ঢাকা, বুধবার 16 November 2016 ২ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ১৫ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

দৃষ্টিহীনরাও পাবেন শৈল্পিক অনুভূতি

আবু হেনা শাহরীয়া : বলা হয়, একজন অন্ধ তার মনের চোখে দেখে। তারপরেও তাদের আরো কিছু ইন্দ্রিয় স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় বেশি কাজ করে। ঠিক এরকমই ব্যাপার বাস্তবেও হতে চলেছে। মানুষ অন্ধ হলেই তার মন অন্ধ হয়ে যায় না। কারণ শিল্প বোঝার জন্যে চোখ নয়, থাকতে হয় অন্তর। তাই অন্ধ মানুষও পৃথিবীর বিভিন্ন সৌন্দর্য বা কদর্যতার অন্যান্য ইন্দ্রিয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারে। বিজ্ঞানের কল্যাণে এখন অন্ধরাও পাচ্ছেন শৈল্পিক অনুভূতি।
সম্প্রতি বিভিন্ন সিনেমাতেও সেই শৈল্পিক কর্মের প্রদর্শনী চলছে। এমনই একটি ছবির নাম ‘ফানা’। এই সিনেমায় ভারতীয় নায়িকা কাজল যখন তার বান্ধবীদের সঙ্গে পুরোনো কেল্লা দেখতে যেতে চান, তখন তার পরিবারের সবাই হই হই করে ওঠেন। কেননা কাজল যে অন্ধ! অন্ধ কিভাবে কেল্লা বা পর্যটন নগরী দর্শন করবে? সিনেমায় দেখানো হয়, পরিবারের আপত্তি সত্ত্বেও কাজলের শিল্পমনের কাছে হার মেনে কাজলকে সেই পর্যটন ভ্রমণে যেতে দেয়া হয়। এবং কাজল অন্ধ হলেও হাতের দ্বারা পুরাকীর্তির বিভিন্ন নকশা স্পর্শ করে তার সৌন্দর্য উপভোগের চেষ্টা করেন।
হয়তো এমন ধারণা থেকেই উদ্বুদ্ধ হয়ে লাইফ ম্যাগাজিনের সাবেক ফটোগ্রাফার জন অলসান দৃষ্টিহীনদের জন্যে খুলেছেন এক অপূর্ব আর্ট গ্যালারি। যেখানে বিখ্যাত সব ছবির থ্রিডি ভার্সন রাখা হয়েছে, যা অন্ধ বা দৃষ্টিহীনদের ছুঁয়ে দেখার অনুমতি দেয়া হয়েছে। ফলে তারা এখন থেকে বিখ্যাত সব ছবির থ্রিডি ভার্সনে নিজের হাত ছুঁয়ে অনুভব করতে পারবেন। এই ছবিগুলো অনেকটা এমবুশ টাইপের। অর্থাৎ এগুলোতে ছবিগুলোর বিষয়বস্তুকে অনেকটা জীবন্ত করে তোলা হয়েছে। যেমন, ছবিতে যদি নদীর ঢেউ থাকে, তবে সেখানে নদীর পানি স্বাভাবিক থাকলেও হয়তো ঢেউগুলো একটু উঁচু করে দেয়া আছে। ফলে নদীর তটে হাত বুলিয়ে যখন পানিতে হাত যাবে তখন আপনার হাতে হয়তো ঢেউয়ের ঝাপটা লাগতে পারে।
পাশাপাশি এর সঙ্গে আরো একটি প্রযুক্তি ডেভেলপ করা হয়েছে, যেটা আপনার হাতের স্পর্শ যেখানে যেখানে যাবে তার একটি বর্ণনা আপনাকে দেবে অডিও ভার্সনে। ফলে যেসব জায়গা আপনার হাতের স্পর্শেও বোঝা যাবেনা, সেখানে আপনাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বর্ননা করা হবে। অনেকটা স্বাভাবিক মানুষ যেভাবে একটা শিল্পকর্ম উপভোগ করেন, এই গ্যালারিতে একজন দৃষ্টিহীনকেও সেই অভিজ্ঞতা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
এমন একটি উদ্যোগে দৃষ্টিহীনদের উল্লসিত প্রশংসা পাওয়া গিয়েছে। তারা অনেকেই বলেছেন, এমন উদ্যোগ তাদের অনেকদিনের আক্ষেপকে দূর করতে সক্ষম হয়েছে। এতদিন অন্যের মুখের জবানিতেই শুনতে হতো চমৎকার সব শিল্পকর্মের বর্ণনা। কেননা দুর্লভ ও দামি এসব শিল্পকর্ম কখনোই ছুঁয়ে দেখার অনুমতি দেয়া হতো না। ফলে এসব শিল্পকর্মের জন্যে নির্ভর করতে হতো অন্যের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। তাই অন্যের দেখার চোখ এবং কল্পনা কিংবা তার সেটা উপস্থাপন করার দক্ষতার ওপর নির্ভর করতে হতো আসলেই একজন দৃষ্টিহীনের সামনে থাকা শিল্পকর্মটি কেমন? এই প্রযুক্তি সামনে আসার পর এখন আর অন্যের কল্পনা কিংবা উপস্থাপন করার দক্ষতার ওপর নির্ভরশীলতা কমে যাবে। এখন একজন দৃষ্টিহীন তার নিজের ইন্দ্রিয় দিয়েই বুঝতে পারবেন তার সামনে থাকা শিল্পকর্মে কি আছে বা তার বিষয়বস্তু কি? জন অলসানের ভাষায়, এটা করা হয়েছে তিনটি ধাপে। প্রথমে টুডি ছবিকে থ্রিডি ডাটায় রূপান্তর করা হয়েছে। পরের ধাপে এই থ্রিডি ডাটাকে একটি শেপ বা ছাঁচের আকার দেয়া হয়েছে। এবং সর্বশেষ ধাপ হিসেবে একে প্রিন্ট দেয়া হয়েছে। এভাবেই একটি সাধারণ ছবিকে দৃষ্টিহীনদের দেখার বা উপলব্ধির উপযোগী করে তোলা হয়। প্রথম প্রদর্শনীতে এটা ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। আমরাও আশায় থাকি আমাদের দেশের দৃষ্টিহীনদের জন্যে এমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয় কিনা। সেটা সরকারি বা বেসরকারি যেকোনো উদ্যোগেই হতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ