ঢাকা, বৃহস্পতিবার 17 November 2016 ৩ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ১৬ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

‘আগে গুলী পরে প্রশ্ন’ রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা ছাড়িয়েছে

১৬ নবেম্বর, সিএনএন/পার্সটুডে : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর সহিংসতা আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এ পর্যন্ত ৬৯ জন রোহিঙ্গা মুসলমান ছাড়াও দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ১৭ জন নিহত হয়েছে। সিএনএন মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছে ‘শুট ফার্স্ট, আস্ক কোশ্চেন লাটার’ : ভায়োলেন্স ইনটেসিফাইস ইন রাখাইন এস্টেট। সেখানকার পরিস্থিতি আরো সংকটজনক হয়ে উঠছে। তবে অন্যান্য সূত্রগুলো বলছে নিহতের সংখ্যা আরো বেশি। আটক করা হয়েছে ২৩৪ জনকে।
মিয়ানমার সরকার যদিও বলছে রাখাইনে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে কিন্তু দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নির্যাতন, তাদের হত্যা ও ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক ফিল রবার্টসন বলেছেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যখনই রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে তখনই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এ বাহিনীর সদস্যরা আগে গুলী করছে, এরপর কোনো প্রশ্ন থাকলে তা জিজ্ঞাস করছে। তাদের রেকর্ড বরাবরই বিশ্রি ধরনের।
রবার্টসন বলেন, রাখাইন স্টেটে নির্বিচারে গ্রেফতার চলছে, নির্যাতন, লুটপাট ছাড়াও মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সেখানে বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। গত সপ্তাহে দেশটির সরকার শত শত ব্যক্তিকে গ্রেফতারের কথা স্বীকার করে বলে তারা পুলিশের ওপর হামলাকারী।
জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান যিনি রাখাইন স্টেটে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে গঠিত এ্যাডভাইজরি কমিশনের প্রধান তিনি এক বিবৃতিতে বলেছেন, উত্তর রাখাইন এলাকায় সাম্প্রতিক সহিংসতা গভীর উদ্বেগজনক যা অস্থিরতা ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং এ ঘটনায় নতুন করে মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর রাখাইন পরিস্থিতি নজরে রাখছে বলে জানিয়েছেন।
এদিকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী রাখাইন এস্টেটে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর হামলার কথা অস্বীকার করলেও তাদের এ ধরনের অভিযানের পাশাপাশি সন্ত্রাসীরা রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করছে। এ ধরনের হামলার জন্যে সরকারি বাহিনী দায়ী বলে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় মিডিয়ার খবরে বলা হচ্ছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের স্যাটেলাইট ওয়াচে দেখা যাচ্ছে মংগদু জেলার কেইত ইয়ো ফিন পিন গ্রামে সাত দিন আগে যেসব ঘরবাড়ি দেখা গেছে এখন তা ভস্মীভূত হয়ে গেছে। আক্রান্ত এলাকগুলোতে এনজিও বা সাংবাদিকদের যেতে দেয়া হচ্ছে না বলে ওসব অঞ্চল থেকে কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না। রবার্টসন আরো বলেন, রাখাইনে যা ঘটছে তা আসলে সন্ত্রাস ছাড়া আর কিছুই নয়।
রাখাইন অঞ্চলে ৮ থেকে ১০ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান থাকলেও তাদের কোনো নাগরিক স্বীকৃতি দেয়নি মিয়ানমার। তারা স্বাভাবিকভাবে যাতায়াত করতে না পেরে কোনো কাজও করতে পারছে না। রোহিঙ্গা মুসলমানদের জমি বা সম্পদের কোনো অধিকার নেই। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত এ জনগোষ্ঠীর বেশ কয়েক লাখ সেনাবাহিনী ও সন্ত্রাসী বৌদ্ধদের হামলায় বাংলাদেশে আশ্রয় নিলেও বছরের পর বছর তাদের ফেরত নিচ্ছে না মিয়ানমার। এদের অনেকে সাগরপথে পালিয়ে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেয়ার সময় ক্ষুধা কিংবা নৌকা ডুবে মারা গেছেন।
গত মাসে লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল স্টেট ক্রাইম ইনেশিয়েটিভ এ্যাট কুইন ম্যারি ইউনিভার্সিটির পরিচালক পেনি গ্রিন রাখাইন এস্টেটকে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্ধকূপ হিসেবে অভিহিত করেন। মিয়ানমারে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত স্কট মার্সিয়েল সম্প্রতি রাখাইন এস্টেট পরিদর্শন করে বলেছেন, সেখানার সন্ত্রাসী ঘটনার সঠিক তদন্ত হওয়া উচিত। এছাড়া সচ্ছতার সঙ্গে তথ্যের আদান প্রদানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।
রাখাইন এস্টেটে সাম্প্রতিক সহিংসতা শুরু হয়েছে গত মাস থেকে। মিয়ানমারের সেনা সদস্য ও পুলিশ নিহত হবার পর ওই স্থানকে বিশেষ অভিযান এলাকা ঘোষণা করে যৌথ অভিযান শুরু হয়। সেনা সদস্য ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় বৌদ্ধ যুবকদের অস্ত্র নিয়ে অভিযানে অংশ নিতে দেখা গেছে। এক পর্যায়ে স্থানীয় যুবক যারা রোহিঙ্গা মুসলমান নয় তাদের অস্ত্র দিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। অভিযানের সময় মিয়ানমার বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে রাখাইন স্টেটে গোলাগুলী বর্ষণ করা হয়।
এদিকে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বা এইচআরডাব্লিউ স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে বলেছে, রাখাইনের মংদাউ জেলার তিনটি গ্রামের ৪৩০টি বাড়ি ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। এইচআরডাব্লিউর এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডাম বলেছেন, স্যাটেলাইট চিত্রে ক্ষয়ক্ষতির যে বিবরণ পাওয়া গেছে বাস্তবে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ।
মিয়ানমারের মুসলমানদের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে মংডু এলাকার রোহিঙ্গা মুসলিম জয়নুল রেডিও তেহরানকে বলেছেন, সেনা ক্যাম্পে হামলার ঘটনা প্রকাশিত হওয়ার পর সেনারা রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর এমনভাবে গুলী চালিয়েছে যেভাবে চিন্তা ছাড়াই পাখিকে মানুষ গুলী করে। তারা নিজ হাতে এবং বুলেট নিক্ষেপ করে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। আড়াই হাজার ঘর ভস্মীভূত করেছে। গুলীবর্ষণ ও আগুনে পুড়ে মারা গেছে ২৯৪ জন। আগুনের হাত থেকে বাঁচার জন্য মা ছেলেকে নিয়ে যখন বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিল তখন মার কাছ থেকে ছেলেকে ছিনিয়ে নিয়ে আগুনে নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে।
গত ৯ অক্টোবর মিয়ানমারে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর একটি ঘাঁটিতে অজ্ঞাত পরিচয় সশস্ত্র ব্যক্তিদের হামলায় ৭ জন  সৈন্য এবং ১০ জন পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়। এ ঘটনার পর সেনাবাহিনী সেখানে ব্যাপক অভিযান চালায়। সরকারের অভিযোগ রোহিঙ্গা মুসলমানরাই ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। সরকারের এ অভিযোগ সম্পর্কে মিয়ানমারের মংডু থেকে রোহিঙ্গা মুসলিম জয়নুল জানিয়েছেন, নিরাপত্তা বাহিনী তাদের সেনাদের মৃতদেহ দেখিয়েছে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে গুলী করে হত্যা করে পরে তাদেরকে সেনা ক্যাম্পে নিয়ে সেনাবাহিনীর পোশাক পরানো হয়। এভাবে তারা দেখানোর চেষ্টা করে যে তাদেরই সেনা নিহত হয়েছে এবং এর দায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ