ঢাকা, সোমবার 21 November 2016 ৭ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ২০ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিরোধীদলগুলোকে ডেকে সংলাপ করে সমস্যা সমাধান করুন

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল রোববার রাজধানীর ভাসানী মিলনায়তনে ভাসানী স্মৃতি সংস আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : দাম্ভিকতা পরিহার করে বেগম জিয়ার প্রস্তাবের ওপর সরকারকে আলোচনার উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, একচোখে নিজেকে দেখা থেকে বিরত থাকুন। সমস্যা সমাধানে মানুষের মনের ভাষা বোঝার চেষ্টা করুন। কারণ দেশের মানুষ এখন মুক্তি চায়। সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক পরিবেশ দেখতে চায়। এই অন্যায়, অত্যাচার, নিপীড়ন ও হত্যার রাজনীতি থেকে মুক্তি পেতে চায়। তাই আসুন খালেদা জিয়ার প্রস্তাব বিবেচনা করে বিরোধীদলগুলোকে ডেকে সংলাপের ব্যবস্থা করে সমস্যা সমাধান করুন। তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে তার জন্মবার্ষিকী পালন করার বিষয়টি আনন্দের বিষয় নয় উল্লেখ করে বলেন, এই দিনে নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য কাজ করার আহ্বান জানান বিএনপি নেতারা। এসময় তারা তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনার পরিবেশ তৈরি করতে নেতাকর্মীদের একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান। 

গতকাল রোববার বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ৫১ তম জন্ম বার্ষিকীর আলোচনায় বিএনপি নেতারা এসব কথা বলেন। রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনে তারেক রহমানের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করে বিএনপি। এতে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভীর সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, মির্জা আব্বাস, বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায় প্রমুখ। 

ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দাম্ভিকতা, অহঙ্কার পরিহার করুন। একচোখে নিজেকে দেখা থেকে বিরত থাকুন। সমস্যা সমাধানে মানুষের মনের ভাষা বোঝার চেষ্টা করুন। কারণ দেশের মানুষ এখন মুক্তি চায়। সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক পরিবেশ দেখতে চায়। এই অন্যায়, অত্যাচার, নিপীড়ন ও হত্যার রাজনীতি থেকে মুক্তি পেতে চায়। তাই আসুন খালেদা জিয়ার প্রস্তব বিবেচনা করে বিরোধীদলগুলোকে ডেকে সংলাপের ব্যবস্থা করে সমস্যা সমাধান করুন। অন্যথায় বিএনপি বহুবার বলেছে, এদেশের মানুষকে কিছু দিনের জন্য দমিয়ে রাখা যায়, চিরদিন দমিয়ে রাখা যাবে না। যে পরিণতি হবে তা কারো জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না।

তিনি বলেন, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হওয়ার পেছনে নানা কারণ রয়েছে। তাকে টার্গেট করা হয়েছে। কারণ তিনি তৃণমূল সংগঠনকে শক্তিশালী করণে কাজ করেছেন। তারেক রহমানের চিন্তা থেকেই বাংলাদেশ ডিজিটাল হওয়া শরু হয়েছে উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ২০০১ সালের নির্বাচনের প্রচারেও তারেক রহমান কাজ করেছেন। একারণে বিএনপি বিপুল ভোটে পাস করেছিল। বিশেষ করে তরুণ সম্প্রদায়কে কিভাবে কাজে লাগানো যায় সে বিষয়ে চিন্তা করেছেন তারেক রহমান। এসময় তিনি জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান। 

ফখরুল বলেন, বেগম জিয়ার প্রস্তাব দেশে বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। পত্র-পত্রিকাগুলোতে আলোচনা চলছে। প্রস্তাবের কোনো কোনো ব্যাপারে দ্বি-মত থাকতে পারে। কিন্তু একটি সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য খালেদা জিয়ার এই প্রস্তাব হচ্ছে একমাত্র ভিত্তি। দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে কিছু কিছু পত্রিকা যারা ১/১১ অবৈধ সরকারকে নিয়ে আসার ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন ভূমিকা পালন করেছিলেন। তারা বিভিন্ন রকম সমালোচনা করছেন শুধু নয়, তারা আওয়ামী লীগের সূরে সূর মিলিয়ে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের ব্যবস্থা করছেন। আমি তাদেরকে উদ্দেশ করে বলছি সুস্পষ্ট করে নিয়ে আসুন, কোন জায়গায় সমস্যা আছে সেটি খুঁজে বের করে আলোচনার ব্যবস্থা করুন। সমাধান করার চেষ্টা করুন।

সরকার অনৈতিকভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকতে সব কিছু গুছিয়ে নিয়েছে উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, কি পুলিশ বাহিনী; কি জুডিশিয়ারি সবখানে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠাগুলোকে দলীয়করণ করে ফেলেছে। একারণেই সরকার বেগম জিয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছে। তারা জানে যে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে কোনভাবেই পাস করতে পারবে না। 

সরকারের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, আপনারা মানুষের ভাষা বোঝার চেষ্টা করুন। গুম হত্যা চালিয়ে চিরদিন মানুষকে দাবিয়ে রাখা যাবে না। 

তিনি বলেন, খালেদা জিয়া দেশের ক্রান্তিলগ্নে জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে জাতীয় নেতার মতো তার বক্তব্য জাতির সামনে উপস্থাপন করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি গুলশানের সেই হত্যাকাণ্ডের পর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ডাক দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ শুনেনি সেই ডাক প্রত্যাখ্যান করেছে। আজকে আবারো বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটক দূর করে মানুষের মনে শান্তি ফিরিয়ে আনবার জন্য তিনি যখন নির্বাচন কমিশনকে নতুন করে গঠন করার আহ্বান জানিয়েছেন তখন একইভাবে আওয়ামী লীগ তা প্রত্যাখ্যান করেছে। কারণ একটাই তারা জানে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন যদি হয়, তাহলে আওয়ামী লীগ কোনোদিনই ক্ষমতায় আসতে পারবে না। আর সেজন্যই তারা খালেদা জিয়ার প্রস্তাবকে নাকচ করে দিয়েছে। বিএনপির মহাসচিব বলেন, খালেদা জিয়ার এই প্রস্তাব চূড়ান্ত বলে তিনি একবারও বলেননি। তিনি তার টুইটে বলেছেন, আমার এই প্রস্তাব আলোচনার ভিত হতে পারে।

দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আসুন আজকে আমরা শপথ করি এই যে সরকার মানুষের বুকে চেপে বসে আছে তাকে হটাবো, জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে সেই লক্ষ্যে কাজ করি।

এর আগে রাজধানীর নয়া পল্টনে এক আলোচনা সভায় মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে আধুনিক এবং রাজনৈতিক নির্মাতা আখ্যা দিয়ে তার চেতনা ও দর্শনকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, মওলনা ভাসানী আমাদের কাছে অনেক বড় মাপের রাজনীতিক। তিনি এদেশের মানুষের মুক্তির জন্য লড়েছেন। দুঃখেকষ্টে তিনি মানুষের কাছে গিয়ে খোঁজ খবর নিয়েছেন। তিনি ছিলেন সফল, অমর, অক্ষয়। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে এ দেশের মানুষ যতদিন থাকবে মওলানা ভাসানী ততদিন বেঁচে থাকবেন।

তিনি বলেন, মওলানা ভাসানী সেই আমলেও ছিলেন অত্যন্ত আধুনিক মানুষ। তিনি রাজনীতি নির্মাণ করতেন। দেশের কোথায় কোনো সমস্যা দেখা দিলে তিনি সবার আগে গিয়ে সেখানে হাজির হতেন। মানুষও তাকে খুব ভালোবাসতো। তিনি ছিলেন গণমানুষের নেতা। ব্রহ্মপুত্রের ভাসান চরে কৃষক সম্মেলন করে তিনি ভাসানী উপাধি পেয়েছিলেন। সব শ্রেণির মানুষের জন্য তিনি ছিলেন উদার।

তিনি আরও বলেন, ভাসানীর যখন শেষ সময় তখন তিনি জিয়াউর রহমানের জন্য দোয়া করেছিলেন এবং বলেছিলেন- আমার সময় ফুরিয়ে আসছে। তুমি এখন কিছু কর। এই দেশের ও মানুষের জন্য। সেই থেকেই জিয়াউর রহমান বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ধারণ করেন। এখানেই মওলানা সফল। তিনি অমর, অজয়। এই দেশ যতদিন থাকবে, দেশের মানুষ যতদিন থাকবে ততদিন মওলানা ভাসানী বেঁচে থাকবেন।

ভাসানীকে সফল রাজনীতিবিদ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, মওলানা ভাসানী চীন, ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রো-এশিয়া সফর করেছেন। তিনি ওই সময়েই সেসব দেশ থেকে রাজনীতি দেখে শিখেছেন। তিনি ভেবেছিলেন বাংলাদেশ একটি স্বাতন্ত্র ভূখ-। এখানকার মানুষের কৃষ্টি আলাদা। এখনকার মানুষের বিশ্বাস আলাদা। এ কারণেই মওলানা ভাসানী মানুষের হৃদয়ে স্থান লাভ করেন। তিনি বলেন, আজকে দেশের মানুষ কেনো জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করে? খালেদা জিয়াকে কেনো স্মরণ করে- কারণ দেশের মানুষ জানে তারা মওলানা ভাসানীর জাতীয়তাবাদী চেতনাকে ধারণ করেন। আজকে তারেক রহমানের জন্মদিনে কেনো মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবে অংশ নেয় কারণ তিনি জাতীয়তাবাদকে ধারণ করেন। ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটের আলোচনায় ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আবার গায়ের জোরে কিভাবে ক্ষমতায় থাকা যায়। আওয়ামী লীগ আগে সংবিধান সংশোধন করে বাকশাল কায়েম করেছিল। কিন্তু এবার আওয়ামী লীগ অলিখিত বাকশাল কায়েম করেছে। এ অবস্থা থেকে দেশের মানুষ মুক্তি চায়।

বেগম জিয়ার প্রস্তাব প্রসঙ্গে বিএনপির এই সিনিয়র নেতা বলেন, বেগম জিয়া দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রস্তাব দিয়েছেন। আপনারা বলেন এটি অন্তঃসার শূন্য। আমরা বলবো এটি মোটেও অন্তঃসার শূন্য নয়। আপনারা সাহস থাকলে বলে ফেলুন, আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন চাই না। অথবা কোন অংশটা বিশ্বাস করেন না তাও বলেন। আপনারা গণতন্ত্রের নামে বাকশাল কায়েম করবেন; আর গণতন্ত্র গলাটিপে হত্যা করবেন তা হবে না। এসময় তিনি তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার পরিবেশ তৈরি করার আহ্বান জানান। 

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, এখন দেশে কোনো রাজনীতি নেই। গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বললে কারাগারে যেতে হয়। এমন অবস্থার পরিবর্তন আনতে হবে। একদিন শুভদিন আসবেই।

মির্জা আব্বাস বলেন, তারেক রহমানের জনপ্রিয়তা সরকারকে ভাবিয়ে তুলেছে। তারেক দেশে ফিরলে কেউ তাকে আটকে রাখতে পারবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ