ঢাকা, শুক্রবার 11 November 2016 ২৭ কার্তিক ১৪২৩, ১০ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

শিক্ষা নিয়ে বিগত বছরগুলোর নয় ছয়

জিবলু রহমান : শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় পদগুলোতে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দিচ্ছে সরকার। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতা ও সমর্থনকারীদের নিয়োগ দেয়া হয়। এ প্রক্রিয়া এখনও চলছে।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে নতুন নিয়োগ দেয়া হয়। প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধক্ষ্যের মতো পদগুলোতে দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও শিক্ষকরা সরাসরি আওয়ামী রাজনীতিতে খুব বেশি সক্রিয় ভূমিকা রাখেননি ঠিকই, কিন্তু আওয়ামী লীগ সমর্থিত বিভিন্ন সহযোগী কোনো না কোনো সংগঠনের নেতা ছিলেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদ্যমান আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষক সংগঠন হিসেবে পরিচিত নীল দলের শিক্ষক নেতৃবৃন্দ, বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি ও নেতৃস্থানীয় শিক্ষক, অধ্যাপকরাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব পান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নীল দলের সাবেক আহবায়ক অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিককে ঢাবি’র উপাচার্যের দায়িত্ব দেয়া হয়। নীল দলের আহবায়ক অধ্যাপক ড. হারুনুর রশীদকে উপ-উপাচার্য ও যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমানকে কোষাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান।

ঢাবি’র নীল দল সমর্থিত শিক্ষকদের সহ-সভাপতি অধ্যাপক মেসবাহউদ্দিন আহমেদকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে নিয়োগ দেয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির কোষাধ্যক্ষ পদের দায়িত্ব দেয়া হয় কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাবেক মহাসচিব শওকত জাহাঙ্গীরকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ড. প্রাণ গোপাল দত্ত। তিনি স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের নেতা।

জাতীয় বিশ্ববদ্যিালয়ের উপাচার্য পদে নিয়োগপ্রাপ্ত অধ্যাপক কাজী শহীদউল্লাহ ঢাবির নীল দলের শিক্ষক নেতা ছিলেন। এ ছাড়া তিনি আওয়ামী লীগ নেতা কাজী জাফরউল্লাহর ভাই। কোষাধ্যক্ষ পদে বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি কাজী ফারুক আহমেদকে নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি জাতীয় পার্টির শীর্ষস্থানীয় নেতা মরহুম কাজী জাফর আহমেদের ভাই। এ ছাড়াও অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ জোট সরকারের শেষদিকে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে বিএনপির বিপক্ষে ও আওয়ামী লীগের পক্ষে নানা রকম বক্তব্য দেন।

উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে নিয়োগপ্রাপ্ত ড. আরআইএম আমিনুর রশিদ ঢাবি’র বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাবেক সভাপতি ও নীল দলের শিক্ষক নেতা ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান আকন্দ ছিলেন গাজীপুর জেলার বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাবেক সভাপতি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে নিয়োগ পান বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোঃ আব্দুস সোবহান। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষক হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক মুহাম্মদ নুরুল্লাহকে উপ-উপাচর্য এবং মোহাম্মদ আব্দুর রহমানকে কোষাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সংগঠন নাগরিক কমিটির সচিব অধ্যাপক ড. আবু ইউসুফকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে নিয়োগ দেয়া হয়। অধ্যাপক ড. সালেহ উদ্দিনকে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক থাকাকালে আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এ ছাড়া সমাজকল্যাণমন্ত্রী এনামুল হক মোস্তফা শহীদের নিকটাত্মীয়।

বঙ্গবন্ধু পরষদের সভাপতি ড. এম আলাউদ্দিন কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে নিয়োগ পান। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো উপ-উপাচার্য পদে নিয়োগ দেয়া হয়। আর এ পদটির দায়িত্ব দেয়া হয় বঙ্গবন্ধু পরিষদের আরেক নেতা ড. কামালউদ্দিনকে। আর রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ পান বঙ্গবন্ধু পরিষদের নেতা ড. শাহজাহান আলী।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু পরিষদের আরেক নেতা ড. আব্দুস সাত্তারকে নিয়োগ দেয়া হয় যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেয়া হয় নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ফকির আবু হোসেনকে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বিএনপি জোট সরকার সমর্থিত অধ্যাপক মনিরুল ইসলামকে সরকার ক্ষমতায় আসার পর কয়েকদিনের মধ্যেই সরিয়ে দেয়। এখানে নিয়োগ দেয়া হয় টাঙ্গাইলের সা’দত কলেজের অধ্যক্ষ এম শামসুল হককে। তার দায়িত্ব পালনের মেয়াদ ছয় মাস না যেতেই তাকে সরিয়ে দিয়ে এ পদে নিয়োগ দেয়া হয় ঢাকা কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফাহিমা খাতুনকে। ফাহিমার ভাই বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম। তার স্বামী ওবায়দুল মোক্তাদির চৌধুরী ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হসিনার পিএস ছিলেন।

রাজধানীর ইডেন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ পদে অধ্যাপিকা মাহফুজা চৌধুরীকে তিন বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় সরকার। এপ্রিল ২০০৯  এ তিনি এলপিআরে চলে যাওয়ার পর পুনরায় তাকে এ নিয়োগ দেয়া হয়। ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ও বর্তমান আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ইসমত কাদির গামার স্ত্রী তিনি। (সূত্রঃ দৈনিক আমার দেশ ১৯ আগস্ট ২০০৯)

গত এক বছরে সারা দেশে প্রায় সব বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কয়েক হাজার শিক্ষক ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে সরকার দলীয় নেতা-কর্মীদের দ্বারা নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। সরকারি প্রজ্ঞাপনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সভাপতি মনোননয়ন করা হচ্ছে। এর ফলে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার বিষয়ে অনভিজ্ঞ ও একাডেমিক কাজে অদক্ষ লোকজন সভাপতি হচ্ছেন। এটা শিক্ষার মানোন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে।

২০০৯ সালে অবশ্য শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছিলেন, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি গঠনের জন্য আমরা আইন করে দিয়েছি। আগের আইন অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্য অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হতে পারতেন। এতে নানা সমস্যা হতো। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আবার এ কমিটি থেকে তাদের একেবারেই বাইরে রেখে আইন করেছিল। কিন্তু জনপ্রতিনিধি হিসেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের একেবারেই বাইরে না রেখে আমরা কলেজ ও মাদরাসার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে এমপিদের থাকার নিয়ম করেছি। আর বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সভাপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধান যে তিনজনের নাম বোর্ডে পাঠাবেন তার মধ্যে অন্তত একটি নাম স্থানীয় এমপির কাছ থেকে জেনে নেয়ার জন্য বলেছি। তবে স্কুলের ক্ষেত্রে এমপিদের কোনো ক্ষমতা দেয়া হয়নি। 

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, কমিটি গঠনের আইনে যা আছে, তা সবাইকে মানতে হবে। আইনের বাইরে কেউ নয়। যদি কেউ তা না মেনে অন্যায়ভাবে এ কমিটি গঠন করে তবে তাকে আইনানুযায়ী শাস্তি পেতে হবে। যদি কারো বিরুদ্ধে আইনের বাইরে গিয়ে কমিটি গঠনে অনিয়ম, রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেয়া, তাদের ওপর নির্যাতন ও লাঞ্ছনা করার অভিযোগ আমাদের কাছে আসে তাহলে আমরা অবশ্যই সেগুলো তদন্ত করে দেখবো। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে সে যেই হোক তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। (সূত্রঃ দৈনিক আমার দেশ, ৪ আগস্ট ২০০৯)

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি, শিক্ষা বোর্ড ও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) মহাপরিচালকের মতো বড় পদগুলো দলীয়করণ মুক্ত নয়। আর এই পদগুলোর দায়িত্ব পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ওইসব প্রতিষ্ঠানে অন্যান্য নিয়োগ, বদলি, পদায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রেও দলীয়করণ করছেন। রাজধানীসহ দেশের সব বিভাগের মহানগরীর সরকারি কলেজগুলোর অধ্যক্ষ, অধ্যাপকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষকদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আর এসব কলেজে থাকা ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শী শিক্ষকদের মফস্বল এলাকায় বদলি করা হয়েছে।

২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কিছুদিন আগে ১১ ডিসেম্বর প্রকাশ করা আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও বলা হয়েছিল, শিক্ষাঙ্গনকে দলীয়মুক্ত করা হবে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে নানা সময় বলেছেন, শিক্ষা প্রশাসনে কোনো রকম দলীয়করণ করা হবে না। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পরই ২ আগস্ট ২০০৯ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনেও বলেছিলেন, ‘আমরা শিক্ষা প্রশাসনে কোনোরকম দলীয়করণ করবো না।’

কিন্তু বাস্তব চিত্র দেখা যাচ্ছে উল্টো। নির্বাচনী অঙ্গীকার ও শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের বিপরীত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে সব ক্ষেত্রে। ফলে শিক্ষার মান যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তেমনি শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোও সম্মান হারিয়েছে। শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষ পদে সরকার সমর্থকদের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি দেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ১৯ আগস্ট ২০০৯ দৈনিক আমার দেশকে বলেছিলেন, ‘এটা একেবারেই ঠিক নয়। রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে নিয়োগ, পদোন্নতি কোনো কিছুই দেয়া হয়নি। স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ীই গত সাত মাসে সব কিছু হয়েছে। দলীয়করণ করে আমরা কিছুই করিনি।’

২০০৯ সালে মাউশির মহাপরিচালক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত অধ্যাপক নোমান-উর রশীদ এক সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। এনসিটিবি’র চেয়ারম্যান পদে প্রথম দিকে দায়িত্ব পেয়েছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের সাবেক ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক খান হাবিবুর রহমান। কিন্তু বর্তমান সরকার সমর্থক না হওয়ায় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির আপত্তির প্রেক্ষিতে তাকে সরিয়ে দিয়ে অধ্যাপক মোঃ মোস্তফা কামাল উদ্দিনকে নিয়োগ দেয়া হয় এ পদে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডের সদস্য সচিব পদের দায়িত্ব দেয়া হয় আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে পরিচিত শিক্ষক সংগঠনের বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির মহাসচিব অধ্যক্ষ আসাদুল হককে।

শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে বড় বড় সব কেলেঙ্কারির পরও শিক্ষামন্ত্রী ততোটা সমালোচিত হননি। যদিও শিক্ষাক্ষেত্রে যেসব কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে তাতে পুরো শিক্ষাব্যবস্থা এখন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী কেলেঙ্কারির নায়কদের শুধু আড়াল করছেন না, তিনি পুরো ঘটনাই বেমালুম চেপে যাচ্ছেন। বলছেন, এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। যারা এসব অভিযোগ করছেন তাদের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ এনেছেন। সাবেক বামপন্থী এ নেতা স্টালিনীয় কায়দায় যারা কেলেঙ্কারি তুলে ধরছেন তাদেরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে হাজির করেছেন। তারা নাকি মন্ত্রীর ভালো কাজে ঈর্ষাবশত এমন করছেন।

দেশের বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় একের পর এক প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটছে। মন্ত্রীর কাছে তা তুলে ধরা হলে তিনি প্রথমে বলেছেন, এগুলো প্রশ্ন ফাঁস নয়, শিক্ষকদের সাজেশন। অতীতে এ ধারাবাহিক প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা না ঘটলেও নিয়ম হচ্ছে, প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠলে সাথে সাথে পরীক্ষা বাতিল করে দেয়া। কিন্তু মন্ত্রী যখন স্বীকার করছেন না, তখন পরীক্ষা বাতিলের প্রশ্নও আসে না। (সূত্রঃ দৈনিক নয়াদিগন্ত ১০ জুলাই ২০১৪)

এরপর ফেসবুক আর ইন্টারনেটে হুবহু পাওয়া গেল প্রশ্ন। একটি-দু’টি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস নয়, ধারাবাহিকভাবে সব পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হতে থাকলো। সোনামণিদের প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষার সব প্রশ্ন ফাঁস হতে থাকলো। সেগুলো সংবাদপত্রে প্রকাশ হওয়ার পর মন্ত্রী বললেন, এগুলো তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। ক্ষমতাসীন দলের সাথে ভিন্ন মত আছে এমন শিক্ষক বুদ্ধিজীবীরা এ সময় ছিলেন নিশ্চুপ। কারণ এসব বিষয় নিয়ে কথা বললে আবার প্রশ্ন ফাঁসের প্রচারণার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে মামলা বা চাকরি চলে যাওয়ার ভয়। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের প্রবল সমর্থক এবং শিক্ষামন্ত্রীর ভক্ত-অনুরক্ত দুয়েকজন শিক্ষক শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ তুললেন। শেষ পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলো। সেই কমিটি রিপোর্ট দেয়ার আগে সংসদে দাঁড়িয়ে মন্ত্রী বললেন, কোনো পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়নি। তার এই দাবির এক সপ্তাহ না যেতেই তার গঠিত কমিটি রিপোর্ট দিয়েছে-হ্যাঁ প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। কিন্তু কারা কিভাবে প্রশ্ন ফাঁস করেছে, তাদের চিহ্নিত করতে পারেননি। কিন্তু প্রশ্ন যে ফাঁস হয়েছে, তা সত্যি। তাহলে প্রশ্ন ফাঁসের দায়িত্ব কে নেবে? জ্ঞানী-গুণী সফল মন্ত্রী তো নিতে পারেন না। এর দায়দায়িত্ব এখন নিতে হবে শিক্ষার্থীদের। কারণ, শিক্ষার্থী না থাকলে পরীক্ষা হতো না।  আর পরীক্ষা না হলে তো প্রশ্ন ফাঁস হতো না। তাই শাস্তি যদি দিতে হয় শিক্ষার্থীদের দিতে হবে। নিয়ম করা হলো, একটি পরীক্ষার পর আর কোনো বিরতি দেয়া হবে না। অর্থাৎ প্রতিদিন ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষা দিতে হবে, যাতে কেউ প্রশ্ন ফাঁস করতে না পারে। প্রশ্ন ফাঁস কেলেঙ্কারি রোধে মন্ত্রীর এই মডেল বিশ্বজুড়ে গৃহীত হতে পারে। এমনকি ইউনেস্ক এই মডেল পরীক্ষামূলক চালু করতে পারে। প্রথমে ব্রিটেন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রশ্ন ফাঁস করে তারপর প্রতিদিন পরীক্ষা নেয়ার ব্যবস্থা করতে পারে। এতে ছাত্রছাত্রীরা সময় কম থাকায় ঘুম থেকে জেগে লেখাপড়ায় মনোযোগী হবে, আর তাতে মেধার বিকাশ ঘটবে।

কেলেঙ্কারি শুধু প্রশ্ন ফাঁসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কেউ যাতে পরীক্ষায় ফেল না করে সে জন্য শিক্ষকদেরও নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। কারণ এত কিছুর পরও যদি ছাত্ররা ফেল করে তাহলে মন্ত্রীর তো মানমর্যাদা থাকে না। এভাবে শিক্ষকদের প্রতি কঠোর নির্দেশ হয়েছে, দিল নরম করে খাতা দেখতে হবে। ফেল করলেও পাস করাতে হবে। ফলাফলে দেখা যাচ্ছে মেধার বিস্ফোরণ ঘটছে। জিপিএ ৫ আর গোল্ডেন জিপিএর ছড়াছড়ি। ভালো ফলাফল করা এই শিক্ষার্থীরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় পাস মার্ক পর্যন্ত পাচ্ছে না, তখন বোঝা যাচ্ছে এরা কী শিখছে।

শুধু ছাত্রভর্তি নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সব শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার কারণে শিক্ষক নিয়োগে নানা অনিয়ম এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। মন্ত্রী জানেন কিনা, আজ সব ধরনের স্কুলশিক্ষক নিবন্ধন ও নিয়োগে মোটা অঙ্কের টাকা ছাড়া চলে না। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে চলছে চরম দলবাজি। শিক্ষক নিয়োগে নৈতিক দিকটির কোনো গুরুত্বই দেয়া হচ্ছে না। ফলে আমরা দেখছি আইডিয়াল ও ভিকারুননিসার মতো দু’টি স্কুলে শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে ভিকারুননিসার শিক্ষক পরিমল জয়ধর ও প্রধান শিক্ষিকা হোসনে আরার অপরাধকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। বাংলাদেশে অতীতে এমন কেলেঙ্কারির ঘটনা আর কখনো ঘটেনি।

শিক্ষামন্ত্রী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ টিআইবির একটি গবেষণা প্রতিবেদন নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। টিআইবির এই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট পাওয়া যায়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনের জন্য তিন কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিময় হয়। মন্ত্রী টিআইবির রিপোর্ট শুধু অসত্য নয়, দুরভিসন্ধিমূলক বলেও উল্লেখ করেছেন। তিনি টিআইবির এই রিপোর্টের সত্যতা প্রমাণ করার জন্য চালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেছেন, না হলে এই রিপোর্ট প্রত্যাহার করতে হবে। কিন্তু টিআইবি তার অবস্থানে অনড় থেকে বলছে, গবেষণা প্রতিবেদন প্রত্যাহারের প্রশ্নই আসে না। মন্ত্রীর চ্যালেঞ্জ নিয়ে এর বেশি কিছু তারা বলছেন না। টিআইবির সাথে যারা সংশ্লিষ্ট তারা সবাই সুশীলসমাজের লোক। এদের অনেকে একসময় বাম রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ফলে শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি তাদের বেশ দুর্বলতা আছে। সুশীলসমাজের মুখপাত্র গণমাধ্যমে তারা সব সময় শিক্ষামন্ত্রীকে সফল মন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। ফলে শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে এখন বেশ বেকায়দায় আছেন। বাম নেতা আওয়ামী লীগার হলে তার রূপ যে এমন হবে তা তারা আগে অনুমান করতে পারেননি। ফলে না পারছেন কইতে, না পারছেন সইতে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে টিআইবির এই অভিযোগ বা গবেষণা প্রতিবেদন যে মন্ত্রী আমলে নেবেন না, তা এখন স্পষ্ট। বরং সুশীলসমাজের জন্য সামনের দিনগুলো যে আরো কঠিন হয়ে পড়বে তার আলামত দেখে তারা নিশ্চয়ই শঙ্কা বোধ করছেন। তাদের জন্য দুর্ভাগ্য হচ্ছে, সুশীলসমাজকে হেস্তনেস্ত করার কাজে আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভার বামপন্থীরা এগিয়ে আছেন। সামনে সুশীল বনাম সাবেক বাম মন্ত্রীদের লড়াই আরো নানা রূপে দেখা যাবে। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ