ঢাকা, মঙ্গলবার 15 November 2016 ১ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ১৪ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সংসদীয় গণতন্ত্র সাংসদ সংস্কৃতি আমাদের প্রত্যাশা

আখতার হামিদ খান : সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে ‘সংঘাতের’ জায়গায় ‘সমঝোতার’ ধারণা প্রাধান্য পাচ্ছে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সবকিছুর সমন্বয়-সমঝোতা আর প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির চর্চায় সংসদ সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের গন্তব্য হচ্ছে সংসদ, আবার রাজনীতির সূচনাও সংসদ থেকেই। অর্থাৎ সংসদ কেন্দ্রে থাকছে। সংসদে বিরোধ মীমাংসা হচ্ছে, বিরোধের জন্ম হচ্ছে, আবার সংসদেই তা আলোচনা হচ্ছে এবং সমাধানের দিকে যাচ্ছে। এই যে সংসদকেন্দ্রিক রাজনীতি, সংসদ ভিত্তিক কর্মকাণ্ড তাকেই আমরা সংসদীয় গণতন্ত্র বলতে পারি। এটা একটা সাধারণ আলোচনা এবং সাধারণ চিত্র। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা ব্যতিক্রম। বাংলাদেশে এখনো সংসদকেন্দ্রিক, সংসদ ভিত্তিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি।
সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারণা এখানে পরিষ্কার নয়। সংসদ এখানে ঐকমত্যের প্রতীক হয়ে ওঠেনি। এখানে সংসদীয় গণতন্ত্র নামে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির স্বেচ্ছাচারিতা, অবাধ সমালোচনা, ওয়াক আউট, বিরোধিতার জন্যে বিরোধিতা ইত্যাদি। বাংলাদেশে এখনো সংসদীয় গণতন্ত্রের ঐতিহ্য গড়ে ওঠেনি। সংসদ নীতি নির্ধারণের অথরিটি হতে পারেনি। সংসদ সমগ্র জাতির জন্যে এখনো একটা পরিপূর্ণ আস্থা এবং বিশ্বাসযোগ্য স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়নি। কিন্তু আলাদাভাবে একটি সাংসদ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
সংসদীয় গণতন্ত্রের সঙ্গে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা অবিচ্ছেদ্য। সংসদীয় গণতন্ত্রের কার্যকারিতা নির্ভর করে সংসদ সদস্যদের কর্মকা-ের ওপর। সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে প্রতিনিধিত্ব করেন। রাজনৈতিক দলের নীতি-আদর্শ-অবস্থান অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা তাদের কর্মকা- পরিচালনা করেন। এজন্য রাজনৈতিক কারণে সংসদে সংসদ সদস্যদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান, ভূমিকা, বিরোধিতা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু সংসদের অভ্যন্তরীণ এ সমস্ত বিরোধিতা ছাপিয়ে বাংলাদেশে একটা সাধারণ “সংসদ সংস্কৃতি”- গড়ে উঠেছে। সংসদে সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে প্রতিনিধিত্ব করলেও সংসদের বাইরে জীবন-যাপনে, আচার-আচরণে, কথা-বার্তায়, পোশাকে-আশাকে, চলাফেলায়, সংসদ সদস্যদের একটা সাধারণ সাযুজ্যপূর্ণ অবস্থান লক্ষ্য করা যায় যাকে সংসদ সংস্কৃতি বলছি।
সংসদ সদস্যদের পাসপোর্ট লাল। সংসদ সদস্যরা কমবেশি সবাই ব্যবসা-বাণিজ্য করেন। সংসদ সদস্যরা অভিজাত এলাকায় বসবাস করেন, পাজেরো হাঁকিয়ে চলেন। সংসদ সদস্যরা প্রায়ই বিদেশ যান। বিভিন্ন পার্টিতে অনুষ্ঠানে একত্রে যোগ দেন। বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন এবং সংসদ সদস্য পরিচয়ে বিশেষ সুযোগ-সুবিধাও ভোগ করতে চান সবসময়। এই সুযোগ-সুবিধা-ভাতার প্রশ্নে সংসদেও সংসদ সদস্যরা দ্রুত একমত হয়ে যান। এ কারণেই সংসদ সদস্যরা আলাদা গোষ্ঠী বা গ্রুপ হিসেবে গড়ে উঠছেন। অর্থাৎ রাজনীতিবিদ নই, আমরা নই, ডাক্তার নই, ইঞ্জিনিয়ার নই-আমরা হচ্ছি সংসদ সদস্য। এটা যেন একটা ভিন্ন পেশা ভিন্ন পরিচয়। এভাবে আলাদা একটা সংসদ সংস্কৃতি গড়ে উঠছে যা সংসদীয় রাজনীতির জন্যে অবশ্যই হুমকি স্বরূপ।
সাংসদ যখন স্ট্যাটাস
অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা বিশেষ করে মানসিক দারিদ্র্যের কারণে আমাদের দেশে অনেক কিছুই হচ্ছে স্ট্যাটাস। আমাদের দেশে ফ্রিজ, রঙিন টিভি, ভিসিআর হচ্ছে মধ্যবিত্তের স্ট্যাটাস। উচ্চবিত্তের স্ট্যাটাস হচ্ছে পাজেরো, অভিজাত এলাকায় বাড়ি, মোবাইল ফোন। স্ট্যাটাস বলেই কিচেনের জায়গায় ফ্রিজ শোভা পায় ড্রইং রুমে। ক্রোকারিজ সামগ্রী শোভা পায় শো-কেসে। মধ্যপ্রাচ্যে পরিবারের একজন সদস্য থাকলে তার পাঠানো কিংবা নিয়ে আসা আরবী লেখা লাক্স সাবানটিরও জায়গা হয় শোকেসের অন্যান্য শো-পিসের সাথে। সন্তান ইংলিশ মিডিয়ামে পড়লে কিংবা বিদেশে পড়াশুনা করতে গেলে তাও স্ট্যাটাস। জীবন-যাপনের অতি সাধারণ উপাদান উপকরণ যখন স্ট্যাটাস হয়ে যায় তখন সংসদ সদস্য বা সাংসদ হওয়াও একটা বিরাট স্ট্যাটাস। এই স্ট্যাটাস থেকেই আলাদাভাবে সাংসদ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এই স্ট্যাটাস সংসদ সদস্যদের জন্যে যেমন তেমনি তাদের সমাজ, আত্মীয়-স্বজনের জন্যেও। সেমিনার থেকে আরম্ভ করে জন্মদিনের অনুষ্ঠান পর্যন্ত একজন সাংসদ ছাড়া অর্থহীন হয়ে পড়ে। অনুষ্ঠানের স্ট্যাটাস্ও নির্ভর করে সাংসদদের উপস্থিতি-অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে।
সাংসদ কি আলাদা কিছু? সাংসদ কি শো-পিসের মতো এক ধরনের উপাদান-উপকরণ? কেন এ অবস্থান তৈরি হয়েছে বা হচ্ছে তা নিয়ে কিছুটা আলোচনা করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং সাংসদ
প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশে কোন রাজনৈতিক দলই এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠেনি। দল হচ্ছে রাজনীতি করবার সস্তা মাধ্যম, দল হচ্ছে সুযোগ-সুবিধা আদায়ের, ভাগ্য বদলের একটা সাময়িক সিঁড়ি মাত্র। এ কারণে রাজনৈতিক দলের অফিসের চাইতে যেকোন একজন নেতার ড্রইং রুম অনেক গোছানো-সাজানো-বিশ্বাসযোগ্য। সংসদ সদস্যদের সাথে রাজনৈতিক দলের স্থায়ী কোন সম্পর্ক গড়ে উঠছে না। যে কেউ যখন তখন দল বদল করছেন, দলে যোগ দিচ্ছেন। সংসদ সদস্যদের স্বচ্ছ রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা নেই, রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে কেউ সাংসদ হচ্ছেন না, বরং সংসদ সদস্য হবার জন্যে রাজনীতি করছেন, দলে যোগ দিচ্ছেন। রাজনীতিবিদরা যেমন রাজনীতি নিযুক্ত, সংসদ সদস্যরাও তাই। সাংসদ হবার জন্য যতটুকু ‘রাজনীতি’ করা প্রয়োজন তারা তাই করছেন। এ কারণে ত্যাগী নেতা-কর্মী, যারা দীর্ঘদিন রাজনীতি করছেন, রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখছেন তাদের মূল্যায়ন নেই। মনে হচ্ছে সংসদ, সংসদ নির্বাচন, সাংসদ ইত্যাদি বিষয়গুলো আলাদা, এগুলোর সাথে ত্যাগের, রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার, রাজনৈতিক ব্যক্তির যেন কোন সম্পর্ক নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ