ঢাকা, সোমবার 14 November 2016 ৩০ কার্তিক ১৪২৩, ১৩ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিদেশী চ্যানেলের অবৈধ ডাউনলিংক ও বিজ্ঞাপন বন্ধের দাবি মিডিয়া ইউনিটের

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশের জন্য আলাদা করে বিদেশী চ্যানেলের ডাউনলিংক বন্ধ, বিদেশী চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দেয়ায় নিষেধাজ্ঞা ও দেশীয় চ্যানেলে বাংলায় ডাবিং করা বিদেশী সিরিয়ালের প্রচার বন্ধের দাবি জানিয়েছে মিডিয়া ইউনিটি। গতকাল রোববার রাজধানীর ঢাকা ক্লাব মিলনায়তনে সংগঠনটির উদ্যোগে আয়োজিত সমাবেশ থেকে এ দাবি জানানো হয়। বেসরকারি টেলিভিশন মালিক, টেলিভিশনের শিল্পী-কলাকুশলী, পরিচালক, নাট্যকার, সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত ব্যক্তিদের ১৬টি সংগঠন নিয়ে মিডিয়া ইউনিটি গঠিত হয়েছে। এর নেতৃত্বে বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশনের মালিকরা রয়েছেন।

সমাবেশে মিডিয়া ইউনিটির আহ্বায়ক ও একাত্তর টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু, সদস্যসচিব ও দেশ টিভির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ হাসান, আরটিভির চেয়ারম্যান মোরশেদ আলম, বাংলাভিশনের চেয়ারম্যান আবদুল হক, এশিয়ান টেলিভিশনের চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও একুশে টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী মনজুরুল আহসান বুলবুল, সময় টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ জোবায়ের, গাজী টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমান আশরাফ ফয়েজ, বিজয় টিভর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহিবুল হাসান চৌধুরী, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হানিফ সংকেত, চ্যানেল ২৪-এর প্রধান নির্বাহী নঈম নিজাম, পরিচালকদের সংগঠন ডিরেক্টর গিল্টের সভাপতি গাজী রাকায়েত, অভিনয় শিল্পী সংঘের সভাপতি নাসিম, অভিনেতা জাহিদ হাসান, শহিদুল আলম সাচ্চু, শহীদুজ্জামান সেলিম প্রমুখ বক্তব্য দেন।

গতকালের সমাবেশ থেকে ৬ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। অপর দাবিগুলো হলো বিদেশী কোনো চ্যানেল বাংলাদেশে ডাউনলিংক করতে পাঁচ কোটি টাকা এককালীন ফি ও প্রতিবছর আড়াই কোটি টাকা নবায়ন ফি দেয়ার বিধান করা, ইতিমধ্যে বাংলাদেশে প্রচারিত সমস্ত অবৈধ ডাউনলিংক চ্যানেল বন্ধ করা, কোনো চ্যানেল ডাউনলিংক করা হলে সেই দেশের মূল চ্যানেল করতে হবে, বাংলাদেশের জন্য আলাদা করে করা যাবে না এবং বিদেশী চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচারের নামে অর্থ পাচার বন্ধ করতে হবে।

সমাবেশে দেয়া লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ভারতীয় চ্যানেলের নামে কিছু বিদেশী চ্যানেল অনুমোদনহীন বাংলাদেশে ডাউনলিংক হচ্ছে। এগুলো ভারতে প্রদর্শিত হয় না। সেখানে এর অনুমোদনও নেই। অথচ বাংলাদেশে দেখানো হচ্ছে। এই চ্যানেলগুলোর উদ্দেশে বাংলাদেশের বিজ্ঞাপনের অর্থ গ্রাস করা। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে বিজ্ঞাপন বিল বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। গত এক বছরে বহু কোটি টাকা এভাবে দেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে।

সমাবেশে বলা হয়, বৈধ পথে যে পরিমাণ টাকা বাইরে যাচ্ছে, তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি অর্থ পাচার হচ্ছে হুন্ডির মাধ্যমে। অবৈধ বিদেশী চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দেয়ায় দেশীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর বিজ্ঞাপনের বাজার সংকুচিত হচ্ছে। তা ছাড়া বিজ্ঞাপনদাতা দেশীয় চ্যানেলে কম মূল্যে বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন। এতে টেলিভিশনে বেশি বিজ্ঞাপন প্রচারের কারণে দর্শকরা বিরক্ত হচ্ছেন।

সমাবেশ থেকে দাবি মানার জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য ৩০ নবেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়া হয়। তা না হলে ওই দিন ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ করা হবে বলে জানানো হয়। বক্তাদের মধ্যে এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজের চেয়ারম্যান এবং মিডিয়া ইউনিটির উপদেষ্টা মাহফুজুর রহমান এই অবৈধ ডাউনলিংক ও বিজ্ঞাপন ব্যবসার জন্য একটিমাত্র বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের মালিককে দায়ী করেন। তিনি এ পথ থেকে ওই মালিককে সরে আসার আহ্বান জানান। তিনি শিল্পী-কলাকুশলীদের তাঁদের এই দাবির প্রতি সমর্থন দেয়া ও আন্দোলনে সঙ্গে থাকার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, সঙ্গে না থাকলে তাঁদের ওই একটি চ্যানেল ছাড়া বাকি ২৬টি চ্যানেলে তাঁদের কোনো অনুষ্ঠান প্রচার হবে না।

নিজের আলোচনায় হানিফ সংকেত একটি জনপ্রিয় চ্যানেলকে ইঙ্গিত দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দেশীয় সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে বেশ কিছু জালিয়াতি চক্র সক্রিয় রয়েছে। সেই চক্রের সঙ্গে দেশের একটি চ্যানেল জড়িত। আমার খুব কষ্ট হয় যখন আমাদের শিল্পীদের সেখানে গিয়ে আবেগে গদগদ হয়ে বলতে শুনি, অমুক চ্যানেল আমাদের পরিবার। আমরা এখানে সবাই পরিবারের সদস্য। চ্যানেলটি এই মেলা করে, ওই মেলা করে। চ্যানেল ব্যবসা করতে এসে তারা ইভেন্ট ব্যবসা খুলে বসেছে। কিন্তু তারা শিল্পীদের স্বার্থে বিদেশী সিরিয়াল বন্ধ রাখতে পারে না, সংস্কৃতি রক্ষায় নিবেদিত হতে পারে না।

এরপর সংহতি প্রকাশ করতে এসে অভিনেতা শহীদুল আলম সাচ্চু বলেন, আমরা এখানে সমবেত হয়েছি সংস্কৃতি রক্ষার দাবিতে। অযৌক্তিকভাবে অন্যের সমালোচনা করতে নয়। কোনো আন্দোলন করার সময় আবেগ এবং ব্যক্তিগত আক্রোশ নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। চেহারাটাকে সুন্দর রাখা উচিত। সবাই মিলে আজকের যে দাবি সেই দাবি অর্জন করতে আমরা সমর্থ হবো সেই প্রত্যাশা রইলো।

ধারবাহিকতায় বক্তব্য দিতে এসে এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান ড. মাহফুজুর রহমান বলেন, ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবো না আপনাদের। এটা সত্যি আনন্দের বিষয় যে মিডিয়া ইউনিটির ডাকে আপনারা সবাই এসেছেন। এখানে আমাদের প্রিয় মানুষ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান রয়েছেন। তিনি জ্ঞানী এবং অভিজ্ঞ মানুষ। তার সাহচর্য আমাদের আরো সাহসী করে তুলেছে। আজকে যেসব সমস্যা নিয়ে আমরা এখানে সমবেত হয়েছি প্রয়োজনে তার সমাধানে আমরা প্রধানমন্ত্রীর দ্বার পর্যন্ত যাবো।

তিনি চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগরের ভূমিকাকে সংস্কৃতির রাজাকারের মতো দাবি করে বলেন, ‘সংস্কৃতি ধ্বংসের জালিয়াতি চক্রের কথা হানিফ সংকেত ইঙ্গিত করে বলেছেন। কিন্তু তিনি লজ্জায় নাম বলতে পারেননি। আমি সেই নামটা বলে দিতে চাই। তিনি আমার খুব কাছের মানুষ। যখন থেকে আমি চ্যানেল নিয়ে এসেছি তার এক সপ্তাহ পর থেকেই তার সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক। তিনি হলেন সাগর ভাই। চ্যানেল আইয়ের জনপ্রিয় মানুষ। তিনি বেশ কিছু বিষয়ে ভুল পথে আছেন। তার ভূমিকা অনেকটা সংস্কৃতির রাজাকারের মতোই। তাকে বলবো সময় থাকতে এই আন্দোলনে যোগ দিন। আর যেসব শিল্পীরা ওই চ্যানেলে যান, কাজ করছেন তাদের আমরা চিহ্নিত করে রেখেছি।’

ডিরেক্টরস গিল্ডের সভাপতি গাজী রাকায়েত বলেন, দেশে দেশীয় বিনোদন বা সংস্কৃতি এখন কোমায় চলে গেছে বিদেশী সিরিয়ালের চাপে। দর্শকেদর চাহিদার কথা বলে বস্তাপঁচা সিরিয়ালগুলো চালাচ্ছে চ্যানেল। এতে করে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দর্শক যা খুশি তাই বিনোদন হিসেবে চাইতে পারে। কিন্তু চ্যানেলের অনেক কিছু বিবেচনা করা উচিত। দেশপ্রেম থাকা উচিত। দেশের শিল্পীদের বেকার করে দিয়ে তারা কোন ইন্ডাস্ট্রি বাঁচাতে চাইছেন আমরা বুঝি না। তিনি বলেন, এক সময় আমরা ধারাবাহিক নাটকের প্রতি পর্বে ১ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। আর সেটি এখন ৬০ হাজারে এসে ঠেকেছে। এটা খুবই বেদনাদায়ক।

অভিনেতা জাহিদ হাসান বলেন, আজকের এই পরিস্থিতি কারো একার দায় নয়। আমরা প্রত্যেকটি বিভাগকেই নষ্ট করেছি ধীরে ধীরে। লজ্জার সঙ্গে বলতে হয়, এতোদিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে যখন নাটক নির্মাণ করতে গেলাম নানা রকম অশালীন প্রস্তাব শুনতে হয়েছে। চ্যানেল শিল্পীদের ভূয়া টিআরপি তৈরি করে নির্মাতাদের চাপ দিয়েছেন ওইসব আনকোয়ালিটির শিল্পীদের নিয়ে নাটক বানাতে। নিজেদের ভেতরে তাই সততা তৈরি খুব জরুরি। আর তারকাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করবেন না। এটা পরিতাপের, কোনো নীতি নির্ধারণী মিটিং বা আলোচনায় আমরা ডাক পাই না, কিছু জানিও না। আমাদের ডাকা হয় আন্দোলনে মাঠে থাকার জন্য।’ 

সবশেষে বক্তব্য রাখেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান। তিনি বলেন, ‘এতোক্ষণ আলোচনা শুনে আন্দোলনের বিষয়টিকে আমার খুব একটা সিরিয়াস মনে হয়নি। এতো ছোটখাটো বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বিরক্ত করা ঠিক হবে না। আগে নিজেরা বসে কিছু বিষয় যাচাই বাছাই করি। সেগুলো নিয়ে তথ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ জানাই। আমার মনে হয় একটা ফল আমার পাবো। আর এখানে কোনো বিবাদ নয়, বিভেদ নয়। সবাই মিলেমিশেই টিকে থাকতে হবে। সম্পর্ক সুন্দর করতে হবে, নষ্ট যেন না হয়।’

প্রসঙ্গত, আগামী ৩০ নবেম্বর জাতীয় শহীদ মিনারে মানববন্ধন করবে মিডিয়া ইউনিটি। সেখানে উপস্থিত থাকবেন দেশের চ্যানেল মালিক, নির্মাতা, শিল্পী, কলাকুশলী ও মিডিয়া ইউনিটির নেতা কর্মীরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ