ঢাকা, রোববার 20 November 2016 ৬ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ১৯ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ঢাকার রাস্তা আধুনিকায়ণে “কোল্ড রিসাইক্লিং”

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : বিদ্যমান রাস্তা কেটে সময় ও খরচ বাঁচিয়ে উঁচু না করেই নতুন প্রযুক্তিতে এবার রাজধানী ঢাকার রাস্তার নির্মাণ হবে। উন্নত বিশ্বের উন্নত প্রযুক্তির আদলে পরিবেশ বান্ধব ও সাশ্রয়ী পদ্ধতির নাম “কোল্ড রিসাইক্লিং”। এই পদ্ধতিতে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা কেটে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তার আধুনীকায়ণ সম্ভব। যা তাক লাগানোর মতই  মনে হবে। রাস্তা কেটে রাস্তা তৈরি পদ্ধতির দুটো যন্ত্রের নাম ‘কোল্ড রিসাইক্লিং অ্যাসফল্ট প্ল্যান্ট’ ও ‘কোল্ড মিলিং মেশিন’। সম্প্রতি এই দুটো যন্ত্রের সংযোজন ঘটেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে (ডিএসসিসি)। গতকাল শনিবার দুপুরে পলাশী থেকে নীলক্ষেত পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাটিকে ‘কোল্ড রিসাইক্লিং’ পদ্ধতিতে আধুনিকায়নের কাজ শুরু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। পলাশী এলাকায় ওই যন্ত্রের সাহায্যে সড়ক উন্নয়ন কাজ উদ্বোধন করে মেয়র সাঈদ খোকন।
ডিএসসিসির যান্ত্রিক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো: আনিসুর রহমান (পবন) জানান, গতকাল থেকেই তারা মূলত পরীক্ষামূলকভাবে কোল্ড রিসাইক্লিং পদ্ধতিতে রাস্তার আধুনীকায়ণ ও উন্নয়ন কাজ শুরু করেছেন। পর্যায়ক্রমে ঢাকার সকল রাস্তায় এই পদ্ধতিতে কাজ হবে। এতে সময় ও অর্থ দুটোই বাঁচবে। এই আধুনিক পদ্ধতিটি বাংলাদেশে এই প্রথম। এই পদ্ধতিতে কাজ হলে নগরবাসীর মাঝেও তাক লাগবে।
গতকাল পলাশীর মোড়ে ওই দুটো যন্ত্রের মাধ্যমে রাস্তা কেটে রাস্তা তৈরি কাজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডিএসসিসি মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, এ যন্ত্রের সাহায্যে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন কাজের খরচ ৪০ থেকে ৪৫ ভাগ কমে যাবে। এটি সড়ক নির্মাণের একটি অত্যাধুনিক পদ্ধতি। “যে রাস্তাটি বানাতে ১ কোটি টাকা লাগতো, সেটি সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকায় আমরা বানাতে পারব। এখানে আমাদের একটা হিউজ কস্ট সেভ হচ্ছে।”
বছরের পর বছর ধরে সড়কের উন্নয়নকাজ করার ফলে সড়কের উচ্চতা আস্তে আস্তে বেড়ে যায়। পাশে যে বাড়িঘর থাকে বৃষ্টির পানি সেসব বাড়িতে ঢুকে পড়ে। এ পদ্ধতিতে রাস্তা কেটে নতুন করে দেয়া হবে বলে সড়কের উচ্চতা বাড়বে না বলে জানান মেয়র। ‘কোল্ড রি-সাইক্লিং অ্যাসফল্ট প্ল্যান্ট’ থেকে কোনো কার্বন নিঃসরণ হবে না। এটি থেকে কোনো ধুলোবালি ও ধোঁয়া নির্গত হবে না বলেও দাবি করেন মেয়র। “এটি কার্বন ইমিশন প্রায় ৯০ ভাগ রিডিউস করে। একারণে এটা পরিবেশবান্ধব।”
বাংলাদেশে সড়ক নির্মাণে এ ধরনের যন্ত্র এটিই প্রথম জানিয়ে সাঈদ খোকন বলেন, অন্য সিটি করপোরেশন বা সড়ক নির্মাণে যুক্ত সরকারি সংস্থা তাদের এ প্ল্যান্ট ব্যবহার কররতে চাইলে সহযোগিতা করবেন তারা।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন জানায়, ক্যাটারপিলার ব্র্যান্ডের কোল্ড মিলিং মেশিনটি ইতালিতে তৈরি। এটি প্রায় ১৩ ইঞ্চি গভীর এবং প্রায় ৭ ফুট অ্যাসফল্টের আস্তরণ কাটতে পারে। প্রতি ঘণ্টায় কাটতে পারে ৭ হাজার ৫০০ ফুট রাস্তা।
স্বয়ংক্রিয় কোল্ড রি-সাইক্লিং অ্যাসফল্ট প্ল্যান্ট তৈরি করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার ডিএমআই কোম্পানি। এটি ঘণ্টায় ১২০ টন অ্যাসফল্ট তৈরি করতে সক্ষম বলে জানান সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, এ যন্ত্রের সাহায্যে ক্ষতিগ্রস্ত বা উঁচু হয়ে যাওয়া সড়ক কাটা হবে। কেটে নেয়া সড়কের এ উপাদানগুলো রি-সাইক্লিং প্ল্যান্টে নিয়ে সেগুলো পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করা হবে। এর ফলে সড়ক থেকে তুলে নেওয়া উপকরণগুলোর ৪০ শতাংশ ব্যবহার করা যাবে।
এ পদ্ধতিতে ১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ১২ ফুট প্রশস্ত একটি সড়কের পুরাতন কার্পেটিং তুলে নতুনভাবে কার্পেটিংয়ে সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা সময় লাগবে বলে জানান কর্মকর্তারা।
ডিএসসিসির যান্ত্রিক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আনিসুর রহমান জানান, ইতালীর তৈরি ওই কোল্ড রিসাইক্লিং পদ্ধতির অ্যাসফল্ট পেপার মেশিনটি আমেরিকা থেকে ঠিকাদারের মাধ্যমে ডিএসসিসির জন্য আনতে খরচ পড়েছে ৯ কোটি টাকার উপরে। এই মেশিনটি রাস্তা কাটবে, রাস্তায় কার্পের্টিং করবে। আর কেটে তোলা মালামাল রিসাইক্লিংয়ের জন্য ধলপুরে যান্ত্রিক সার্কেলের কারখানা বিভাগে স্থাপন করা হয়েছে আধুনিক পদ্ধতির একটি অ্যাসফল্ট প্লান্ট। সেখানেই রাস্তায় ব্যবহার উপযোগী মালামাল রিসাইকেলের কাজটি হবে। আগের অ্যাসফল্ট প্লান্টটির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়াসহ সেকেলের হওয়ায় সেটি টেন্ডারের মাধ্যমে ২২ কোটি টাকায় বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। নতুন প্লান্টটি চলতি বছরের জুনে স্থাপন করা হয় বলে জানান আনিসুর।
নতুনভাবে স্থাপিত অ্যাসফল্ট প্লান্টের কার্যকারিতা বর্ণনা করতে গিয়ে ইঞ্জিনিয়ার আনিসুর রহমান জানান, এটির প্রস্তুতকারী দেশ কোরিয়ার ডিএমআই কোম্পানি। অটোমেটিক রিসাইক্লিং সিস্টেমে প্রোডাকশন ক্যাপাসিটি ১২০ টন প্রতি ঘন্টায়।
গতকাল সন্ধ্যায় পলাশীর মোড়ের নয়া পদ্ধতিতে রাস্তার উন্নয়নের প্রসঙ্গে জানান, রাস্তার একপাশ কাটা হয়েছে। সেখানে কার্পেটিংয়ের কাজ চলছে। এটা পরীক্ষামূলক। আজকে একসাথে কাটার পর রাস্তার কার্পেটিং করা হচ্ছে। সামনে আর এভাবে হবে না। আগে রাস্তা কেটে পুরাতন মালামাল তুলে নেয়া হবে। ওই কাটা অবস্থায় ২/৩ দিন যাওয়ার পর দেখেশুনে পরে কার্পেটিং করা হবে। এতে করে রাস্তার স্থায়িত্বও বাড়বে। কোনভাবেই রাস্তার ক্ষতিসাধন হবে না। তিনি জানান, পরবর্তীতে রাস্তা পাওয়া সাপেক্ষে অন্য কোন রাস্তায় একই পদ্ধতিতে উন্নয়ন কাজ করা হবে। রাস্তার উন্নয়ন কাজ করে থাকেন ডিএসসিসির সিভিল বিভাগ। তারা আমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা বুঝিয়ে দেয়ার পর আমাদের যান্ত্রিক সার্কেল থেকে সেটিতে কোল্ড রিসাইক্লিং পদ্ধতিতে উন্নয়ন কাজ করা হবে, এটা একটি আধুনীক পদ্ধতি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ