ঢাকা, শুক্রবার 18 November 2016 ৪ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ১৭ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সেবাদাস

হেলাল আরিফীন : জুতোজোড়া খুবই মনোযোগ দিয়ে পালিশ করছে সেবাদাস। নিজের সবটুকু মনন ঢেলে, অনেক যত্ন করে। অনেকটা সময় ধরে ব্রাশ করাতে জুতোজোড়া দিঘীর কালো জলের মতো চকচকে হয়েছে। জুতোজোড়া হাতে নিয়ে কলিংবেলের সুইচে হাত রাখল সে। কিন্তু সুইচটা টিপল না, কি ভেবে যেন থেমে গেল। তারপর জুতোজোড়া বাক্সের মধ্যে রেখে বাক্সটা কাঁধে  নিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটতে শুরু করল সে।
গলির মুখেই একটা খালি রিকশা পেয়ে তাতে উঠে পড়ল সেবাদাস। রিকশাটা কিছুটা দূরত্বে চলে আসতেই বাক্সের ভেতর থেকে জুতোজোড়া বের করে চোখের সামনে মেলে ধরল সে। আর জুতোজোড়ার দিকে তাকিয়ে খুশিতে চোখদুটো জ্বল জ্বল করে উঠল তার। খুশি হওয়ারই কথা, এক জোড়াজুতো না থাকলে তার ছেলে নরেনের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে।
অনেক চেষ্টা চরিত্র করেও ছেলের জন্য এক জোড়া জুতো কিনে দিতে পারে নি সে। পারবে কী করে, মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে জুতো-স্যান্ডেল মেরামত করে যা উপায় রুজি হয়, তা দিয়ে তিনবেলার তিনমুঠো অন্ন জোগানই কঠিন। স্বামী-স্ত্রী ও এক সন্তান সহ তিনজনের সংসারে অন্যান্য খরচও তো কম নয়। তবু ছেলেটাকে লেখাপড়া করানোর খুব ইচ্ছে সেবাদাসের। তাই বংশ পরম্পরায় বাপদাদার এই পেশায় না ঢুকিয়ে ছেলেকে স্কুলে দিয়েছে সে। কিন্তু ওর স্কুলের যা বায়নাক্কা, আজ এ লাগবে তো কাল সে লাগবে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। ঘরের দরজার পাশে দাঁড়িয়েই হাঁক ছাড়ল সেবাদাস- বউ, কুনঠে গেলি? দুরোজা খুল না?
মালতি দরজা খুলে দিয়ে  বিরক্তির গলায় বলল, ষাঁড়ের মতোন চিল্ল¬াইতাছো কেনে, দরোজায় ধাক্কা দিলেই তো খুলি দিই।
মালতি স্বামীর কাঁধ থেকে বাক্সটা নিয়ে মেঝেতে নামিয়ে রাখতে বলল, আইজ এতো সোকাল সোকাল ফিরা এলে কেনে? এমনে ইলাম রে বউ, তুই হামারে দেখি খুশি হুশ নাই?
মালতি ঠোঁট উল্টে বলল, তুমারে দেখি হামার খুশি হইনের কী আছে?
অ, তুই হামারে দেখি খুশি হুশ নাই। আইচ্ছা, তাহলে চলি যাই?
সেবাদাস দরজার কাছে আবার এগিয়ে যেতেই মালতি গিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে হেসে বলল, আরে, কুনঠে যাও? মুখ হাত ধুয়ে আসো। হামি খাবার গরম করে আনছি।
সেবাদাস তক্তপোশে বসতে বসতে বলল, নরেন কুনঠে গ্যাছে?
খিলতে গ্যাছে।
বাক্সর ভেতর থেকে জুতোজোড়া বের করে সেবাদাস মালতির সামনে ,ধরে রেখে খুশি গলায় বলল, ইটি কী হেনেছি দ্যাখ..
মালতি জুতোজোড়ার দিকে তাকিয়ে খুশি গলায় বলল, জুতা হেনেছো? হামার নরেনের লাগি তুমি জুতা হেনেছো? কাইল থিকে হামার  নরেন ইস্কুলে যিতে পারবিক।
বিকেলে খেলা থেকে ফিরে এসে নরেন জুতোজোড়া দেখে খুব খুশি হলো। জুতোজোড়া পরে মেঝেতে একটু হাঁটাহাঁটি করে এসে নরেন বলল, জুতা কুনঠে থিকে কিনিছো বাজান?
জুতা তো হামার পায়ে বড় বড় লাগিছে?
সেবাদাস ইতস্তের গলায় বলল, জুতা তো কিনি হানি নাই বাপজান?
নরেন কিছুটা বিম্মিত হয়ে বলল, কিনি হানো নাই তাহলি কুনঠে থিকি আনছো?
সেবাদাস দুখি গলায় সবকিছু খুলে বলল।  সব শুনে  নরেন কান্নামিশ্রিত গলায় বলল,  এই জুতা তো হামি পরবি না বাজান? এই জুতা তুমি এখনই ফিরত দিয়া আসবি। এই জুতা থাকলি হামি আর স্কুলেও যাইবে না।
সেবাদাস জুতোজোড়া ফেরত দেয়ার জন্য বাক্সে ভরে তখনই বাসা থেকে বের হয়ে গেল।

সুমন বাক্স থেকে জুতোজোড়া বের করে পরতে পরতে খুশি গলায় বলল, আগেরটা চেয়ে এই সুটা খুব ভালো আম্মু।
শায়লা হেসে বললেন, ভালো তো হবেই , নতুন জুতো ভালো হবে না? এমন লোকের কাছে জুতো পালিশ করতে দিলে সে নিয়ে চলে গেল?
সুমন বলল, আমি কি জানতাম লোকটা আমার জুতো নিয়ে চলে যাবে? পালিশ হওয়ার পর কলিং বেল টিপবে বলেছিল।
কলিংবেলটা বেজে উঠতেই শায়লা পাশের রুম থেকে বললেন, সুমন দেখ তো কে এসেছে?
সুমন দরজা খুলে দেখল জুতো হাতে  সকালের সেই লোকটা দাঁড়িয়ে আছে। সুমন ভেতরে গিয়ে শায়লাকে ডেকে আনল। শায়লা এসে সেবাদাসের দিকে রুঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রাগি গলায় বললেন, আমার ছেলেকে জুতো না দিয়ে কোথায়  চলে গিয়েছিলে? তোমার জন্য এখনই আবার নতুন জুতো কিনতে হলো?
সেবাদাস জুতো জোড়া মেঝেতে রেখে বুকের উপর হাত দুটো জড়ো করল। শায়লা এবার ধমকের গলায় বললেন, কী ব্যাপার, কথা বলছ না কেন? জুতো নিয়ে কোথায় হাওয়া  হয়ে গিয়েছিলে?
সেবাদাসের ঠোঁট দুটো কাঁপতে শুরু করলো। মুখ  ফুটে স্পষ্টভাবে কিছুই বলতে পারল না সে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ