ঢাকা, শনিবার 19 November 2016 ৫ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ১৮ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

টিভি ও জাতীয় স্বার্থ

আশিকুল হামিদ : বেশিদিন আগের কথা নয়, গভীর আক্ষেপের সঙ্গে লিখেছিলাম, স্বদেশে স্বদেশকে অর্থাৎ বাংলাদেশে বাংলাদেশকে খুঁজে পাওয়া যায় না। সবকিছুর পেছনে প্রধান কারণ যে ভারতের সিনেমা এবং ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য সে কথারও উল্লেখ করেছিলাম। সেই সাথে না বলে পারিনি যে, এদেশের শিশু-কিশোররাও আজকাল ‘বিলকুল নেহি’ ও ‘ছহি কাহা’ ধরনের হিন্দি বলতে শুরু করেছে। বলেছিলাম, ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত হিন্দি সিরিয়ালের প্রবল প্রভাবের কারণে এদেশের নাটক দেখার দর্শকই আজকাল পাওয়া যায় না। চলচ্চিত্রও লাটে উঠেছে হিন্দি সিনেমা ও সিরিয়ালের কারণে। মার্কেটে, হোটেলে, বাসে, ট্রেনে এবং ট্যাক্সিক্যাবের পাশাপাশি রিকশাওয়ালাদের কণ্ঠেও আজকাল হিন্দি ছাড়া বাংলা গান শোনা যায় না। এমনকি যে কোনো বিয়ে বা গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানেও শুনতে হয় ভারতীয় হিন্দি সিনেমার ‘জনপ্রিয়’ নানা সংগীত! রেকর্ডেড তো বটেই, গেয়ে থাকেন এদেশের ‘নামকরা’ শিল্পীরাও। শুধু গানের কথাই বা বলা কেন, যে কোনো বাসা-বাড়িতে গেলেও দেখা যাবে, টিভিতে ভারতের বিভিন্ন চ্যানেল দেখছে পরিবারের সবাই মিলে। ছেলেমেয়েদের মুখে মুখে ঘুরে ফিরছে হিন্দি সিরিয়ালের ডায়ালগ। আরো অনেকভাবেই হিন্দি সংস্কৃতি বাংলাদেশীদের আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।
এসবই সম্ভব হচ্ছে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোর বাধাহীন প্রচারের কারণে। একে তাই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ছাড়া আর কিছু বলা যায় না, যার সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য একটাই- বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি যাতে ইতিহাসের বিষয়ে পরিণত হয়। এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বিগত কয়েক বছরে। বাংলাদেশে এখনো শিল্প-সংস্কৃতির আলাদা বা স্বাধীন কোনো জগত আছে এবং সেখানে তৎপর আছেন বিশিষ্টজনেরা- কথাটা আমার মতো আরো অনেকেই বাধ্য হয়ে ভুলে গেছেন। এ সম্পর্কে জানার জন্য যে কেউ বেইলী রোডের নাটক পাড়া থেকে রামপুরার টিভি ভবনের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের স্টুডিও ও অফিস এবং চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ অঙ্গন এফডিসিসহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পর্যন্ত সেই সব স্থান বা এলাকাগুলোতে মনে মনে নজর বুলিয়ে আসতে পারেন, যেসব স্থান বা এলাকাকে এদেশের সংস্কৃতির ‘প্রাণকেন্দ্র’ বলা হয়। কোনো একটি প্রাণকেন্দ্রে তৎপর বিশিষ্টজনেরাই কিন্তু এতদিন ভারতীয় টিভি চ্যানেলের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ জানাননি। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে তোলার ব্যাপারেও তাদের কখনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। বাস্তবে বিশিষ্টজনদের একটি অংশকে ব্যবহার করেই বরং বাংলাদেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারতের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন সর্বাত্মক করা হয়েছে। ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশেও চরম মুসলিম বিদ্বেষী খুনি-সন্ত্রাসীদের নায়ক বানিয়ে নাটক মঞ্চায়নের সেঞ্চুরি করেছে কোনো কোনো গোষ্ঠী, কিন্তু শেরে বাংলা ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী এবং শেখ মুজিবুর রহমানের মতো দেশপ্রেমিক জননেতাদের কাউকে নিয়ে কোনো কাহিনী, নাটক বা সিনেমা তৈরি করা হয়নি। কারণ একটাই- হিন্দির চামচামো করে বিশেষ গোষ্ঠীর লোকজন ভারতের সুনজরে থাকতে চেয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, বিভিন্ন সময়ে হিন্দির বিরোধিতাকারী দেশপ্রেমিকদের প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক এমনকি জঙ্গি ও পাকিস্তানের দালাল বলেও গালাগাল করেছেন ওই গোষ্ঠীর লোকজন।
বর্তমান পর্যায়ে কথা উঠেছে কিছু বিশেষ কারণে। ক’দিন আগে, গত ৫ নবেম্বর এদেশের বেসরকারি বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের মালিক, কর্মকর্তা এবং সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্টজনদের উদ্যোগে গঠিত হয়েছে ‘মিডিয়া ইউনিটি’ নামের নতুন একটি সংগঠন। এ উপলক্ষে ঢাকা ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ঘোষিত উদ্দেশ্য ও বক্তব্য নজর কেড়েছে সচেতন সকলের। কারণ, এত বছর পর বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের পক্ষে সেদিন কথা বলেছেন এমন অনেকেও, যাদের সম্পর্কে জনমনে অন্যরকম ধারণা ছিল। সংবাদ সম্মেলনের আয়োজকরা অভিযোগ করেছেন, এদেশের কিছু পণ্যের বিজ্ঞাপন ভারতের টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত হওয়ায় বাংলাদেশের বেসরকারি সকল টিভি চ্যানেলের আয় কমে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। বেকার হবেন হাজার হাজার সাংবাদিক, কলাকুশলী ও শ্রমিক-কর্মচারী। আনুমানিক একটা হিসাবও দিয়েছেন তারা। জানিয়েছেন, বিজ্ঞাপন প্রচারের নামে এ পর্যন্ত ১০০ কোটি টাকার বেশি ভারতে পাচার হয়ে গেছে। বিষয়টিকে মানি লন্ডারিং হিসেবে অভিহিত করেছেন তারা। বলেছেন, এভাবে একদিকে দেশীয় টিভির অস্তিত্ব হুমকির মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে, অন্যদিকে অবৈধ পথে পাচার করা হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এর ফলে সরকার যে প্রাপ্য ট্যাক্স থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সে কথাটাও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গেই তুলে ধরেছেন আয়োজকরা। টাকা পাচার বন্ধের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন তারা। চলতি মাস নবেম্বরের মধ্যে ভারতীয় টিভি চ্যানেলে বাংলাদেশী পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধ করার অল্টিমেটাম দিয়ে ‘মিডিয়া ইউনিটি’র নেতারা ঘোষণা করেছেন, না হলে ‘যে কোনো মূল্যে’ সম্মিলিতভাবে এর প্রতিরোধ করা হবে।
এখানে প্রাসঙ্গিক দু’একটি তথ্যের উল্লেখ করা দরকার। যেমন ১০০ কোটি টাকা পাচার হয়ে যাওয়ার বিষয়ে ‘এ পর্যন্ত’ বলতে তারা ঠিক কত বছরের কথা বুঝিয়েছেন তা কিন্তু পরিষ্কার হয়নি। দ্বিতীয়ত, ‘যে কোনো মূল্যে’ কিভাবে প্রতিরোধ করা হবে সে ব্যাপারেও সুস্পষ্ট কোনো কর্মসূচির কথা জানানো হয়নি। উল্লেখযোগ্য অন্য একটি বিষয় হলো, সম্ভবত প্রথমবারের মতো নিজেদের দুর্বলতার কথাও স্বীকার করেছেন বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর মালিক ও হর্তাকর্তারা। বলেছেন, অনুষ্ঠানের মান তেমন ভালো নয় বলেই বাংলাদেশের দর্শকরা ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এখন থেকে মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান নির্মাণের অঙ্গীকার করেছেন তারা, যাতে দর্শকদের ফিরিয়ে আনা যায়। কথাটা পাঠকরা লক্ষ্য করবেন। কারণ, এর মধ্য দিয়ে নতুন সংগঠন ‘মিডিয়া ইউনিটি’ এই সত্য স্বীকার করে নিয়েছে যে, দেশী চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠান মানসম্পন্ন নয় এবং সে জন্যই এদেশের দর্শকরা ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়েছে। শুধু ঝুঁকে পড়েনি, হা করে সবকিছু গিলছেও। আর একই কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন কোম্পানি তাদের বিজ্ঞাপন প্রচার করছে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোতে। এটাই স্বাভাবিক। কারণ, যে দর্শক তথা সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয় সে দর্শকরা তো এদেশের নিম্ন মানের ও কুরুচিপূর্ণ অনুষ্ঠানই দেখে না! এজন্যই বিজ্ঞাপনদাতা কোম্পানিগুলোও ভারতীয় চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপন প্রচার করতে উৎসাহী হয়ে উঠেছেন।
উল্লেখ্য, এ ব্যাপারে অন্যরাও এগিয়ে এসেছেন। মিডিয়া ইউনিটির পরদিন ৬ নবেম্বরই সংবাদ সম্মেলন করেছে ফেডারেশন অব টেলিভিশন প্রফেশনালস অরগানাইজেশন বা এফটিও। এখানে আবার অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং পরিচালক-প্রযোজকদের ভিড় বেশি দেখা গেছে। মূল কথায় তারাও ভারতীয় টিভি চ্যানেলে বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন প্রচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। তারাও নবেম্বর মাসের মধ্যে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন। যারা বলেছেন তাদের বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে, এতদিনে তারা বুঝতে পেরেছেন, ভারতীয় টিভির বাধাহীন বিস্তার ও দাপটের কারণে বাংলাদেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো কঠিন প্রতিযোগিতা ও চাপের মুখে পড়েছে। এর ফলে একদিকে বাংলাদেশী চ্যানেলগুলোর বিজ্ঞাপন আয় অনেক কমে গেছে, অন্যদিকে দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে বিপুল অর্থ। তারা তাই ভারতীয় টিভি চ্যানেলে বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের এবং দেশীয় সংস্কৃতি রক্ষার উদ্দেশ্যে ভারতীয় টিভি চ্যানেলের প্রচার বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন।
এ ধরনের দাবির সঙ্গে দেশপ্রেমিক মাত্রই একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। তা সত্ত্বেও কথার পিঠে কথা কিন্তু না বলে পারা যায় না। জিজ্ঞাসাও করতে হয়- এতদিন কোথায় ছিলেন এই বিশিষ্টজনেরা, যখন সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে বাংলাদেশের সর্বনাশ চূড়ান্ত করা হচ্ছিল? তারা সোচ্চার হয়েছেন ঠিক এমন এক সময়ে, দেশ যখন সর্বনাশের শেষপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে। অথচ সময় থাকতে অর্থাৎ শুরু থেকেই তারা যদি সম্মিলিতভাবে চেষ্টা চালাতেন তাহলে পরিস্থিতি এতটা মারাত্মক হতে পারতো না। বিচ্ছিন্নভাবে উদ্যোগ অবশ্য অনেকেই নিয়েছেন, কিন্তু সেগুলোর সঙ্গে অন্যরা যুক্ত না হওয়ায় সুফল পাওয়া যায়নি। স্মরণ করা দরকার, বছর আড়াই-তিনেক আগে ফিল্মি জগতের নায়ক-নায়িকারাও একবার বাংলাদেশের সিনেমা হলগুলোতে ভারতীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শনের বিরুদ্ধে মিছিল সমাবেশ করেছিলেন। সেবার সবচেয়ে লক্ষণীয় ছিল বিশেষ করে নায়িকাদের পোশাক। প্রত্যেকের পরণেই ছিল ভারতের দামী সব শাড়ি। অন্যরাও ভারতীয় কাপড়ে তৈরি পোশাকই পরেছিলেন। এতটাই দেশের জন্য ভালোবাসা ছিল তাদের! অমন অভিজ্ঞতার কারণেই ফিল্মি জগতের নায়ক-নায়িকারা সেবার জনসমর্থন অর্জন করতে পারেননি। 
অনেকের মধ্যে একই প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে এবারের আন্দোলন চেষ্টার সময়ও। কারণ, বাংলাদেশের সব টিভি চ্যানেলই বছরের পর বছর ধরে ভারতীয়দের দিয়ে ভারতে নির্মিত ভারতীয় বিভিন্ন পণ্যের ‘অ্যাড’ বা বিজ্ঞাপন প্রচার করে চলেছে। এতে তাদের টনক নড়েনি। যে মুহূর্তে বাংলাদেশী শিল্পীদের দিয়ে বাংলাদেশে নির্মিত বাংলাদেশী কয়েকটি পণ্যের বিজ্ঞাপন ভারতীয় টিভিতে প্রচারিত হয়েছে তখনই ধেয়ে এসেছেন ওই বিশিষ্টজনেরা। আমরা অবশ্য মনে করি, মিডিয়া ইউনিটি এবং এফটিওসহ টিভির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও ঘোষিত উদ্দেশ্যের প্রতি অবশ্য সমর্থন জানানো দরকার। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে তাদের দাবিগুলোও মেনে নেয়া উচিত সরকারের।
শিল্প-সংস্কৃতি এবং ভারত সম্পর্কে কথা যখন উঠেছেই তখন সর্বশেষ কিছু তথ্যেরও উল্লেখ সেরে নেয়া যাক। ভারতে সাম্প্রদায়িক সংঘাত-সহিংসতা নতুন বিষয় না হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেটা আবারও মারাত্মক হতে শুরু করেছে। যথারীতি মুসলিমরাই সংঘাত-সহিংসতার অসহায় শিকার হচ্ছেন। প্রচণ্ড নিরাপত্তাহীন অবস্থায় রয়েছেন তারা। মহারাষ্ট্র, উত্তর প্রদেশ ও গুজরাটের মতো কোনো কোনো রাজ্যে এরই মধ্যে মুসলিমদের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ চালানো হয়েছে। এসব আক্রমণে প্রাণহানিও ঘটেছে। গরু জবাই ও খাওয়া নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপগুলোও মুসলিমদের বিরুদ্ধে গেছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতির এতটাই অবনতি ঘটেছে যখন ধর্মনিরপেক্ষ লেখক-সাংবাদিক ও রাজনীতিকসহ ভারতের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিকে বলতে হয়েছে, ভারতে একজন মুসলিমের তুলনায় একটি গরুও বেশি সুরক্ষিত। অর্থাৎ ভারতে মুসলিমদের চাইতে গরুর ‘কদর’ অনেক বেশি! এমন অবস্থার পেছনে রয়েছে মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রহস্যময় নীরবতা, যাকে প্রকারান্তরে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের প্রতি সমর্থন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মূলত প্রধানমন্ত্রী মোদির এই নীতি ও কৌশলের কারণেই ভারতে সাম্প্রদায়িক হিংসা-বিদ্বেষ এবং সংঘাতের বিস্তৃতি ঘটে চলেছে। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান যতো উচ্চই হোক না কেন, আক্রান্ত হচ্ছেন দেশটির মুসলিমরা। এভাবে চলতে থাকলে মোদির স্লোগান ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র স্থলে ‘হেট ইন ইন্ডিয়া’ স্লোগানটিই বেশি জনপ্রিয় ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে বলেও সতর্ক করেছেন ধর্মনিরপেক্ষ ভারতীয় বিশিষ্টজনেরা। তারা বলেছেন, এর ফলে বিশ্বে নিন্দার ঝড় উঠবে ভারতের বিরুদ্ধে।
এমন বক্তব্যে ও মন্তব্যে যে সামান্যও অতিরঞ্জন কিংবা অসত্য নেই তার প্রমাণ পাওয়া গেছে অনেক ঘটনার মধ্য দিয়েই। মুম্বাই তথা বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা শাহরুখ খান থেকে আমির খান ও সালমান খান পর্যন্ত ‘কিং’, ‘পারফেকশনিস্ট’ ও ‘সম্রাট’ ধরনের বিশেষণে সম্মানিত ও অভিহিত নায়ক-অভিনেতারা বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা এবং বিদ্বেষের অসহায় শিকার হয়েছেন। কারণ, তারা সাম্প্রদায়িক সংঘাত এবং মুসলমানদের শোচনীয় অবস্থা সম্পর্কে মাঝেমধ্যে কিছু কথা বলে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে তেড়ে এসেছে হিন্দুত্ববাদীরা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রনাথ মোদির দল ও জোটের নেতারা মারমুখী হয়ে উঠেছেন। প্রভাবশালী মন্ত্রীরাও আক্রমণ যথেষ্টই শানিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় রাজনীতিতে যেমন মুম্বাইয়ের সিনেমা জগতেও তেমনি স্পষ্ট বিভক্তি ঘটেছে। উল্লেখ্য, আমির খান, সালমান খান ও শাহরুখ খানসহ বেশ কয়েকজন মুসলিম অভিনেতা বহু বছর ধরে শীর্ষস্থানীয় নায়ক হিসেবে প্রবল দাপটের সঙ্গে বলিউডে রাজত্ব করে চলেছেন। তাদের অভিনীত প্রতিটি সিনেমাই বক্স অফিস হিট করে। সারা ভারতে শোরগোল পড়ে যায়। সিনেমা হলগুলো দর্শকদের জায়গা দিতে পারে না। হিন্দু এবং অমুসলিম অন্য নায়করা তাদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছেন। এটাই মুসলিম নায়ক ও অভিনেতাদের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি মাঝেমধ্যে ভীতিকর ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে বলে মুসলিম নায়করা এমনকি ভারত ছেড়েও চলে যেতে চান।
এখানে মুসলিম চিত্রনায়কদের সম্পর্কে বলা হলেও বাস্তবে ভারতীয় মুসলিমদের বিরুদ্ধে কত ভয়ংকরভাবে আক্রমণ চালানো হচ্ছে তার প্রমাণ হিসেবে চলমান বিভিন্ন ঘটনার তালিকা দিতে হলে লিখে শেষ করা যাবে না। এখানে বরং দু-একটি তথ্যের উল্লেখ করা যাক। ভারতের অধিকৃত কাশ্মীরে এখনো প্রতিদিন শত শত মুসলিমকে হত্যা করা হচ্ছে। ধর্ষণের শিকার হচ্ছে শত শত মুসলিম নারী। দেশটির অন্য সকল রাজ্যেও মুসলিমরা হত্যা ও দমন-নির্যাতনের মুখে রয়েছে। মাত্র ক’দিন আগে, গত ৩০ অক্টোবর রাতে মধ্য প্রদেশের রাজধানী ভুপাল কেন্দ্রীয় কারাগারে আগে থেকে বন্দী হিসেবে অবস্থানরত আটজন মুসলিম ছাত্র নেতাকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছে। নিহতরা ভারতে নিষিদ্ধ সংগঠন সিমি বা স্টুডেন্টস মুভমেন্ট অব ইন্ডিয়ার সদস্য ছিলেন। পুলিশ অবশ্য হত্যার কথা অস্বীকার করে বলেছে, ওই আট ছাত্র নেতা নাকি ভুপাল কারাগারের একজন রক্ষীকে হত্যা করে পালিয়ে গিয়েছিলেন!
অন্যদিকে ভারতেরই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে, ভুপালের ওই কারাগারটি সুরক্ষিত এবং অত্যন্ত উচ্চ নিরাপত্তাপূর্ণ কারাগার। সেখানে রয়েছে সার্বক্ষণিক কঠোর প্রহরার ব্যবস্থা। সশস্ত্র কারারক্ষীদের সংখ্যাও অনেক। সুতরাং একজন কারারক্ষীকে হত্যা করতে পারলেই কারো বা আটজনের পক্ষে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া কাঁটাচামচ দিয়ে গলা কেটে হত্যার অভিযোগটিকেও বানানো কেচ্ছাই মনে করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় জিজ্ঞাসা ও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে কথিত বন্দুকযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে। কারণ, যারা কাঁটাচামচ দিয়ে হত্যা করে পালিয়েছিলেন তাদের কাছে কোনো রকমের আগ্নেয়াস্ত্র থাকার প্রশ্ন উঠতে পারে না। পুলিশও বলেনি যে, কারাগার থেকে পালানোর পর ওই আটজনের সঙ্গে অন্য কারো দেখা বা যোগাযোগ হয়েছিল, যারা তাদের অস্ত্র দিয়ে থাকতে পারে। তাহলে তারা কথিত অস্ত্রগুলো পেলেন কিভাবে? কথা আরো আছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত ভিডিও চিত্রে এক পুলিশকে নিহত একজন ছাত্রনেতার পকেটে একটি কাঁটাচামচ ঢুকিয়ে দিতে দেখা গেছে। প্রমাণিত হয়েছে, আটজনকেই খুব কাছ থেকে গুলি করেছে পুলিশ ও অ্যান্টি টেরোরিস্ট স্কোয়াড বা এটিএস-এর সদস্যরা। এসব কারণেই একজন রক্ষীকে হত্যা করে কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার তত্ত্বটি মাঠে মারা গেছে। ভারতের সাধারণ মানুষও এই কাহিনী বিশ্বাস করেনি।
এমন ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চয়ই বিস্তারিত বলার অপেক্ষা রাখে না। বাস্তবেও সব মিলিয়ে ভারতীয় মুসলিমদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছে। ভারতে সাম্প্রদায়িক হিংসা-বিদ্বেষ ও সংঘাতও বিপদজনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এর মূল কারণ আসলে দেশটির রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের হিন্দুত্ববাদী মনোভাব ও কর্মকা-। দেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে আদর্শ বানানো হলেও ১৯৪৭ সাল থেকেই ভারতীয় মুসলিম জনগোষ্ঠী ভয়ংকর দমন-নির্যাতনের শিকার হয়ে এসেছেন। মুসলিম বিরোধিতার এই একটি বিষয়ে ভারতের সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যেই অঘোষিত সমঝোতা রয়েছে- যার প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন সময়ে দাঙ্গার নামে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের সময়।
এ প্রসঙ্গেই বাংলাদেশের বিশিষ্টজনদের দিকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করা দরকার, যারা সর্বনাশ ঘটে যাওয়ার পর এতদিনে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। আমরা অবশ্য তাদের এই দেশপ্রেমিক ভূমিকার পক্ষে থাকতে চাই এবং আশা করি, কোনো কারণেই তারা আর পেছনে ফিরে যাবেন না। এখন দেখার বিষয়, টিভি সংশ্লিষ্টদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার আদৌ কোনো ব্যবস্থা নেয় কি না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ