ঢাকা, মঙ্গলবার 15 November 2016 ১ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ১৪ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অনন্য ব্যক্তিত্বে নারী

॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
আল্লাহ বলেন, “আর যদি তারা সন্তুষ্ট চিত্তে মোহরের কিছু অংশ ছেড়ে দেয়, তাহলে তোমরা সানন্দে ভোগ করো।” মোহরানার সর্বোচ্চ পরিমাণ নিধারিত না থাকলেও সর্বনিম্ন নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন- “স্ত্রীদের কাউকে অঢেল সম্পদ দান করে থাকলেও তা ফেরত নিতে পারবে না।” ‘আল-কুরআন, ৪:২০।’ ইমাম শাফিঈর মতে দেনমোহরের পরিমাণ যত কমই হোক বিবাহ জায়েয হবে। ইমাম মালেকের মতে এর নিম্ন পরিমাণ তিন দিরহাম এবং আবু হানাফীর মতে দশ দিহরাম।” ‘মুহাম্মদ, ইমাম, আল-মুয়াত্তা, অনুবাদ: মুহাম্মদ মূসা, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, অধ্যায়: আন-নিকাহ, অনুচ্ছেদ: ফুফু ও তার ভাইঝিকে একত্রে বিবাহ করা নিষেধ, ১৯৮৮, পৃ. ৩০৫।’’ দেনমোহর নির্ধারিত না করে বিবাহ দিলেও নারী স্বামী কর্তৃক দেনমোহর পাবার অধিকার রাখে। সেক্ষেত্রে ‘মোহরে মিসাল’ অর্থাৎ সমপরিমাণ প্রযোজ্য হবে।
ভরণ-পোষণের ক্ষেত্রে অধিকার : ভরণ-পোষণ এর আরবী ‘নাফকাহ’। যার পারিভাষিক অর্থ স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে দেয় খাদ্যদ্রব্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, বাসস্থান ইত্যাদি। এ দায়িত্ব পালনকালে স্বামীকে স্মরণ রাখতে হবে যে, স্ত্রী তার দাসী বা বাদী নয় বরং তার জীবন সংগিনী। স্বামী, স্ত্রীর ভরণ-পোষণ, পোশাক পরিচ্ছদ এবং বাসস্থানের ব্যবস্থা করবে এবং এ সম্পর্কে যাবতীয় ব্যয়ভার স্বামী নির্বাহ করবে। এ মর্মে আল্লাহ্ বলেন- “আর সন্তানবতী নারীরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দু’বছর দুধ খাওয়াবে। যদি দুধ খাওয়ার পূর্ণ মেয়াদ সমাপ্ত করতে চায়। আর সন্তানতের অধিকারী অর্থাৎ পিতার উপর হলো সে নারীর সমস্ত খোর-পোষের দায়িত্ব প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী দান করবে।” ‘আল-কুরআন, ২:২৩৩।’ এ আয়াতের দ্বারা একথা প্রমাণিত হয় যে, শিশুকে স্তন্যদান করা মাতার দায়িত্ব। আর মাতার ভরণ-পোষণ ও জীবনধারণের অন্যান্য যাবতীয় খরচ বহন করা পিতার দায়িত্ব। এছাড়াও পবিত্র কুরআনের সূরা তালাকের ২নং আয়াতে বলা আছে- “তামরা যেখানে যে অবস্থাতেই বসবাস কর, স্ত্রীদেরকেও সেখানেই বসবাস করতে হবে।” এ ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মহানবী সাঃ বলেন- “তুমি যা খাবে স্ত্রীকে তা খাওয়াবে এবং তুমি যা পরবে স্ত্রীকেও তা পরতে দেবে।” ‘আবূ দাউদ, ইমাম, আস-সুনান, অধ্যায়: আন-নিকাহ, অনুচ্ছেদ: ফী হাক্কিল মারআতি আলা জাওজিহা, আল-কুতুবুসসিত্তা, রিয়াদ: দারুস সালাম, ২০০০, হাদীস নং- ২১৪২, পৃ. ১৩৮০।’’ সুতরাং স্বামীর নিকট থেকে ভরণ-পোষণ পাওয়া নারীর অধিকার। “তবে কি পরিমাণ ভরণ-পোষণ দিবে, বিবাহিত অবস্থায়ই হোক অথবা তালাক প্রাপ্তা অবস্থাতেই হোক, এ ব্যাপারে ইসলামী ফিকহবিদগণ একমত হয়েছেন যে, উভয়েই ধনী হলে ধনীর মান, গরীব হলে গরীবের মান হিসেবে প্রাপ্য হবে। আর যদি উভয়েই একজন ধনী, আর অপরজন গরীব হয়, তাহলে মধ্যম শ্রেণির ‘নাফকা’ প্রদেয় হবে। স্ত্রীর ‘নাফকা’ সংক্রান্ত ব্যাপারে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মান মর্যাদা ও সামর্থ্যের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। যদি উভয়ের মান মর্যাদা ও সামর্থের পার্থক্য থাকে তবে মধ্যম শ্রেণির ‘নাফকা’ দেয়া বিধেয়’। ‘রহমান, তানযিলুর, ইসলামী আইনের সংকলন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা: ১৯৮৯, পৃ. ২৭।’’
অর্জিত সম্পদ সংরক্ষণের অধিকার : ইসলাম নারীদেরকে অর্থ উপার্জনে বারন করেনি। বরং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে দেশের, সমাজের উন্নতি করার কথা বলা হয়েছে। এবং অর্জিত সম্পদ সংরক্ষণেরও অধিকার তাদের দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ বলেন- “পুরুষের জন্যও তাদের উপার্জনের নির্দিষ্ট অংশ রয়েছে এবং নারীদের জন্যও তাদের উপার্জনের নির্দিষ্ট অংশ রয়েছে।” ‘আল-কুরআন, ৪:৩২।’ তবে প্রকৃতি ও দৈহিক অবয়ব এবং ক্ষমতায় নারী ও পুরুষের সমান নয়। তাই একই পরিবেশে নারী-পুরুষ অবাধ মেলামেশা করে অর্থ উপার্জনে নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে বিধায় নিজ নিজ ক্ষেত্রে অর্থ উপার্জন করা বাঞ্ছনীয়। “নারীগণ এই ভাবে নিজ নিজ ক্ষেত্রে উপার্জনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং পারিবারিক আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। তবে তারা সম্পূর্ণ সময় বাইরের কাজে ব্যাপৃত থাকলে অনেক সময়ে গৃহের কাজ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সন্তান-সন্ততির সুষ্ঠু লালন-পালনে অসুবিধা দেখা দেয়।” ‘‘খালেক, আব্দুল, নারী ও সমাজ, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০৪, পৃ. ২৯৫।’’ দৈহিক দুর্বলতার কারণে নারী-পুরুষের ন্যায় ভারী ও কঠিন কাজ করতে স্বভাবত অক্ষম। তাই যে কাজ তাদের জন্য সহজ সেটিই যেমন- সেলাই এর কাজ, হস্তশিল্পের কাজই বেশি উপযোগী, এছাড়া মেধাবী নারীরা শিক্ষিকা বা ডাক্তারী পেশায় নিয়োজিত হয়ে অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি সমাজের অশেষ কল্যাণ বয়ে আনতে পারে।
উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির অধিকার : উত্তরাধিকার হলো মালিকানা, যার মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত মাল বা সম্পদ অন্যের অনুকূলে বর্তায়। অনেক ধর্মেই মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদে উত্তরাধিকার হতে নারীদের বঞ্চিত করা হয়েছে। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে পিতার বড় সন্তানই মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তির একমাত্র মালিক হতো। বর্তমানে হিন্দু ধর্মেও নারীরা পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারি হয় না। কিন্তু ইসলাম নিকট আত্মীয়ের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে তাদের সুনির্দিষ্ট অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে। আল্লাহ্ বলেন- “পুরুষের অংশ রয়েছে সেই সম্পদে, যা তাদের মাতা-পিতা এবং ঘনিষ্ট আত্মীয়-স্বজন রেখে গিয়েছে। সেই সম্পদ কম হোক বা বেশি হোক, তাতে তাদের একটি নির্দিষ্ট অংশ রয়েছে।” ‘আল-কুরআন, ৪:৭।’ সম্পদে নারীদেরকে অধিকার প্রদান নারীদের প্রতি ইসলামের বিশেষ অবদান। পবিত্র কুরআনে উত্তরাধিকারের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের নিয়মাবলী সুনির্দিষ্টভাবে ও সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে। কুরআনের যে সকল আয়াতে উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা হয়েছে সেগুলো হলো সূরা-বাকারা আয়াত ১৮০, সূরা-বাকারা আয়াত ২৪০, সূরা- নিসা আয়াত৭-৯, সূরা-নিসা আয়াত ১৯, সূরা-নিসা আয়াত ৩৩ এবং সূরা-মায়েদা আয়াত ১০৬-১০৮। নিকট আত্মীয়দের মধ্যে সম্পদ বণ্টনের কথা কুরআনের তিনটি আয়াতে বিস্তারিত বর্ণিত আছে। আয়াত গুলো হলো, সূরা-নিসা ১১-১২ এবং ১৭৬। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ উত্তরাধিকার বর্ণনা করেন, “আল্লাহ্ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে আদেশ করেন একজন পুুরুষের অংশ দু’জন নারীর অংশের সমান। অতঃপর যদি শুধু নারীই হয় দু’-এর অধিক, তবে তাদের জন্য ঐ মালে ৩ ভাগের ২ ভাগ যা ত্যাগ করে মরে এবং যদি একজনই হয় তবে তার জন্য অর্ধেক। মৃতের পিতা-মাতার মধ্যে থেকে প্রত্যেকের জন্য ত্যাজ্য সম্পত্তির ৬ ভাগের ১ ভাগ, যদি মৃতের পুত্র সন্তান থাকে। যদি পুত্র সন্তান না থাকে পিতা-মাতাই ওয়ারিস হয়, তবে মাতা পাবে ৬ ভাগের ১ ভাগ। অত:পর যদি মৃতের কয়েকজন ভাই থাকে তবে মাতা পাবে ৬ ভাগের ১ ভাগ, ওসিয়তের পর, যা করে গেছে কিংবা ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের পিতা ও পুত্রের মধ্যে কে তোমাদের জন্য অধিক উপকারী তোমরা জান না। এটা আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত অংশ। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ রহস্যবিদ।” ‘আল-কুরআন, ৪:১১।’ (১) কন্যা যা পাবে তার দ্বিগুণ পাবে ছেলে। (২) যদি মৃতের কোন ছেলেমেয়ে থাকে। তবে স্ত্রী পায় আট ভাগের এক ভাগ এবং স্বামী চার ভাগের একভাগ। (৩) যদি মৃতের ছেলেমেয়ে না থাকে, তবে স্ত্রী পায় চারভগের এক ভাগ এবং স্বামী পায় দুইভাগের একভাগ। (৪) যদি মৃতের কোন বংশধর না থাকে, তবে বোন পাবে ভাইয়ের তুলনায় সম্পত্তি অর্ধেক। (৫) উল্লেখ্য, একজন পুরুষ একজন মহিলার চেয়ে দ্বিগুণ সম্পত্তি পায়। ইসলামে অর্থনৈতিক দায়িত্ব পুরুষের কাঁধে অর্পিত, নারীর উপর নয়। মেয়েদের বিয়ের পূর্বে বাবা বা ভাইয়ের উপর দায়িত্ব থাকে। বিয়ের পর তা অর্পিত হয় স্বামী বা ছেলে সন্তানের উপর। ইসলাম পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর জন্য পুরুষের কাঁধে অর্থনৈতিক দায়িত্ব দিয়েছে আর এ কারণেই ইসলাম পুরুষকে সম্পত্তির দ্বিগুণ অংশ দিয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ, এক ব্যক্তি মৃত্যুকালে ছেলেমেয়ের জন্য (এক ছেলে ও এক মেয়ে) ১,৫০,০০০ টাকা রেখে গেল। তখন ছেলে পাবে ১,০০,০০০ টাকা আর মেয়ে পাবে ৫০,০০০ টকা। ছেলে যে, ১,০০,০০০ টকা পেল সেখান থেকে পরিবারর দায়িত্ব স্বরূপ সে পুরোটা বা ধরা যাক, ৮০,০০০ টাকা ব্যয় করলে এবং তার নিজের জন্য ২০,০০০ টাকা থাকে। অপর পক্ষে মেয়েটি কারো জন্য এক পয়সাও খরচ করতে বাধ্য নয় সে তার পুরোটাই সঞ্চয় করতে পারে। আপনি কোনটা পছন্দ করবেন- ১,০০,০০০ টাকা পেয়ে ৮০,০০০ টাকা খরচ করা, নাকি ৫০,০০০ টাকা পেয়ে পুরোটা নিজের জন্য রেখে দেয়া?” ‘নায়েক, ডা: জাকির আব্দুল করিম: ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমদের আপত্তিসমূহের জবাব, অনুবাদ, নাবিলা মাকারেমুল ইসলাম, ঢাকা: বিশ্বপ্রকাশনী, ২০০৮, পৃ. ৫৫, ৫৬ ও ৫৭।’’ কাজেই ইসলামের অন্তনির্হিত উদ্দেশ্য অনুধাবন না করে ইসলামের বিরুদ্ধে  প্রোপাগান্ডা ছড়ানো মোটেও কাম্য নয়।
ভালবাসা লাভের অধিকার : যেহেতু স্বামী-স্ত্রী একে-অপরের পরিচ্ছদ। সুতরাং সে ক্ষেত্রে স্ত্রীর সাথে আমোদ-প্রমোদ, হাসি-ঠাট্ট এবং ভালবাসা দিয়ে স্ত্রীকে প্রফুল্ল রাখা স্বামীর কর্তব্য।  স্ত্রীর সাথে রুক্ষ ব্যবহার করা স্বামীসূলভ কাজ নয়। সেজন্য হাদীসে বলা হয় “তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম।” স্ত্রীর সাথে সদাচার করার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ্ বলেন- “আল্লাহ্ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচারণ এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার আদেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসঙ্গত কাজ ও অবাধ্য হতে বারণ করেন।” ‘আল-কুরআন, ১৬:৯০।’ এছাড়াও আল্লাহ্ সূরা নিসার ১৯ নং আয়াতে বলেন, “তোমরা স্ত্রীদের সাথে উত্তরম ব্যবহার করো” সাথে সাথে স্ত্রীর ভুল ত্রুটিরও ক্ষমা করার জন্য আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ্ বলেন- “তবে তোমরা যদি তাদের ক্ষমা করো তাদের উপর জোর জবরদস্তি না করো এবং তাদের দোষ-ত্রুটি ক্ষমা করে দাও তাহলে জেনে রেখো আল্লাহ্ নিজেই বড় ক্ষমাশীল ও দয়াবান।” ‘আল-কুরআন, ৬৪:১৪।’ স্ত্রীর যদি কখনো ভুলত্রুটি হয়ে যায় তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে রাগান্বিত হয়ে এমন কিছু করা উচিত নয় যা দাম্পত্য জীবনের জন্য ক্ষতিকর। বরং স্ত্রীর অন্যান্য গুণের কথা স্মরণ করে তাকে ক্ষমা করা উচিত।
অর্থনৈতিক অধিকার : নারীরা সমাজ উন্নয়নে সমান অংশীদার। অর্থনৈতিক উন্নতি ছাড়া সামাগ্রিক ভাবে সমাজের উন্নয়ন সম্ভব নয়। পুরুষের যেমন অর্থনৈতিক ক্রিয়াকর্ম পরিচালন করা, অর্থ উপার্জন, ভোগ ও পূর্ণ কর্তৃত্ব পাওয়ার অধিকার থাকে; নারীও তেমনি অর্থনৈতিক ক্রিয়া কর্ম পরিচালনা করা, অর্জিত সম্পত্তির পূর্ণ অধিকার ও ভোগের কর্তৃত্ব পাওয়ার অধিকার রাখে। এ ব্যাপারে ইসরাম কোন বৈষম্য সৃষ্টি করেনি। “পশ্চিমাদের ১৪০০ বছর পূর্বে ইসলাম নারীদের অর্থনৈতিক অধিকার প্রদান করেছে। একজন পূর্ন বয়স্ক নারী বিবাহিত হোক কি অবিবাহিত, কারো সাথে পরামর্শ ব্যতিরেকেই সম্পদের মালিক হতে পারে। বিলি বণ্টন করতে পারে, মালিকানা আদান-প্রদান করতে পারে, হিজাব বা পর্দা মেনে একজন নারী আয় বর্ধক পেশায় নিয়োজিত করতে পারে। মুসলিম সমাজ নারীদের পেশা গ্রহণে উৎসাহিত করে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রচুর মহিলা গাইনোলজিস্ট দরকার, দরকার প্রচুর মহিলা নার্স। সমাজে অর্ধেক নারী বসাবাস করায় প্রচুর মহিলা শিক্ষিকা প্রয়োজন, এছাড়াও নারীরা নিজের ঘরে বসে অর্থনৈতিক ক্রিয়া কর্ম করতে পারেন। যেমন: দর্জি বা সেলাই কাজ করা, এম্ব্রয়ডারী, কুঠির শিল্পের কাজসহ তার সাধ্যানুযায়ী যে কোন বৈধ কাজ করতে পারে। সে মিল কারখানা বা ছোট ফ্যাক্টরী যা, কেবল নারীদের জন্য করা হয়েছে সেখানেও কাজ করতে পারে। এছাড়াও সে এমন স্থানেও কাজ করতে পারেন যেখানে নারীর জন্য পৃথক সেকশন করা আছে। কেননা ইসলামে নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশার বিধি-নিষেধ রয়েছে। একজন নারী ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সে ‘মাহরামের’ সাহায্যে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে। এ ব্যাপারে সর্বোত্তম উদাহরণ হলো আমাদের মাতা বিবি খাদিজা রাঃ। তিনি আরবের মধ্যে একজন সফল ব্যবসায়ী ও ধানাঢ্য মহিলা ছিলেন। তিনি শালিনতা বজায় রেখে লোকের মাধ্যমে বিশেষ করে মহানবী সাঃ এর সাথে বিয়ের পর মহানবী সাঃ এর মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করতেন। ‘নায়েক, ডা. জাকির আব্দুল করিম, ঢাকা: দৈনিক ইত্তেফাক, ২৫ মার্চ, ২০১১, পৃ. ৩১।’
সাক্ষী দানের ক্ষেত্রে নারীর অধিকার : পুরুষ বা মহিলার নামোল্লেখ ব্যতীত সাক্ষীর কথা কমপক্ষে কুরআনের তিনটি সূরায় উল্লেখ আছে: ক) যখন উত্তরাধিকারের ওসিয়ত করা হয়, স্বাক্ষী হিসেবে দুইজন ধর্মপরায়ণ ব্যক্তির প্রয়োজন হয়।” ‘নায়েক, ডা. জাকির আব্দুল করিম, ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমদের আপত্তিসমূহের জবাব, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫১।’ পবিত্র কুরআনে সূরা মায়েদার ১০৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে- “হে মুমিনগণ, তোমাদের মধ্যে যখন কারো মুত্যু উপস্থিত হয়, তখন ওসিয়ত করার সময় তোমাদের মধ্যে থেকে ধর্মপরায়ণ দু’জনকে সাক্ষী রেখো। তোমার সফরে থাকলে এবং সে অবস্থায় তোমাদের মৃত্যু উপস্থিত হলে, তোমরা তোমাদের ছাড়াও দু’ব্যক্তিকে সাক্ষী রেখো।” ‘আল-কুরআন, ৫:১০৬।’ খ) তালাকের ক্ষেত্রেও দু’জন ধর্মপরায়ণ ব্যক্তির সাক্ষ্যের প্রয়োজন হয়। আল্লাহ কুরআন মাজিদে বলেন- “এবং তোমাদের মধ্যে থেকে দু’জন নির্ভরযোগ্য লোককে সাক্ষী রাখবে। তোমরা আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে সাক্ষ্য দেবে।” ‘আল-কুরআন, ৬৫:২।’ গ) সতী সাধ্বী নারীর বিরুদ্ধে অপবাদের জন্য চারজন সাক্ষীর দরকার হয়: “যারা সতী সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর চারজন পুরুষ উপস্থিত করে না, তাদেরকে ৮০টি বেত্রাঘাত করবে এবং কখনো তাদের সাক্ষ্য কবুল করবে না। এরাই নাফরমান।” ‘আল-কুরআন, ২৪:৪।’ ধরা যাক একজন রোগী কোন এক নির্দিষ্ট রোগের জন্য অপরেশন করতে চাচ্ছেন। চিকিৎসা চূড়ান্ত করার জন্য সে দু’জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সার্জনের উপদেশ নেয়াকে প্রাদান্য দেবে। যদি সে দু’জনের সার্জন না পায় তাহলে তার দ্বিতীয় এখতিয়ারে থাকবে একজন সার্জন ও দু’জন এমবিবিএস ডাক্তার। একই ভাবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দু’জন পুরুস সাক্ষী অগ্রাধিকারযোগ্য। ইসলাম পুরুষদেরকে পরিবারের জন্য উপার্জনকারী হিসেবে বিবেচনা করে। যেহেতু পুরুষের কাঁধেই অর্থনৈতিক দায় দায়িত্ব, তাই তাদেরকেই অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে মহিলার তুলনায় অধিক দক্ষ আশা করা হয়। দ্বিতীয় এখতিয়ার, একজন পুরুষ সাক্ষী ও দু’জন মহিলা সাক্ষী। যেন কোন একজন মহিলা সাক্ষী ভুল করলে অপরজন তা শুধরে নিতে পারে। কুরআনে ‘তাদিল্লা’ শব্দে ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ ‘সন্দেহ’ বা ‘ভুল করা’। অনেকে ভুল করে তার অনুবাদ করে ‘ভুলে যাওয়া’। তাই একমাত্র অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই দু’জন মহিলা সাক্ষী একজন পুরুষ সাক্ষীর সমান করা হয়েছে। খুনের ক্ষেত্রেও দু’জন মহিলা সাক্ষীকে একজন পুরুষ সাক্ষীর সমান করা হয়েছে। কিছু আলেম মত প্রকাশ করেছেন যে, খুনের ক্ষেত্রে মহিলা সাক্ষীর আচরণ নারীসূলভ প্রভাব ফেলতে পারে। সে রকম ক্ষেত্রে মহিলারা পুরুষের চেয়ে অধিক ভীত থাকে। তার উদ্বেগজনক অবস্থায় সে সন্ধিগ্ধ হয়ে যেতে পারে। “হাদীস গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য আয়েশা রা. এর একক সাক্ষ্যেই যথেষ্ট বিবেচিত হয়েছে; মোহাম্মদ সাঃ এর প্রাণপ্রিয়া স্ত্রী আয়েশা রাঃ এর একমাত্র সাক্ষ্যের উপর ভিত্তি করেই ২,২১০টি নির্ভরযোগ্য হাদীস বর্ণিত আছে। এটাই যথেষ্ট প্রমাণ যে, একজন মহিলার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য। অনেক ফিকাহ্বিদই মত প্রকাশ করেন যে, রমযানের নতুন চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে একজন মহিলার সাক্ষ্যই যথেষ্ট। ইসলামের একটি স্তম্ভ রোযার জন্য একজন মহিলার সাক্ষ্যই যথেষ্ট। সকল মুসলিম মহিলা ও পুরুষ তার সাক্ষ্য মেনে নিচ্ছে। কোন কোন ফিক্হবিদের মতে, রমযানের প্রথমে একজন সাক্ষী ও রমযানের শেষে দু’জন সাক্ষীর প্রয়োজন হয়। পুরুষ বা মহিলার সাক্ষ্যের কারণে কোন পার্থক্য সৃষ্টি হয় না। কিছু কিছু মহিলা সাক্ষীর অগ্রাধিকার রয়েছে। কিছু ঘটনায় মহিলা সাক্ষীর প্রয়োজন হয়, সেখানে পুরুষের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। ধরা যাক, মহিলাদের মৃত্যুর পরে গোসল দেয়ার ক্ষেত্রে মহিলা সাক্ষীর প্রয়োজন হয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মহিলা ও পুরুষ সাক্ষ্যের এই তারতম্য তাদের ভিন্ন লিঙ্গের জন্য নয়। বরং ইসলামের দৃষ্টিতে সমাজে তাদের ভিন্ন প্রকৃতি ও ভূমিকার কারণে হয়।”‘‘নায়েক, ডা. জাকির আব্দুল করিম, ঢাকা: ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমদের আপত্তিসমূহের জবাব, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৩-৫৪।’’
নারীর আইনগত অধিকার : “ইসলামী জীবন দর্শন নর-নারীর সমান মর্যাদার অধিকারী। শরীয়ত নর-নারী উভয়ের জীবন ও সম্পদ রক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। যদি কোন পুরুস কোন নারীকে হত্যা করে তাহলে সে কঠিন শাস্তি লাভ করবে, তাহলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-। সূরা বাকারার ১৭৮ ও ১৭৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে- “তাকেও হত্যা করা হবে। যদি কোন নারী হত্যা করে তাকেও মৃত্যু দ দেয়া হবে।” ইসলামের আইন অনুসারে নারী পুরুষের ‘কিসাস’ সমভাবে চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দেহের বদলে দেহ, উভয় সমান শাস্তি পাবে। যদি মৃতের অভিভাক এমনকি সে যদি নারীও হয় এবং বলে যে, হত্যাকারীকে মাফ করে ‘দিয়াাত’ অর্থাৎ ক্ষতিপূরণ গ্রহণ কর- তার মত গ্রহণ করা হবে। যদি নিহতের আত্মীয়ের মধ্যে মতানৈক্য হয়, কেউ বলে হত্যাকারীকে হত্যা করাই উচিত, কেউ বলে ‘দিয়াত’ গ্রহণ করে তাকে মাফ করে দেয়া উচিত- তাহলে হত্যাকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া থেকে ফিরিয়ে রাখা উচিত। সমভাবে নারী-পুরুষ যেই মতামত দিক না কেন তার গুরুত্ব একই।” ‘নায়েক, ডা. জাকির আব্দুল করিম: লেকচার সমগ্র (১), ঢাকা: সংকলন, মো: রফিকুল ইসলাম, সম্পাদনা পর্ষদ, পিস পাবলিকেশন, ২০০৯, পৃ. ৩৪৮।’ সূরা মায়েদা ৩৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে-  ‘চোর সে নারী বা পুরুষ যেই হোক না কেন, তার হাত কাটে দাও, তার অপরাধের শাস্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে স্বীকৃত।”‘‘আল-কুরআন, ৫:৩৮।’ অর্থাৎ নারী-পুরুষ যেই চুরি করুক তার হাত কাটা হবে, শাস্তি একই। সূরা নূরের ২নং আয়াতে বলা হয়েছে, “কেউ যদি ব্যভিচার করে সে নারী বা পুরুষ যেই করুক না কেন তাকে একশ’ দোররা মারো।” ‘আল-কুরআন, ২৪:২।’ ব্যভিচারের শাস্তি সে নারী বা পুরুষ যেই হোক না কেন তার শাস্তি একই অর্থাৎ একশ’ দোররা, ইসলামে নারী পুরুষের একই শাস্তি। ইসলাম একজন নারীকে ১৪০০ বছর পূর্বে সাক্ষ্য দেয়ার অধিকার প্রদান করেছে। অথচ এখন আধুনিককালে ইহুদি পুরোহিতরা বিবেচনা করছে যে, নারীদের সাক্ষ্যদানের অধিকার দেয়া হবে কি না? যা ইসলাম ১৪০০ বছর পূর্বে অধিকার দিয়ে রেখেছে। সূরা নূরের ৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে- “যদি কেউ কোন নারীর সতীত্ব নিয়ে কথা বলে তাকে ৪জন সাক্ষী হাজির করতে হবে, না পারলে তাকে ৮০ দোররা মারতে হবে।” ‘‘আল-কুরআন, ২৪:৪।’’ [চলবে]
-মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ