ঢাকা, শুক্রবার 18 November 2016 ৪ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ১৭ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অপরাধ জগতে অবৈধ বিদেশী

বাংলাদেশে অবৈধভাবে বসবাস এবং চাকরি ও ব্যবসাসহ নানা ধরনের কাজে নিয়োজিত বিদেশীদের সম্পর্কে অনেক উপলক্ষেই বলা হয়েছে। এদের সংখ্যাও কয়েক হাজার মাত্র নয়। কোনো কোনো পরিসংখ্যান অনুযায়ী অবৈধ বিদেশীদের সংখ্যা সাত-আট লাখেরও বেশি। কিন্তু সব জানা সত্ত্বেও সরকারের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এমন অবস্থার সুযোগ নিয়েই একদিকে হাজার হাজার বিদেশী অবৈধভাবে প্রবেশ ও বসবাস করছে, অন্যদিকে বেড়ে চলেছে তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। দৈনিক সংগ্রামের এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, মাদক ব্যবসা, জাল টাকা ছাপানো, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি এবং মোবাইলের মাধ্যমে লটারি জেতার খবর জানিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়ার মতো কার্যক্রম তো চালাচ্ছেই, ছিনতাই-ডাকাতি ও খুন করা পর্যন্ত ভয়ংকর ধরনের অপরাধেও জড়িত রয়েছে অবৈধ এই বিদেশীরা। হঠাৎ কখনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলেই কেবল আইন-শৃংখলা বাহিনী তৎপর হয়ে ওঠে। যেমন লটারিতে টাকা ও এলইডি টিভি পাওয়ার খবর জানিয়ে বিকাশের মাধ্যমে ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে গত সোমবার উত্তরা এলাকা থেকে চারজন বিদেশীকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। 

এটা সাম্প্রতিক সময়ের একটি ঘটনা মাত্র। অন্যদিকে দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, নানা ধরনের অপরাধে জড়িত অবৈধ বিদেশীদের সংখ্যা এত বেশি যে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পর্যন্ত তাদের সকলকে চিহ্নিত করার ব্যাপারে রীতিমতো অসহায় হয়ে পড়েছে। উদ্বেগের একটি বড় কারণ হলো, অবৈধ বিদেশীদের প্রকৃত সংখ্যা এবং তাদের কতজন দেশের কোথায়, কোন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছে এবং কতজন দৃশ্যমান কোনো কাজ ছাড়া এমনিতেই বসবাস করছে- এসব বিষয়ে সরকারের কোনো বিভাগ বা সংস্থার কাছেই কোনো তথ্য-পরিসংখ্যান নেই। মাত্র কিছুদিন আগে অজ্ঞতার বিষয়টি স্বীকার করেছেন স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। যে তিনটি সরকারি প্রতিষ্ঠান বিদেশীদের চাকরি, ব্যবসা বা অন্য কোনো কাজের অনুমতি দিয়ে থাকে সে তিনটির তথা বিনিয়োগ বোর্ড, বেপজা বা এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন এবং এনজিও ব্যুরোর তথ্য হলো, বৈধভাবে বিদেশী রয়েছে মাত্র সাড়ে ১৬ হাজার। এভাবে সরকারের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে সাড়ে ৯৫ হাজার বিদেশী অবৈধভাবে বসবাস করছে। 

ওদিকে ভীতিকর কিছু তথ্য জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ- সিপিডি। সংস্থাটির এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে শুধু ভারতেরই পাঁচ লাখের বেশি নাগরিক অবৈধভাবে চাকরি ও ব্যবসা করছে। এই ভারতীয়রা ২০১৫ সালের এক বছরেই তাদের দেশে নিয়ে গেছে অন্তত ৩০ হাজার কোটি টাকা। অন্য কিছু সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে অবৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশীরা প্রতি বছর ৪০ হাজার কোটি টাকা তাদের দেশে পাঠাচ্ছে। তাদের সংখ্যা পাঁচ থেকে সাত লাখ। গার্মেন্ট, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, বিজ্ঞাপনী সংস্থা এবং মোবাইল ফোন কোম্পানি পর্যন্ত নানা ধরনের প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে কর্মরত রয়েছে তারা। অনেকে ট্যুরিস্ট ভিসায় দু’চার মাসের জন্য এসে চাকরিতে ঢুকেছে, অনেকে আবার ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে এলেও সে পারমিট আর নবায়ন করেনি। সবকিছুর পেছনে রয়েছে সরকারি সংস্থাগুলোর গাফিলতি। অবৈধ বিদেশীদের সংখ্যা এবং তারা কোথায় কোন ধরনের চাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্য করছে এসব বিষয়ে সরকার কিছু জানার চেষ্টা করে বলেও মনে হয় না। উল্লেখ্য, স্বল্পসংখ্যক ছাড়া অবৈধ বিদেশীদের প্রায় সবাই ভারতীয় নাগরিক। বিভিন্ন অপরাধ যারা সংঘটিত করছে তাদের মধ্যে ভারতীয়রা তো রয়েছেই, পাশাপাশি নাইজেরিয়া, কঙ্গো, ঘানা, লিবিয়া, ইরাক, তানজানিয়া, উগান্ডা, সুদান, আলজেরিয়া, ফিলিপাইন এবং শ্রীলংকার নাগরিকদের জড়িত থাকার খবরও জানা যাচ্ছে।

এমন অবস্থার কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তথ্যাভিজ্ঞরা বলেছেন, ভিসা এবং ওয়ার্ক পারমিটের ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো মনিটরিং করা হয় না বলে অবৈধ বিদেশীরা বসবাস শুধু নয়, চাকরির পাশাপাশি চুটিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যও করছে। অনেকের এমনকি পাসপোর্ট পর্যন্ত নেই। এ ধরনের বিদেশীরাই অপরাধেও বেশি জড়িত বলে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে উত্তরায় ছাত্র হত্যাসহ বেশ কিছু ঘটনার উল্লেখ রয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে অবৈধ বিদেশীরা জড়িত। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, লাখ লাখ বিদেশীর অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ এবং চাকরি ও ব্যবসার পাশাপাশি অপরাধে জড়িত থাকার খবর নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ভীতিকর। বলা বাহুল্য, সরকারের গাফিলতিই এমন অবস্থার প্রধান কারণ। বিদেশীদের ব্যাপারে সরকারের কোনরকম মনিটরিং নেই বললেই চলে। অথচ বিদেশীরা কোথায় কি করছে বা কোন ধরনের তৎপরতা চালাচ্ছে এসব বিষয়ে পুলিশ ও গোয়েন্দাদের মাধ্যমে খোঁজ-খবর রাখা সরকারের কর্তব্য। ভিসার মেয়াদ শেষে বিদেশীরা ফিরে যাচ্ছে কি না তা মনিটর করা এবং ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর কেউ থেকে গেলে তাকে বহিষ্কার বা গ্রেফতার করাসহ আইনত ব্যবস্থা নেয়াও সরকারের কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। অন্যদিকে সরকার দেখিয়ে চলেছে চরম গাফিলতি। এ অবস্থার সুযোগ নিয়েই ভারতীয়দের অনুসরণ করে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের লোকজনও বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। 

আমরা মনে করি, এমন অবস্থা চলতে দেয়া যায় না। সরকারের উচিত অতি কঠোর ব্যবস্থা নেয়া যাতে বিদেশীদের পক্ষে অবৈধভাবে প্রবেশ করা এবং চাকরি ও ব্যবসার আড়ালে বসবাস করা সম্ভব না হয়। এজন্য মনিটরিং-এর ব্যবস্থা নিশ্চিত ও জোরদার করতে হবে। কতজন বিদেশী আসছে, তারা ঘোষিত উদ্দেশ্যের বাইরে কোনো কাজ করছে কি না, তারা অপরাধে জড়িত রয়েছে কি না- এসব বিষয়ে মনিটরিং থাকতে হবে। ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে যারা আসছে তাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বহিষ্কার বা গ্রেফতার করতে হবে। অবৈধ জেনেও যেসব কোম্পানি বিদেশীদের চাকরিতে রেখেছে তাদের বিরুদ্ধেও লাইসেন্স বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা মনে করি, দেশের ভেতরে বেকারত্ব কমানোর পাশাপাশি অপরাধ প্রতিহত করতে হলে দেশ থেকে অবৈধ বিদেশীদের বিদায় করার বিকল্প নেই। দেশের নিরাপত্তার প্রশ্নটিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেয়া দরকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ