ঢাকা, বৃহস্পতিবার 17 November 2016 ৩ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ১৬ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

তুরস্ক-পাকিস্তান-সৌদি সামরিক জোট গঠনের সম্ভাবনা

১৬ নবেম্বর, ডেইলি সাবাহ : বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের অশান্ত পরিস্থিতি এবং মুসলিম দেশগুলোতে আইএস ও বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হুমকি মোকাবেলায় সাবেক বিশাল খেলাফতের নেতৃত্বদানে অভিজ্ঞ তুরস্ক, বিশ্ব সুন্নি মুসলিমদের ছায়ানেতা সৌদি আরব ও পরমাণু শক্তিধর পাকিস্তানের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সামরিক জোট গঠন হতে পারে। এ ত্রিদেশীয় সম্ভাব্য জোট সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোতে বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপ প্রতিরোধে এবং স্থিতিশীল আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখতে ও টেকসই উন্নয়নে পথিকৃতের ভূমিকা রাখতে পারে। পশ্চিমা দেশগুলোর সহযোগিতা ছাড়াই আঞ্চলিক নিরাপত্তাসম্পর্কিত সমস্যা সমাধানে সমন্বয়ে সক্ষম শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আন্তঃমহাদেশীয় খিলাফতের নেতৃত্বদানকারী তুরস্ক। গত জুলাইয়ে সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেশটির জনগণ তাদের এ সক্ষমতাকে আবারো প্রমাণ করেছে। এ ঘটনার পর অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসীদের এবং ইউরোপ ও আমেরিকার হুমকি মোকাবেলায় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন দেশটির নেতারা। এ ক্ষেত্রে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা আমেরিকা ও এর সহযোগী ন্যাটো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে অনিশ্চিত সম্পর্ক অব্যাহত রাখবেন, নাকি চীন ও রাশিয়া ব্লকের সাথে নতুন জোটের পরিকল্পনা করবেন। ইতোমধ্যেই ব্যর্থ অভ্যুত্থানে আমেরিকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকায় তুরস্কের জনগণের মাঝে মার্কিনবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। অভ্যুত্থান- চেষ্টার পর থেকে সিরিয়া, ইরাক, মিসর ও লিবিয়ায় মার্কিন শঠতাপূর্ণ রণনীতির বিরুদ্ধে সতর্ক ও সোচ্চার হয়েছে তুরস্কের জনগণ ও নীতিনির্ধারকেরা। বিশেষ করে ককেশাস ও বলকান অঞ্চল ঘিরে তুরস্কের স্বার্থ বিঘিœত করার মার্কিন নীলনকশার কারণেই হয়তো দুই দেশের সম্পর্ক আর বেশি দিন স্থায়ী হবে না। এ ক্ষেত্রে আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য- কেন্দ্রিক শক্তিশালী প্রতিপক্ষ রাশিয়ার সাথে তুরস্কের সাম্প্রতিক সৌহার্দ্যরে আভাস ওই অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে গেমচেঞ্জার হিসেবে ভূমিকা পাওয়া শুরু করতে যাচ্ছে। এ কথাও সত্য, মুসলিম দেশগুলোতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ইসলামপন্থীদের কট্টোর বিরোধী রাশিয়া মিসরের স্বৈরশাসক সিসি এবং সিরিয়ার একনায়ক বাশার আল আসাদের একনিষ্ঠ মিত্র। ফলে আদর্শিকভাবে রাশিয়ার ওপর খুব বেশি নির্ভর করতে পারে না তুরস্ক। সেদিক থেকে সমমনোভাবাপন্ন আঞ্চলিক শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে একটি দুরদৃষ্টিসম্পন্ন সামরিক জোট গঠনের তাগিদ অনুভব করছে তুরস্ক। এ পরিস্থিতিতে একজন অবৈধ সামরিক শাসকের নেতৃত্বাধীন মিসরকে একটি বিশ্বাসযোগ্য জোটের সহযোগী মনে করতে পারছে না তুরস্ক। অন্য দিকে ইরানের শিয়া মতাদর্শীরা বৃহত্তর পারস্য সাম্রাজ্য বিস্তার পরিকল্পনার চেষ্টায় বিভোর। ওই অঞ্চলের গোষ্ঠীগত কর্মসূচি বাস্তবায়নের সঙ্কীর্ণ নীতি ছাড়া অন্য কিছু গুরুত্ব দিচ্ছে না তারা। এ দিক থেকে আরব বিশ্বের প্রতিবিপ্লবের মুখোমুখি সৌদি আরবকেই অন্যতম সহযোগী মনে করা যেতে পারে। কেননা সৌদী জনগণের মনোভাবের সাথে তুরস্কের নীতির মিল রয়েছে। এ ছাড়া সৌদী নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইসলামিক মিলিটারি অ্যালায়েন্স টু ফাইট টেররিজম বা আইএমএফটি সিরিয়ায় খুব একটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। আইএসসহ অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে মোকাবেলায় ৩৯টি মুসলিম দেশের সমন্বয়ে গঠিত আন্তঃরাষ্ট্রীয় এ সামরিক জোটে শুধু কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সৌদি আরবকে দৃশ্যমান অকাঠামোগত সহায়তা দিচ্ছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, ওই অঞ্চলের সমস্যা সমাধানে এবং পশ্চিমা শক্তিগুলোর অযাচিত নাকগলানো ঠেকাতে এ জোট সক্ষম হয়নি। তবে এ জোটকে অকার্যকর প্রতীয়মান করতে যুক্তরাষ্ট্রেরও পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। এ ছাড়াও অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সৌদি আরবকে মার্কিন নীতির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে, আমেরিকার এ মারাত্মক মনোভাবকে সৌদি সরকার সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছে বলে মনে হয় না। এ দিকে ত্রিদেশীয় জোট গঠনের পক্ষে সৌদী সমর্থন মিসরে স্বৈরশাসক বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে অতীতে ভুল শুধরে সামনের দিকে এগোবে নাকি সময় অপচয় করবে, তা ঠিক করা সৌদি আরবেরই দায়িত্ব।
বিশ্ববাজারে তেলের দরপতনের কারণে সৌদীর অর্থনীতি কিছুটা নিম্নমুখী হলেও দেশটি এখনো অর্থনৈতিকভাবে পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র। এ মুহূর্তে আঞ্চলিক শক্তিতে প্রাধান্য বিস্তারে তুরস্কের মতো সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনকারী দেশের প্রতি আস্থা স্থাপন করতে হবে সৌদি আরবকে। কেননা এক সময়ের উসমানিয়া খিলাফতের অধীনে থাকা সৌদি সমাজের মঙ্গল হিতাকাক্সক্ষীতুরস্ক। অন্য দিকে মার্কিন বলয় থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে পরমাণুশক্তিধর পাকিস্তান। মার্কিন বৈরি আরেক শক্তিধর দেশ চীনের সাথে সম্পর্ক গভীর করার মাধ্যমে আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে পাশে পেতে চায় পাকিস্তান। পাকিস্তানের সাথে ঐতিহাসিকভাবে সৌদি আরবের বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। পাকিস্তানকে সৌদি আরবের সবচেয়ে পরম মুসলিম বন্ধু বলে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক জায়ান্ট চীনের সাথে তুরস্কের সম্পর্ক উন্নয়নে পাকিস্তান মাধ্যম হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়াও তুরস্কের সাথে দশকের পর দশক ধরে পাকিস্তানের নানাবিধ সম্পর্ক রয়েছে। গত কয়েক বছরে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম পাকিস্তানে রফতানি করেছে তুরস্ক। এ দিক দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে দুই দেশের সমমনোভাবাপন্ন অবস্থান রয়েছে। ইয়েমেন হামলায় সৌদি জোটে সরাসরি শামিলের প্রস্তাব দিয়েছিল পাকিস্তানকে। কিন্তু হামলায় সরাসরি অংশগ্রহণ উচিত হবে কি না, সে ক্ষেত্রে তুরস্কের পরামর্শ অনুসরণ করতে শুরু করে পাকিস্তান। এ দিকে শক্তিশালী ন্যাটো জোটের সাথে যেমন তুরস্ক যুক্ত রয়েছে, অন্য দিকে মার্কিন-বিরোধী চীন-রাশিয়া নেতৃত্বাধীন সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সদস্য পাকিস্তান। এসব দিক থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনীতিতে সৌদি আরবের সাথে তুরস্ক ও পাকিস্তানের কৌশলগত সাজুয্য রয়েছে। তবে এ কথাও মনে রাখতে হবে, ওই অঞ্চলে আমেরিকার এত দিনের শক্তিশালী অবস্থানে আরেকটি নতুন সামরিক জোটের হানা দেয়া সহজ নয়। কেননা এ ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপের একটি আকস্মিক প্রতিক্রিয়া রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা পূরণে অন্য কোনো শক্তিকে সুযোগ না দিয়ে সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে নিয়ে একটি শক্তিশালী সামরিক ব্লক সৃষ্টি করতে পারে তুরস্ক। ক্রমান্বয়ে অন্য দেশগুলোও এ জোটে যোগ দিতে পারে। এই জোট একবার কর্যকর হয়ে গেলে সৌদি নেতৃত্বাধীন ওআইসির সদস্যরাষ্ট্রগুলোও এর সাথে একীভূত হতে পারে। এভাবে মার্কিন ব্লকের মোকাবেলায় উদ্ভূত নতুন বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সমন্বয়ে নতুন আঞ্চলিক সামরিক জোট গঠনে একটি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ