ঢাকা, বুধবার 16 November 2016 ২ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ১৫ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রাণী বিলুপ্তির জন্য দায়ী কে মানুষ না প্রকৃতি?

জাফর ইকবাল : পৃথিবীতে প্রায় ১০ মিলিয়ন প্রজাতির প্রাণী আছে যা সংখ্যায় অনেক বেশি। কিন্তু জীববিজ্ঞানীরা ধারণা দেয় আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে যতো প্রজাতির প্রাণী ছিল বা এখনো আছে তাদের হিসাব করলে দেখা যাবে, এ পৃথিবীতে প্রায় ৫ বিলিয়ন প্রজাতির প্রাণীর আবির্ভাব ঘটেছে। হিসাব করে যে অদ্ভুত বিষয়টি জানা গেছে তা হলো, আশ্চর্যজনকভাবে এই ৫ বিলিয়ন প্রজাতির প্রায় ৯৯ শতাংশই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন পৃথিবীর কিছু অসাধারণ বৃহৎ প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটেছে, যখন পৃথিবীতে মানুষের বসবাস ক্রমশ বেড়ে গেছে। কিন্তু এ দুটি বিষয়ের মধ্যে আদৌ কি কোনো সম্পর্ক আছে?
গবেষণায় দেখা গেছে, আরো অনেক প্রাণী প্রতিবছর এভাবে বিলুপ্তির দিকে চলে যাচ্ছে। অনেক বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন আমরা এমন এক যুগে আছি যখন প্রাণীদের অধিক মাত্রায় বিলুপ্তি ঘটছে। বিগত ৫০ কোটি বছরে এমনটি মাত্র পাঁচবার ঘটেছে। বিজ্ঞানীরা বর্তমান সময়কে ষষ্ঠ বিলুপ্তির যুগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এবং তারা এ বিলুপ্তির জন্য মানুষকে দায়ী করছেন। অতিরিক্ত প্রাণী ও মৎস্য শিকার এ বিলুপ্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভূতাত্বিকগণ বলেন, আমরা পৃথিবীর একটি সম্পূর্ণ নতুন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছি যা পৃথিবীর ইতিহাসে সম্পূর্ণ একটি নতুন অধ্যায়। এমন একটি কাল যাকে তারা ‘অ্যানথ্রোপোসিন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ২১০০ সালের মধ্যে মানুষ বর্তমানে বেঁচে থাকা প্রাণীদের প্রায় অর্ধেক বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিবে বলে তারা ধারণা করেন।
 যেহেতু আমরা এই যুগে বসবাস করছি তাই এই বিলুপ্তির পেছনে মানুষের হাত আছে বলতে পারি। কিন্তু হাজার হাজার বছর আগে যখন পৃথিবীতে মানুষের বসবাস ছিল না তখন কেন প্রাণীদের বিলুপ্তি ঘটতো? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে আমাদের দেখতে হবে বিজ্ঞানীরা এ সম্পর্কে কী কী তথ্য সংগ্রহ করেছেন। সমস্যা হচ্ছে এসব বিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে একে অপরের সঙ্গে একমত হতে পারেননি এমনকি বর্তমানের ঘটনার ব্যাপারেও তারা একে অপরের সঙ্গে একমত নন। সেইসঙ্গে পঞ্চম ও ষষ্ঠ বিলুপ্তির যুগে এমন অনেক প্রকৃতির প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে যারা আকারে অনেক ক্ষুদ্র ছিল। এসব ক্ষুদ্র প্রাণীদের কিছু সংখ্যকের বিলুপ্তি ঘটে প্রস্তর যুগে। এ প্রস্তর যুগে ভূমন্ডলীয় তাপমাত্রা প্রায় ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পায়। যার ফলে এ সময় অনেক প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটে। এদের মধ্যে বেশিরভাগ ছিল বৃহৎ প্রাণী। যাদের ওজন ৪৪ কেজির বেশি। এসব প্রাণীর বিলুপ্তির কারণ নিয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞানীদের মধ্যে মত বিরোধ দেখা দেয়। হতে পারে অতিরিক্ত শিকার এর জন্য দায়ী। আবার কেউ কেউ মানুষকে এর জন্য দায়ী ভাবেন। অনুমান করা যায় ১৮৭০ সালে মানুষ ও ম্যামোথ (লোমযুক্ত দৈত্যাকার হাতি) একই সঙ্গে বসবাস করতো। কিন্তু পরবর্তীতে প্রমাণিত হয় যে অধিক শিকারের ফলেই এরা বিলুপ্ত হয়েছে।
কিছু গবেষণায় জানা গেছে যে, অধিক শিকারের ফলে আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার প্রাণী জগতের বিলুপ্তি ঘটেছে। তখনকার জলবায়ু এখন থেকে অনেক আলাদা ছিল এবং তখনকার প্রাণীগুলো শুষ্ক আবহাওয়ায় অভ্যস্ত ছিল। প্রমাণ পাওয়া গেছে যখন মানুষ বসবাসের জন্য জঙ্গলে অবস্থান নিয়েছে তখন তারা খুবই স্বাভাবিকভাবে তাদের আশপাশের প্রাণীদের শিকার করতো। এসব প্রাণী মানুষের শিকারের কৌশল সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিল। তাছাড়া তখনকার জলবায়ু ও মানুষের আগুন জ্বালাতে শেখানো ওদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ‘মানুষ যখন পৃথিবীতে বসবাস শুরু করে তখন থেকে উল্লেখযোগ্য জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছিল যার ফলে এটা বলা মুশকিল যে কি কারণ ছিল যা তখনকার প্রাণীদের বেঁচে থাকার কৌশলের পরিবর্তন আনছিল’।- ওভারকিল তত্ত্বের প্রবক্তা একথা বলেন। এ তত্ত্বটি মূলত এটা প্রকাশ করে যে এসব প্রাণীর বিলুপ্তির পেছনে মানুষ দায়ী। মানুষ কেন ২৩ প্রকারের প্রাণী শিকার করতো কিন্তু বাকি ৯ প্রকার করতো না? উত্তর আমেরিকায় তুষার যুগে মানুষের সংখ্যা অনেক কম ছিল এবং তাদের কাছে পশু শিকারের জন্য খুব সামান্য অস্ত্র ছিল যার ফলে তারা অতিকায় প্রাণীদের শিকার করতে পারতো না। ওভারকিল তত্ত্বের একজন সমালোচক ডেভিড মেল্টাজর বলেন, মানুষ যে তুষার যুগে প্রাণী বিলুপ্তির কারণ এ ব্যাপারে কোনো সঠিক প্রমাণ পৃথিবীতে নেই। ২০১৫ সালে একটি পর্যালোচনায় মেল্টাজর ২৫ পাতার একটি লেখনির মাধ্যমে ওভারকিল তত্ত্বটিকে ভুল প্রমাণ করতে চেয়েছেন।
উদাহরণ স্বরূপ তিনি বলেছেন, ৩২টি প্রজাতির মধ্যে ৯টি প্রজাতি টিকে ছিল। মানুষ কেন শুধুমাত্র ২৩টি প্রজাতি শিকার করেছে বাকি ৯টিকে কেন শিকার করেনি। ওভারকিল তত্ত্বে এ সম্পর্কে কোনো যুক্তি উল্লেখ নেই। আর তারা কেনইবা নির্দিষ্ট প্রাণীদেরকেই শিকার করবে যেখানে অন্যান্য প্রাণীগুলো শিকার করা আরো সহজ ছিল। ওভারকিল তত্ত্বের প্রবক্তারা দ্রুতই তাদের তত্ত্বকে এই অভিযোগ থেকে বাঁচাতে চেষ্টা করেন। ২০০৭ সালে হেনিস বলেন, যারা এ তত্ত্বের ওপর প্রশ্ন তুলেছে তারা এ ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী নন অথবা তারা জিনিসটিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করছেন। তিনি আরো বলেন, আমাদের কাছে কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই বলে আমাদের তত্ত্বটি যে ভুল এটা বলা যায় না।
তুষার যুগের প্রাণীদের ধ্বংসের ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা এই দুই ধরনের মতবাদ-ই দিয়ে আসছেন। কেউ বলছেন মানুষের শিকারের কারণে এরা বিলুপ্ত হয়েছে আবার কেউ বলছেন জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এমনটি হয়েছে। এ তর্ক অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। তারা একই ধরনের প্রমাণ দেখছেন কিন্তু ভিন্ন ভিন্নভাবে সেটিকে ব্যাখ্যা করছেন। আসলে দুটি বিষয়ের কোনোটিই অযৌক্তিক নয়। দুটি তথ্যেরই যৌক্তিকতা আছে। এটা কী হতে পারে না, যে প্রাণীগুলো মানুষের অধিক শিকার ও জলবায়ু পরিবর্তন উভয় কারণেই হয়েছে? গবেষক সুরভেল বলেছেন, ‘কোনো ঘটনার পেছনে একের অধিক কারণ থাকাটা সম্ভব।’ সুরভেল এটাও বলেন, ‘আমরা সবাই একই প্রমাণ দেখছি কিন্তু এটাকে আমরা ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছি।’ তুষার যুগের প্রাণী বিলুপ্তির পেছনের মূল কারণ এখনো সঠিকভাবে জানা যায়নি। কিন্তু বর্তমানে যে বিপুল সংখ্যক প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে তার জন্যে নিঃসন্দেহে আমরা অর্থাৎ মানুষই দায়ী।
বর্তমানে জলবায়ু খুব দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে যার মুল কারণ মানুষের কর্মকান্ড। যার ফলে প্রচুর পরিমাণ প্রাণী ধ্বংসের পথে চলে যাচ্ছে এবং ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ