ঢাকা, শনিবার 12 November 2016 ২৮ কার্তিক ১৪২৩, ১১ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

উপেক্ষিত হচ্ছে শিশুর অধিকার

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। এরাই করবে আগামীতে সমাজ ও দেশ পরিচালনা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের শিশুরা নির্যাতনের শিকার। তারা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। তাদের খাবারের সঠিক ব্যবস্থা নেই। ঘুমানোর জায়গার অভাব তীব্র। শীতকালে থাকে না তাদের প্রয়োজনীয় গরম কাপড়। অনেক সময় কাঁথা-কাপড় ছাড়াই শীতের রাতে মেঝেতে ঘুমিয়ে পড়তে হয়। গৃহকর্মে নিয়োজিত ৫৪ শতাংশ শিশু শারীরিক নির্যাতনের শিকার। মানসিক নির্যাতনের শিকার ৫৭ শতাংশ। আর ৮০ শতাংশ শিশুকে কাজ করতে হয় প্রতিদিন ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা করে। দারিদ্র্য, অভিভাবকহীনতা, অসচতেনতা প্রভৃতি কারণে শিশুরা নির্যাতিত হয় বেশি। এক শ্রেণির মানুষ শিশুদের দাস হিসেবেই গৃহকর্মে, কারখানায় বা ব্যবসাকেন্দ্রে খাটিয়ে নেয়। ন্যূনতম মজুরি, খাবার ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয় না শিশুশ্রমিকদের জন্য। অনেকে খুব অল্প শ্রমমূল্যে শিশুদের পেয়ে অধিকক্ষণ খাটিয়ে নেয়। অসহায়, অভিভাবকহীন ও অক্ষরজ্ঞানহীন শিশুশ্রমিকরা মালিকের অন্যায়ের কোনও প্রতিবাদ করতে পারে না। মালিক বা তাদের লোকেরা যা বলে তাই শুনতে হয়। যা দয়া করে খেতে দেয় তাই খেয়ে কাজ করতে হয় চোখ বুজে। সামান্য প্রতিবাদ করলেই নেমে আসে অকথ্য নির্যাতন। কাজ থেকে তাড়িয়েও দেয়া হয় কখনও কখনও। অনেক সময় ঘরের ভেতর শিশুশ্রমিককে বন্দী করে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়ে মেরে ফেলে লাশ গুমের ঘটনাও ঘটে আমাদের দেশে। অর্থাৎ আমাদের শিশুরা মারাত্মক নিরাপত্তাহীনতার শিকার। শিশুশ্রমিকরা তো বটেই, যেসব শিশু শ্রমিক নয়, তাদেরও নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। স্কুলের পথে কিংবা খেলার মাঠেও শিশুরা শতভাগ নিরাপদ থাকছে না। ধর্ষণ বা অপহরণের শিকার হচ্ছে অনেক শিশু। বেশি সমস্যা হয় মেয়ে শিশুদের।
শিশুদের নিয়ে কাজ করে এমন ১৬৭টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত শিশু অধিকার ফোরাম-এর ‘গোপন শিশু দাসত্ব: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় উল্লিখিত ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, নির্মম দাসত্বের শিকার এদেশের ৪ লাখ ২১ হাজার শিশুশ্রমিক। এদের ৩ বেলা ঠিকমতো খেতে দেয়া হয় না। বিশ্রামের সুযোগ নেই। ভোর ৫টা থেকে শুরু করে রাত ১২টা অবধি একটানা কাজ করে যেতে হয়। ঘুমে চোখ ঢুলুঢুলু করলেই নেমে আসে বকুনি, ধমক। এমনকি দৈহিক নির্যাতন। আগুনের ছ্যাঁকা। দ্য নিলসেন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড পরিচালিত গবেষণায় বলা হয়, ৬৬ শতাংশ শিশু মানসিক নির্যাতনের শিকার। ৭ শতাংশ হয় ধর্ষিত। শিশুশ্রমিকদের বয়স ৮ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। শিশু গৃহকর্মীর মধ্যে ৯৯ ভাগই মেয়ে। মেয়ে শিশুশ্রমিকরা গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করে যখন ঘুমোতে যায় তখনও তাদের নিস্তার নেই। কোথাও কোথাও বাড়ির দারোয়ান-ড্রাইভাররা মেয়ে শ্রমিক শিশুটিকে জোরপূর্বক ভোগ করে। এমন ঘটনা হয়তো সব বাসাবাড়িতে ঘটবার সুযোগ নেই। তবে সংখ্যায় কম হলেও এ অমানবিক ঘটনা যে ঘটে তা তো গবেষণার রিপোর্টেই বলা হয়েছে। গৃহকর্মী মেয়েশিশুদের ওপর এহেন যৌন নির্যাতনের নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। তবে যেসব বাসায় এমন জঘন্য অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলে সেগুলো চিহ্নিত করে নির্যাতিত গৃহকর্মী শিশুদের উদ্ধার করা পুলিশের জন্য খুব কঠিন কাজ নয়। কঠিন নয় যারা শিশুশ্রমিকদের যৌন নির্যাতন করে তাদের গ্রেফতার করে আইনের হাতে তুলে দেয়াও। শিশুদের প্রতি নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তিবিধানের আইন আছে এদেশে। কিন্তু প্রায়শ সে আইন কার্যকর হয় না নানা কারণে। এজন্য সকলের সচেতনতা প্রয়োজন। দরকার আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদেরও তৎপরতা। অন্যথায় শিশুশ্রমিক নির্যাতনসহ নারী শিশু গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে আরও।
শিশু অধিকার সংগঠনসমূহ গৃহকর্মী শিশুদের ওপর গবেষণা করে তাদের সুরক্ষার যেসব নির্দেশনা দিয়েছে সেগুলো বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় অমানবিক পরিস্থিতি থেকে নির্যাতনের শিকার শিশুদের উদ্ধার করা যেমন কঠিন, তেমনই কঠিন সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের আইনের হাতে সোদর্প করে তাদের উপযুক্ত শাস্তিবিধানও। আমরা মানবাধিকার কর্মী, শিশু অধিকারের জন্য কর্মরত দেশী-বিদেশী সংস্থাসহ সকলের পরামর্শ বিবেচনা করে নির্যাতনের শিকার শিশুশ্রমিকদের রক্ষার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি। শিশুশ্রমিকদের প্রতি এখনও বর্বর আচরণ করে তাদের মৌলিক অধিকারসমূহ ভূলুণ্ঠিত করা হবে তা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যারা শিশুশ্রমিকদের মৌলিক অধিকার হরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ