ঢাকা, শনিবার 19 November 2016 ৫ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ১৮ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আতঙ্কে সংখ্যালঘুরা

আবু মুনির : সাম্প্রদায়িক ইংরেজি communal এবং সম্প্রীতি Great love সুতরাং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি communal Great love ধর্ম ও সম্প্রদায় শব্দ দু’টোকে অনেকেই একই মনে করে। কিন্তু ধর্ম ইংরেজি হলো Religion. আর ধর্ম সম্প্রদায় ইংরেজি হলো Religious Community বৌদ্ধ, হিন্দু, ইহুদি ও খৃষ্ট ধর্মই জগতে প্রধান ধর্মসমূহের অন্তর্গত।  আর ইসলাম হলো পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। আমরা তাই মহাত্মা বুদ্ধ, শ্রীকৃষ্ণ, হযরত মূসা ও যীশু খৃষ্টের পাশাপাশি রেখে হযরত মুহম্মদ (সাঃ) এর জীবনী পাঠ করি।
শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র বলেছেন, ‘ধর্মে সবাই বাঁচে বাড়ে/ সম্প্রদায়টা ধর্ম না রে”। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘মহাপুরুষেরা ধর্ম সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠা করে যান, আর আমরা তা হতে সম্প্রদায়টাই লই, ধর্মটা লই না’। সাদাত হাসান মান্টু বলেছেন, ‘হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খৃষ্টান-ইহুদি ধর্মের মানুষকে একই স্রষ্টায় সৃষ্টি করেছেন। হিন্দুদের ভগবান, মুসলমানদের আল্লাহ্, খৃষ্টানদের সদা প্রভু, বৌদ্ধদের ঈশ্বর, ইহুদিদের গড়ে সৃষ্টি করেনি। একই বিধাতা সৃষ্টি মানুষ যখন নিজ ধর্ম, ধর্মগ্রন্থ ও ঈশ্বর নিয়ে রেষারেষি, খুনোখুনি করে তখন তাকে মাতলামী ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না।’
সাম্প্রদায়িক স¤পর্ক হলো, ‘একটি সাম্প্রদায়ের মৌলিক নীতিমালা, যেগুলো সে সম্প্রদায়ের সকল সদস্যকে পারম্পরিক মেল বন্ধনে আবদ্ধ রাখে এবং একইভাবে বিভিন্ন সম্প্রদায়কে একটি রাষ্ট্রের কাঠামোতে আবদ্ধ রাখে, কোন কোন সময়ে এসব সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ দেখা দিতে পারে এবং দেখা দেয়, এসব বিরোধের ন্যায়সঙ্গত সমাধান না করা হলে তার সুদূর প্রসারী পরিণাম বয়ে আনে। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মের সম্প্রদায়গুলোর বৈশিষ্ট্য এবং পারস্পরিক সম্পর্ক চিহ্নিত করার পারস্পরিক মানদন্ড হিসেবে স্ব স্ব ধর্মকে গ্রহণ করা যায়। এর কারণ এই যে, বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা ও উপব্যবস্থা, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান, সাহিত্য ও দর্শন গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে ধর্মই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে। পূর্বে ধর্ম ছিল রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ ও শাসনের জন্য দিক নির্দেশনার প্রধান উৎস।”
বর্তমানে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিন্দু ও নৃগোষ্ঠীর লোকেরা আতংকে, নিরাপত্তাহীনতায় দিনযাপন করছে। সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার নাসিরনগরে হিন্দু মন্দির ভাঙচুর, বাড়ী-ঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় সচেতন দেশবাসী মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মস্ত্রী সায়েদুল হকের পদত্যাগ দাবী করেছে। মন্ত্রী নিজেই প্রমাণ করেছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে গালিসূচক উক্তিটি করে ঐ কথা উচ্চারণ করে মিডিয়াকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। এটা  যে সরকারের পাতানো খেলা প্রশাসনের লোকদের বদলী ও দলীয় লোকদের বহিষ্কার তা প্রমাণ করে। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের জায়গা জমি দখলের ঘটনার সাথেও সরকারী দলের লোক জড়িত এবং প্রশাসন অন্যায়ভাবে তাদেরকে ভিটে ছাড়া করছেন। নাসিরনগরে সহিংসতার পেছনে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল যে দায়ী সেটি মন্ত্রীও গোপন রাখেননি।  বাংলাদেশকে শান্তি ও সম্প্রীতির দেশ বলে আমরা বড়াই করি; কিন্তু সেই শান্তি ও সম্প্রীতি যারা মন্দির ভাঙচুর ও ঘরবাড়ী লুট করে বিরোধীদলের উপর দোষ চাপায়; সেটিকে অনেকটা পুঁজি করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। শাস্তি পায়নি রামু বা সাঁথিয়ায় ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার দোহাই দিয়ে যারা সংখ্যালঘুদের বাড়ী-ঘরে আক্রমণ চালিয়ে ছিল তারাও।
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের ঘটনায় জমি সংক্রান্ত বিরোধ শুধু নয়; নৌকা মার্কা ইউপি চেয়ারম্যান জমি দেয়ার আশ্বাসে ভোট সংগ্রহ করাও সাঁওতাল সম্প্রদায়ের উক্ত ঘটনার জন্য দায়ী। কোন ভূমির প্রকৃত মালিকানা স্বত্ব নির্ধারণের জন্য উহার C.S Cadastral Survey রেকর্ড, S.A (State Acquisition) রেকর্ড, B.R.S (Bangladesh Rivisional Settlement) রেকর্ড ধারাবাহিকভাবে পর্যালোচনা করা এবং সেই অনুসারে প্রকৃত মালিকানার তত্ত্ব উদঘাটন করা সম্ভব। প্রশাসন দাবী করছে পাকিস্তান আমলে আখ চাষের জন্য সরকার উক্ত  ভূমি অধিগ্রহণ করেছিল। কিন্তু উহার প্রকৃত কোন তত্ত্ব প্রশাসন উপস্থাপন করতে পারেনি। রাজনৈতিক ইতিহাসেও কালের পরিক্রমায় বিভিন্ন  রেকর্ড সৃষ্টি হয়ে থাকে। যেমন: বৃটিশ আমল, পাকিস্তান আমল এবং বাংলাদেশ আমল। একটিকে বাদ দিয়ে আরেকটিকে বিবেচনায় আনার কোন সুবিধা নেই। সুতরাং আমরা শুধু বাংলাদেশ আমল নিয়ে রাজনৈতিক সমস্যারও কোন সমাধান করতে পারব না বলে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করেন। 
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ধর্ম ইসলাম। ৬৪০ খ্রীঃ আমর বিন আস (রাঃ) কর্তৃক মিশর বিজয়ের পর আলেকজান্দ্রিয়া নগরীতে এক যীশু মূর্তির নাক ভাঙ্গার অভিযোগে খৃষ্টান বিশপ কর্তৃক তোলপাড় সৃষ্টি হলে আমর বিন আস নিজের নাক কেটে দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু নাক ভাঙ্গার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের পর বিশপ বলেছিলেন, ‘যে জাতির মধ্যে এমন মহৎ শাসকের জন্ম, এমন সত্যবাদী যুবকের জন্ম আমরা সানন্দে সে জাতির শাসন মাথা পেতে মেনে নিচ্ছি।”
শেখ সাদী (রাঃ) বলেছেন, ‘আমি শুনেছি যে, একটি বকরীকে এক বুযুর্গ ব্যক্তি বাঘের মুখ হতে ছাড়িয়ে এনেছিলেন। রাত্রে বুযুর্গ ব্যক্তি বকরীর গলায় ছুড়ি চালিয়ে দিল, তখন বকরীর প্রাণ কেঁদে উঠল এবং বলল যে, তুমি আমাকে চিতাবাঘের মুখ হতে ছাড়িয়ে এনে পরিণামে নিজেই চিতাবাঘে পরিণত হলে।”
ধর্মীয় ব্যাপারে সহিষ্ণুতা প্রদর্শনের তাগিদ মহাগ্রন্থ আল কোরআনে রয়েছে। ৬ নং সূরা আন আমের ১০৮ নং আয়াতে, ১০নং সূরা ইউনুসের ১৯নং আয়াতে, ২২ নং সূরা হজ্বের ৬৭-৬৯ নং আযাতে।
আয়েশা (রাঃ) কে লক্ষ্য করে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘হে আয়েশা এ জাতির কুফরী ত্যাগ ও ইসলাম গ্রহণ করার সময় যদি নিকটবর্তী না হত এবং আমি যদি এই আশংকা না করতাম যে, আমি যদি কাবাঘর ভেঙে ফেলি তাহলে লোকদের মধ্যে বিভ্রান্তি, ফিৎনা ও গোলযোগ সৃষ্টি হবে এবং লোকেরা মুহাম্মদ আল্লাহর ঘর ভেঙ্গে ফেলেছে এই বলে ইসলাম ত্যাগ করে কুফরী দিকে ফিরে যাবে তাহলে আমি কা’বাঘরের জাহেলী যুগে বর্তমান ভিত্তি ভেঙে ইব্রাহীম (আঃ) তৈরি করা আসল ভিত্তির উপর পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতাম। কিন্তু ফিৎনা সৃষ্টি হওয়ার আশংকায় আমি তা করছি না। (হুজ্জাতুল লাহিল বালিগা ২/১০)।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ