ঢাকা, শুক্রবার 11 November 2016 ২৭ কার্তিক ১৪২৩, ১০ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী: নিভৃতচারী সাহিত্যসেবী ও সমাজসংস্কারক

আজাদ এহতেশাম : শিল্পী জীবনের ভিত্তিমূল ব্যক্তি মানুষের আদর্শ প্রত্যয় ও প্রতীতী সমন্বয়ে রচিত হয় যা সমগ্রজীবন ব্যাপী উদ্ভাসিত হয় কর্ম ও জীবনাচরণের পরতে পরতে। ইসলামি ঐতিহ্য, আদর্শ ও মূল্যবোধ বাংলা সাহিত্যে যে কয়জন লেখকের বিশ্বাসের ভিত্তিমূলে জারিত ছিলো মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী (১৮৯৬-১৯৫৪) তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর সৃজনীশক্তি ও ধীশক্তির সংশ্লিষ্টতায় বাংলা সাহিত্যে একজন আদর্শ ও নন্দিত সাহিত্যিকের মর্যাদায় তিনি অভিষিক্ত হয়েছেন। তাঁর লেখনী স্পর্শে কীর্তিত হয়েছে জাতির গৌরবময় অতীত ইতিহাসের নব নব উপলব্ধি ও চেতনার আলোকবর্তিকা। তাঁর রচনা সহজ সরল এবং ঋজু গদ্যশৈলী কপটতাহীন ভাব প্রকাশে শব্দের অনবদ্য চয়ন। তিনি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন চিন্তা ও যুক্তিবাদী মনের আরশিতে ইসলামের অতীত শৌর্যবীর্যের ঐতিহ্য নির্ভর কাহিনী ও ঘটনার রূপায়ণে এক অনন্য স্বাতন্ত্র্যতা দেখিয়েছেন।
মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর লেখনীর বিষয় বৈচিত্র্যে বহুরৈখিক না হলেও মুসলিম কৃষ্টি-কালচার ও ইসলামী অনুশাসনের আনুগত্য এবং পরিচ্ছন্ন জীবনবোধের সাধনায় সমাজ সেবার ভূমিকা পালন করেছেন দ্বিধাহীন চিত্তে। এ কারণে তাঁর রচনা ইসলামী চেতনা সমৃদ্ধ অতীত ঐতিহ্যে ও ইসলামের স্বর্ণালি যুগের প্রতিভাস।
সংখ্যাবিচারে তাঁর সৃষ্টির সংখ্যা অপ্রতুল হলেও সাহিত্যমান বিচারে তাঁর রচনা শৈল্পিক মানে উত্তীর্ণ। যদিও তাঁর প্রচুর রচনা গ্রন্থবদ্ধ হয়নি এখনো। জীবনীগ্রন্থ রচনায় তাঁর কৃতিত্ব ও সার্থকতা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে সমুন্নত। তাঁর রচিত গ্রন্থসংখ্যা মোট কতটি তাও পরিষ্কার নয়। আবার কোন কোন গ্রন্থের শিরোনামও আজ পর্যন্ত উদ্ঘাটিত হয়নি। যে গ্রন্থগুলোর পরিচয় পাওয়া যায় তা হলো: ‘মরুভাস্কও (১৯৪১), ‘ছোটদের হযরত মোহাম্মদ (১৯৭৭), ‘কায়েদ আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ (১৯৪৮), ‘মোহাম্মদ আলী (১৯২১), ‘মহামানুষ মুহসিন (১৯৩৪), ছোটদের জন্য লিখেছেন: ‘ছোটদের শাহ্নামা, ‘ছোটদের হাতেম তাই, ‘মণি চয়নিকা প্রভৃতি। এ ছাড়া তাঁর দু’টি অনুবাদ গ্রন্থ হলো: ‘এডিথ রবাট্স সংকলিত “ডনকুইকসোটের গল্প (১৯১৮) এবং তুর্কী বীরাঙ্গনা খালেদা এদিব খানমের তুর্কী উপন্যাসের বঙ্গানুবাদ ‘স্মার্ণা নন্দিনী’। তাছাড়া ‘আল এসলাম, কোহিনূর, নূর, সওগাত, সাম্যবাদী, প্রবাসী, বুলবুল, নওবাহার, মাহে নও, কৃষক, মাসিক মোহাম্মদী, দিলরুবা প্রভৃতি পত্রিকায় শিক্ষা, সাহিত্য, সমাজ, ইসলাম, ইতিহাস ঐতিহ্য প্রভৃতি বিষয়ে তাঁর শত শত প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলা ভাষায় প্রাত্যহিক কথোপকথন ও সাহিত্য রচনার ব্যাপারে মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর চিন্তা চেতনা ছিল সম্পূর্ণ নিঃসংশয় ও নিষ্কলুষ। বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনায় তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য প্রকাশ পরিলক্ষিত হয় নির্দ্বিধচিত্তে। সে সময়ে উর্দু প্রীতি শিক্ষিত মুসলিম সমাজে একেবারেই দুর্লক্ষ্য ছিল না। আদর্শিক কারণে বাঙালি মুসলিম সমাজে কোন কোন সময়ে উর্দু ও বাংলার মধ্যে সংঘর্ষ নিভৃত অন্তরালে চলতে চলতে এক সময় প্রকাশ্যে রূপও নিয়েছিল। পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ‘আল এসলাম’ পত্রিকায় তিনি লিখলেন ‘সাহিত্য প্রসঙ্গ’ নামে প্রবন্ধ। এ প্রবন্ধে তিনি লেখেন:
‘জীবিতা বাংলাকে মৃত মনে করিয়া উর্দুর চাদরে ঢাকিয়া রাখিতে যতই চেষ্টা হোক না বাংলা উর্দুর চাদর গা ঝাড়া দিয়া ফেলিয়া যখন উঠিবে, তখন তাহাকে চাপিয়া রাখা যাইবে না।’
বাঙালির অস্তিত্ব ও প্রাণের সংবিত্তি বাংলা ভাষার ভিত্তিমূলে প্রোথিত বলেই বাংলা বাঙালির প্রাণ, জীবনের উৎসমূলের সঞ্জীবনীসুধা এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। সমাজের উচ্চবিত্তের মানুষেরা যারা বাংলাকে অবহেলা করে উর্দু ভাষার তারিফ মহিমায় পঞ্চমুখ তারা কখনোই বাংলা ভাষাকে চিনতে পারেননি; নির্বোধ জনের মতো উর্দুর নেশা তাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এ বিষয়ে তাঁর চিত্তের উদ্বেগ ও ব্যাকুলতা প্রকটিত হয়ে উঠেছে ‘সাহিত্য প্রসঙ্গ’ প্রবন্ধে:
  ‘বড় লোকের কথা ছাড়িয়া দেওয়া যাইতে পারে। তাঁহাদের অনেকে এখনও উর্দুর স্বপ্ন দেখিতে বিরত নহেন। যাঁহারা উর্দুর নেশার হাত হইতে কতটা উদ্ধার লাভ করিয়াছেন, তাহারাও বাঙলাকে প্রাণের ভাষা বলিয়া চিনেন নাইÑঅনেকে বা উপেক্ষার চক্ষে দেখিয়া থাকেন।’
ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন আমলের শেষ দিকে মুসলমানদের জাতীয় জীবন সংস্কৃতি ও সাহিত্য অন্য সংস্কৃতির প্রভাব বলয়ে অনেকটাই নিষ্প্রভ হয়ে পড়েছিল। তাছাড়া রাষ্ট্রীয় কর্তাব্যক্তিদের আনুকূল্যতা বঞ্চিত মুসলিম কবি সাহিত্যিক, আলেম-ওলামাগণও মুসলিম ঐতিহ্য নির্ভর সাহিত্য চর্চায় অনুৎসাহিত হয়ে পড়েছিল। মুসলিম আলেম প-িতগণের বাংলা ভাষায় ইসলামি জ্ঞান, দর্শন, বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে অনুবাদের মাধ্যমে বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতিতে ইসলামের সংশ্লেষ ও সমন্বয় অত্যাবশ্যকীয় হয়ে উঠেছিল কিন্তু কিন্ত এ বিষয়ে আলেমদের ঔদাসীন্যে তাঁর ব্যথিত চিত্তের ক্ষোভই প্রকাশিত হয়েছে।
 ‘মৌলিক প্রবন্ধ না হউক, এসলামের দর্শন, বিজ্ঞান, জ্যোতিষ, ইতিহাস প্রভৃতি বাঙলা অনুবাদ করিয়া তাঁহারা মোসলমান বাঙলা সাহিত্যের তথা মোসলমানদের জাতীয়তার যে উপকার করিবেন, তাহা যথার্থ রূপে বলিবার ভাষা আমাদের আছে কি? বাঙলা সাহিত্যের হিসাবে মৌলবীসমাজ পঙ্গু হওয়াতেই তো আমাদের এই দশা।’
মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর চিৎপ্রকর্ষের সারাৎসার কেন্দ্রিভূত ছিল ইসলামী ঐতিহ্য ও আদর্শ ভিত্তিক জীবনাচরণের মাধ্যমে বাঙালি মুসলিম সমাজের সার্বিক উন্নয়ন। তিনি ছিলেন ন্যায়ভিত্তিক আদর্শিক ইসলামী অনুশাসনের স্বপ্নদ্রষ্টা। তাঁর বিশ্বাস সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক স্খলন, বিজাতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসনে দেশীয় সংস্কৃতির রুগ্নতা ইত্যাদি অসঙ্গতিতে সমাজের পুনর্জাগরণ সুমহান ইসলামের আদর্শ ও আলোতেই সম্ভব। সে লক্ষ্যে তিনি ১৯২০ সাল থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত কলকাতা কেন্দ্রিক মুসলিম মালিকানাধীন বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রায় দুই শতাধিক প্রবন্ধ লিখেছিলেন।
তাঁর রচনার বিষয় বৈচিত্র্যে নিত্য নূতনের চমৎকারিত্ব না থাকলেও জীবনীভিত্তিক গ্রন্থ রচনায় তাঁর মুন্সীয়ানা সর্বজন স্বীকৃত। তাঁর প্রকাশিত আটটি গ্রন্থের ছয়টি জীবনীভিত্তিক গদ্যে রচনা। তাঁর প্রতিভার দীপ্তি ও মনীষার সর্বোত্তম প্রকাশ ও শ্রেষ্ঠ রচনা ‘মরুভাস্কর’ (১৯৪১)। সে সময়ে হযরত মোহাম্মদ (স.) এর উপর প্রামাণ্য ও নির্ভরযোগ্য কোনো গ্রন্থ ছিল না বললেই চলে। হিন্দু লেখক গিরিশচন্দ্র সেন, কৃষ্ণকুমার মিত্র প্রমুখ লেখকের গ্রন্থই প্রচলিত ছিল। তাঁদের লেখার অসঙ্গতি ও তথ্য প্রমাণের অভাবই তাঁকে একটি প্রামাণিক ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। বিশ্বের সমস্ত মানবকূলের শ্রেষ্ঠ মানব, মনীষী, বিজ্ঞানী এবং মানবতার মুক্তির দূত হযরত মুহম্মদ (সা.) এর অপূর্ব দেহক্লান্তি ও রূপলাবণ্যের যে চিত্রকল্প উপস্থাপন করেছেন তা ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এ গ্রন্থের ‘মানুষ মুহম্মদ (সা.)’ প্রবন্ধে  রাসূলের রূপ বর্ণনা তিনি করেছেন:
  ‘তাঁহার শীর্ষে সুদীর্ঘ কুঞ্চিত কেশপাশ, বয়ানে অপূর্ব কান্তশ্রী। তাঁহার আয়তকৃষ্ণ দু’টি নয়ন, কাজল রেখার মতো যুক্ত-ভ্রƒযুগল তাঁহার সুউচ্চ গ্রীবা, কালো কালো দু’টি চোখের ঢলঢল চাহনি মনপ্রাণ কাড়িয়া নেয়া। তিনি দীর্ঘ নন, খর্ব নন, কৃশ নন। এক অপূর্ব পুলকদীপ্তি তাঁহার চোখে মুখে, বলিষ্ঠ পৌরষের ব্যঞ্জনা তাঁহার অঙ্গে। বড় সুন্দর, বড় মনোহর সেই অপরূপ রূপের অধিকারী।
কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ (১৯৪৮) গ্রন্থটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের উপযোগী করে সংক্ষিপ্ত কলেবরে গ্রন্থটি প্রণীত হয়েছিল। জিন্নাহ্ সাহেবের সুদীর্ঘ কর্মময় জীবন, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, ইসলামী জীবনাদর্শ, ব্যক্তি জিন্নাহ্ সাহেবের চারিত্রিক গুণাবলি ও দৃঢ়তা সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরা হয়েছে এ গ্রন্থে।
বাংলার এক কিংবদন্তী সন্তান হাজী মুহম্মদ মুহসীন। বাঙালি মুসলমানদের হৃদয়ে তিনি মুকুটবিহীন স¤্রাট, গৌরব ও অহংকারের প্রতীক। প্রচুর অর্থ বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েও গরীবের ন্যায় জীবন যাপন, নিরহংকার, উচ্চমানবিক হৃদয় ও মানবতাবোধ তাঁর চরিত্রের কুসমকোমলতা যে ভাবে মানুষকে মনুষত্বের দিক জাগ্রত করেছিল তা সত্যই পৃথিবীতে বিরল। কিন্তু এই মহৎপ্রাণ ব্যক্তির আদর্শিক শিক্ষণীয় ঘটনা ও চারিত্রিক গুণাবলী সম্বলিত কোন গ্রন্থই বলা চলে তৎকালে ছিল না; বিবেকের দায়বদ্ধতায় তিনি হাজী মহম্মদ মুহসীনের জীবনস্মৃতি, নানা ঘটনা, ভ্রমণ বৃত্তান্ত একত্রে সন্নিবেশিত করে একখানি পূণাঙ্গ জীবনী গ্রন্থ রচনায় প্রয়াসী হয়েছিলেন। গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি উল্লেখ করেছেন:
  ‘মহামানুষ হাজী মুহম্মদ মুহসীনের নাম জানেন না এমন লোক অন্তত বাংলাদেশে কেহ নাই। তাঁহার ত্যাগ, সন্ন্যাস ও দানশীলতা, পরদুঃখকাতরতা, নিরহঙ্কারচিত্ত, ধার্মিকতার সঙ্গে অপূর্ব তাঁহার বিদ্যা,জ্ঞান-ভূয়োদর্শন, দৈহিক শক্তি সকল বিষয়েই তিনি সাধারণ মানুষের ঊর্ধ্বে ছিলেন।’
 মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর নির্ভীক চিত্ত সত্য প্রকাশে কখনো বিব্রত হননি। যুক্তি শৃঙ্খলিত ভাষার চাতুর্যে সমাজে যা কিছু ন্যায়নিষ্ঠ মানব কল্যাণে অন্বিত তার সবই তিনি নিঃসঙ্কোচে প্রকাশের দুরন্ত সাহস দেখিয়েছেন। মুসলমানদের নানা কুসংস্কার, অসঙ্গতি, ইসলামী অনুশাসন বিমুখতায় বিজাতীয় সংস্কৃতির আত্মীকরণের বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী সমাজ সংস্কারে রূপ নিয়েছিল। তাঁর যুক্তিবাদী মন ও পরিচ্ছন্ন চিন্তার ঔদার্যে ইসলামী কৃষ্টি-কালচার মুসলিম সমাজে ব্যাপনেচ্ছায় জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আদর্শ বিচ্যুত হননি। এ কারণেই তিনি একজন পরিপূর্ণ আদর্শবাদী সাহিত্যিক ও একনিষ্ঠ সমাজসেবক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ