ঢাকা, মঙ্গলবার 15 November 2016 ১ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ১৪ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মুসলিম স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন হবে

॥ ২য় পর্ব ॥
প্রতিটি পরিবারকে সুখ-শান্তির সোনালী নীড়ে পরিণত করার সুমহান লক্ষ্য অর্জন করার জন্যে যেসব দিক-নির্দেশনা আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন এবং তাঁর প্রিয় রাসূল দিয়েছেন, সেগুলোর প্রতি যথার্থ মনোযোগী হওয়া একান্ত জরুরী। পরিবারের সূচনা হয় বিয়ের মধ্য দিয়ে। বিয়ের মাধ্যমেই নর এবং নারীর দু’টি জীবন একটি মাত্র স্রোতে প্রবাহিত। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, তেলে-জলে কখনো মেশে না। অর্থাৎ মিলন ঘটে না। তাই দেখা যায় বিপর্যয়। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও যদি তেল আর জলের মতো হয়, তাহলে পারিবারিক বিপর্যয় দেখা দেবে-এটাই স্বাভাবিক। ফলে প্রশ্ন দাঁড়ায় নর-নারী বাছাই কীভাবে করতে হবে? অধিকার বা কর্তব্য সম্পর্কে কথা বলার আগে আমরা বরং এ প্রশ্নটির সমাধান করার চেষ্টা করি।
বিয়ের ক্ষেত্রে কনের চারটি গুনের কথা হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো- ঐশ্বর্য, আভিজাত্য, সৌন্দর্য ও দ্বীনদারিত্ব। ইমাম রেজা (আ:) বলেছেন, একজন পুরুষের জন্যে সবচেয়ে বড়ো সম্পদ হলো ঈমানদার নারী পাওয়া, যে নারী সেই পুরুষটিকে দেখামাত্রই সুখী হয়ে উঠবে এবং তার অবর্তমানে তার সম্পদ ও সম্মান রক্ষা করবে। নারীর যে চারটি গুনের কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে দ্বীনদারিত্বই হলো প্রধান বিষয়। কারণ দ্বীনদার রমণীর কাছে অন্য তিনটি গুণের মূল্য অপ্রধান। কেননা দ্বীনদার নারী ঐশ্বর্য, আভিজাত্য কিংবা সৌন্দর্যের বড়াই করে না। ধন-সম্পদ এবং বংশগত সাম্য না থাকলে খুবই সমস্যা দেখা দেয়। স্বামী বেশী ধনী হলে স্ত্রীকে ছোটলোক বলে খোঁটা দেয়ার আশঙ্কা থাকে। পক্ষান্তরে স্ত্রীর বাবা-মা তুলনামূলকভাবে ধনী হলে স্বামীকে ছোটলোক বা বিভিন্নভাবে খোটা দেয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে জীবন-যাপন প্রণালীতে তারতম্যের সম্ভাবনা থাকে। আর এসব থেকেই পারিবারিক সমস্যা সাধারণত দেখা দেয়। আরেকটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তাহলো এই চারটি বিষয়ে সমতা থাকলেও বর-কনের পারস্পরিক পছন্দের ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে; কোনভাবেই জোর-জবরদস্তি করা যাবে না। জোর করে বিয়ে করা বা দেয়া হলে পরিণতি কখনোই ইতিবাচক হয় না। এই মৌলিক বিষয়গুলো মনে রেখে বিয়ে করার পর স্বামী-স্ত্রীর যে দাম্পত্য জীবন গড়ে ওঠে, সেক্ষেত্রে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর এবং স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কর্তব্যগুলো আন্তরিকভাবে পালন করা সুখ-শান্তির অনিবার্য শর্ত। আমরা প্রথমেই স্ত্রীর প্রতি স্বামীর কর্তব্যের দিকগুলো ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরার চেষ্টা করছি ।
একটি পরিবারের স্তম্ভ হলো দু’টি। নারী-পুরুষ তথা স্বামী ও স্ত্রী। এ দু’জনের মধ্যে যে কোন একজনকে পরিবারের অভিভাবকত্ব নিতে হয়। অভিভাবক শূন্য পরিবার বিশৃঙ্খল। পরিবার সংগঠনটির সাথে ঘরে-বাইরের বহু বিষয়ের সম্পর্ক থাকে। তাছাড়া নারীর তুলনায় পুরুষ যেহেতু কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রাকৃতিকভাবেই শক্তিমান, তাই আল্লাহ রাববুল আলামীন পুরুষকেই স্ত্রী তথা পরিবারের অভিভাবক হিসাবে ঘোষণা করেছেন। বলেছেন, ‘পুরুষরা হলো স্ত্রীদের অভিভাবক এবং ভরণপোষণকারী।’ অন্যদিকে রাসূলে খোদা (সাঃ) বলেছেন, ‘পুরুষ হলো পরিবারের প্রধান, আর যারা প্রধান তাদের কর্তব্য হলো নিজ নিজ অধীনস্থদের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া।’
তো কোরআন এবং হাদীস অনুযায়ী পরিবারের অভিভাবকত্ব যেহেতু পুরুষ তথা স্বামীর ওপর ন্যস্ত হয়েছে, তাই স্বামী অর্থাৎ পরিবারের অভিভাবকের দায়িত্ব এবং কর্তব্যও অনেক বেশী। পুরুষ কর্তাটিকে তাই হতে হয় পরিবারের প্রধান শৃঙ্খলা বিধায়ক। যে পরিবারে এর ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়, সেখানেই বিপর্যয় নেমে আসে। তবে এখানে যে বিষয়টি মনে রাখতে হবে তাহলো পরিবারের কর্তা বলে সে যেন অন্যান্যদেরকে তার প্রজা ভেবে না বসে বরং পারস্পরিক পরামর্শ, আন্তরিকতা ও দুরদর্শিতার সাথে শ্রদ্ধা-সম্মান ও স্নেহের ভিত্তিতে একটি সুন্দর, সুশৃঙ্খল পরিবেশ গড়ে তোলাই হবে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য। স্ত্রী যেহেতু পরিবার সংগঠনে স্বামীর প্রধান সহযোগী এবং পরিবারের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বিধানের প্রধান ব্যক্তি, সেজন্যে স্ত্রীর ওপর স্বামীর যথাযথ দায়িত্ব পালনই হলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একথা সর্বজনবিদিত সত্য যে, দীর্ঘ পথ চলতে গেলে মাঝখানে ছোট-খাটো সমস্যা অর্থাৎ হোঁচট খাওয়ার একটা আশঙ্কা থেকে যেতেই পারে। আর যেখানে ব্যক্তি এবং ব্যক্তিত্বের সহাবস্থান ঘটে এবং তা যদি স্বামী-স্ত্রীর মতো দু’টি ব্যক্তিত্বের দীর্ঘ সংসার জীবনের পথ পাড়ি দেয়ার মতো ঘটনা হয়, তাহলে ছোট-খাটো যে কোন ধরণের সমস্যা দেখা দেয়াটা অসম্ভব কিছু নয়। আর সমস্যা দেখা দিলে দোষ কার তা না খুঁজে বরং কীভাবে তার সমাধান করা যায়, তারই প্রচেষ্টা চালানো উচিত। কারণ মানুষের প্রকৃতিগত মানবীয় দুর্বলতার কারণেই দোষ-ত্রুটি হয়ে থাকে। ফলে দোষ-ত্রুটি খুঁজতে গেলে অযথা বিড়ম্বনাই বাড়বে। সেক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। সমস্যা সমাধানের পর দোষ যদি স্ত্রীরও হয়ে থাকে, তবু তাকে তিরস্কৃত করা যাবে না। কারণ মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা:) বলেছেন, ‘কোন ঈমানদার পুরুষ যেন কোন ঈমানদার নারীকে ঘৃণা না করে।’ স্ত্রীরতো দোষ থাকতেই পারে। তাই বলে কি তার কোন গুণ নেই? যদি গুণ থেকেই থাকে, সেক্ষেত্রে গুণগুলোকে সামান্য তুলে ধরে দোষকে চেপে যাওয়াটাই হবে অভিভাবকসুলভ আচরণ। আল্লাহ রাববুল আলামীন পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘তোমরা স্ত্রীদের সাথে ভালো আচরণ কর। তোমরা যদি তাদের অপছন্দ কর, তাহলে অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ্ তাদের মধ্যে অনেক কিছুই ভালো ও কল্যাণ জমা করে রেখেছেন।’ স্ত্রীদের ব্যাপারে আল্লাহ্র নির্দেশিত আচরণবিধি অনুযায়ী অবশ্যই সহিষ্ণুতার পরিচয় দিতে হবে। মনে রাখতে হবে মহানুভবতার মধ্যে কল্যাণ নিহিত রয়েছে, আর অসহিষ্ণুতার মধ্যে রয়েছে সমূহ বিপর্যয়।
স্মামীকে হতে হবে প্রেমিক। প্রেমের মাধ্যমে, ভালোবাসার মাধ্যমে স্ত্রীর সাথে নীবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। প্রত্যেক স্ত্রীই চায় তার স্বামী তাকে একান্তভাবে ভালোবাসুক। কিন্তু ভালোবাসার জন্যে স্ত্রীরা সাধারণত মুখ খোলে না। সেজন্যে স্বামীর ওপর একটা গুরু দায়িত্ব অর্পিত হয় স্ত্রীকে আবিস্কার করার। প্রতিটি মানুষেরই ব্যক্তিগত ভালো লাগা, মন্দ লাগার ব্যাপার থাকে। স্ত্রীর প্রিয় বিষয়গুলোকে অর্থাৎ সে কী পছন্দ করে, কী অপছন্দ করে-সে বিষয়গুলো মনোযোগের সাথে লক্ষ্য করতে হবে। তার চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপারগুলোর প্রতিও একইভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে। এগুলো আবিষ্কার করার পর ন্যায় সঙ্গত চাওয়া-পাওয়া ও অধিকারগুলো পূরণের ব্যাপারে আন্তরিক হতে হবে। স্বামী তার আচার-আচরণ, ভাবভঙ্গি দিয়ে স্ত্রীকে যদি বোঝাতে পারে তাহলে স্বামীর প্রতি স্ত্রীও আকৃষ্ট হবে এবং সেও তার ভালোবাসা উজাড় করে দেবে।
আর স্বামীকে যদি তার স্ত্রী ভালোবাসে তাহলে তার সংসার গোছাতেও আন্তরিক হবে। নারী জাতি স্বভাবতই স্নেহ, আদর, ভালোবাসা প্রত্যাশা করে৷ যতোই সে স্নেহ আর আদর পায়, ততোই সে সুন্দর হয়ে ওঠে। নারী এমন এক আবেগপ্রবণ চরিত্র যে, স্নেহ আর আদর পাওয়ার জন্যে এবং সবার প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠার জন্য সে অনেক কিছু ত্যাগ করতেও দ্বিধা করে না। ছোট বেলা থেকে যে মেয়েটি বাবা-মায়ের আদর-স্নেহ পেয়ে বড়ো হলো, সে মেয়েটি যখন বিয়ে করে স্বামীর কাছে আসে তখন স্বাভাবিকভাবেই সে চায় স্নেহ ভালোবাসার সকল আকাক্সক্ষা তার কাছ থেকেই পূরণ করতে। বাবা-মা, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে এতোদিন যতো ভালোবাসা পেয়েছিল সে, স্ত্রী হয়ে স্বামীর কাছে যাবার পর স্বামীর কাছ থেকেই তা পেতে চায়। ফলে কতোবেশী পরিমাণ ভালোবাসা একজন স্ত্রী তার স্বামীর কাছে প্রত্যাশা করে তা একবার ভেবে দেখুন। আর স্ত্রীর তা প্রাপ্য, কারণ স্ত্রী তার নিকটজনদের ছেড়ে একমাত্র স্বামীর কাছে চূড়ান্ত আস্থা নিয়ে এসেছে৷ তার এই ত্যাগকে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখা খুবই জরুরী। নবী করিম (সা:) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি স্ত্রীকে বলে আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি’ এই কথাটা তার স্ত্রীর মন থেকে কখনোই মুছে যায় না। এই হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, স্ত্রীকে মনে মনে ভালোবাসলে চলবে না, ভালোবাসার কথা মুখেও প্রকাশ করতে হবে এবং ভালোবাসা হতে হবে আন্তরিক ও অকৃত্রিম। স্ত্রীর কাছ থেকে দূরে অবস্থান করলে নিয়মিত খোঁজ-খবর নেয়া উচিত। কাজের ফাঁকে অফিস থেকে ফোন করে কথা বললে স্ত্রীর নিঃসঙ্গতা কাটে।
বিদেশ-বিভূঁইয়ে বাস করলে চিঠিপত্র লেখা যেতে পারে। ফোন করে অভাব-অনুভূতির কথা প্রকাশ করলে দূরত্ব সত্ত্বেও আন্তরিকতা বৃদ্ধি পায়। যেখানেই আপনি বেড়াতে যান না কেন, বৌ-এর জন্য ছোট-খাটো করে হলেও উপহার সামগ্রী কিনে এনে তার হাতে দিলে স্ত্রী বুঝবে যে, স্বামী তাকে ভুলেনি৷ সামান্য উপহার সামগ্রী ভালোবাসার অকৃত্রিম নিদর্শন হয়ে উঠবে। বিনিময়ে স্ত্রীর অমূল্য ভালোবাসায় ধন্য হবে স্বামীর জীবন, পুষ্পিত হয়ে উঠবে সংসার তথা দাম্পত্য জীবন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ