ঢাকা, রোববার 20 November 2016 ৬ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ১৯ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সাঁওতালরাই রংপুর চিনিকলের জমির মালিক

স্টাফ রিপোর্টার : গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের রংপুর চিনিকলের জমির মালিক সাঁওতাল এবং স্থানীয় দরিদ্র মানুষের বাপ-দাদারা। খতিয়ান অনুযায়ী, জমির মালিকানায় নাম রয়েছে সাঁওতালদের বাপ-দাদাদের।  ‘গাইবান্ধায় সাঁওতালদের ওপর অমানবিক নির্যাতনে দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা ও নাগরিকদের করণীয়’ শীর্ষক সাংবাদিক সম্মেলনে এমন তথ্য জানান ‘সচেতন নাগরিকবৃন্দ’। গতকাল শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) শনিবার এ সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করেন তারা। এতে সচেতন নাগরিকবৃন্দের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল বারাকাত, বিশিষ্ট গবেষক ও কলামিস্ট  সৈয়দ আবুল মকসুদ, ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পংকজ ভট্টাচার্য প্রমুখ।
গত ৬ নবেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের রংপুর চিনিকলের জমিতে আখ কাটাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের সংঘর্ষ হয়। এতে ৩ সাঁওতাল নিহত হন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ জমির মালিক সরকার দাবি করা হলেও সাঁওতালদের দাবি, এ জমি তাদের পূর্বপুরুষদের।
সচেতন নাগরিকবৃন্দ’র লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সরকারের মন্ত্রী, সচিব থেকে শুরু করে অনেকে মিডিয়ার সামনে বলেছেন, এই জমি কখনও সাঁওতালদের ছিল না। এটি সম্পূর্ণ অসত্য ও জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপকৌশল। আমরা যে কথাটি বলতে চাই, তা হল- এটা সাঁওতাল এবং স্থানীয় দরিদ্র মানুষের বাপ-দাদার জমি। আমরা এই জমির খতিয়ান কপি পেয়েছি।
এতে বলা হয়, ‘খতিয়ানে দুদু মাঝি, দুর্গা মাঝি, জলপা মাঝি, জেঠা কিস্কু, মঙ্গলা মাঝি, মুংলি, চারো মাঝি, সুকু মাঝি- এই সব অনেক নাম পেয়েছি, যাদের জমি ছিল বাগদা ফার্মের মধ্যে। সাঁওতালরা বলেছেন, সাঁওতাল বাগদা সরেনের নাম অনুসারে এই ফার্ম পরিচিতি পায়।'
সঞ্জীব দ্রং বলেন, '১৯৬২ সালের ৭ জুলাই তৎকালীন প্রাদেশিক সরকারের সঙ্গে সুগারমিল কর্তৃপক্ষের চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তির কপি পেয়েছি। সেই চুক্তিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, আখ চাষের জন্য এই জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। যদি ভবিষ্যতে কখনও আখ চাষ না হয় বা আখ ছাড়া অন্য কিছু চাষ হয়, তবে এ জমি উদ্ধার করে প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। ফিরিয়ে দিতে খরচ হলে তাও সরকার দেবে বলে চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।'
তিনি  বলেন, ‘চুক্তিতে বলা হয়েছে, এই সব জমির  বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করা যাবে না। এমনকি জমির আইল পর্যন্ত পরিবর্তন করা যাবে না। অথচ সুগার মিল কর্তৃপক্ষ এ জমি নানা কাজে লিজ দিয়েছে। আমাদের কাছে পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের একটি কপি এসেছে। এ দরপত্রের বিজ্ঞাপনে (২০১৫ সালের ১ এপ্রিল) ১১টি পুকুর ও ১২টি প্লটের জন্য দরপত্র চাওয়া হয়েছে। এটি পুরোপুরি চুক্তির লংঘন।'
'আদিবাসীরা আমাদের বলেছেন, তারা বাপ-দাদার জমিতেই পুনর্বাসন চান, নতুন কোনো জমিতে নয়। আমাদের তারা এও বলেছেন, জীবন রেখে কি হবে যদি বাপ-দাদার জমি বেদখল হয়ে যায়,' বলেন আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক।
আবুল বারাকাত বলেন, 'জমি অধিগ্রহণের সময় মৌজা ও খতিয়ানের নামের সঙ্গে মানুষের নামও লেখা হয়েছে। মানুষের নামের ৭৫ ভাগ আদিবাসী। সাড়ে ৫ হাজার বিঘা জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৪ হাজার বিঘাই সাঁওতালদের। তিনি বলেন, 'লিজ থেকে লাভের একটা হিসাবও করেছি আমরা, তাতে আসে ২২শ' কোটি টাকা। ক্ষতিপূরণের প্রসঙ্গটিও যে এসেছে তারও ৭৫ শতাংশ সাঁওতালসহ অন্যান্য আদিবাসীরা পাবেন।
প্রয়োজনীয় শর্তগুলো পূরণ না হওয়া সত্ত্বেও জেলা প্রশাসন চিনিকলের জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেছে জানিয়ে অর্থনীতিবিদ বারাকাত ওই স্থানে কোনো অর্থনৈতিক অঞ্চল না করার ঘোষণা দিতেও সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
 সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, '৬ নবেম্বরের ঘটনা রাষ্ট্রীয় অবিচারের শ্রেষ্ট দৃষ্টান্ত। পুলিশ গুলী করে ৩ জনকে হত্যা করেছে। আরও মৃতের খবর আপনারা কয়েকদিন পরে পাবেন। কারণ লাশ কোথায় রেখেছে, না রেখেছে তা হয়তো আমরা এ মুহূর্তে জানি না। এ ঘটনা মানবাধিকারের লংঘন, ভূমি অধিকার লংঘন এবং এটা সংবিধানেরও লংঘন।'
গাইবান্ধায় সাঁওতালদের ওপর হামলার ঘটনায় সরকারের কাছ থেকে পূর্ণ ব্যাখ্যা দাবি করে আবুল মকসুদ বলেন, 'আমরা ব্যাখ্যা দিয়েছি। আপনারা কেন এমন করলেন তার ব্যাখ্যা দিন। পূর্ণ ব্যাখ্যা মানে তদন্ত রিপোর্ট। নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা করে ও আহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ৫ লাখ টাকা করে দেয়ারও দাবি জানান তিনি।
আরও ২ জন গ্রেফতার
গাইবান্ধা সংবাদদাতা : গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের ওপর হামলা, হত্যা, ঘরে আগুন, পুরোনো বসতবাড়িতে লুটপাটের ঘটনায় করা মামলায় সন্দেহভাজন আরও দুজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তারা হলেন সারোয়ার হোসেন (৪১) ও আকবর আলী (৫০)। তারা উপজেলার তরফ কামাল গ্রামের। গত শুক্রবার রাতে নিজ বাড়ি থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার তরফকামাল গ্রামের সরোয়ার হোসেন (৪১) ও একই গ্রামের আকবর আলী (৫০)। গতকাল শনিবার সকালে আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ নিয়ে এই মামলায় মোট ১০ জন গ্রেপ্তার হলেন। ঘটনার ১১ দিন পর গত বুধবার রাতে সাঁওতালদের মামলা নেয় পুলিশ। সাঁওতালদের পক্ষে উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের রামপুরা গ্রামের স্বপন মুরমু বাদী হয়ে প্রায় ৬০০ জনকে অজ্ঞাত আসামী দেখিয়ে এই মামলা করেন। গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুব্রত সরকার বলেন, পুলিশের গ্রেপ্তার অভিযান চলছে। গত ৬ নবেম্বর গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় রংপুর চিনিকলের জমিতে আখ কাটাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের সংঘর্ষ হয়। এতে পুলিশসহ উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে তিরবিদ্ধ হয়েছেন নয়জন। গুলীবিদ্ধ হন চারজন। এই সংঘর্ষের ঘটনায় তিনজন সাঁওতাল নিহত হন।
আখ ক্ষেতে আগুন
রংপুর চিনিকলের গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের আখ ক্ষেতে রহস্যজনক অগ্নিকান্ডের খবর পাওয়া গেছে। গতকাল শনিবার দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। অগ্নিকান্ডে ৩৩ বিঘা জমির আখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খবর পেয়ে গোবিন্দগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: আবদুল আউয়াল জানান, খামারের ফকিরগঞ্জ এলাকার ১১ আই ব্লকের জমিতে অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হয়। এতে খামারের ৩৩ বিঘা জমির দন্ডায়মান আখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অগ্নিকান্ডের ব্যাপারে তদন্ত চলছে। খবর পেয়ে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার, চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও থানার ওসি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবদুল হান্নান বলেন, আগুনের সূত্রপাতের কারণ তদন্তের পর জানা যাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ