ঢাকা, শনিবার 12 November 2016 ২৮ কার্তিক ১৪২৩, ১১ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মাসুদ মিয়া দেশের বোঝা নয়

দেলদুয়ার (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা : প্রতিবন্ধীরা দেশের বোঝা নয়। তারাও হতে পারে জাতির মূল্যবান সম্পদ। প্রয়োজন একটু সহযোগিতার হাত। প্রবল ইচ্ছা ও কঠোর পরিশ্রম পৌঁছে দিতে পারে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে। কঠোর পরিশ্রম ও প্রবল ইচ্ছার কারণে সকল বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছে প্রমাণ করেছেন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের চেয়েও প্রতিবন্ধীরা এগিয়ে যেতে পারে। প্রতিবন্ধি মাসুদ মিয়া (৩২), পিতা-আব্দুস সামাদ। বাড়ি টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার মঙ্গলহোড় গ্রামে। ১৯৮৪ সালে মাসুদের জন্ম। সামাদ মিয়া ও মাসুমা বেগমের চার সন্তানের মধ্যে মাসুদ প্রথম। তিন বছর বয়সে টাইফয়েড জ্বরে মাসুদের দু-চোখ অন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের পক্ষ থেকে সেই সময়ে শেষ চেষ্টা করেও ফেরাতে পারেনি চোখের আলো। তারপর থেকেই অন্ধ। 

প্রতিবন্ধী মাসুদের ছোটবেলা থেকেই প্রবল ইচ্ছা ছিলো লেখাপড়া করে অনেক বড় কিছু করার। ১৯৯৫ সালে ১১ বছর বয়সে তিনি ভর্তি হন সমাজ কল্যাণ অধিদফতর পরিচালিত টাঙ্গাইল জেলা শহরে বিবেকানন্দ স্কুলে। ১৯৯৯ সালে লুইবেন হেলেন ক্লারের ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখাপড়া করে ৫ম শ্রেণী পাস করেন। কিন্তু সংসারের অভাব অনটনে আর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেননি। অভাবের সংসারে বাবাকে সাহায্য করতে মনস্থির করেন। কিন্তু মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পাততেও চান না। শেষে ঠিক করেন বাড়ির কাছে প্রাইমারি স্কুলের পাশে ঝালমুড়ি, চানাচুর ও বিস্কুট বিক্রির। 

২০০১ সালের শেষের দিকে টঙ্গি প্রতিবন্ধী ইন্সটিটিউটে বাঁশ-বেতের কাজ শিখতে যায় মাসুদ। কিছুদিন কাজ শেখার পর বাড়ি এসে পুনরায় কর্মজীবনে আটকে যায়। প্রায় তিন বছর ঝাকায় করে ভ্রাম্যমাণ দোকান পরিচালনা করেন। এরপর বাড়ির সামনে একটি মুদির দোকান দিয়ে বাবা ছেলে মিলে দোকান চালাতেন। এর ফাঁকে একটি গরু বর্গা নিয়ে লালন পালন করেন। এতে কিছু লাভ হলে নিজেই দুটি গরু কিনে মোটা তাজাকরণের কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে ঘুরতে থাকে ভাগ্যের চাকা। এরপর পাওয়ার টিলার কিনেন এবং অগভীর নলকূপের মাধ্যমে ধান চাষাবাদ শুরু করেন। দু’চোখ অন্ধ হলেও অগভীর নলকূপের শ্যালো ইঞ্জিন তিনি নিজেই চালাতেন এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে পাওয়ার টিলারের বকেয়া টাকা তুলতেন। সংসারে কিছু স্বচ্ছলতা ফিরে এলে তার ছোট জমজ দুই ভাইয়ের মধ্যে সোহেলকে বিদেশ পাঠান। অপর ভাই রাসেল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। বোনকেও বিয়ে দিয়েছেন। 

এবার মাসুদ মিয়ার ছোটবেলার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পালা। বাবা ও ছোট ভাইদের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেন বাড়ির কাছে ১৩ শতাংশ জায়গার ওপর পোল্ট্রি ফার্মের। ২০১০ সাল থেকে তার পোল্ট্রি ফার্র্মের ব্যবসা শুরু। বিভিন্নভাবে টাকা সংগ্রহ করে প্রায় ১৫ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে পোল্ট্রি ফার্মের ব্যবসা শুরু করেন। প্রথম ধাপে তার ১৫শ’ মুরগি ছিল। কিন্তু বার্ড ফ্লুর আক্রমণে তার অধিকাংশ মুরগি মারা গেলে লোকসানের সম্মুখীন হন। থেমে না থেকে দ্বিতীয় ধাপ শুরু করেন। কিন্তু সেবারও ভাল ফলাফল হয়নি। পড়ে যান পুঁজি সংকটে। পরে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গার মাসুদ মিয়ার খালু পোল্ট্রি ডিলার শাহজাহান তালুকদার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। ২ হাজার ৫শ’ বাচ্চা, খাবার, ঔষধসহ অন্যান্য মালামাল মিলে প্রায় ১১ লাখ টাকার পুঁজির ব্যবস্থা করে দেন। তৃতীয় এই ধাপে ৬ মাস বয়স থেকে মুরগিগুলো ডিম দেয়া শুরু করে। একটানা ১৮ মাস পর্যন্ত মুরগিগুলো ডিম দিবে। মাসুদের খামারে প্রাায় ২৩শ’ লেয়ার মুরগি রয়েছে। স্থানীয় বাজারের ডিমের চাহিদা পূরণ করছে মাসুদের খামার।

গত ১ বছর ধরে ফার্ম থেকে ডিম সংগ্রহ করা হচ্ছে। আগামী ৬ মাস পর্যন্ত আরও ডিম সংগ্রহ করা যাবে। মাসুদ মিয়ার হিসাব মতে প্রথম অবস্থায় প্রায় প্রতিদিন ২ হাজার ২শ থেকে ২ হাজার ৩শ পর্যন্ত ডিম পাওয়া গেছে। ফার্ম থেকেই প্রতিদিন পাইকারি ডিম বিক্রি করেন। গড়ে প্রতিটি ডিম বিক্রি হয় ৭/৮ টাকা। গত এক বছরে তিনি প্রায় ৫০ লাখ টাকার ডিম বিক্রি করেছেন। প্রতিদিন মুরগির খাবার বাবদ ৮ হাজার টাকাসহ কর্মচারীর বেতন, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে মাসে প্রায় খরচ হয় ৩ লাখ টাকা। গত এক বছরে মাসুদ মিয়ার প্রায় ১৪ লাখ টাকা লাভ হয়েছে। লাভ থেকে তিনি তার খালুর ধারের টাকা পরিশোধ করেছেন। ভোর  থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত টানা কাজ করেও তার আত্মতৃপ্তি সে নিজে উপার্জন করছে। তার উপার্জনেই সংসার চলছে। এমনকি তার ভগ্নিপতি (সালমার স্বামী) সেলিম মিয়া গত চার বছর আগে হৃদরোগে মার যাওয়ার পর থেকে সালমার সংসার খরচ বাবদ মাসে ১০ হাজার টাকা করে দিয়ে আসছে।

২০০৫ সালে নাটোরে রেখা আক্তারকে বিয়ে করার পর থেকে দাম্পত্য জীবন চলছে স্বাভাবিক। তার ঘরে জন্ম হয়েছে অর্পা (৯) নামের এক কন্যা সন্তানের। মঙ্গলহোড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ালেখা করছে অর্পা। মা বাবা ভাই মিলে এখনো যৌথ পরিবারে বাস করছেন। 

সরকারি বেসরকারি একটু সহযোগিতা পেলে শুধু দেশ নয় বিশ্বেও তিনি মডেল হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে পারবেন বলে আশা করেন। এ ব্যাপারে তার ফার্মের কর্মচারী জিয়া মিয়া বলেন, মাসুদ ভাই ফার্মে আমার চেয়েও বেশি পরিশ্রম করেন। আমার নিয়মিত বেতন পরিশোধসহ ভাইয়ের মতো ব্যবহার করেন। মাসুদ মিয়ার বন্ধু মেহেদী হাসান বলেন, ছোটবেলা থেকেই মাসুদ কঠোর পরিশ্রমী। তার সততায় এলাকাবাসী মুগ্ধ। গ্রামের প্রতিটি বাড়ি রাস্তাঘাট তার চেনা। চোখে না দেখলেও অন্যের সাহায্য ছাড়া একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের মতো তিনি কাজ করেন। 

মাসুদ মিয়ার স্ত্রী রেখা আক্তার  বলেন, তার মতো একজন স্বামী পেয়ে আমি সুখেই আছি। আমার স্বামী অন্ধ তাতে আমার কোনো দুঃখ নেই। জুয়া-নেশাখোরের সাথে বিয়ে না হয়ে একজন কঠোর পরিশ্রমী ভাল মানুষের সাথে যে আমার বিয়ে হয়েছে এতে আমি গর্বিত। 

মাসুদের বাবা সামাদ মিয়া ও মা মাসুমা বেগম বলেন, মাসুদকে কখনই তারা প্রতিবন্ধী মনে করেনি। এ অবস্থায় আপনারা যে মাসুদের খামার পরিদর্শন করছেন এতেই আমরা খুশি। মাসুদ কিছু পায় আর না পায় তাতে কিছু আসে যায় না। মাছুদের প্রতি সকলেই যে সহানুভূতি দেখিয়েছে এতেই আমরা খুশি।

প্রতিবন্ধী মাসুদ বলেন, প্রতিবন্ধীদের অনেকেই সমাজের বোঝা মনে করেন। কিন্তু আপনারা আমার খামার পর্যন্ত এসেছেন এতেই আমি খুশি। তিনি আরো বলেন, প্রতিবন্ধী হিসেবে সমাজের বোঝা মনে না করে কর্মমুখী শিক্ষাগ্রহণ করে শ্রম ও মেধা খাটিয়ে নিজেকে সমাজের বোঝা থেকে সম্পদে পরিণত করা সম্ভব। 

দেলদুয়ার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এসএম ফেরদৌস আহমেদ বলেন, দেলদুয়ার উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহাদত হোসেন কবির, উপজেলা প্রকৌশলী খ ম ফরহাদ হোসাইন ও পাথরাইল ইউপি চেয়ারম্যান হানিফ উজ্জামান লিটনকে সঙ্গে নিয়ে মাসুদ মিয়ার পোল্ট্রি ফার্ম ঘুরে দেখেছি। সরকারিভাবে তাকে যতোটুকু সহযোগিতা করা যায় তার চেষ্টা আমরা করবো। আমরা মাসুদ মিয়ার চাহিদা অনুযায়ী একটি নতুন ঘরসহ সুবিধাজনক স্থানে পোল্ট্রি ফার্ম স্থানান্তরের ব্যয়ভার বহন করার আশ্বাস দিয়েছি। এ ছাড়া মাসুদ মিয়ার জমিজমা সংক্রান্ত সকল সমস্যা ভূমি অফিসের স্ব-উদ্যোগে বিনা পয়সায় সমাধান করার জন্য ইতিমধ্যে তিনি সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রতিবন্ধী মাসুদের এ বিষয়টিকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় সুধীজন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ