ঢাকা, বুধবার 16 November 2016 ২ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ১৫ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

একদলীয় জেলা পরিষদ নির্বাচন প্রসঙ্গে

রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তি ও প্রতিবাদ উপেক্ষা করে নির্বাচন কমিশন জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী ২৮ ডিসেম্বর সারা দেশে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে একমাত্র আওয়ামী লীগ ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো দলই নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এমনকি জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল নামে পরিচিত এরশাদের জাতীয় পার্টিও এই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। আওয়ামী মহাজোটের দলগুলোও নির্বাচনে অংশ নেবে না। সংসদের বাইরের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিরও ইতিবাচক অবস্থান নেয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ জেলা পরিষদের যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে সে নির্বাচনে শুধু আওয়ামী লীগই অংশ নেবে। ফলে আরো একটি একদলীয় ও একতরফা নির্বাচনের রেকর্ড স্থাপিত হবে।
প্রকাশিত খবরে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশ না নেয়ার প্রধান কারণ হিসেবে ইলেক্টোরাল কলেজ-এর কথা বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ২৯ আগস্ট মন্ত্রিসভার নিয়মিত সাপ্তাহিক বৈঠকে অনুমোদিত এ সংক্রান্ত আইনটিতে বলা হয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং পৌর সভা ও সিটি করপোরেশনসহ জেলার চার স্তরের স্থানীয় সরকার কাঠামোর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি ‘ইলেক্টোরাল কলেজ’ গঠন করা হবে এবং এর সদস্যরাই জেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোট দেবেন। তাদের ভোটেই ২১ সদস্যের জেলা পরিষদ গঠন করা হবে।
জেলা পরিষদ নির্বাচনের জন্য সংশোধিত আইনটি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে নিন্দিত ও সমালোচিত হয়েছে। কারণ, পরিকল্পিত ইলেক্টোরাল কলেজ-এর মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকারকেই অস্বীকার করেছে সরকার। প্রসঙ্গক্রমে ইতিহাসও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন পর্যবেক্ষকরা। পাকিস্তানের স্বৈরশাসক জেনারেল আইয়ুব খান তার প্রবর্তিত মৌলিক গণতন্ত্রের জন্য এ ধরনের ইলেক্টোরাল কলেজ তৈরি করেছিলেন। আইয়ুব খান ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ নামে এমন এক ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন, যে ব্যবস্থায় জনগণ তথা সাধারণ ভোটাররা শুধু ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভোট দেয়ার সুযোগ পেতো। এভাবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে ৪০ হাজার করে ৮০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রী বা বিডি মেম্বার নির্বাচিত হতেন। এরাই পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের দুই প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করতেন। ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ নামের উদ্ভট এ ব্যবস্থায় ভোটার তথা ৮০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রীকে সহজেই টাকার বিনিময়ে কেনা যেতো। কেনা হয়েছেও। ফলে গণতন্ত্রের সর্বনাশ তো হয়েছিলই, জনগণও হারিয়েছিল ভোটাধিকার। এজন্যই আইয়ুব খানের আমলে প্রাপ্ত বয়ষ্কদের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার দেয়ার দাবি সব সময় ছিল প্রধান একটি দাবি। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকারের দাবিটি ১৯৬৯ সালের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আদায় করা হয়েছিল। এই ইতিহাসের আলোকে বলা হয়েছে, জেলা পরিষদ নির্বাচনের জন্য ইলেক্টোরাল কলেজ প্রবর্তনের মাধ্যমে বর্তমান সরকারও আইয়ুব খানকে অনুসরণ করে জনগণকে তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার পদক্ষেপ নিয়েছে। 
ইলেক্টোরাল কলেজের পাশাপাশি অন্য একটি বিশেষ কারণেও জেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সে কারণটি হলো, দেশের বিভিন্ন এলাকায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের অনেক জনপ্রতিনিধিকেই বরখাস্ত করেছে সরকার। এই তালিকায় রয়েছেন সিটি করপোরেশনের চারজন মেয়র, ১০৫ জন উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান, ২১ জন পৌর মেয়র, ৪৪ জন সিটি ও পৌর কাউন্সিলর এবং ১৪০ জন ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বার। বরখাস্ত হওয়া ৩১৪ জনের মধ্যে অনেককেই মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে কারাগারে ঢোকানো হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, আদালতে জামিন পাওয়া সত্ত্বেও তাদের বেশিরভাগ মুক্তি পাননি। অনেককে আবার নতুন নতুন মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। মূলত সে কারণেও আসন্ন জেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে বিরোধী কোনো দলই আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
প্রসঙ্গক্রমে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কথাও স্মরণ করা দরকার। কয়েক ধাপে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সহিংসতার মাধ্যমে শুধু নয়, অন্য অনেক পন্থায়ও ইউপি নির্বাচনের সমগ্র প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীনরা নিজেদের দখল প্রতিষ্ঠা করেছেন। দেশের সব এলাকাতেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দলের প্রার্থীদের ভীতি দেখিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দেয়া এবং মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এমন এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল, যার ফলে প্রায় কোনো ইউনিয়নেই বিরোধী দলের প্রার্থীরা দাঁড়াতে পারেননি। অন্যদিকে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং কোথাও কোথাও নামমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত বলে ঘোষিত হয়েছেন কেবল আওয়ামী লীগের লোকজন। ফলে আলোচ্য আইনটির ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হলে জেলা পরিষদের সকল পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত ব্যক্তিরাই শুধু নির্বাচিত হবেন।
অমন সম্ভাবনার কারণেই দেশের কোনো রাজনৈতিক দলই জেলা পরিষদ নির্বাচনের জন্য পাস করা আইনটিকে যেমন সমর্থন করেনি তেমনি জেলা পরিষদ নির্বাচনের ব্যাপারেও আগ্রহ দেখাচ্ছে না। আমরাও মনে করি, সরকারের উচিত জনগণের আন্দোলনে প্রত্যাখ্যাত ও বাতিল হয়ে যাওয়া কোনো ব্যবস্থা প্রবর্তনের চেষ্টা থেকে সরে আসা এবং জনগণের সরাসরি ভোটে জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পদক্ষেপ নেয়া। এজন্য সংশোধিত আইনটি বাতিল করতে হবে অনতিবিলম্বে। জেলা পরিষদের ডিসেম্বরে পরিকল্পিত নির্বাচনও অনুষ্ঠান করা চলবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ