ঢাকা, সোমবার 14 November 2016 ৩০ কার্তিক ১৪২৩, ১৩ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রেস্তোরাঁর বদলে হবে বাসা

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : নজিরবিহীন জঙ্গি হামলায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম হওয়া গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি সাড়ে চার মাস পর প্লট মালিকের হাতে বুঝিয়ে দিয়েছে পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদর রহমান জানান, প্লট মালিক সামিরা আহম্মদ তার সম্পত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে আদালতে আবেদন করেছিলেন। “আদালত অনুমতি দেয়ায় আমরা ওই জমি ও ভবন গতকাল রোববার বিকালে প্লট মালিকের কাছে হস্তান্তর করেছি। ”

গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর প্লটটি ১৯৭৯ সালে ‘আবাসিক ভবন কাম ক্লিনিক গড়ে তোলার জন্য’ ডা. সুরাইয়া জাবিনকে বরাদ্দ দেয়া হয়। গুলশান লেকের পার ১৯৮২ সালে ওই প্লটের একপাশে গড়ে তোলা হয় লেকভিউ ক্লিনিক।

সুরাইয়া জাবিনের মৃত্যুর পর প্লটের মালিক হন তার মেয়ে সামিরা আহম্মদ ও সারা আহম্মদ। সামিরার স্বামী সাদাত মেহেদী তার বন্ধু নাসিমুল আলম পরাগসহ কয়েকজন মিলে ২০১৪ সালের জুনে ওই জমির খালি অংশে গড়ে তোলেন হলি আর্টিজান বেকারি। 

লেকের ধারে খোলামেলা পরিবেশে দ্বিতল ভবনের ওই ক্যাফে দ্রুত বিদেশীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ক্যাফের সঙ্গে সবুজ লনে বিদেশী অনেকে চাদর বিছিয়ে রোদ পোহাতেন, শিশুদের খেলার পর্যাপ্ত জায়গাও ছিল। জনপ্রিয়তা বাড়ায় এক সময় মূল ফটকের ঠিক পাশেই বসানো হয় পিজা কর্নার। চলতি বছরের শুরুতে যোগ হয় আইসক্রিমের স্টল। এই বর্ণনাটা এখন কেবলই ইতিহাস আর বেদনাময় স্মৃতি। 

গত রোজার মধ্যে ১ জুলাই রাতে একদল জঙ্গি হলি আর্টিজানে ঢুকে বিদেশীসহ বেশ কয়েকজনকে জিম্মি করে। ১৭ বিদেশীসহ ২০ জনকে হত্যা করে তারা। পরদিন সকালে কমান্ডো অভিযান চালিয়ে ওই রেস্তোরাঁর নিয়ন্ত্রণ নেয় নিরাপত্তা বাহিনী। ঘটনার পরপরই সেখানে গিয়ে নিহত হন দুজন পুলিশ কর্মকর্তা। এরপর সকালে অভিযান শেষে ছয় জঙ্গির লাশ পাওয়ার কথা জানায় নিরাপত্তা বাহিনী। সাঁজোয়া যান নিয়ে ওই অভিযানে হলি আর্টিজান বেকারি অনেকটাই বিধস্ত হয়। ওই প্লটের দায়িত্ব নেয় পুলিশ। ফটকে তালা দিয়ে বসানো হয় সার্বক্ষণিক প্রহরা। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, তদন্ত ও আলামত সংরক্ষণের প্রয়োজনে সেখানে কাউকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। 

এদিকে কূটনৈতিক পাড়া গুলশানের নিরাপত্তা ভেদ করে ওই হামলার ঘটনার পর আসাসিক প্লট ও ভবনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। 

গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন সে সময় বলেছিলেন, ওই জমিতে অবৈধভাবে রেস্তোরাঁ খোলা হয়েছিল। এ জন্য মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ। 

ইজারার শর্ত ভঙ্গ করায় এরপর রাজউকের পক্ষ থেকে নোটিশ পাঠানো হয়। সেই নোটিশ মালিকের হাতে না পৌঁছানোয়, হলি আর্টিজানের ফটকে ঝুঁলিয়ে দেয়া হয় নোটিশ। এরপর প্লটের মালিক আদালতে গেলে সম্প্রতি বিচারক তার পক্ষেই আদেশ দেন। সেই আদেশের ভিত্তিতে পুলিশ গতকাল রোববার নিয়ন্ত্রণ বুঝিয়ে দেয়। 

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে রাজউক চেয়ারম্যান এম বজলুল করিম চৌধুরী বলেন, “আমরা বিষয়টি জেনেছি। পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে আমরা সেখানে লোক পাঠিয়েছি।”

গতকাল বিকেলে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) কর্তৃপক্ষের কাছে রেস্তোরাঁর দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়ার পর সিটিটিসি-এর অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) আব্দুল মান্নান জানান, গতকাল সকাল থেকেই রেস্তোরাঁর হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়। সার্বিকভাবে বিকেল নাগাদ প্রতিষ্ঠানটির সত্ত্বাধিকারী শাহাদাত হোসেনের কাছে সব কিছু বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। 

ঘটনার পর অবশ্য পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল থেকে পর্যাপ্ত আলামত সংগ্রহের পর তা উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। 

এ হামলার ঘটনা তদন্তে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও সিঙ্গাপুর থেকে প্রযুক্তি সহায়তা নেয়ার কথা বলেছিলো পুলিশ। 

হলি আর্টিজানের মালিকদের একজন শাদাত মেহেদী বলেন, ‘পুলিশ আমাদের কাছে হস্তান্তর করেছে। কিন্তু হলি আর্টিজান এখানে পুনরায় চালু করা হবে না। ’ তিনি বলেন, ‘রেস্টুরেন্টটি বাসা হিসেবে ব্যবহার করা হবে। গুলশানের অন্য জায়গায় জমি নেয়া হয়েছে। সেখানে হলি আর্টিজান নতুন করে চালু করা হবে।’

ঘটনার পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া পাহারায় ছিল হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁ। তদন্তের স্বার্থে রেস্তোরাঁ ও এর পাশের লেকভিউ ক্লিনিকটি পুলিশের নিরাপত্তা বলয়ের ভেতরে ছিলো। রেস্তোরাঁয় সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। তদন্তের প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং পরিদর্শনের জন্য পুলিশের অনুমতি সাপেক্ষে বিদেশী নাগরিকরা সেখানে প্রবেশ করতে পারতেন। আলমত যেন নষ্ট না হয়, সেজন্য এই বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় রাখা হয়েছিল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ