ঢাকা, শুক্রবার 18 November 2016 ৪ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ১৭ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বইপত্র

প্রাচীনকালের পরের কালের রূপকথা
লেখক : আশরাফ পিন্টু
প্রচ্ছদ: সিকদার আবুল বাশার
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৬
মূল্য : ১৫০টাকা
প্রকাশনী: গতিধারা, ঢাকা।
 
কবি, লেখক ও গবেষক আশরাফ পিন্টু এমনি অন্তর দৃষ্টি সম্পন্ন  একজন জীবনশিল্পী। সাধারণ বিষয়বস্তুও শিল্পশ্রীম-িত হয়ে উঠেছে তার কলমের আঁচড়েÑ একথা কোনোক্রমেই বলা যেত না যদি না তার অণুগল্পের বই ‘‘প্রাচীনকালের পরেরকালের রূপকথা’’ পড়ার সুযোগ না হতো। লেখকের ভূমিকা থেকে আমরা জানতে পারি এটি তার চতুর্থ অণুগল্পগ্রন্থ। বাংলাসাহিত্যে অনেকেই মনোমুগ্ধকর ছোটগল্প লিখেছেন। খুব ছোট আকারে গল্প লিখেছেন বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায়Ñ তিনি বনফুল ছদ্মনামেই খ্যাত। তাঁর কোনো কোনো ছোটগল্প এতই ছোট যে পোস্টকার্ডে লিখলেও জীবনের একটি মনোমুগ্ধকর একটা ছবি ফুটে উঠত তাতে। আশরাফ পিন্টুর এই বইতে ৪১টি অণুগল্পের মধ্যে ৩টি অণুগল্পের পরিধি প্রায় ৫ লাইন (মানচিত্র), সাড়ে ৪ লাইনের (ডাঁটি লাগানো কুড়াল) এবং ৩ লাইনের (নিখোঁজ সংবাদ)। গল্প তিনটি অণুগল্পের নিরিখে এতই ছোট যে চায়ের কাপে এক চুমুক দেওয়ার সময়কালের মধ্যেই তা শেষ হয়ে যায়। অথচ কী অসাধারণ বক্তব্য এবং টিপ্পনীকাটা মন্তব্য। শুনতে প্রায় চুটকির মতো কিন্তু রূপকাশ্রিত তার মূলকথা বিদ্যুতের মতো পাঠক চিত্তে একটি উপলব্ধি জাগ্রত করে।
এবার উদাহরণ স্বরূপ বলি ‘ডাঁটি লাগানো কুড়াল’-এর মূলকথা। এতো সহজ অথচ এর ভেতরে লুকিয়ে আছে সেই চিরসত্য বাণী ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’। মেঘনাদের শত্রু যে তার খুল্লতাত বিভীষণ। মেঘনাদের মতো এ গল্পের প্রতিবেশীর (বাঁশের) দুঃখ তো একটাইÑ ‘কুড়ালের সাথে একটি বাঁশের ডাঁটিও লাগানো ছিল, নইলে কুড়াল কখনো একা এ কাজ করতে পারত না।’ লেখকের উপলব্ধি গভীর, প্রখর অথচ গল্প উপস্থাপনায় আছে সহজ-সরল কৌশল। গল্প বলার এই যে সহজ-সরল কৌশল এবং গভীর উপলব্ধিÑএই দুটি শিল্পগুণ পাঠকচিত্তকে গভীর ভাবে বিমুগ্ধতার জালে আবদ্ধ করে। অনুরূপ ভাবে মাত্র দুই মিনিটে ‘মানচিত্র’ ও ‘নিখোঁজ সংবাদ’ অণুগল্প দুটি পাঠ করে পাবেন দুটি মর্মবাণী: একটু সচেতনতার অভাবে মানবজীবনে কীভাবে বিনষ্ট হয়ে যায় মূল্যবান দূর্লভ সম্পদ (মানচিত্র) এবং এও দেখি Ñ মিথ্যা আশ্বাসে জনগণকে প্রলুব্ধ করার হাস্যকর কৌশল আমাদের সমাজে ঘটছে অহরহ (নিখোঁজ সংবাদ)।
আশরাফ পিন্টুর গল্পে দেশের অন্যায়-অত্যাচারের কথা আছে পশু-পাখির জবানিতে। আর বিচারের অঙ্গুলি সংকেত আছে পাঠকের কাছে। পশু-পাখির জবানিতে অসাধারণ সত্য কথা প্রকাশ পেয়েছে; যেমনÑ‘সাজতে গুজতে ফিঙে রাজা’ গল্পে টিয়ে পাখি রাজাকে বলেছে: ‘আপনি ক্ষমতায় থাকতে কীভাবে (নিরপেক্ষ) রাজা নির্বাচন হবে?’ আবার ‘ষষ্ঠী রাজার দর্শন’ গল্পে আছে- পশুরাজ্যের হিং¯্র পশুরা পোষ না মানলে সবাইকে গুলী করে মেরে ফেলার নির্দেশ। রাজা চান তাঁর আজ্ঞাবহ অনুগত মানুষ। রাজার মতাদর্শের জন্যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ লৌহমানবের বদলে চাই ভঙ্গুর মনোভাবের তুষারমানব। তুষার আগুনের উত্তাপ পেলে গলে তরল হয়ে যায়, তাই রাজার চাই সেই তুষারমানব। রূপকাশ্রয়ী এ গল্পে সে কথাই ধ্বনিত। ‘হ্যাট সমস্যা’, ‘ পোশাকের বিদ্রোহ’ অন্য ধরণের ব্যঙ্গরসের দুটি রূপক গল্প। এখানে আছে মানুষের মজ্জাগত মন্দ স্বভাব, অণুকরণ প্রিয়তা ও কৃত্রিমতায় আচ্ছন্ন জীবনাচরণের কুফলের কথা। তেমনি ব্যঙ্গরসের মোড়কে আছে আরো দুটি গল্পÑ‘মাকড়সা ও মানুষ’ এবং ‘জানে আলম সমাচার’। এখানে আছে  লজ্জাহীন মানুষের নিকৃষ্টতার কথা এবং ফরমালিন ব্যবসায়ীর মরণের পরেও হাস্যকর পরিণতির কথা।
কলেবর বেড়ে যায় তবু গল্পের প্রতি অনুরাগের জন্যে অন্তত একটি গল্পের কথা বলি। গল্পের নাম ‘তালগাছ’। রবীন্দ্রনাথের ‘তালগাছ’ কবিতায় উন্নত আকাক্সক্ষার কথা উচ্চারিত। আর আশরাফ পিন্টুর ‘তালগাছ’ গল্পটি রূপক ও সাংকেতিকতায় প্রকাশ পেয়েছে দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমের কথা। স্বার্থসিদ্ধির কবলে পড়ে দেশে দল বিভাজনের মতো এ গল্পে লালদল, সবুজদল আছে। ওদের অধিকারের সংগ্রামে তালগাছ একবার লালদলের কবলে, আরেকবার সবুজদলের কবলে পড়ে। তালগাছের স্থিতি নেই, শান্তি নেই। শেষ পর্যন্ত তালগাছের কন্ঠে শুনি মায়ের মতো , দেশের মাটির মতো একটি উদাত্ত আহ্বান: ‘আমার শিকড় দু’পক্ষের সীমানায় ছড়িয়ে পড়েছে। কাজেই কেউ আমার পর নয়। আমি দু’পক্ষের মাঝেই মিলে-মিশে বসবাস করতে চাই।’ আশরাফ পিন্টুর ‘তালগাছ’-এর কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত এই ধ্বনিমাল্য সত্যিকারের দেশপ্রেমেরই কণ্ঠস্বর।
পরিশেষে আর মাত্র দু’টি কথা বলতে ইচ্ছে করছে: ১. এ বইখানি যেন একালের ‘কথা সরিৎ সাগর’-এর মর্যাদা লাভ করে। ২.ক্ষুধার্ত,তৃষ্ণার্ত মানুষের কণ্ঠস্বরের প্রতীক হিসাবে সাহিত্য স¤্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের বহুল প্রশংসিত ‘বিড়াল’ প্রবন্ধটি কলেজ পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত আছে।  একালে শিশুশ্রেণিতে ‘জলপরি ও কাঠুরে’ উপদেশমূলক গল্পটি পাঠ্য। তেমনি প্রত্যাশা Ñ কোনো একদিন তালগাছের মতো উৎকৃষ্ট উপদেশমূলক রূপক গল্পটি শিশুশ্রেণিতে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত হবে। এর জন্যে দীনেশচন্দ্র সেনের মতো উদার প্রাণের একজন লেখকের সহযোগিতা আবশ্যক।
-মনোয়ার হোসেন জাহেদী

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ