ঢাকা, শনিবার 19 November 2016 ৫ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ১৮ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রেলের দুরবস্থা

পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই রেলের উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু আমাদের রেলের অবস্থা হচ্ছে দিন দিন খারাপ। সড়কপথে হরতাল, অবরোধ প্রভৃতি থাকলে বাধ্য হয়ে মানুষ রেলগাড়িতে যায়। অন্যথায় আমাদের রেলগাড়িতে মানুষ ওঠে না। উঠতে চায়ও না। কিন্তু বাইরের দেশে রেলগাড়ি বেশ আনন্দদায়ক ভ্রমণ। প্রয়োজন না থাকলেও পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে মানুষ রেলভ্রমণ করে। জাপান, জার্মানি, চীন প্রভৃতি দেশে রেলগাড়ি চলে খুব দ্রুত। প্রায় উড়ো জাহাজের গতিতে ঘণ্টায় ৪০০ থেকে ৫০০ মাইল বেগে। আমাদের রেলগাড়ি চলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। ৩০০-৪০০ মাইল দূরত্বে অবস্থিত শহরে রেলগাড়িতে যেতে আমাদের লাগে প্রায় সারাদিন। অন্যদেশে এমন দূরত্বে রেলগাড়িতে পৌঁছতে লাগে মাত্র এক-দেড় ঘণ্টা। এছাড়া অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা, ছিনতাই, ডাকাতের কবলে পড়ে মালপত্র খোয়ানোসহ জীবন বিনাশের ঘটনাও ঘটে এখানে। শুধু তাই নয়, সকালের গাড়ি বিকেলে পৌঁছানোর ঘটনাও ঘটে। রেলসড়কের পুরনো অবকাঠামো, প্রয়োজনীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, রেলসড়কের ওপর হাটবাজার, দু’পাশে বসতি, কয়েক মাইল পর পর অন্য যানবাহনের ক্রসিং প্রভৃতি কারণে রেলগাড়ির গতি যেমন ধীর হয়, তেমনই এসব প্রতিবন্ধকতার জন্য রেলসড়কে দুর্ঘটনাও ঘটে প্রায় প্রতিদিনই। তাই আমাদের দেশের অনেক মানুষই আজকাল রেলগাড়িকে আতঙ্ক মনে করেন। তারা পারতপক্ষে রেলগাড়িতে ভ্রমণ করেন না। অথচ আমাদের এদেশে এক সময় রেলগাড়ি ছিল আকর্ষণীয় পরিবহন মাধ্যম। মানুষ সখ করে রেলগাড়ির নিকিট কেটে ভ্রমণ করতেন। অবশ্য এক শ্রেণির যাত্রী আছেন যারা রেলগাড়িতে ভ্রমণ করলে ভাড়া দিতে হয়, টিকিট কাটতে হয় তা ভালোভাবে জানেনই না। তারা মনে করেন, চেকারকে কিছু দিলেই যাওয়া যায়।
গত বৃহস্পতিবার দৈনিক ইত্তেফাকে রেললাইনের দুরবস্থা নিয়ে একটি রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে এতে। রিপোর্টটিতে কেবল ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, তেজগাঁও, টঙ্গী রেলস্টেশনের আওতাভুক্ত রেলসড়কের কথা বলা হলেও এ অবস্থা প্রায় সারা দেশেরই। অনেক জায়গায় রেললাইনের নাট-বল্টু, ক্লিপ নেই। সড়ক থেকে পাথর সরে গেছে বা চুরি হয়ে গেছে। বিনা বাধায় লাইন দিয়ে মানুষ হাঁটাচলা করছে রেলসড়কের ওপর দিয়ে। দোকানপাটও বসে রেল সড়কের ওপর। কেনাকাটা চলে। ক্যারম, ক্রিকেট খেলাও চলে মহানগরী ঢাকার মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া রেলসড়কের পাশেই। মাঝে মাঝে বস্তি, বাজার উচ্ছেদ করা হলেও রহস্যজনকভাবে সেগুলো আবার বসে যায়। কারওয়ান বাজারের কাছে রেলসড়কের পাশে বিরাট বস্তিটি এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছে। দিনে-দুপুরে এখানে প্রকাশ্যে গাঁজা বেচাকেনা হয়। পুলিশসহ কেউ তাদের কিছু বলে না। টঙ্গী থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত অনেকগুলো বস্তি উঠেছে রেলসড়কের পাশে। এসব বস্তি কারা বসায়? কেন বসে তা সবারই মোটামুটি জানা। কিন্তু বস্তি উচ্ছেদের কার্যকর কোনও ব্যবস্থা নেয়া হয় না। পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে লেখালেখি হলে কিংবা টিভিতে রিপোর্ট সম্প্রচারিত হলে সংশ্লিষ্টদের কয়েকদিন নড়াচড়া দেখা যায় ঠিকই। কিন্তু পরে আবার যেই কে সেই।
১৮৬১ সালের রেলওয়ে আইন মোতাবেক রেলসড়কের ২০ ফুটের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ব্যতীত সাধারণ মানুষের চলাচল নিষিদ্ধ। অর্থাৎ সব সময় ১৪৪ ধারা বলবৎ। অথচ এ আইন কেউ মানে না। রেলসড়কের ওপর দিয়ে শত শত মানুষ তো হাঁটাচলা করেই। সড়কের ওপর লোহালক্কড় ফেলে ওয়েল্ডিং কারখানার লোকজন কাটাকুটাসহ প্রায় সারাদিন গ্রিল তৈরির মতো কাজকর্ম অবাধে করে চলে। কেউ তাদের বাধা দেবার নেই। ফলে ঢাকার মগবাজার, খিলগাঁও, মালিবাগ তেজগাঁও এলাকায় প্রায়শ রেল দুর্ঘটনা ঘটে। মানুষ ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যায়। আইন অনুসারে রেলসড়কের ২০ ফুটের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া কাউকে পাওয়া গেলে কর্তৃপক্ষ গ্রেফতার করে শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারে। কিন্তু এ আইন সম্পর্কে যেন কারোরই কোনও করণীয় নেই। জনগণ যেমন লাইন ধরে রেলসড়কের ওপর দিয়ে চলাচল করে, তেমনই পুলিশও তাদের কিছু বলে না। আজকাল তো মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রেলসড়কে দিব্যি লোকজনকে হাঁটতে দেখা যায়, এতে যদি দুর্ঘটনা ঘটে, কেউ মারা যায়, তাহলে সে দোষ কার?
যাহোক, রেলের উন্নয়ন করতে হলে সবরকম দুর্নীতি, অনিয়ম দূর করে একে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। সংশ্লিষ্টদের ঘোষণা অনুসারে পাতালরেলের শোরগোল শোনা যাচ্ছে। ওপরে যে দুর্নীতি ও অনিয়ম আছে তা যেন পাতালেও না ঘটে। রেলের অবস্থা সুন্দর হোক, দুর্নীতিমুক্ত হোক। রেল জনপ্রিয় পরিবহনে পরিণত হোক। গ্রহণযোগ্য হোকÑ এ আমাদের সকলের কাম্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ