ঢাকা, শনিবার 12 November 2016 ২৮ কার্তিক ১৪২৩, ১১ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মাদরাসা জাতীয়করণ এখন সময়ের দাবি

অধ্যক্ষ মো: ইয়াছিন মজুমদার : চলতি অক্টোবর মাসের ৬ ও ৭ তারিখে দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকায় প্রকাশিত মো: খালেদ সাইফুল্লাহ সিদ্দিকীর লেখা  “চাকরি জাতীয়করণ বনাম মাদ্রাসা শিক্ষা”- শীর্ষক লেখায় তিনি মাদ্রাসা জাতীয়করণের বিপক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। তিনি তার মতের পক্ষে যে সব কারণ উল্লেখ করেছেন তার সারমর্ম হল- জাতীয়করণ হলে মাদ্রাসা শিক্ষকদের সরকারের নির্দেশ মেনে চলতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষার স্বাতন্ত্র্য স্বকীয়তা ও মূল্যবোধ ক্ষুণ্ন হবে। প্রফসররা মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করবে।
কোন সরকার যদি মাদ্রাসার স্বকীয়তা বিনষ্ট হওয়ার মত সিলেবাস ইত্যাদি চাপিয়ে দেয় তা প্রতিরোধ করার কেউ সাহস করবে না ইত্যাদি। মাদ্রাসা শিক্ষার সাথে সংশিষ্ট ও হিতাকাক্সক্ষী হিসেবে আমি ব্যক্তিগতভাবে তার সাথে একমত হতে পারছি না। বর্তমানে পুরো শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের লক্ষ্যে দেশে শত শত স্কুল কলেজ জাতীয় করণ হচ্ছে। অথচ একটি মাদ্রাসা ও জাতীয় করণের ঘোষণা অদ্যাবধি আসেনি। মাদ্রাসা জাতীয়করণ এখন সময়ের দাবি। জাতীয়করণ না হলে মাদ্রাসা শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মাদ্রাসা শিক্ষার জাতীয়করণের সাথে সরকারের নির্দেশ মানা না মানার কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ সরকার এমপিওভুক্ত মাদ্রাসায় শত ভাগ বেতন প্রদান করে। সরকারের নীতিমালা মেনেই মাদ্রাসা পরিচালনা করতে হয়। বর্তমানে বাংলা, ইংরেজী ইত্যাদি সাধারণ বিষয় স্কুল ও মাদ্রাসায় অভিন্ন বই পাঠ্য। ইতো মধ্যে কিছু বইয়ের লেখা নিয়ে বির্তক উঠেছে। গল্প, কবিতায় বিশেষ ধর্মের সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে যেমন- শব্দ গঠনে ‘র’ তে রথ পড়ানো। আবার নবম, দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে প্রথম থেকে ধারাবাহিক এগারটি গল্পের মধ্যে আটটি হিন্দু লেখকদের। বর্তমানে জাতীয়করণ না থাকা অবস্থায় কি কোন মাদ্রাসা এ বইগুলো বাদ দিয়ে অন্য কোন বই পাঠ্যভুক্ত করতে পারবে?
মাদ্রাসায় সাধারণ বই ও সিলেবাসের বোঝা বর্তমানে এত বেশি যা ছাত্রদের পাঠ ভীতি সৃষ্টি করছে এবং আরবী ও ইসলামী শিক্ষায় ব্যাঘাত ঘটাছে। এ সিলেবাস বাদ দিয়ে কেউ কি খুশি মত সিলেবাসে পাঠদান করতে পারবে? এর উত্তর হল পারবে না। সম্প্রতি এনটিআরসি এ মাদ্রাসা শিক্ষক নিয়োগের যে প্যানেল দিয়েছে বহু হিন্দু শিক্ষক মাদ্রাসায় নিয়োগের তালিকাভুক্ত আছেন। তা হলে জাতীয়করণের সাথে স্বাতন্ত্র রক্ষার সম্পর্ক কি? এ অবস্থায় মাদ্রাসা শিক্ষকদের সংগঠনসমূহ শান্তিপূর্ণ ভাবে সরকারের কাছে মাদ্রাসার স্বাতন্ত্র ও রক্ষার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এতে অনেক ক্ষেত্রে সুফল পাওয়া যাচ্ছে। জাতীয়করণ হলেও মাদ্রাসা শিক্ষার স্বাতন্ত্র রক্ষায় এমনি ভাবে মাদ্রাসা শিক্ষকদের সংগঠনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের প্রচেষ্টা চলবে।
তাহলে জাতীয়করণ হলে সমস্যা কোথায়? জাতীয়করণ হলে প্রফেসররা মাদরাসায় শিক্ষকতা করবে এতে শিক্ষার মান নষ্ট হবে। এ কথাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। কারণ এখন ঢাকা, সিলেট ও বগুড়া তিনটি সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায় প্রফেসররা ক্লাস নিচ্ছেন। সেখানকার শিক্ষার মান কি একেবারে খারাপ? বরং অন্য অনেক বেসরকারি মাদ্রাসার চেয়ে ভাল। মাদরাসাসমূহকে নিয়ন্ত্রণকারী মাদ্রাসা বোর্ড ও আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা কর্মচারীরা মাদ্রাসার সনদ দিয়ে চাকুরি করছেনা। বরং সাধারণ শিক্ষার সনদ দিয়ে চাকরি করছে। অপরদিকে এক সময় ফাযিল ও কামিল বিএ ও এমএ মান পায়নি ফলে সরকারি মাদ্রাসায় তাদের চাকরির সুযোগ ছিল না। তাই কলেজের প্রফেসররা শিক্ষকতা করেছে। বর্তমানে শত শত ছাত্র বিএ ও এমএ’র মান নিয়ে ফাযিল ও কামিল পাস করে বের হচ্ছে। তারা বিসিএস শিক্ষায় অংশ নিয়ে জাতীয়করণকৃত মাদ্রাসার শিক্ষক হতে পারবেন।
তাছাড়া যে সকল মাদ্রাসা জাতীয়করণ হবে সেগুলোতে কর্মরত আলেমরা কি ছাটাই হয়ে যাবে? বরং তারা ও শিক্ষকতা করবে ফলে জাতীয় করণকৃত মাদ্রাসায় প্রফেসরদের চাইতে আলেমের সংখ্যা বেশি হবে। যা স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় সহায়ক হবে। জাতীয় করণ না হলে মাদ্রাসা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রথমত শত শত স্কুল-কলেজ জাতীয়করণ হবে। সেখানকার শিক্ষকের পদগুলো পর্যায়ক্রমে খালি হবে। শত শত স্কুল কলেজ ছাত্রের জন্য সরকারি চাকরির ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হবে। অপরদিকে মাদ্রাসা জাতীয় করণ না হলে মাদ্রাসা থেকে পাস করা ছাত্রদের সরকারি চাকরির ক্ষেত্র সংকুচিত হবে। ফলে জনগণ তাদের সন্তানদের মাদ্রাসায় পড়ানোর আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।
দ্বিতীয়ত বর্তমানে একজন শিক্ষক যেখানে চাকরি করছেন সেখানে যদি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হন বা পরিচালনা কমিটির রোষানলে পড়েন তবে তাকে চরমভাবে ভুগতে হয়। এতে সুষ্ঠু পাঠদান ব্যাহত হয়। জাতীয়করণ হলে এ ধরনের সমস্যায় অন্তত: বদলীর মাধ্যমে নিজ সম্মান বাঁচিয়ে অন্যত্র যাওয়ার সুযোগ থাকবে। সমাজে অর্থনৈতিক মর্যাদা একটি বড় বিষয়।
জাতীয়করণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আলেমদের মর্যাদাকে বাড়াবে। ভারতীয় উপমহাদেশে একসময় মাদ্রাসা শিক্ষাই ছিল একমাত্র শিক্ষা এবং জাতীয়করণকৃত। প্রত্যেকটি মাদ্রাসার জন্য বিশাল জায়গীর বরাদ্ধ ছিল। ঐ জায়গীরের খাজনার দায়িত্ব ছিল মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের। জায়গীর থেকে যে আয় হত তা দিয়ে মাদ্রাসার খরচ মেটানো হত এবং এলাকার উন্নয়ন কাজে অর্থ বরাদ্দ হত মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ফলে মাদ্রাসা ও আলেমদের একটা আলাদা মর্যাদা ছিল। ইংরেজরা জায়গীর থেকে মাদ্রাসার কর্তৃত্ব ছিনিয়ে নেয়।
ফলে মাদ্রাসা আয় শূন্য হয়ে জনগণের সাহায্য সহযোগিতার মুখাপেক্ষী হয়ে যায়। তখন অর্থাভাবে বহু মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে স্কুল কলেজ সরকারিকরণ হলে মাদ্রাসা বেসরকারি থাকলে মাদ্রাসাসমূহ মর্যাদাহীন, শ্রীহীন হয়ে ছাত্রসংখ্যা কমে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। তাই স্কুল কলেজের সমাহারে মাদ্রাসা জাতীয়করণ এখন  সময়ের দাবি।
লেখক- অধ্যক্ষ ফুলগাঁও ফাযিল ডিগ্রি মাদ্রাসা, লাকসাম, কুমিল্লা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ