ঢাকা, শনিবার 12 November 2016 ২৮ কার্তিক ১৪২৩, ১১ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

শিক্ষা নিয়ে বিগত বছরগুলোর নয় ছয়

জিবলু রহমান : [দুই]
৩০ জুন ২০১৪ ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত ‘দক্ষিণ এশিয়ায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে বিশ্বব্যাংক। বলা হয়, স্কুলে ভর্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে নিরক্ষরতা দূরীকরণে ব্যাপক অগ্রগতি হলেও শিক্ষার গুণগত মানে হতাশাজনক অবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশ। শুধু বাংলাদেশ নয়, শ্রীলঙ্কা বাদে ভারত, পাকিস্তাসহ দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশেই একই অবস্থা। এসব দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে গড় শিক্ষার মান খুবই নিম্ন পর্যায়ে। ফলে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য যথাযথ দক্ষ হয়ে উঠতে পারছে না শিক্ষার্থীরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করা শিক্ষার্থীদের এক তৃতীয়াংশের মৌলিক অক্ষর ও সংখ্যা জ্ঞানে দুর্বলতা রয়েছে। শিক্ষকদের অবস্থাও উদ্বেগজনক। গ্রামীণ অঞ্চলে এমন অনেক শিক্ষক আছেন যারা ছাত্রদের তুলনায় সামান্য বেশি জানেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের গণিতে দক্ষতা খুবই নিম্ন পর্যায়ের। পঞ্চম শ্রেণীর দুর্বল ২০% শিক্ষার্থী তৃতীয় শ্রেণীর প্রথম দিকের (ফলাফলের বিচেনায়) ২০% তুলনায় দক্ষতায় পিছিয়ে আছে। গণিতের পাশাপাশি ভাষাজ্ঞানে দুর্বলতাও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে রয়েছে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শিক্ষার মান দুর্বল হওয়ার পেছনে শিক্ষকদের যোগ্যতার অভাবকে তুলে ধরা হয়। বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের প্রসঙ্গও প্রতিবেদনে উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, স্কুলের তহবিলের জন্য টাকা নিয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। স্কুল পরিচালনা কমিটি অনেক সময় তাদের আত্মীয়-স্বজনকে নিয়োগ দেয়। ফলে যোগ্য প্রার্থী বাদ পড়ে যান। বিশ্বব্যাংক এই হতাশাজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরে।
এগুলো হলো-শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত পুষ্টি, শিক্ষকদের গুণগত মান বাড়ানো, শিক্ষাখাতে আর্থিক প্রণোদনা বাড়ানো, বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা এবং শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পরিমাপ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটানো। (সূত্রঃ দৈনিক আমার দেশ ২ জুলাই ২০১৪)
২৬ এপ্রিল ২০১৫ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে শিক্ষা ট্রাস্ট থেকে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে বৃত্তির চেক প্রদানকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিটি শিশুর স্কুলে ভর্তি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে শিক্ষার উন্নয়নে কোনো বাধা সৃষ্টি না করতে রাজনীতিকদের প্রতি আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ছেলে এবং মেয়ে কেউই স্কুলের বাইরে থাকবে না। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট তহবিলের মূলধন বাড়াতে আগামী বাজেটে আরও অর্থ বরাদ্দ দেয়া হবে।
শেখ হাসিনা সচ্ছল ব্যক্তিদের এ ট্রাস্ট তহবিলে অনুদান দিতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তার সরকারের অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, এ ধরনের অনুদান কর রেয়াতের সুবিধা পাবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা খাতকে আন্তর্জাতিক মানের সমপর্যায়ে আনতে বিগত ৬ বছরে এ খাতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। এ লক্ষ্যে একটি প্রগতিশীল শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে এবং এতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষায় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এছাড়া গণিত, ভাষা ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায়ও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ শিক্ষানীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দও দেয়া হয়েছে। (সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর ২৭ এপ্রিল ২০১৫)
 প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শিক্ষার উন্নয়নে বেশ কিছু পদক্ষে নেয়া হয়েছে। আমরাও লক্ষ্য করছি, গত কয়েক বছরে স্কুলের শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষা দুটি বেড়েছে। কয়েক বছর আগে পর্যন্ত ছিল শুধু এসএসসি ও এসএইচসি পরীক্ষা। এর সঙ্গে যোগ হলো পঞ্চম শ্রেণি (পিএসসি) ও অষ্টম শ্রেণি (জেএসসি)। তার মানে চারটি পাবলিক পরীক্ষা। ক্লাসেও এখন পরীক্ষার সংখ্যা বেড়েছে। শুধু তা-ই নয়, গত এক দশকে বইয়ের ভারও বেড়েছে অনেক বেশি। তারপর যোগ হলো সৃজনশীল পরীক্ষার ব্যবস্থা। এতগুলো পরীক্ষা যোগ হলো, এত জ্ঞানের বিষয় যোগ হলো, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল হওয়ার জন্য বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হলো। সেই অনুযায়ী ক্লাসরুম, শিক্ষক, আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি, নিয়মিত প্রশিক্ষণ-এগুলোর কেমন উন্নতি হলো।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রকৃত মেধাবীরা অনেক ক্ষেত্রেই নিয়োগ পাচ্ছে না। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নিয়োগ বাণিজ্যের কারণে শিক্ষার মান দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে অভিমত প্রকাশ করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) নেতৃবৃন্দ। ১৪ অক্টোবর ২০১৪ জাতীয় প্রেস ক্লাবে সুজন আয়োজিত বাংলাদেশের শিক্ষার বর্তমান হালচাল শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব অভিমত দেন। গোলটেবিলে মূল প্রবন্ধে সুজনের প্রধান সমন্বয়কারী দীলিপ কুমার সরকার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিসহ শিক্ষকদের বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক ও অন্যান্য দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্যই এখন অন্যতম যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত করা হয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৯২ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রথমে কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল অতিরিক্ত ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা নিশ্চিতকরণ। কিন্তু বর্তমানে গণহারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া হয়। যেগুলোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নির্মাণ কাঠামো, আর্থিক সংগতি ও সবল শিক্ষানুষঙ্গ বিবেচনায় আনা হয়নি। প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা, শিক্ষাখাতে বরাদ্দ, ভর্তির হার বাড়লেও কমছে না ঝরে পড়ার হার, শিক্ষকদের অপ্রতুল বেতন-ভাতা এবং টিউশনি ও কোচিং বাণিজ্য, শিক্ষক রাজনীতি ও আদর্শনিষ্ঠায় ক্রমাবনতি, লেজুড়ভিত্তিক ছাত্র রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব, শিক্ষানীতি, শিক্ষা আন্দোলন ও পণ্যে রূপান্তরিত শিক্ষা, নিয়োগ বাণিজ্য ও শিক্ষার রাজনীতিকরণ, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ ও ইতিবাচক দিকসমূহ নিয়ে বিস্তর আলোচনা করা হয়।
 গোলটেবিলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব এন আই খান বলেন, দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনেক বেশি। তাই নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন। বাইরে থেকে দেখলে সহজ মনে হলেও বিষয়টি বেশ কঠিন। এজন্য শিক্ষার মান উন্নয়নে একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ও ছাত্রের প্রভাব থাকে বেশি। এখানে সরকারের নিয়ন্ত্রণ কম থাকে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যা সমাধানে তারা কার্যকর ভূমিক পালন করতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর ড. আসিফ নজরুল বলেন, জিপিএ ৫-এর পরিমাণ বৃদ্ধি করে মাকাল ফল তৈরি করা হচ্ছে। কোয়ানটিটি বেড়েছে, কোয়ালিটি বাড়েনি। এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে খাতায় লিখলেই নম্বর পাওয়া যায়। তাই শিক্ষার্থীদের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস করে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নকল করে জাতির মেরুদন্ড-ভেঙে ফেলা হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থায় উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মানুষের মধ্য ব্যবধান  তৈরি হচ্ছে।
সাংবাদিক মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, স্বাধীনতার ৪৩ বছর পার হলেও উচ্চ মাধ্যমিকের পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ৩০ বছর ধরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় না। ছাত্রসমাজের যে আন্দোলন করার কথা দুর্ভাগ্যজনক হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
সাবেক সংসদ সদস্য এস এম আকরাম বলেন, কোনটা আগে চাই আর কোনটা পরে করতে হবে এই বিষয়ে সঠিক পরিকল্পনা নেয়ার যে ঘাটতি রয়েছে সেদিকে গুরুত্ব সহকারে নজর দিতে হবে।
সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অধিক হারে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আলু-পটলের ব্যবসায় পরিণত করা হয়েছে। শিক্ষার মান না বাড়িয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে। এটা উদ্বেগজনক পরিস্থিতি।
সুজনের সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খানের সভাপতিত্বে গোলটেবিলে আরো বক্তব্য রাখেন, সুজন নির্বাহী সদস্য বিচারপতি কাজী এমদাদুল হক, বুয়েটের সাবেক ভিসি ড. আব্দুল মতিন চৌধুরী, শিক্ষাবিদ শরীফা খাতুন, চিত্রনায়ক ও সুজনের সদস্য ইলিয়াস কাঞ্চন, উন্নয়ন কর্মী রেহানা বেগম প্রমুখ। (সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব ১৫ অক্টোবর ২০১৪)
একদিকে পরীক্ষা ও বইয়ের চাপ বৃদ্ধি, অন্যদিকে স্কুল, শিক্ষক ও প্রশিক্ষণের সংকট। তাহলে এর মধ্যে থেকে শিক্ষার্থীরা কী করবে? এই ফাঁক থেকেই সম্প্রসারিত হয়েছে প্রাইভেট টিউশনি, কোচিং ও গাইড বইয়ের তৎপরতা। প্রশ্নপত্র ফাঁস-শিক্ষাকে নিয়ে এসব বাণিজ্যিক উন্মাদনারই ফলাফল।
‘সকল নাগরিকের জন্য অভিন্ন উন্নতমানের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব’-এই অবস্থান থেকে বাংলাদেশ সরে গেছে অনেক আগে। এর বদলে তার বর্তমান নীতি দাঁড়িয়েছে, ‘মেধা নয়, আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী শিক্ষা গ্রহণ করো। টাকা থাকলে শিক্ষা কেনো, স্কুলে বা বাইরে’। শিক্ষা নয়, ডিগ্রি কেনাবেচার বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়। তার ফলে গত দুই দশকে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিপুল বিকাশ হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের স্কুলভীতি ও ঝরে পড়ার একটি মূল কারণ হলো শিক্ষাক্রমে বিষয়বস্তুর আধিক্য ও বইয়ের বোঝা। ১৯৮০’র দশকে এবং ৯০’র দশকে তৃতীয় শ্রেণীতে ওঠার পরই ড্রপ-আউট বা ঝরে পড়ার হার বেড়ে যায়। এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে শ্রেণীতে বিষয়বস্তুর আধিক্য ও বইয়ের বোঝা।
বর্তমান সময়ে স্কুলের ছোট ছোট শিশুদের কাছে এক আতঙ্কের নাম বইয়ের ব্যাগ। সকালে রাস্তায় নামলেই আমরা দেখতে পাই, অতি বিশাল ব্যাগের ভার শিশুরা কীভাবে বহন করছে। তাদের এই সমস্যা সমাধানে রীতিমতো আইন নিয়ে এগিয়ে এসেছে ভারত সরকার। ২০১৫ সালের জুলাই মাসে দেশটির সরকার ঘোষণা করে, শিশুদের স্কুল ব্যাগের ওজন শিশুর নিজের শরীরের ওজনের শতকরা দশ ভাগের বেশি হতে পারবে না। সেই সঙ্গে সরকার ৪৪ দফা সুপারিশ জারি করে পরামর্শও দিয়েছে, কীভাবে শিশুর বইয়ের ব্যাগের ওজন কমানো সম্ভব।
তবে নিয়ম ও পরামর্শ দিয়েই কর্তৃপক্ষ বসে নেই। তা সঠিকভাবে পালন করা হচ্ছে কিনা তা জানতে মহারাষ্ট্র রাজ্যের কর্মকর্তারা শিশু শিক্ষার্থীদের স্কুল ব্যাগের ওজন যখন  বেশি আকস্মিকভাবে পরীক্ষা করে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  ভারতীয় কর্মকর্তারা বলেছেন, ভারী স্কুলব্যাগ বহন করার ফলে শিশুরা ক্লান্ত হয়ে পড়ছে এবং তাদের শিরদাঁড়া ও হাড়ের জোড়া অংশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। (সূত্রঃ দৈনিক আজকের পত্রিকা ৪ ডিসেম্বর ২০১৫)
মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি না পাওয়া, বিভিন্ন বিষয়ে কাক্সিক্ষত নম্বর না পাওয়া, উত্তরপত্রে নম্বর কম-বেশি  দেয়া, নম্বর যোগ করার ক্ষেত্রে (ডাটা এন্ট্রি) দুর্নীতির অভিযোগ করেছেন অভিভাবকরা। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতিসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও করেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। তাদের দাবি, অর্থের বিনিময়ে উত্তরপত্রে গোপন কোড নম্বর ফাঁস করে দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট খাতায় দেয়া হয়েছে বেশি নম্বর। কিছু ক্ষেত্রে রফা না হওয়ায় খাতায় নম্বর কমিয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। চাহিদামতো খুশি না করায় শিক্ষার্থীর প্রাপ্ত নম্বরের চেয়ে কম নম্বর উঠানো হয়েছে রেজাল্ট শিটে।
২০১৫ সালে ডিপিইসহ সারা দেশের শিক্ষা অফিসে এ ধরনের কমপক্ষে ৩৫ হাজার অভিযোগ জমা পড়েছিল। এর মধ্যে অনেক অভিযোগ প্রমাণিতও হয়েছে। নম্বর কম দেয়ার মতো ৮ হাজার ঘটনা সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। ফলে তাদের খাতা মূল্যায়ন শেষে নতুনভাবে ফল ঘোষণা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত থাকায় ১৭ শিক্ষক, দুই শিক্ষা অফিসার, দুই ডাটা এন্ট্রি অপারেটর এবং এক অফিস সহকারীকে সাময়িক বরখাস্তসহ নানা ধরনের শাস্তি দেয়া হয়েছে। পরীক্ষায় এভাবে অনিয়ম আর দুর্নীতি প্রমাণের ঘটনায় খোদ অধিদফতরে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। (সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর ২১ জুন ২০১৫)
একশ্রেণীর শিক্ষক এবং অফিসার পরীক্ষা নিয়ে এই স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। মূলত নিজের প্রাইভেট পড়ানো ও কোচিংয়ের শিক্ষার্থী বা প্রভাবশালীদের সন্তানকে ভালো ফল করানোর মানসিকতা থেকেই এ ধরনের অনৈতিক কাজ করছেন। এদের চক্রটি পরীক্ষার হলে বলে দেয়া বা পরে উত্তরপত্রে নম্বর বাড়িয়ে দেয়া বা নম্বর যোগকালে (ডাটা এন্ট্রি) কম-বেশি করছে। এ পরীক্ষায় ভালো ফলের সঙ্গে বৃত্তি পাওয়া না পাওয়ার বিষয় জড়িত না থাকলে দুর্নীতি এভাবে ছড়াতো না।
প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় দুর্নীতি ভর করেছে বলে বেশকিছু দিন ধরেই অভিযোগ করছেন বিশেষজ্ঞরা। ‘গণসাক্ষরতা অভিযান’র (ক্যাম্পে) নির্বাহী পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একাধিকবার বলেছেন, প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় দুর্নীতি ঢুকে গেছে। ৭ জুন ২০১৫ জাতীয় প্রেস ক্লাবে জাতীয় শিক্ষক কর্মচারী ফ্রন্টের এক সভায় তিনি বলেন, সমাপনী পরীক্ষার কারণে একশ্রেণীর শিক্ষক-অভিভাবক দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। এ পরীক্ষা আর রাখা ঠিক হবে কিনা-এমন প্রশ্ন উঠেছে।
এর আগে ২০১৫ সালের জুন মাসের গোড়ার দিকে রাজধানীর এলজিইডি ভবনে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের উপস্থিতিতে এক অনুষ্ঠানেও তিনি প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা বাতিলের দাবি তোলেন।
২০০৯ সালে সমাপনী পরীক্ষা শুরু হয়। এরপর থেকেই একশ্রেণীর শিক্ষক-অভিভাবক এমনকি শিক্ষা বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ২০০৯ ও ২০১০ সালের পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, অধিকাংশ উপজেলায় প্রথম-দ্বিতীয় হয়েছে শিক্ষা অফিসার বা অফিসের অফিসারের মেয়ে বা ছেলে। বিষয়টি ডিপিইর নজরে গেলে পরে এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করলে এ দুর্নীতি বন্ধ হয়। মূলত উপজেলাভিত্তিক খাতা মূল্যায়ন হওয়ায় অসাধু ব্যক্তিরা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি করার সুযোগ পাচ্ছেন। ২০১৪ সালে ২৭ লাখ ৮৯ হাজার ২৬৩ শিক্ষার্থী পিইসিতে অংশগ্রহণ করে। এদের মধ্যে ২৬ লাখ ২৮ হাজার ৮৩ জন এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। তার মধ্যে ২ লাখ ৪৪ হাজার ১১ জন জিপিএ-৫ পায়। বৃত্তি পেয়েছে ৫৪ হাজার ৫০২ জন।
১৭ মে ২০১৪ এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। ৮টি সাধারণ বোর্ডসহ ১০টি বোর্ড মোট ১৪ লাখ ২৬ হাজার ৯২৩ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করে ১৩ লাখ ৩ হাজার ৩৩১ জন। পাসের হার ৯১.৩৪ ভাগ। যা আগের বছরের চেয়ে ২.৩১ ভাগ বেশি। ২০১৩ সালে পাসের হার ছিল ৮৯.০৩ ভাগ। ২০১৪সালে জিপিএ-৫ পেয়েছে রেকর্ড সংখ্যক ১ লাখ ৪২ হাজার ২৭৬ জন। ২০১৩ সালের চেয়ে জিপিএ ৫-এর সংখ্যা ৫১ হাজার ৫০ জন বেশি। ২০১৩ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৯১ হাজার ২২৬ জন শিক্ষার্থী।
২০১৪ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার উত্তরপত্রে বেশি নম্বর দিতে লিখিত নির্দেশ দেয়া হয়েছিল পরীক্ষকদের। প্রধান পরীক্ষক ও পরীক্ষকদের আলাদাভাবে  বোর্ডের পক্ষ থেকে এ নির্দেশনা দেয়া হয়। ৮টি বিষয়ের নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে বাংলা প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র, ইংরেজি প্রথম এবং দ্বিতীয়পত্র, গণিত, পদার্থ, রসায়ন, সাধারণ বিজ্ঞান। ইংরেজি প্রথম পত্রে মূল্যায়নে ২১টি নির্দেশনা দেয়া হয়। এর মধ্যে ১১ নম্বরের (ডি) নির্দেশনায় পরীক্ষার্থী কোন কোর্সে ৩৮ পেলে ৪০, ৪৮ পেলে ৫০, ৫৮ পেলে ৬০, ৬৮ পেলে ৭০ এবং ৭৮ পেলে ৮০ করতে সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করতে বলা হয়। ১৮ নম্বর নির্দেশনায় কোন পরীক্ষার্থী কোন কোর্সে ৩২, ৩৯, ৪৯, ৫৯, ৬৯ ও ৭৯ পেলে ওই উত্তরপত্র পুনরায় পরীক্ষা করে নম্বর বাড়িয়ে দিতে বলা হয়। অর্থাৎ ৩২ পেলে ৩৩, ৩৯ পেলে ৪০, ৪৯ পেলে ৫০, ৫৯ পেলে ৬০, ৬৯ পেলে ৭০ এবং ৭৯ পেলে ৮০ নম্বর দিতে বলা হয়। ১৯ নম্বর নির্দেশনায় ২৮, ২৯, ৩০, ৩১ এবং ৩২ নম্বর ত্যাগ করে বাড়িয়ে দিতে অর্থাৎ ৩৩ নম্বর দেয়ার কথা বলা হয়। নির্দেশনা শেষে আবার স্টার চিহ্ন দিয়ে ৩২, ৩৯, ৪৯, ৫৯, ৬৯ ও ৭৯ নম্বরকে দয়া ও সতর্কভাবে পুনরায় পরীক্ষা করে উচ্চতর গ্রেড করতে বলা হয়। গণিতের উত্তরপত্র মূল্যায়নের বিষয়ে পরীক্ষকদের জন্য ‘গণিত বিষয়ের বিশেষ নিয়মাবলি’ দেয়া হয় ১৫টি। ১৫ নম্বর নিয়মাবলিতে বলা হয়-যে সকল উত্তরপত্রে প্রাপ্ত নম্বর সর্বনিম্ন পাস নম্বরের কাছাকাছি যেমন-২৮, ২৯, ৩০, ৩১ বা ৩২ সেসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনবোধে উপরের নিয়মাবলি শিথিল করে পুনরায় মূল্যায়ন করে পাস নম্বর দেয়ার চেষ্টা করতে হবে। প্রধান পরীক্ষক কর্তৃক প্রদত্ত পরীক্ষকদের জন্য ২৫টি নির্দেশনা দেয়া হয়। ২৪ নম্বরের খ নির্দেশনায় বলা হয় কোন উপ-নম্বর ৩৯, ৪৯, ৫৯, ৬৯ ও ৭৯ ধারী খাতাগুলো সহানূভূূতির সঙ্গে বিবেচনা করবেন। এছাড়া বাংলা, সাধারণ বিজ্ঞান, পদার্থ, রসায়নসহ বিভিন্ন বিভাগের উত্তরপত্র মূল্যায়নে একই ধরনের নির্দেশনা দেয়া হয়।
উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পাসের হার ও জিপিএ-৫ বাড়ানো হচ্ছে। অথচ শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা বাড়ছে না। এতে শিক্ষার্থীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভাল ফল করছে অথচ দেখা যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় এসব শিক্ষার্থী গণহারে ফেল করছে। এতে লাভ কি হলো। যোগ্যতা বাড়াতে না পারলে ১০০ ভাগ শিক্ষার্থী পাস করলেই লাভ কি? কোন লাভ নেই। উত্তরপত্র মূল্যায়নে নম্বর বাড়িয়ে দেয়ার নির্দেশনা কখনওই যুক্তিযুক্ত নয়। এটা তো গ্রেস নম্বর নয়। এছাড়া গ্রেস দিতে চাইলে তা ঘোষণা দিয়েই দিতে হবে।
পাসের হার বাড়ছে। জিপিএ-৫ বাড়ছে। কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান দিনদিন কমছে। এটা জ্যামিতিক এবং গাণিতিক দুই হারেই কমছে। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরা ক্লাসে সঠিকভাবে এক লাইন বাংলা লিখতে পারে না। ইংরেজি তো অনেক পরে। তাহলে লাভ কি হলো? শিক্ষার মান তো বাড়ছে না। 
উত্তরপত্রে বেশি নম্বর দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। উত্তরপত্র বিতরণের সময় বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়- শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা হয় এমনভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে হবে যাতে কেউ ফেল না করে। পরীক্ষার কেন্দ্রেও এখন নকল ও দেখাদেখি হয় অবাধে। আগে বহিষ্কার করা হতো এখন সেটাও করা হয় না।
 ২০১৪ সালে ঢাকা বোর্ডের ইংরেজি বিভাগের একজন প্রধান পরীক্ষকের নেতৃত্বে ৪২০০ উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হয়। এর মধ্যে একজনও ফেল করেনি। এটা কি করে সম্ভব।   [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ