ঢাকা, শনিবার 12 November 2016 ২৮ কার্তিক ১৪২৩, ১১ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মধ্যযুগে মুসলমানদের শিক্ষাব্যবস্থা

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : [শেষ কিস্তি]
হারুন উক্ত শিক্ষককে বলেছিলেন যে, তিনি ছাত্রের প্রতি যেন শক্ত না হন যাতে তার সহজাত বৃত্তিগুলো বিকৃত হয়; আবার তিনি এত নম্ন হবেন না যে, সে সুযোগে ছাত্ররা অলস হয়ে পড়বেন।
তিনি প্রথমে দয়া ও সহানুভূতি দেখিয়ে ছাত্রকে সোজা করার প্রয়াস চালাবেন, তবে তাঁর নমনীয় আচরণ যদি ব্যর্থ হয় তবে তাঁকে ছাত্রের প্রতি কঠোর হতে হবে। ‘‘ইবনে খালদুন, মুকাদ্দিমা-মুসা আনসারী কর্তৃক ‘মধ্যযুগের মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি গ্রন্থ উদ্ভুত, বাংলা একাডেমী, ঢাকা-১৯৯৯, পৃ: ৩২৮’’। খলিফা তার যুবরাজের সুশিক্ষার প্রয়োজনে শিক্ষককে বেত ব্যবহারেরও অনুমোদন দিয়েছিলেন। ইবনে সিনা তাঁর ‘রিসালাতুল সিয়াসতে’ শিক্ষককে ছড়ি ব্যবহারের উল্লেখ করেন। ‘’Hitti, OP, Cit, P-409’’ প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে মুখস্থ করার উপর বেশী জোর দেয়া হত।
উচ্চ শ্রেণীর শিক্ষা- ছাত্রদের মেধার ভিত্তিতে বিভিন্ন রকমের হতো। এ ক্ষেত্রে ছাত্রদের ইচ্ছাও কাজ করত। কিছু ছাত্র ছিল যারা শিক্ষার নির্দিষ্ট শাখায় শিক্ষিত হয়ে অন্যান্য শিক্ষার্থীদেরও ঐ শাখায় জ্ঞানী করে তুলতে অনুপ্রাণিত হত।
একশ্রেণীর ছাত্র ছিল যারা তাদের শিক্ষা সীমাবদ্ধ রেখেছিল ব্যক্তিগত অর্জনের মধ্যে, মানব কল্যাণ তাদের লক্ষ্য ছিল না। আর এক শ্রেণীর ছাত্র ছিল যারা নিজেদের সমাজে ভাল সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে তোলার জন্য যোগ্য করে তুলত। আর এক শ্রেণীর ছাত্র ছিল যারা চিত্রকর্ম, বিজ্ঞান, অথবা হস্তলিখন বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে নির্দিষ্ট পেশায় কাজ করত। ‘’Mohd, Abdul Muid Khan, OP, Cit, P-420’’.
মধ্য যুগের মুসলিম শাসনামলে বাগদাদ, বসরা, কুফা, কর্ডোভা, কায়রো প্রভৃতি স্থান উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। শিক্ষকদের মধ্যে তিন শ্রেণীর শিক্ষক ছিলেন। প্রথম শ্রেণীর যে সমস্ত শিক্ষক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের কুরআন শিক্ষা দিতেন তাদেরকে মুয়াল্লিম বলা হত। ধর্মতত্ত্ব সংক্রান্ত জ্ঞানের জন্য কখনো কখনো তাদেরকে ফকীহ বলা হত। মুয়াল্লিমদের সামাজিক মর্যাদা ছিল সামান্য। দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষকদের ‘মুয়াদ্দিব’ বলা হত। তারা মর্যাদাসম্পন্ন লোকের ও খলীফাদের সন্তান-সন্ততিদেরকে শিক্ষা দিতেন। এই শ্রেণীর শিক্ষকরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চেয়ে উচ্চ স্তরে ছিলেন। এর পরের স্তরে ছিলেন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিযুক্ত অধ্যাপকবৃন্দ। উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদিগকে জনসাধারণ খুব শ্রদ্ধা করত। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্য তালিকা ভাগ থাকলেও উচ্চস্তরের শিক্ষার জন্য পাঠ্যতালিকা অনুসরণের কোন ধরাবাধা নিয়ম ছিল না।
প্রত্যেক শিক্ষক বা অধ্যাপকের নিজস্ব শিক্ষা পদ্ধতি এবং পাঠ্যতালিকা ছিল। অধ্যাপক নিয়োগ এবং বরখাস্ত করার অধিকার বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ছিল। কিন্তু শিক্ষা পদ্ধতি ও পাঠ্যক্রম নির্বাচনের ক্ষেত্রে শিক্ষকরা পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতেন। ধর্ম বিপদাপন্ন হলেই শুধু সরকার হস্তক্ষেপ করত। ‘’Khuda Bukhst, OP. Cit, P-421’’. অধ্যাপকগণ তাদের বক্তৃতায় সাধারণত স্বরচিত অথবা অন্য কোন লেখকের বই অনুসরণ করতেন। অভিজ্ঞ শিক্ষকদের পাঠ্যপুস্তক মুখস্থ ছিল। ফলে বক্তৃতা দেয়ার সময় তাদের কোন অসুবিধা হত না। শিক্ষকগণ বক্তৃতা দিয়েই সন্তুষ্ট হতেন না, তিনি চেস্টা করতেন যাতে ছাত্ররা তাঁর বক্তৃতা বুঝতে পারেন। এই জন্য তিনি ছাত্রদের প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতেন এবং ছাত্রদেরকেও প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে বলতেন। অনেক শিক্ষকই কোন বিষয়ের উপর আলোচনাকালে নিজের আসন ছেড়ে ছাত্রদের সাথে মিশতেন। ‘’Khuda Bukhs, OP, Cit, P-283’’. অনেক সময় শিক্ষকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরেও ছাত্রদের সাথে আলাপ করতেন।
শিক্ষকরা কোন কোন সময় ছাত্রদের লেখাপড়ার সমস্যায় তাদের গৃহে আসতে বলতেন। ছাত্রগণ শিক্ষকদের অত্যন্ত সম্মান ও যথার্থ সেবা করতো। মধ্যযুগের মুসলিম জনপদে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক বিশ্ব শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাসে কৃতিত্বের স্বাক্ষর বহন করে। সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকদের বেতন অনেকটা নিয়মিত হয়ে উঠেছিল। ইবনে বতুতা তার বর্ণনায় শিক্ষকদের পারিশ্রমিক দৈনিক পনর দিনারের কথা বলেছেন। এ ছাড়া শিক্ষক ও দরিদ্র ছাত্ররা মসজিদ, পবিত্র স্থান, হাসপাতালের আয়, ধনী সম্প্রদায়ের চাঁদা হতে সাহায্য লাভ করতেন। সরকারী কোষাগার হতেও তাদের বেতনভাতা দেয়া হত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৎসরের নির্দিষ্ট সময়ে নিয়মিত ছুটির ব্যবস্থা ছিল না। পাঠ্যবিষয় অধ্যয়ন শেষ না হলে ছুটি হত না। কোন নির্দিষ্ট পাঠ্যসূচী আয়ত্বে আনার পরেই কিছুদিন অবকাশ দেয়া হত। শিক্ষা ক্ষেত্রে মধ্যযুগে খানকাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। এ সময় থেকে মুসলিম বিশ্বের নানা স্থানে খানকা গড়ে ওঠে। সূফীগণ তাদের খানকায় শিষ্যদের দর্শন ও ধর্মতত্ত্ব শিক্ষা দিতেন। কালক্রমে খানকাকে ঘিরে মাদ্রাসা ও পাঠাগার গড়ে ওঠে। ইরাক ও ইরান ভ্রমণকালে ইবনে বতুতা অসংখ্য খানকা দেখেছেন। এছাড়া বয়স্কদের শিক্ষিত করা ও নিরক্ষরতা দূর করার জন্য প্রচেষ্টা চালান হতো। অনেক স্থানে নিয়মিতভাবে শিক্ষাদানের জন্য পরিষদ ছিল। আব্বাসীয় সোনালী যুগে ধর্মজ্ঞান বিকাশে আর একটি বড় অবদান হল মুসলিম ব্যবহার শাস্ত্রের উন্মেষ। আব্বাসীয় আমলে পরিবর্তিত বাস্তব অবস্থায় মুসলিম সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন ধর্মীয়, সামাজিক, আর্থ রাজনৈতিক সমস্যাবলীর সমাধানের প্রচন্ড তাগিদে তাদের ধর্মজ্ঞানের আর একটি নতুন স্বতন্ত্র কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শাখা, আইনবিদ্যার উদ্ভব হয়। ‘‘মূসা আনসারী, মধ্যযুগের মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি, বাংলা একাডেমী, ঢাকা-১৯৯৯, পৃ: ৩৪৩’’।
কুরআনের ঐশী বাণীতে আল্লাহর অনুজ্ঞাসমূহ বিধৃত হয়; সুন্নায় তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়; কিন্তু সেগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ, বিস্তৃত ও সুসংহত রূপ লাভ করে এবং তার অন্তর্নিহিত যৌক্তিক সূত্রায়ন ঘটে ইলমূল ফিকাহ বা ব্যবহারিক শাস্ত্রে। ঐতিহাসিক বিচারে এ শাস্ত্রের বিকাশ গুরুত্ব বহন করে। আব্বাসীয় যুগের বাস্তবতায় ব্যবহারিক শাস্ত্রের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সুসংহত রূপদানের প্রয়োজন হয়।
আইন অধ্যয়নের জন্য কয়েকটি কেন্দ্র গড়ে ওঠে। এরূপ আইন স্কুলের নিজস্ব ধ্যান ধারণায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও গড়ে ওঠে। আবু হানিফা নোমান বিন সাবিত (৬৯৯-৭৬৮ খ্রি:) ছিলেন ইরাকী স্কুলের প্রাণপুরুষ। ইরাকী স্কুলকে ঘিরে হানাফী মাজহাব গড়ে ওঠে। হেজাজি স্কুল বা মালেকী মজহাবের প্রাণপুরুষ ছিলেন মালেক বিন আনাস (৭১৪-৭৯৫ খ্রি:)। আব্বাসীয় শাসনের প্রারম্ভে যুক্তিবাদী উদারপন্থী ইরাকী স্কুল এবং রক্ষণশীল সুন্নাপন্থী হেজাজী স্কুলের মধ্যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
এই বিতর্কের কেন্দ্র বিন্দু ছিল কুরআন ও আইনের অন্যান্য উৎসের তুল্যমানে সুন্নার অবস্থান কি? এই বিতর্কে কেন্দ্রবিন্দু ছিল কুরআন ও আইনের অন্যান্য উৎসের তুল্যমান সুন্নার অবস্থান কি? এই বিতর্কে ইমাম শাফেয়ী ও (৭৬৭-৮২০ খ্রি:) জড়িয়ে পড়েন। তিনি ঐত্যিহ্যবাদী ও প্রগতিবাদীদের মধ্যকার দ্বন্দ্বে গতিশীল অবস্থান গ্রহণ না করে মধ্যবর্তী আর এক অবস্থান গ্রহণ করেন ফলে শাফী মাজহাব গড়ে উঠে। আবার আহমদ ইবন হাম্বল (৭৮০-৮৫৫ খ্রি:) শাফী, মালেকীদের নমনীয় মনোভাবের পরিবর্তে কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন। এরূপ অবস্থায় হাম্বলী মজহাব গড়ে ওঠে। সুন্নী সম্প্রদায়ের মধ্যে উক্ত চারজন বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিভঙ্গির যে ভিন্নতা দেখা দেয় শিক্ষা ক্ষেত্রেও উক্ত মজহাবগুলোর স্ব-স্ব নীতির প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয়। শিক্ষা গ্রহণের বিষয়, শিক্ষা পদ্ধতি কি হওয়া উচিত সে বিষয়ে উক্ত মাজহাবের স্ব-স্ব দৃষ্টিভঙ্গিও রয়েছে। বাগদাদ, মসূল, দামাস্কাস, হালাব, মিশর এবং নিশাপুরে পৃথক পৃথক মজহাবগুলোর পৃথক পৃথক মাদ্রাসা বা বিদ্যাপীঠ ছিল। পঞ্চদশ শতাব্দীতে দামাস্কাসে ৩৩টি হানাফী, ৩১টি শাফী, ৯টি হাম্বলী, ১টি মালেকী মাদ্রাসা ছিল। আর ৬টি শাফী ও হানাফী উভয় মাদরাসা হিসেবে ব্যবহৃত হত। ‘’Encyclopaedia of Islam, Masjid, P-381’’. হানাফী বিদ্যাপীঠে পঠিত বিষয়সমূহের মধ্রে ছিল আবশ্যিক ও ঐচ্ছিক বিষয়। প্রাপ্ত বয়স্ক সকল মুসলিমের জন্য নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাতের বিধানাবলী, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার জ্ঞান, হালাল-হারামের জ্ঞান, আচার-ব্যবহার, বিবাহ ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয় জানা আবশ্যকীয় ছিল। অন্যদিকে ঐচ্ছিক বিষয় ছিল নীতিবিদ্যা, দর্শন, চিকিৎসাবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা ইত্যাদি।
শাফী বিদ্যাপীঠে পঠিত বিষয় বিভক্ত হয়েছিল ধর্মীয় (Religious) দর্শবিমুখ (Non-recligious) এ দু’প্রধান বিষয়ে। ধর্মবিমুখ শিক্ষার মধ্যে কিছু ছিল হারাম (Forbidden) কিছু মাকরূহ (Disliked) আর কিছু মুবাহ (Permissible)। তার মধ্যে হারাম হলো- যাদুবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, দর্শন এবং যা মনে সন্দেহের উদ্রেক করে তেমন বিষয়। আর ধর্মীয় (Religious) শিক্ষা তিনভাগে বিভক্ত ছিল (১) আবশ্যকীয় (Obligatory) (২) ঐচ্ছিক (Optional) ও ৩) অতিরিক্ত (Voluntary) আবশ্যকীয় বিষয়ের মধ্যে ছিল- ওযুর নিয়মাবলী, নামাযের নিয়ম-কানুন।
এছাড়া পিতামাতার প্রতি সন্তানকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা দান করতে বলা হয় যা আবশ্যকীয় শিক্ষার অন্তর্ভূক্ত যেমন- পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা, সংযমী হবার শিক্ষা এবং অনৈতিক কার্যকলাপ, চুরি, মদ্যপান, মিথ্যা বলা, পরনিন্দা ইত্যাদি খারাপ কাজ বিরত রাখতে বাধ্য করা। কুরআন শিক্ষা, ফিকহ, আরবী ভাষা ও গ্রামার ইত্যাদি বিষয় ও আবশ্যকীয় বিষয়ের অন্তর্ভূক্ত ছিল। ঐচ্ছিক বিষয়ের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত ছিল মুসলিম ব্যবহার শাস্ত্র, আরবী ভাষা, গ্রামার এবং হাদীস বিশারদদের জীবনী, মুসলিম মুজতাহিদদের বুদ্ধিবৃত্তিক মতামত (ইজমা) ইত্যাদি। এছাড়া চিকিৎসাবিদ্যা ও গণিতশাস্ত্র যা মানব কল্যাণে প্রয়োজনীয়।
আবার শিয়া বিদ্যাপিঠে তাদের রাজনৈতিক দর্শনের অগ্রাধিকার দেয়া হলেও বিজ্ঞান এবং দর্শন নির্ভর শিক্ষা তাদের পাঠ্যবস্তু ছিল।
কাজেই দেখা যায়, মধ্যযুগে মুসলিম শাসনামলে শিয়া, সুন্নী সকল সম্প্রদায় তাদের নিজস্ব চিন্তা চেতনার উর্ধ্বে অবস্থান করে একটি মানব কল্যাণময় শিক্ষাব্যবস্থার উপহার দিয়েছিল। তবে হানাফী মজহাব অন্যান্য মজহাব থেকে উদারপন্থী ও প্রগতিশীল হওয়ায় পূর্বাঞ্চলীয় ও পশ্চিমাঞ্চলীয় মুসলিম বিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। ফলে হানাফী মতাদর্শে গড়ে উঠা বিদ্যাপীঠগুলো এ অঞ্চলে শিক্ষাদীক্ষায় বেশ অবদান রাখে। তাই এ অঞ্চলেই অধিকাংশ মুসলিম বিজ্ঞানীদের আবির্ভাব হয়। এ ক্ষেত্রে আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে যায় ৮৩০ খ্রি: বাগদাদে খলিফা আল মামুন কর্তৃক বায়তুল হিকমাহ (বিজ্ঞান ভবন) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। উচ্চতর মানবিক বুদ্ধিবৃত্তিক বৈজ্ঞানিক শিক্ষা গবেষণাকে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে ইহা প্রতিষ্ঠিত হয়। অনুবাদ কেন্দ্র ছাড়াও এ প্রতিষ্ঠান শিক্ষা সংক্রান্ত গবেষণা কেন্দ্র ও সাধারণ পাঠাগার হিসেবে কাজ করত।
এর সঙ্গে একটি মানমন্দিরও ছিল। বায়তুল হিকমাহ মধ্য ও প্যারিস, ফ্রান্স, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজের অনেক পূর্বে আলোক বিতরণ করেছিল। বাগদাদ এ সময় ইউরোপ, এশিয়ার সকল জ্ঞান পিপাসুদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল। এছাড়া বসরা, কুফায় গড়ে ওঠে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রাচ্য সিরাজ, মারগা, ইস্পাহান, গজনি, মার্ভ, নিশাপুর, রায়, বুখারা, সমরককন্দসহ অনেক নগর বন্দরে গড়ে ওঠে বিজ্ঞান মানমন্দির। ‘‘মূসা আনসারী, প্রগুক্ত, পৃ: ২৬০’’। প্রতিটি হাসপাতালে চিকিৎসা বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়া হত। বিজ্ঞান মানমন্দিরে গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, যন্ত্র প্রকৌশলীবিদ্যা শিক্ষা দেয়া হত। এছাড়া ১০৬৫-৭ সালে নিযামুল মূলক্ তুসীর প্রতিষ্ঠিত নিযামীয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মুসলিম বিশ্বের বহুদিনের আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ‘’Hitti, OP. Cit. P-410’’ এতে একটি পাঠ্যক্রম পরিলক্ষিত হয়।
এই শিক্ষাক্রমে সর্বপ্রথম রাষ্ট্রীয় দর্শনের প্রতিফলন ঘটতে দেখা যায়। আরবী ভাষা, ব্যাকরণ, অলংকার শাস্ত্র, সাহিত্য, যুক্তিবিদ্যা, অংকশাস্ত্র, স্কলাসটিক দর্শন পাঠদানের মধ্য দিয়ে এর মানবিক শাখা গড়ে ওঠে। তফসীর, হাদীস, ফিকাহ শাস্ত্র, পাঠ্যক্রমে ধর্মীয় শিক্ষা বিভাগ হিসেবে গড়ে ওঠে। মধ্যযুগে ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাংগঠনিক কাঠামো, পাঠ্যক্রম নিজামিয়ার আদলে গড়ে ওঠে। ‘’Hitti, OP, Cit, P-416’’ মুসলিম শিক্ষা ব্যবস্থা মধ্যযুগে স্পেনেও উন্নতির চরম শিখরে পদার্পণ করেছিল। কর্ডোভা, গ্রানাডা, মালাগা, সেভিল প্রভৃতি শহরে অসংখ্য বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠেছিল। পশ্চিম ইউরোপে টলেডো আরব জ্ঞান-বিজ্ঞানের বড় কেন্দ্র হিসেবে বহুদিন ধরে টিকেছিল। বস্তুত বলা চলে টলেডো ছিল প্রাচ্য বিদ্যাপীঠ (First school of oriental) ‘’Hitti, OP, Cit, P-606-7’’. মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি জনপদে এরূপ সমৃদ্ধ যুগোপযোগী মুসলিম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ছায়াতলে জন্ম নেয় হাজার হাজার মুসলিম জ্ঞানীগুণী, বুদ্ধিজীবি, বিজ্ঞানী। মুসলিম এ সকল মনীষীগণ প্রাচীন জ্ঞান-বিজ্ঞানকে উদ্ধার করে যেমন অনুবাদের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য সংরক্ষণ করেছিলেন তেমন জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় যেমন- রসায়ন শাস্ত্র, জীববিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভূগোল ও সমুদ্র বিদ্যা, গণিত শাস্ত্র, ইতিহাস শাস্ত্র, পদার্থবিদ্যা ও প্রকৌশল স্থাপত্যে, চিকিৎসা বিজ্ঞানে, কৃষি বিজ্ঞানে, দর্শন, আইন শাস্ত্রে প্রভৃতি ক্ষেত্রে মৌলিক অবদান রেখে যান। যা স্পেনের মাধ্যমে মূলত ইউরোপে প্রবেশ করে। যার ফলশ্রুতিতে তৎকালীন ইউরোপের উদীয়মান বুদ্ধিজীবিরা মুসলিম জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা লাভ করে ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত সেমিনারী বা একাডেমী বা কলেজে এগুলো একটি উদ্যোগী ভূমিকা পালন করায় অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, প্যারিস, সারবোন, বোলাঙ, সালের্নো প্রভৃতি বিখ্যাত বিদ্যানিকেতন প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে কেবল মুসলিম বিজ্ঞান দর্শন পঠন-পাঠনই হত না বরং আরবী ভাষা থেকে তা অনুবাদের মাধ্যমে সকলের পড়ার উপযোগী করে তোলা হতো। আর একাদশ শতকে চরাই উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে যখন ল্যাটিন ইউরোপে প্রগতিশীলতার বিকাশ উন্মুখ হয় তখন ইউরোপীয় সেমিনারীতে স্কলাসটিক দর্শনের প্রভাবে ডায়ালেকটিক বাক্যে সর্বস্ব কূটতর্কের প্রভাব বিদ্যমান থাকলেও যেহেতু এতে রহস্যবাদ জড়িত ছিল না, তাই মুসলিম বিজ্ঞান দর্শনের বহুল চর্চার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞান মনস্কতার উন্মেষ ঘটে। যেমন রোজার বেকনের প্রয়োগবাদ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিচার ধারার উপর ইবনে হায়সামসহ অন্যান্য মুসলিম বিজ্ঞানীদের প্রভাব ছিল খুবই লক্ষণীয়। ‘’S.M. Sharif. ed. History. ed. History of Muslim Philosophy, Delhi, 1984, P-1370’’. বস্তুত একাদশ হতে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যে প্রয়োগবাদ, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধারণার অনুপ্রবেশ ঘটে, ফলে ইতালীয় রেনেসাঁস এবং সতের শতকে নয়া বিজ্ঞানের পটভূমি রচিত হয়। ‘’Hitti, Oo. Cit, P-490’’ তাই বলা যায়, মুসলমানদের ইতিহাসের যেসব দিক নিয়ে তাদের গর্ব করার মত কিছু আছে তার মধ্যে অন্যতম তাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাস। শিক্ষার যথেষ্ট সংজ্ঞা যদি Harmonious development of soul body and mind হয় তাহলে মধ্যযুগের মুসলিম শিক্ষা ব্যবস্থাই ছিল প্রকৃত শিক্ষার স্বরূপ। বর্তমান কালের শিক্ষা ব্যবস্থায় মানবতাবিরোধী অনৈতিক কার্যকলাপকেই যখন শিক্ষা হিসেবে চালিয়ে দেয়া হয় সেদিক দিয়ে মধ্যযুগের মুসলিম শিক্ষা ব্যবস্থা আধুনিক শিক্ষার মান থেকেও অনেকাংশে বেশী গ্রহণযোগ্য ছিল এবং এ শিক্ষাই যুগ যুগ ধরে প্রতিনিধিত্ব করে বিশ্বসভ্যতায় বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
লেখক : শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ