ঢাকা, শুক্রবার 18 November 2016 ৪ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ১৭ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আইন এবং প্রয়োগ দুটোই সমান্তরাল চলতে হবে

জিবলু রহমান : পৃথক পৃথক আইনের আওতায় গঠিত হলেও মেরুদণ্ডহীন হয়ে আছে দেশের স্বাধীন কমিশনগুলো। কিছু ক্ষেত্রে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করার মানসিকতা পোষণ করছে না। আবার কিছু ক্ষেত্রে আইনি সীমাবদ্ধতা ও সরকারের আন্তরিকতার অভাবে অকার্যকর হয়ে আছে। নামে স্বাধীন কমিশন হলেও একটি কমিশনও জনস্বার্থে তেমন কোনো ভূমিকা রাখছে না। এ জন্য আইনি দুর্বলতা, আর্থিক নির্ভরশীলতা ও রাজনৈতিক বিবেচনায় কমিশন প্রধানদের নিয়োগ দেয়াসহ নানা কারণ রয়েছে।

স্বাধীন কমিশনগুলোর দুরবস্থার পেছনে কারণ হলো, ‘যেসব আইনের আওতায় কমিশনগুলো গঠিত, সে আইনেই ক্ষমতা কম দেয়া হয়েছে। ইচ্ছাকৃতভাবেই কমিশনগুলোকে দুর্বল প্রতিষ্ঠান হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ এসব কমিশনের ক্ষেত্রে সরকারের অর্থ বরাদ্দ কম থাকে। এটাও তাদের দুর্বল হওয়ার অন্যতম কারণ। তৃতীয়তঃ দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে কমিশনগুলোর চেয়ারম্যান বা সদস্য নিয়োগে যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক মতাদর্শকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয় এবং চতুর্থতঃ জাতি গঠনে ও দেশের স্বার্থে এ ধরনের কমিশনের গুরুত্ব, অবদান সম্পর্কে যারা সরকার চালান তাদের কোনো স্বচ্ছ ধারণা থাকে না। যতদিন এসব কমিশন দুর্বল থাকবে ততদিন দেশ দারিদ্র্যসীমার ঊর্ধ্বে উঠতে বা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে পারবে না।

আইন কমিশন

১৯৯৬ সালে আইন কমিশন প্রতিষ্ঠা করে সরকার। কমিশনের মূল কাজ-পুরনো আইনের সংশোধন, পরিবর্তন ও পরিমার্জন করে আইনটি যুগোপযোগী ও জনকল্যাণকর করে তোলা। এ ছাড়া অকার্যকর আইন বাতিলের এবং নতুন আইন প্রবর্তনের জন্য সরকারকে সুপারিশ করা, আইনের অপব্যবহার রোধে সুপারিশ করা, বিচার ব্যবস্থার আধুনিকায়নে প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুপারিশ করা, দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলাসমূহ নিষ্পত্তিতে বিলম্বের কারণসমূহ চিহ্নিতকরণ, আদালত ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক নিয়ে সুপারিশ, আইনগত সহায়তা কার্যক্রম কীভাবে কার্যকর করা যায় সে ব্যাপারে সুপারিশ, সরকার কোনো বিষয়ে আইনগত মতামত চেয়ে পাঠালে তা প্রদান করা উল্লেখযোগ্য।

আইন কমিশন আইনের ৯ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কমিশন কোনো প্রতিবেদন চূড়ান্ত করলে তা সরকারের কাছে পেশ করবে এবং সরকার প্রতিবছর সংসদের প্রথম অধিবেশনে ওই সুপারিশ বাস্তবায়নসম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন পেশ করবে।’ কিন্তু এ আইন শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

প্রায় ১৯ বছর আগে গঠিত এ কমিশন থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আইনের পরিবর্তন, পরিমার্জনসংক্রান্ত ১৩২টি সুপারিশ পাঠানো হয়েছে সরকারের কাছে। কিন্তু দু-একটি ছাড়া কোনো সুপারিশই আমলে নেয়নি সরকার। (সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর ১৯ জানুয়ারি ২০১৫) 

২৯ ডিসেম্বর ২০১৪ আইন কমিশন সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয় নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করে। সেখানে একজন সদস্যের সঙ্গে মতবিরোধের জের ধরে মাঝপথেই সংবাদ সম্মেলনস্থল ত্যাগ করেন এর চেয়ারম্যান এবিএম খায়রুল হক। কমিশনের সদস্য অধ্যাপক শাহ আলমের সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি।

ওই সংবাদ সম্মেলনে গত এক বছরের কাজের বিবরণ উপস্থাপন করার পর চেয়ারম্যান খায়রুল হকের কাছে সাংবাদিকরা জানতে চান এ পর্যন্ত যেসব সুপারিশ পাঠানো হয়েছে তার কি কি সরকার বাস্তবায়ন করেছে? জবাবে খায়রুল হক বলেন, ‘সেটা আপনারা সরকারকে জিজ্ঞাসা করুন। আমার কাছে কোনো ফিডব্যাক নেই। তবে আমি ফিডব্যাক প্রত্যাশা করি।’ 

এ পর্যায়ে কমিশনের সদস্য ড. শাহ আলম বলেন, ‘গত ৬ বছর ধরে আমি এখানে কর্মরত। এ সময়ের মধ্যে ৩৯টি সুপারিশ পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আকারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আইন অনুযায়ী এগুলো তারা সংসদে পাঠাতে বাধ্য। কিন্তু একটি সুপারিশও তারা পাঠায়নি।’ 

এ সময় সাবেক প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর আইন কমিশনে নিয়োগ পাওয়া খায়রুল হক বলেন, ‘এটা তার (শাহ আলম) ব্যক্তিগত মত, কমিশনের নয়।’ তখন শাহ আলম বলেন, এটা মতামতের বিষয় নয়। সাংবাদিকরা যে তথ্য জানতে চেয়েছেন আমি সে তথ্যই উপস্থাপন করেছি। এখানে মতামত দেয়ার কিছু নেই। এ পর্যায়ে বিচারপতি খায়রুল হক ক্ষুব্ধ হয়ে সংবাদ সম্মেলন থেকে চলে যান।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) 

বিশ্বিবিদ্যালয় শিক্ষার সংবিধিবদ্ধ শীর্ষ সংস্থা হিসেবে ইউজিসির উদ্দেশ্য হচ্ছে-উচ্চশিক্ষার গুণগত মান বাড়ানো ও শক্তিশালী করা। দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির পাঠদান ও গবেষণা কার্যক্রমের মান ঠিক রাখাও মুখ্য বিষয়। এর আরও লক্ষ্য হচ্ছে-একাডেমিক শৃংখলা, অর্থনৈতিক জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিতের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় গুণগত উন্নয়ন সাধন। কিন্তু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণে ও গুণগত মান বজায় রাখতে প্রতিষ্ঠানটির বিশেষ ভূমিকা নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলছে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। ঘটছে সার্টিফিকেট বাণিজ্যের মতো ঘটনা। প্রতিটি সেশনে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ছাত্রছাত্রী ভর্তির নিয়ম থাকলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তা মানছে না। একটির বেশি ক্যাম্পাস না রাখা, নিজস্ব ক্যাম্পাস থাকার বিষয়ে আইন থাকলেও ক্ষেত্রবিশেষে তা মানা হচ্ছে না। এসব বিষয়ে দেখভালের দায়িত্ব ইউজিসির। সেই ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হচ্ছে সংস্থাটি।

২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য চূড়ান্ত সতর্কতা জারি করেছিল শিক্ষামন্ত্রণালয়। কিন্তু ওই বাধ্যবাধকতা ততটা আমলে নেয়নি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। পরবর্তীতে স্থায়ী ক্যম্পাসে যাওয়ার সময় কয়েক দফা বাড়ানো হয়।  অথচ গত পাঁচ বছরেও স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি ৩৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।

আবার অনেক বিশ্ববিদ্যালয় অন্যত্র স্থায়ী ক্যাম্পাস দেখিয়ে ঢাকায় সিটি ক্যাম্পাস নামে অবৈধ শাখা ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে। আবার কেউ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সংযুক্ত ক্যাম্পাসের নামে অবৈধ শাখা ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে। অনেকের বিরুদ্ধে নির্ধারিত জমির চেয়ে কম জমিতে ভবন নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই ভবন নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। 

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে বলা আছে, যাত্রা শুরুর সাত বছরের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসেই শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে হবে। আইন অনুযায়ী ঢাকা ও চট্টগ্রামে স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য কমপক্ষে এক একর, অন্যান্য স্থানের জন্য দুই একর অখ- জমি থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের  সংখ্যা ৯৫টি। এর মধ্যে ৩৯টি বিশ্ববিদ্যালয়কে আগামী জানুয়ারির মধ্যে  স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে হবে। ফলে তাদের হাতে আর দুইমাস সময় রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে এসব বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব ক্যাম্পাসে যেতে পারবে না। ফলে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে মন্ত্রণালয়ের।

ঢাকার বাইরে দুই একর জমি ক্রয় এবং সেখানে অবকাঠামো তৈরি করে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা যথেষ্ট ব্যয় সাপেক্ষ। এছাড়া ঢাকার ভেতরে অখ- এক একর জমি পাওয়াও কঠিন। অথচ অধিকাংশ শিক্ষার্থী ঢাকামুখী। শিক্ষার্থীরা ঢাকার বাইরে যেতে আগ্রহী নয়। এ কারণে ঢাকার বাইরে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করলে শিক্ষার্থী সংকট তৈরি হবে এমন আশংকা রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর।

তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ পাস হওয়ার পর একই বছর ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার সময় বেঁধে দেয়া হয়। দ্বিতীয় দফায় ২০১২ সালে, তৃতীয় দফায় ২০১৩ সালে, চতুর্থ দফায় ২০১৫ সালের জুন এবং পঞ্চম দফায় ২০১৭ সালের ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু এই সময়েও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারবে না-এমন শংকা খোদ ইউজিসির।

তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের মধ্যে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পেয়েছে তাদের ইতিমধ্যেই স্থায়ী ক্যাম্পাসে চলে যাওয়ার কথা। ওই সময়ের মধ্যে ৫১টি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পেয়েছে। এদের মধ্যে ১৫টি পুরোপুরিভাবে স্থায়ী ক্যাম্পাসে কার্যক্রম চালাচ্ছে। বাকিরা এখনও স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি। রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায় কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। যাদের স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার উদ্যোগও কম। বিভিন্ন বাসা বাড়িতে শাখা ক্যাম্পাস খুলে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ধানমন্ডির একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তরায় পৃথক শাখা ক্যাম্পাস রয়েছে। সব ক্যাম্পাসেই শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হচ্ছে। অথচ ইউজিসিকে বলা হচ্ছে, তাদের আউটার ক্যাম্পাস নেই। তাদের দাবি, একটি ভবনে জায়গা না হওয়ায় আলাদা ভবনে অন্য ফ্যাকাল্টির কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এটা সংযুক্ত ক্যাম্পাস।

নর্দান ইউনিভার্সিটির স্থায়ী ক্যাম্পাসের কাজ চলছে গাজীপুরের কাশিমপুরে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির বনানী এবং কারওয়ান বাজারে কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউতে রয়েছে পৃথক দুটি ক্যাম্পাস।

এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের মূল ক্যাম্পাস উত্তরায়। উত্তরার পাশাপাশি তারা মতিঝিল ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে। ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির মূল ক্যাম্পাস আশুলিয়ায়। এর পাশাপাশি তারা ধানমন্ডি এবং উত্তরায় শাখা ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে। ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রাজধানীর দুটি স্থানে ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে। গ্রীন ইউনিভার্সিটি রাজধানীর শেওড়াপাড়া এবং মিরপুর ২ নম্বর সেকশনে পৃথক শাখা ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে। ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি মিরপুর ১ নম্বর সেকশন এবং শ্যামলীতে পৃথক শাখা ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে। ধানমন্ডির বিভিন্ন স্থানে একাধিক ভবন ভাড়া নিয়ে ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ। ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিও একইভাবে একাধিক ভবন ভাড়া নিয়ে ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে।

অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের ঠিকানা উত্তরায় হলেও বনানীতে সিটি ক্যাম্পাসের নামে শাখা ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে। ইউজিসির সর্বশেষ তথ্য মতে, এখনো ৬৪টি আউটার ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এর মধ্যে বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রামে দুটি, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামে পাঁচটি, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ঢাকা ও চট্টগ্রামে সাতটি, চট্টগ্রামের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ঢাকায় একটি, আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি বিভিন্ন স্থানে ১৬টি, কুইন্স ইউনিভার্সিটি রাজশাহীতে একটি, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস চট্টগ্রামে একটি আউটার ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে।

মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিও চালাচ্ছে সংযুক্ত ক্যাম্পাস। গুলশানে তাদের মূল ক্যাম্পাস। মিরপুরে রয়েছে সায়েন্স ফ্যাকাল্টি নামে সংযুক্ত ক্যাম্পাস। (সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক ১৩ নভেম্বর ২০১৬)

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)

কেনা জানে যে ঘুষ-দুর্নীতিতে আজ ছেয়ে গেছে দেশ। এ বিষয়ে প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে তিক্ত অভিজ্ঞতা। সরকারের একটি অন্যতম দায়িত্ব হলো দেশকে ঘুষ-দুর্নীতি থেকে মুক্ত করা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর একটি আক্ষেপ ছিল যে তিনি ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করতে পারছেন না। কিন্তু ঘুষ-দুর্নীতি যে খারাপ ও অগ্রহণযোগ্য, সে কথা প্রকাশ্যে তুলে ধরে তার বিরুদ্ধে জনমত গঠনের চেষ্টার কোনো কার্পণ্য তিনি করেননি। বহু জনসভায় তিনি ‘চাটার দল’, ‘চোরের খনি’, ‘গাজী আমার কম্বল গেল কই?’, ‘দুর্নীতি আমার কৃষক-শ্রমিকরা করে না, করেন আপনারা শিক্ষিত লোকেরা’...ইত্যাদি কড়া কড়া কথা বলতে কসুর করেননি।  (সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক ১১ জুলাই ২০১৬)  

 দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন-২০০৪-এর অধীনে গঠিত বর্তমান দুদক। এ কমিশনের লক্ষ্য হচ্ছে দুর্নীতি দমনের মাধ্যমে সমাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণে অনেকটাই ব্যর্থ কমিশন। দুদকের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত মামলা হয়েছে প্রায় অভিযান করেছে দুদক। এতে সরকারি সেবা খাতে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ সরাসরি উপকৃত হয়েছে। ফাঁদ পেতে ‘ঘুষখোর’ ধরাকে দুদকের প্রধান দৃশ্যমান কাজ বলে প্রতীয়মান হয়েছে। কিন্তু আইনের সংশোধনীর ফলে এখন ঘুষখোরদের হাতেনাতে ধরা কঠিন হয়ে যাবে।

কেন এভাবে দুদকের ক্ষমতা খর্ব হল? ঘুষবিরোধী অভিযানের ফাঁদে ভূমি অফিসের ঘুষ-দুর্নীতি বেশি ধরা পড়েছে। আমলাতন্ত্রের শক্তিশালী কোনো অংশ হয়তো চায় না তাদের কেউ হাতেনাতে ঘুষসহ ধরা পড়ুক। তাই দুদকের কাজটা এভাবে কঠিন করে দেয়া হয়েছে। এজন্য একটু ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে সংশোধনীর সংশ্লিষ্ট ধারাটি যুক্ত করা হয়েছিল।

বিভিন্ন সময়ে আইন সংশোধন করে দুদকের হাত-পা বেঁধে সাঁতার কাটানোর প্রক্রিয়া চলছে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই। এর অংশ হিসেবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা করার আগে সরকারের অনুমোদন নেয়ার ধারা যোগ করা হয়েছিল আইনে; কিন্তু তা টিকেনি। সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় হাইকোর্ট তা অবৈধ ঘোষণা করে বাতিল করে দিয়েছেন। এরপরও দমে যাননি আমলাতন্ত্রের শক্তিশালী চক্র। এক্ষেত্রে না পারলেও ‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২’ সংশোধন করে দুদকের ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে। ৯ জুন ২০১৬ এ সংক্রান্ত উত্থাপিত বিলটি সংসদে পাস হয়েছে। আগে দুর্নীতি ও অর্থ পাচার তদন্তের ক্ষমতা ছিল শুধু দুদকের। ঘুষ ও দুর্নীতিসহ মানি লন্ডারিং আইনের ২৭টি অপরাধ তদন্ত করতে পারত স্বাধীন প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু সংশোধিত বিল পাস হওয়ায় এখন থেকে ঘুষ-দুর্নীতি ছাড়া অন্য অপরাধ তদন্ত করতে পারবে না দুদক। বাকি ২৬টি অপরাধ তদন্ত করবে পুলিশ, সিআইডি, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ নয়টি সংস্থা। অথচ অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্তে আন্তর্জাতিকভাবে দুদকের স্বীকৃতি আছে। প্রথমবারের মতো বিদেশ থেকে পাচার করা টাকা ফেরত আনতে পেরেছে এই প্রতিষ্ঠানটিই। সিঙ্গাপুর থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর অর্থ পাচারের টাকা ফেরত এনেছিল দুদক।

প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগ অনুসন্ধানের দায়িত্ব দুদকের ঘাড়ে চাপানো নিয়েও গত তিন বছরে কম টানাপোড়েন হয়নি। ২০১৩ সালে এই দায়িত্ব দিয়ে দুদকের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করা হয়। বাধ্য হয়ে প্রতারণা এবং জালিয়াতির অভিযোগ পুলিশের কাছে ফেরত পাঠানোর সুপারিশ করে প্রতিষ্ঠানটি। শেষ পর্যন্ত আবারও আইন সংশোধন করে পুলিশকে দায়িত্ব ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন দুদক শুধু সরকারি সম্পত্তি, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত অভিযোগ অনুসন্ধান করবে। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ