ঢাকা, বৃহস্পতিবার 17 November 2016 ৩ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ১৬ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

হান্টিংটনের সেই অশনি সংকেত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। নিউইয়র্ক, শিকাগোসহ অন্তত ৭টি বড় শহরে শুরু হওয়া ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ এখন অন্তত আরও ২৫টি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। ট্রাম্পের মালিকানাধীন বিভিন্ন স্থাপনার সামনেও চলছে বিক্ষোভ। ক্যালিফোর্নিয়া শহরে প্রায় ৪০টি অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি হাইস্কুলের শিক্ষার্থীরাও ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। এদিকে আমেরিকার ওরেগন অঙ্গরাজ্যের সর্ববৃহৎ নগর পোর্টল্যান্ডে বিক্ষোভ সহিংস আকার ধারণ করে। ১০ নভেম্বর রাতে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী নগরীর কেন্দ্রস্থলে জড়ো হয়। তারা দোকান ও গাড়ি ভাংচুর করে, পটকা ছুঁড়ে মারে এবং আবর্জনার স্তূপে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ ওই পরিস্থিতিকে দাঙ্গা বলে ঘোষণা করে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পিপার স্প্রে এবং রাবার বুলেট ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনের পর এবার যে পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা অবাক হওয়ার মতো। ক্যালিফোর্নিয়ার বহু লোক তো ট্রাম্পের আমেরিকার সাথে থাকতেই চাচ্ছে না। তারা আমেরিকা থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন থাকতে চায়। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন জাগে, যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ এভাবে বিভক্ত হয়ে পড়লো কেন? ট্রাম্প কী করেছে, কী বলেছে এবং কী বার্তাই বা দিয়েছে? এবার নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প যে উগ্র এবং বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন সেটাই কি বর্তমান সময়ের বিক্ষোভের কারণ? নাকি যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ট্রাম্পের মধ্যে আরো ভয়ানক কিছু দেখতে পেয়েছে?
নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়েছে আইএস ও আলকায়েদা। ট্রাম্পের জয়কে স্বাগত জানিয়ে আইএস বলেছে, তারা এটাই চাইছিল। ট্রাম্প জিতলেই মার্কিন দমননীতি বাড়বে। জঙ্গি দমনের নামে আমেরিকা বিশ্বজুড়ে সাধারণ ও নিরপরাধ মুসলমানদের হেনস্থা করবে। বিদ্বেষবশত মুসলমানদের কোণঠাসা করবেন ট্রাম্প। ফলে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে পাল্লা দিয়ে বাড়বে আলকায়েদা ও আইএস’র জনপ্রিয়তা। নিরীহ, ধর্মনিরপেক্ষ এবং উদার মুসলমানরা আরো বেশি করে ঝুঁকবেন আইএস ও আলকায়েদার দিকে। আইএস ঘনিষ্ঠ আল-মিনবার জেহাদী মিডিয়া নেটওয়ার্ক জানিয়েছে, এখন যত দিন পারে ফুর্তি করুক আমেরিকানরা। তবে ট্রাম্পের হাতেই ওদের ধ্বংস লেখা আছে। কারণ ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যে যেখানেই মার্কিন সেনারা অভিযান চালাবে সেখানেই তাদের জবাই করবে আইএস বা আলকায়েদা। পাল্টা হামলা হবে আমেরিকার মাটিতেও। ট্রাম্পের বিজয়কে আইএস ও আলকায়েদা যে ভাষায় অভিনন্দন জানিয়েছে তাতে শান্তি ও সমঝোতার কোন বার্তা নেই। বরং রয়েছে অশান্তি ও যুদ্ধের বার্তা। ট্রাম্পের কিছু উগ্র ও অযৌক্তিক বক্তব্য তাদের যেন উস্কে দিয়েছে। এ ধরনের বক্তব্য শান্তিপ্রিয় মানুষের কাম্য নয়। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচনী প্রোপাগাণ্ডায় ট্রাম্প যেসব উগ্র ও বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন, বিজয়ী হওয়ার পর তিনি হয়তো আর সে ভাষায় কথা বলবেন না। প্রেসিডেন্টের চেয়ারে বসার পর তিনি হয়তো বাস্তবতা উপলব্ধি করবেন এবং হয়তো যৌক্তিক পথেই চলার চেষ্টা করবেন। এটা তো বিশ্লেষণের আশাবাদ। কিন্তু বাস্তবতা কি সবসময় যৌক্তিক বিশ্লেষণকে মেনে চলে? চলে না, এবারের নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয় তার বড় উদাহরণ। ট্রাম্পের মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্যের প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণার পর দিন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি স্থানে মুসলিম নারীদের লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। আক্রান্তরা একে ‘হেইট ক্রাইম’ বলে অভিহিত করেছেন। পুলিশ এসব ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। আমরা জানি, যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর মানুষ ঘৃণা ও বিদ্বেষের পৃথিবীতে বসবাস করতে চায় না। যারা শাসক হবেন, প্রেসিডেন্ট হবেন তাদের তো ঘৃণার সমাজ সৃষ্টি করার জন্য সাধারণ মানুষ ভোট দেয় না। মানুষ তো শান্তিময় সমৃদ্ধ জীবনের লক্ষ্যেই ভোট দিয়ে থাকে। মানুষের মনের এ কথাটি ট্রাম্প বুঝতে সক্ষম হন কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক স্যামুয়েল পি হান্টিংটন তাঁর ‘ক্ল্যাশ অফ সিভিলাইজেশন’ গ্রন্থে সভ্যতার সংঘাত প্রসঙ্গে যে তত্ত্ব ঝেড়েছেন তা সামনে রাখলে তো ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পর্কে প্রশ্ন জাগে। নানাবিধ বক্তব্য ও বিশ্লেষণের সাথে হান্টিংটন এই দাবিও করেছিলেন যে, পশ্চিমা সভ্যতা ও হিন্দু সভ্যতা একজোট হয়ে আগামীতে ইসলামী সভ্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। আর চৈনিক সভ্যতা ইসলামী সভ্যতার সাথে ঐক্য গড়ে তুলবে। উল্লেখ্য যে, এই তত্ত্ব নাইন-ইলেভেনের সাত বছর আগে উপস্থাপন করা হয়েছিল। নাইন-ইলেভেনের পর পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে সেদিকেই যেন ধাবিত হচ্ছে। এবারের মার্কিন নির্বাচনে ভারত ও বাংলাদেশের হিন্দুরা ভোট দিয়েছেন ট্রাম্পকে, আর মুসলমানরা ভোট দিয়েছেন হিলারিকে। নির্বাচনের ফলাফল যেন সভ্যতার সংঘর্ষের আশংকাকেই রূপ দিতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের হিন্দুদের রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশী সংখ্যালঘুরা। পাশাপাশি বাংলাদেশে একটি প্রতিনিধিদল পাঠানোর জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন তারা। এনআরবি নিউজ পরিবেশিত খবরে আরো বলা হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলা এবং মন্দির ভাংচুরের ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে ১১ নভেম্বর নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দফতরের সামনে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের যুক্তরাষ্ট্র শাখা আয়োজিত মানববন্ধন থেকে ওই আহ্বান জানানো হয়। উল্লেখ্য যে, এবার আমেরিকার নির্বাচনে বাংলাদেশ ও ভারতের অধিকাংশ হিন্দুই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন করেছেন। নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণের পাশাপাশি তারা নগদ অর্থও প্রদান করেছেন।
আমরা জানি, ঐতিহাসিক কারণেই আমাদের এই উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার সমস্যাটি এখনও রয়ে গেছে। তবে এই সমস্যার মাত্রা সব দেশে এক রকম নয়। আমাদের উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক সমস্যার মাত্রা ভারতে সবচেয়ে বেশি। আর এর মাত্রা সব চেয়ে কম বাংলাদেশে। এ কারণেই বাংলাদেশকে বলা হয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। আর এবার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর যে হামলা হয়েছে তার লক্ষণ কিন্তু সাম্প্রদায়িক নয়। বরং পত্র-পত্রিকার খবর ও বিশ্লেষণে রাজনৈতিক চরিত্রটি উঠে এসেছে। ক্ষমতাসীন দলের কোন্দল, পদ বঞ্চনাসহ রাজনৈতিক বিতণ্ডা মুখ্য বিষয় বলে এলাকার মন্ত্রীও উল্লেখ করেছেন। আমরা মনে করি নাসিরনগরের ঘটনার যথাযথ তদন্ত ও বিচার সম্পন্ন হওয়ার পর আমরা পুরো বিষয়টা স্পষ্টভাবে জানতে পারবো। তবে আশার কথা হলো, নাসিরনগরসহ দেশের জনগণ হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাথে সাথে রুখে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশে এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারও সংখ্যালঘুদের অধিকার ও নিরাপত্তার ব্যাপারে খুবই সচেতন ও আন্তরিক। প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ করা যায় যে, নাসিরনগরের ঘটনা নিয়ে দেশে এবং বিদেশে এতো হৈচৈ করার পরও কেউ তো বলতে পারছেন না যে, সেখানে একজন হিন্দুরও প্রাণহানি হয়েছে। অথচ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে তো প্রতিবছরই নানা ছুতোয় মুসলমানদের হত্যা করা হচ্ছে। শুধু গরুর গোস্ত খাওয়ার অপরাধে মুসলমানদের পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে তো দেশে কিংবা বিদেশে কাউকে উচ্চকণ্ঠ হতে দেখা যায় না। কিন্তু আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের হিন্দুদের রক্ষায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ কামনা করা হবে কেন? ডোনাল্ড ট্রাম্প কি বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট? আর উগ্র ও বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যের কারণে এখন তো যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের উপর হামলার নানা ঘটনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এমন একজন প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানালো তারা কোন্ কাণ্ডজ্ঞানে? আমরা তো এ কথা জানি যে, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বাংলাদেশের সব নাগরিকের জানমাল-ইজ্জতের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকারের। এ ক্ষেত্রে কোন ত্রুটি লক্ষ্য করা গেলে তা বলতে হবে বাংলাদেশ সরকারকেই। আর সরকার যদি এ ক্ষেত্রে ভূমিকা পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দেয় তাহলে সংবিধানের আলোকে যে কোন পদক্ষেপ গ্রহণের অধিকার রাখে মজলুম সম্প্রদায়সহ দেশের জনগণ।
নাসিরনগরের ঘটনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সংখ্যালঘুরা যে প্রোপাগাণ্ডা চালালো তাতে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ হয়েছে। কিছু দিন আগে নাসিরনগরের ঘটনা নিয়ে ভুল বার্তা দিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুষমা স্বরাজও। আর ১০ নভেম্বর রাতে বিবিসির প্রবাহ টেলিভিশন অনুষ্ঠানে খুবই আপত্তিকর কথা বলেছেন আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা এবং সাবেক মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে যে ধরনের সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, সবার মধ্যেই সংখ্যালঘুদের বিতাড়নে ঐক্যবদ্ধ মনোভাব লক্ষ্য করা গেছে। এমন বক্তব্যের পর প্রশ্ন জাগে, এসব কিসের আলামত? হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, সুষমা স্বরাজ ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত যে ভাষায় কথা বললেন, তাতে তো মনে হচ্ছে হান্টিংটনের দেখানো পথেই ওরা হাঁটতে চাইছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ