ঢাকা, রোববার 20 November 2016 ৬ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ১৯ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আগে গুলী পরে প্রশ্ন!

জাতিগত নিপীড়নের ধারাবাহিকতায় মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের রাখাইন রাজ্যে এবার ব্যাপকভাবে রোহিঙ্গাদের ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বেশ কয়েকটি রোহিঙ্গা গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। তারা জানিয়েছে, স্যাটেলাইটে সেসব ভস্মীভূত গ্রামের ছবি ধরা পড়েছে। ঘটনা তদন্তে জাতিসংঘের প্রতি সংগঠনটি আহ্বান জানিয়েছে বলে জানায় আল-জাজিরা। ১২ নবেম্বর হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২২ অক্টোবর থেকে ১০ নবেম্বরের মধ্যে উত্তরাঞ্চলীয় মংগদাউ জেলার তিনটি গ্রামে ৪৩০টি বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস এক বিবৃতিতে বলেন, ‘নতুন স্যাটেলাইট ইমেজ রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের নিদর্শনই শুধু প্রকাশ করেনি বরং এটাও নিশ্চিত করেছে যে, আমরা আগে যা ভেবেছিলাম পরিস্থিতি তার চেয়েও ভয়াবহ।’ এইচ আর ডব্লিউ-এর তথ্য অনুযায়ী যে তিনটি গ্রাম ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলো হলো- পায়উংপিত, কিয়েতইযোপিন এবং ওয়াপেইক। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী রাখাইন রাজ্যে জাতিগত নিষ্ঠুর দমন-পীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সেখানে ঘর-বাড়িতে আগুন দেয়া, নারীদের ধর্ষণসহ নানান ধারার শারীরিক মানসিক নিপীড়ন চলছে।
সম্প্রতি সিএনএন মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছে, ‘শ্যুট ফার্স্ট আস্ক কোয়েশ্চেন লেটার’। এদিকে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান যিনি রাখাইন স্টেটে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে গঠিত অ্যাডভাইজারি কমিশনের প্রধান তিনি এক বিবৃতিতে বলেছেন, উত্তর রাখাইন এলাকায় সাম্প্রতিক সহিংসতা গভীর উদ্বেগজনক যা অস্থিরতা ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং এ ঘটনায় নতুন করে মানুষ ঘর-বাড়ি ছাড়া হচ্ছে। রাখাইন অঞ্চলে প্রায় ১০ লাখ মুসলমান থাকলেও তাদের কোনো নাগরিক স্বীকৃতি দেয়নি মিয়ানমার সরকার। তারা স্বাভাবিকভাবে যাতায়াত করতে না পারায় কাজকর্মও করতে পারছে না। রোহিঙ্গা মুসলমানদের জমি বা সম্পদের কোনো অধিকার নেই। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও সন্ত্রাসী বৌদ্ধদের হামলায় বেশ কয়েক লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে আশ্রয় নিলেও তাদের ফেরত নিচ্ছে না মিয়ানমার সরকার। এদের অনেকে সাগর পথে পালিয়ে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেয়ার অভিযাত্রায় ক্ষুধায় ও নৌকাডুবিতে মৃত্যুবরণ করেছেন।
রাখাইন স্টেটে গত মাস থেকে শুরু করা অভিযানে সেনাসদস্য ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়েছে স্থানীয় বৌদ্ধ যুবকরাও। অভিযানের সময় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার থেকেও রাখাইন স্টেটে গুলিবর্ষণ করা হয়। তারা ব্যাপকভাবে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে। কমপক্ষে আড়াই হাজার বাড়ি ঘর ভস্মীভূত হয়েছে। গুলিবর্ষণে ও আগুনে পুড়ে মারা গেছে প্রায় তিনশ’ জন। আগুনের হাত থেকে বাঁচার জন্য মা ছেলেকে নিয়ে যখন বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিল তখন মার কাছ থেকে ছেলেকে ছিনিয়ে নিয়ে আগুনে নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে। মিয়ানমারে জাতিগত নিপীড়নের যেন কোন শেষ নেই। মানবাধিকার সংগঠনগুলো স্বল্পমাত্রায় কিছু উহ্-আহ্ করছে কিন্তু জ্বালাও-পোড়াও হত্যাযজ্ঞ বন্ধে বর্তমান বিশ্বসভ্যতা যৌক্তিক ও কার্যকর কোন ভূমিকা পালন করছে না। গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অংসান সু চির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসী নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার পরও পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন হয়নি। বরং নির্বাচনের আগে-পরে ফাঁস হয়েছে সূচির মুসলিমবিদ্বেষী নানা কথা। নির্বাচনে তিনি কোন মুসলমানকে প্রার্থীও করেননি। ফলে প্রশ্ন জাগে ভেতর বা বাইরে থেকে তথা বর্তমান বিশ্ব-ব্যবস্থায় কি রোহিঙ্গা মুসলমানদের মুক্তির কিংবা মানুষের মত বাঁচার কোনো বার্তা নেই?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ