাকার আয়না দেখে ভালো লেগেছে তাই চুরি করে নিয়েছি। আমার ব্যাগ থেকেও কত কিছু হারিয়ে গেছে। তখন তো এমন অস্বস্তিবোধ করিনি; বরং মনে মনে পুলকিত হয়েছি। এই সামান্য একটা প্লাস্টিকের কাপÑ এর জন্য কেনো এমন অস্থিরতায় ভুগছি।
জিনাত আরা ম্যাডাম বাসে অফিসে যাওয়া- আসা করেন। ছুটির পর অফিসের সামনে থেকেই বাসে ওঠেন। বাস থেকে নামার পরই বাঁ হাতে একটা গলি। চিপা গলির দুপাশে নানান ধরনের দোকান। গলিটার শেষ মাথায় কালভার্ট। ময়লা ভরা খালের পাশে তিন-চারটা ভ্যান। ভ্যান বোঝাই মালপত্র। কেউ পুরনো কাপড় কেউ মৌসুমী ফল বিক্রি করে। শুধু একটি ছেলে প্লাস্টিকের নানান ধরনের জিনিসপত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। হাসিখুশি মুখ, ব্যবহারও সুন্দর। তার বেচা কেনাও হয় ভালো। জিনাত আরা ম্যাডাম মাঝে মাঝেই পছন্দ মতো এটা সেটা কিনে নিয়ে যান। সেদিন বিকালে ম্যাডামকে আসতে দেখেই ছেলেটি হাসিমুখে লম্বা একটা সালাম দিয়ে কেমন আপনজনের মতো বললো, আপা ভালো আছেন? ছেলেটির আন্তরিকতায় ম্যাডাম মুগ্ধ। কালভাট পার হয়ে দু’পা হাঁটলেই তাঁর বাসা। তিনি বাস থেকে নেমে রিক্সা করেও যেতে পারেন কিন্তু বয়স হয়েছে একটু হাঁটাও প্রয়োজন। তাছাড়াও নিত্য নতুন জিনিস দেখতে তাঁর ভালো লাগে। মাঝে মাঝে অল্প পয়সার জিনিস কিনেও নেন। বাসার সবাই বকাবকিও করে থাকে এ জন্য। কিন্তু এসবের মধ্যে ম্যাডাম ছোট বেলার দিনগুলোর মধ্যে যেনো ফিরে যান। সে কথা বুঝতে চায় না।
সেদিন মনটাও ভালো ছিলো না। অনেক দিনের চায়ের কাপটা পিয়নটা ভেঙে ফেলেছে। কি ভেবে দোকানের সামনে দাঁড়ালেন ম্যাডাম। ছেলেটি দোকান থেকেই একটা চিরুনি তুলে দু’বার তার লম্বা চুলে চালালো। তারপর বললো, আপা ইচ্ছে মতো বেছে নেন। তারপরও বাসায় নিয়ে কোনো খুত ধরা পড়ে, নিয়ে আসবেন পাল্টে দেবো। আপনি আমার পুরনো কাস্টমার। দুই কথা কোনোদিন হয়নি, আশা করি আর হবেও না।
একপাশে বস্তির অনেকগুলো মেয়ে এটাসেটা নেড়েছেড়ে দেখছে। ছেলেটি বললো, মালপত্র বেশি উল্টাপাল্টা করো না। আগে পছন্দ করো, দাম নিয়ে এই মোতালেবের কাছে আটকাবে না। এদিকে ম্যাডাম কয়েকটা জিনিস বেছে নিয়ে বললো, মোতালেব এগুলোর ঠিক ঠিক দাম বলে দাও। দাম বেশি ধরলে কিন্তু এই আপার ছায়াও আর দেখতে পাবে না। কথা বলার ফাঁকেই একটা কাপ ঢুকে গেল ম্যাডামের বড় ভ্যানিটি ব্যাগে। ছেলেটা বললো, কি যে বলেন আপা, দশটা দোকান যাচাই করে যদি দেখেন মোতালেব  বেশি নিয়েছে তখন আমার দু’গালে দুই রাম চড় লাগাবেন। আমি খুশি হবো।
- ঠিক আছে, একটা টিফিন বক্স, চা ছাকনি, দু’টো স্টিলের বাটি।
- আর কিছু নাইতো?
কথাটা শুনেই তিনি কেমন ভরকে গেলেন। তবে মনের জোর ছাড়লেন না।
- না। আজ এগুলুই থাক। বললেন বটে তবু মনটার মধ্যে কেমন যেনো একটু কেঁপে উঠলো।
ছেলেটি মনে মনে একটা হিসাব করে বললো, আপনি পঞ্চাশ টাকা দেন।
- একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না? আরো কমাও।
- কি যে বলেন আপা!
গার্মেন্টসের মেয়েরা মালপত্র নেড়েচেড়ে দেখছিলো। ওদের চলে যেতে দেখে মোতালেব বললো, কি আপারা চলে যাচ্ছেন যে, মাল পছন্দ হলো না। কথাটা বলেই একগাল হেসে ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে ছেলেটি বললো, ওরা চুরির মতলবে এসেছিলো আপা। মোতালেবের চোখ ফাঁকি দেয়া অতো সহজ নয়। পাঁচ বছর ধরে ব্যবসা করছি। চোখ-কান খোলা রাখি বলেই এখনো টিকে আছি। তা না হলে কবেই লাল বাতি জ্বলে যেতো।
জিনাত আরার বুকটার মধ্যে আবার চমকে উঠলো। ছেলেটা কি আমাকে উদ্দেশ্য করে বলছে! ওকি কিছু দেখেছে? জিনাত আরা ম্যাডামের বুকের মধ্যে অস্থিরতা বাড়তে থাকলো। তাড়াতাড়ি সরে যেতে পারলেই যেনো শান্তি। তিনি নিজেকে হালকা করার জন্য বললেন, একেবারে এক দামে কি ফুটপাতে বেচা কেনা চলে!
- আপা এই ছিটেফোটা লাভের পয়সা দিয়েই সংসার চলে। ময়লা খালের পাশে নিজের ভ্যানে ব্যবসা করি কিন্তু এখানেও মাস্তানদের বখরা দিতে হয়।
ম্যাডাম আর কোনো কথা না বাড়িয়ে জিনিসের মূল্য পরিশোধ করে দ্রুত পা বাড়ালেন। কিন্তু কেবলই মনে হতে লাগল পেছন থেকে ছেলেটি যদি ডেকে বলে- আপা মনে করে দেখেন তো আর কিছু নিয়েছেন কি না। একথা মনে হতেই আর একটু দ্রুত পা চালালেন ম্যাডাম। সারা শরীর ঘেমে একাকার। কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। বুকটা ধরফর করছে। বাসার কাছাকাছি আসতেই আখের রস বিক্রেতাকে দেখে ম্যাডাম প্রচ- আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে গিয়ে বললেন, তোমার রস ঠান্ডা হবে তো?
- হ্যাঁ আপা।
- দাও।
Ñআপনাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে ম্যাডাম। আপনি আমার এই টুলটার উপর বসেন তারপর রস খান। এখন যে কী দিনকাল আইল। গরমের পর বৃষ্টি-বৃষ্টির পর গরম।
জিনাত আরা ম্যাডামকে পাড়ার সবাই চেনে। আজ তাঁকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আখের রস খেতে দেখে অনেকেই হা করে চেয়ে থাকলো। তখন সূর্যটাও প্রায় ডুবু ডুবু।
ক্লান্ত অবসন্ন শরীর টেনে নিয়ে ঢুকলো বাসায়। সিড়ি টপকে দোতলায় গিয়ে ধপ করে বসে পরলেন সোফায়। কাজের মেয়েকে ডেকে বললেন, হাসি ফ্যানের স্প্রিট বাড়িয়ে দেতো। হাসি বললো, খালাআম্মা মুখহাত ধুয়ে ফ্রেস হন-আমি চা আনছি।
- দিয়া কি করছেরে?
- আপা সারাদিন ফেসবুক নিয়েই তো বসে থাকে, লাইক মারে আর হাসে।
- কলেজে যায়নি?
- হ্যাঁ। কলেজ থেকে এসেই তো...
- তুই যা এখন।
জিনাত আরা ম্যাডাম বাথরুমে ঢুকে ফ্রেস হলেন, শরীর একটু চাঙ্গা হলো বটে কিন্তু কাপটা যেনো  আঠার মতো লেগে থাকলো কলিজার মধ্যে। কফি খেতে খেতে আবার ভাবলো, আমি বোকার মতো এতো ঘাবড়াচ্ছি কেনো। মানুষ পুকুর চুরি করছে। আবার সেটাকে বৈধ করার জন্য নির্লজ্জেও মতো লড়ে যাচ্ছে। আর আমার তো বাদী পক্ষ নেই। পাঁচ/দশ টাকা মূল্যের কাপ। এমন দু’একটা এদিক সেদিক হয়ে গেলেও ঐ মোতালেবের কিছু যায় আসে না। এ নিয়ে এতো ভাবছি কেন!
পরদিন বাস থেকে নেমে তিনি রিক্সা নিলেন। কালভার্ট পার হওয়ার সময় ছেলেটার দিকে একবারও তাকালেন না। তবে অস্পষ্ট সেই আপা শব্দটা পিছু ছাড়ছিলো না। বাসায় এসে কি ভেবে তিনি মেয়েটার রুমে ঢুকলেন। দিয়ার পড়ার টেবিলের তাকের উপর সেই কাপটা দেখে বুকটার মধ্যে একটু সান্ত¦Íনার ঢেউ গড়ালো। আবার অজানা একটা ভয়ও এসে জুটলো।
- কাপটা তোর পছন্দ হয়েছে?
- ছবিটা ভালো লাগলো-তাই নিয়ে এলাম। আচ্ছা মা, কাপটা তুমি কবে এনেছো, আর লুকিয়েই বা রেখেছিলে কেন? আব্বুর ভয়ে?
- কি যে বলিস না!
- অল্প দামি কিনা তাই বলছি।
- ওসব কথা রাখ। তোর কথা বল।
- আমার আবার কি কথা?
- কেমন আছিস, কোনো কিছু তোর চাই কি না এই সব আর কি।
- মা, তোমার শরীর ঠিক আছে তো? একবার আব্বুর সাথে সমুদ্রে যাও। দেখবে মনটা তোমার বিশাল হয়ে গেছে। মনের মধ্যে ছোট খাটো কোন কিছু ঢুকতেই পারবে না।
- গেলে মন্দ হয় না, তবে আমরা তিনজনই যাবো।
 Ñএবার যাও দুটো সাবজেক্ট এখনো বাকি। ও ভালো কথা একশো টাকা দাওতো। কলম কিনতে হবে। নতুন কলমটা ব্যাগ থেকে চুরি হয়ে গেছে।
- স্কুল কলেজে এমনই হয়। তুই আমার একটা কথার জবাব দে তো, কুশের অঙ্কুরসম ক্ষুদ্র, দৃষ্টি অগচর তবু তীক্ষèতম। এমন অপরাধের জন্যও কি মানুষের মনে অনুশোচনার সৃষ্টি হয়?
- একথা বলছো কেন?
- এমনি জানতে চাইছি।
- তোমাকে আজ যেনো কেমন কেমন লাগছে। আমি বেশ বুঝতে পারছি তোমার অফিসে কিছু একটা হয়েছে। সে যাই  হোক, তুমি একটা কাজ করো। নামাজ পড়ো, দেখবে সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে।
- কি করে বুঝলি?
- আমার মনের মধ্যে কোন অশান্তির সৃষ্টি হলে আমি গভীর রাতে এক মনে নামাজ পড়ি। তারপরই ভালো লাগে।
- তোর আবার অশান্তি কিসের?
- ধরো কোনো বান্ধবীর সাথে ভুলবুঝাবুঝি হলো অথবা কোনো বিষয়ে আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। আবার হঠাৎ কারো প্রতি প্রচন্ড রাগ হলো। এরকম হলে অশান্তিতে ভুগি।
মেয়ের কথাগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনলেন জিনাত আরা বেগম। তারপর বললেন, তোর পরীক্ষা তো সামনেই। এবার আরো ভালো করা চাই। কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে আমাকে বলিস। তোর বাবা আজকাল প্রায়ই রাত করে বাসায় ফেরে। আমার ভালো লাগে না। তোরা খেয়ে নিস। আমার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। মনে হয় ডায়বেটিস বেড়েছে। আমি শুয়ে পড়ি।
গভীর রাত। জিনাত আরা বেগম চুপি চুপি বিছানা থেকে উঠলেন, দরজা খুলে দক্ষিণের বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ালেন।
রাতের বুকে কেমন শান্ত শিশুর মতো ঘুমিয়ে আছে প্রকৃতি। একলা চাঁদ আনমনে পাড়ি দিচ্ছে আকাশনদী। দক্ষিণের দিকটা বেশ খোলামেলা। দৃষ্টি চলে যায় বহু দূর। রাতের নিস্তব্ধতা এমন মহোময় তা কোনো দিন ভাবতে পারেননি জিনাত আরা। মনটা কেমন সদ্য ফোটা গোলাপের মতো পবিত্র হয়ে উঠলো। সেখান থেকে ফিরে এসে অজু করলেন তিনি। একটা জায়নামাজ নিয়ে আবার সেই বেলকনিতে গেলেন।
অনেক দিন পর অন্য রকম মন নিয়ে তিনি নামাজ পড়লেন। নামাজ শেষ হওয়ার পরও উঠলেন না। বসে থাকলেন জায়নামাজের উপর। মনকে এমন করে বিহ্বল করে দেয়ায় মতো সময় তার জীবনে পূর্বে কখনো আসেনি।
হঠাৎ মোতালেবের মুখটা ভেসে উঠলো। তিনি স্পষ্ট শুনতে পেলেন, আপা এই মোতালেব কোনো জিনিস নিয়ে আপনার সাথে চালাকি করলে দুই গালে দুই রাম চাটি লাগাবেন। চোখ কান খোলা রাখি বলেই এখনো ব্যবসা করে যাচ্ছি।
বেশ সকালেই দিয়ার ঘুম ভাঙলো। ছুটির দিন হলেও দিয়াকে ছুটতে হবে প্রাইভেট পড়তে। ব্রাশ হাতে নিয়ে দক্ষিণের বেলকনিতে গিয়েই সে হতবাক। বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো ঘুমন্ত মায়ের মুখের দিকে।
মা কি সারা রাত এখানেই ছিলো? মায়ের জন্য দিয়ার মনটা কেমন করে উঠলো। মায়ের মনে কিসের এতো কষ্ট, মা কে ডাকলো দিয়া মা, রাতে নামাজ পড়ে এখানে ঘুমিয়ে পড়েছো। এক কাজ করো, ফজরের নামাজটাও পড়ে নাও। এখন থেকে নামাজ আর ছেড়ো না। বয়সও তো বেড়েছে।
পরদিন অফিস থেকে ফেরার পথে জিনাত আরা ম্যাডাম আর রিক্সা নিলেন না। হাঁটতে হাঁটতে এসে দাঁড়ালেন মোতালেবের ভ্যানের সামনে।
ম্যাডামকে দেখেই মোতালেব সালাম দিয়ে বললো, আপা, নতুন কিছু মাল এনেছি পছন্দ হলে নিতে পারেন। আপনার জন্য সবচেয়ে কম রেট। পুরনো কাস্টমার বলে কথা।
- না রে, আজ আর কিছু নিবো না। সেদিন একটা মাল বেশি নিয়েছিলাম, কিন্তু মনের ভুলে তার দাম দেয়া হয়নি।
কথাটা বলেই ব্যাগ থেকে সেই প্লাস্টিকের কাপটা বের করতে গেলেন ম্যাডাম। মোতালেবের ঠোঁট খুলে ছড়ালো তৃপ্তির  হাসি। আত্মবিশ্বাসের হাসি।
Ñআপা কাপটা ফেরত দিতে হবে না। ওটা মনে করেন...
Ñকেনো, তুই কি জানতি সেদিন আমি তিনটা মালের সাথে একটি কাপও নিয়েছিলাম?
Ñ আমি জানতাম, আপনি কাপটা ফেরত দিতে আসবেন তাই বলিনি। সবাই সবকিছু পারে না আপা।
মোতালেবের কথা শুনে সারা শরীর যেনো অসার হয়ে গেলো জিনাত আরা ম্যাডামের। তিনি এই পথের ছেলেটার কাছে সত্যিই হেওে গেলেন? এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন ছেলেটার দিকে। 
হঠাৎ জিনাত আরা ম্যাডাম রাগে ফেটে পড়লেন। বললেন, হয় টাকা নিবি নয়তো মাল ফেরত নিবি। তানাহলে তোকে থাপড়ায়ে...।
মোতালেব চুপ। ম্যাডাম দ্রুত রিক্সা নিলেন। চোখ ঝেপে অশ্রু গড়ালো। আঁচলে চোখ মুছে সামনে তাকালেন তিনি। সন্ধ্যার গলিপথটা যেনো সন্ধ্যার সোনালী আলোয় হাসছে তখন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ