ঢাকা, রোববার 13 November 2016 ২৯ কার্তিক ১৪২৩, ১২ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রামপাল নিয়ে সরকারি বিজ্ঞাপন ‘বিভ্রান্তিকর ও প্রতারণামূলক’

স্টাফ রিপোর্টার : বিতর্কিত রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে প্রচারিত সরকারি বিজ্ঞাপনকে ‘বিভ্রান্তিকর ও প্রতারণামূলক’ বলে মন্তব্য করেছে সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি। বিশ্ব ঐতিহ্য রক্ষাকল্পে গঠিত এই নাগরিক সংগঠনটি বলছে, মিথ্যা তথ্যের ওপর এই বিজ্ঞাপন নির্মিত হয়েছে। এটা অবশ্যই বন্ধ করা উচিত।
গতকাল শনিবার সকালে কমিটির উদ্যোগে জাতীয় প্রেস ক্লাব হলরুমে “কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সর্বশেষ অবস্থা ও সরকারি অবস্থান বিষয়ে সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির মতামত ও দাবী” শীর্ষক এক সাংবাদিক সম্মেলনে মূল বক্তব্য রাখেন সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির আহবায়ক এডভোকেট সুলতানা কামাল। এতে সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যবৃন্দ নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম, অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, বাম রাজনীতিক রুহিন হোসেন প্রিন্স, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্মসম্পাদক শরীফ জামিল ও সুন্দরবন রক্ষা আন্দোলনের আহ্বায়ক ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনা করেন বাপা সাধারণ সম্পাদক ও সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব ডাঃ মোঃ আব্দুল মতিন।  
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, সার্বিক বিচারে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এই কয়লাভিত্তিক প্রকল্প। এটি কোনো যুক্তিতেই সারা বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিসরে কোনো জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন সচেতন মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় এবং কোনো দিনই তা গ্রহণযোগ্য হবে না। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিতর্কিত রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে প্রচারিত সরকারি বিজ্ঞাপনক ‘বিভ্রান্তিকর ও প্রতারণামূলক’। মিথ্যা তথ্যের ওপর এই বিজ্ঞাপন নির্মিত হয়েছে। এটা অবশ্যই বন্ধ করা উচিত।
সুন্দরবনকে বাংলাদেশের ‘প্রাকৃতিক বর্ম’ উল্লেখ করে সুলতানা কামাল বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এই বন তার বুক পেতে দিয়ে আমাদের লাখ লাখ মানুষ, প্রাণ ও সম্পদকে রক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেছে। অথচ সেই সুন্দরবনকে সরকারি উদ্যোগে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়ার মতো আত্মঘাতী ও স্ববিরোধী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আসলে সুন্দরবন প্রশ্নে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান আর জলবায়ু প্রশ্নে তার অবস্থান ও আকাক্সক্ষা পরস্পরবিরোধী। কারণ, জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করতে হলে সুন্দরবনকে অক্ষত রাখা আমাদের প্রধান ও পরম দায়িত্ব।
লিখিত বক্তব্যে আরো বলা হয়, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের গণ-বিরোধিতার অন্যতম মূল বিষয় হচ্ছে এর সম্ভাব্য মারাত্মক পরিবেশ দূষণ। ইতোমধ্যে ইউনেস্কোর প্রতিবেদনেও তা উল্লেখ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীসহ একাধিক মন্ত্রী ও সরকার দলীয় নেতৃবৃন্দ রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎপ্রকল্প নিয়ে আন্দোলনকারী নাগরিক সমাজ সম্পর্কে ভিত্তিহীন ও ধৃষ্টতাপূর্ণ মন্তব্য করছেন। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ভারত ফ্রেন্ডশীপ পাওয়ার কোম্পানীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এতোদিন পর বুঝলেন আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি বলে পৃথিবীতে কোনো প্রযুক্তি নেই। অথচ রামপাল ও সুন্দরবন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়েও ‘আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল’ ও কতিপয় অন্যান্য ভুল তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বাংলাদেশের জনগণকে কটাক্ষ করে অগ্রহণযোগ্য ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে জনগণকে ভ্রান্ত ধারণা দিয়েছেন -যা প্রকারান্তরে প্রতারণার শামিল, গোঁজামিলে ভরা এবং অনৈতিক।
সুলতানা কামাল চ্যালেঞ্জ করে বলেন, সুন্দরবন বিশেষ করে রামপাল নিয়ে আমরা কখনোই কোনো অযৌক্তিক বক্তব্য রাখিনি। যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ ও বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমেই আমরা রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরোধিতা করছি এবং সুন্দরবনের সুরক্ষাকল্পে সকল অগ্রহণযোগ্য ও ক্ষতিকর কর্মকা-ের বিরোধিতা করছি। জাতীয় কমিটির পক্ষে জনস্বার্থ ও সুন্দরবন বিরোধী সকল সরকারি অপপ্রচার বন্ধ করে, জনদাবি মেনে নিয়ে অমূল্য জাতীয় সম্পদ ও বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনকে বাঁচানোর স্বার্থে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পটি অবিলম্বে বাতিল করার আবারও জোর দাবি জানান তিনি
খুশী কবির বলেন, দেশ ও জনগণের স্বার্থ এবং জনগণের জীবন-জীবিকা রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের চেয়ে অনেক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন কার স্বার্থে এটিকে বিবেচনায় নিতে হবে। যদি জনগণের স্বার্থেই উন্নয়ন হয়, তবে রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র অবশ্যই সরিয়ে নিতে হবে। তিনি বলেন, এই সুন্দরবন রক্ষার জন্য আমরা আশির দশক থেকে জনসচেতনতা চালিয়ে আসছি।
অধ্যাপক ড.বদরুল ইমাম বলেন, রামপাল প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেছেন, বিশ্বের কোথায়ও আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি বলে কিছু নেই। কিন্তু এ কথাটি সঠিক নয়, এটি বলার মাধ্যমে মুলতঃ তার অজ্ঞতাই প্রকাশ পেয়েছে। কারণ জাপান, চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কয়েকশ’ আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি চালু রয়েছে বা হতে যাচ্ছে। তবে রামপাল প্রকল্পের জন্য আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিও যে গ্রহণযোগ্য নয়, তা আমরা শুরু থেকেই বলে এসেছি। কারণ এর মাধ্যমে ১০-১২% গ্যাস উৎপাদন কম হবে, ফলে সুন্দরবনের কোনো উপকারই হবে না, বরং ক্রমান্বয়ে বন ধ্বংস হবে।
অধ্যাপক এম এম আকাশ সরকারের উদ্দেশ্যে বলেন, বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর জন্য পরিবেশের ক্ষতি বা সুন্দরবন ধ্বংস করতে হবে- এ ধারণাটিই সঠিক নয়। বরং এসব কথা যারা বলছেন বা বুঝাচ্ছেন তারা কোনোক্রমেই আমাদের সরকার বা দেশের বন্ধু হতে পারেন না। আজ সারা দেশের জনমানুষের উদ্বেগ ও ইউনেস্কোর অবস্থান প্রমাণ করেছে, আমাদের সরকার সুন্দরবন প্রশ্নে বিভ্রান্তিতে রয়েছে, সরকারের অবস্থান পরিস্কারভাবেই স্ববিরোধী। সরকারের এ বিষয়ে বোধোদয় হবে ও তারা রামপাল প্রকল্প বাতিল করবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।  
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জাতিসংঘ ও তার আন্তরাষ্ট্রীয় সংগঠন যে তথ্য দেয় তা অবশ্যই বিজ্ঞানভিত্তিক বিবেচনায় নিশ্চিত হয়েই দেয়া হয়। তারা রামপাল প্রকল্পের যে বিরোধিতা করছে, তা কারো পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। যথেষ্ট বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের মাধ্যমেই তাদের মতামত ও সিদ্ধান্ত তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, উন্নয়ন ও পরিবেশ কখনোই পরস্পর বিরোধী নয়,  প্রয়োজনে কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের চিন্তা পরিহার করে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। এতে পরিবেশও রক্ষা পাবে, বিদ্যুৎ চাহিদাও মেটানো যাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ