ঢাকা, সোমবার 21 November 2016 ৭ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ২০ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রাজনীতিতে ধর্ম এবং বিশ্ব পরিস্থিতি

ধর্ম রাজনীতিতে আসলেই যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সেটা এবারের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাধ্যমে আবারো প্রমাণিত হলো। তীব্র ইসলাম বিরোধিতার মাধ্যমে কট্টর খ্রিস্টান ও ইহুদিকের সমর্থনে প্রেসিডেন্ট পদটি বাগিয়ে নিলেন একজন চরমপন্থী ব্যক্তি। যারা ধর্মনিরপেক্ষকতার নামে মানুষকে ধর্মহীন এবং ধর্মবিযুক্ত করতে চায়, তারা এখন আর কিছু বলে না। একজন ইসলামপন্থী মিশর বা তুরস্ক বা বাংলাদেশে ক্ষমতায় বা রাজনীতিতে এলে মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতার ধুয়া তুলে বন্য জন্তুর মতো সুশীলেরা মারমুখী ভক্তিতে এগিয়ে আসে। আমেরিকার বেলায় তারা কথা বলে না। দ্বিচারিতা বা মোনাফেকির নির্লজ্জ উদাহরণ এইসব। দ্বিচারিতা বা মোনাফেকির নির্লজ্জ উদাহরণ শুধু আমেরিকাতেই নয়; সর্বত্রই দেখা যায়। সংখ্যালঘুর গোয়ালঘর পোড়ালে (যদিও কাজটি খারাপ) যারা কোমর বেঁধে চেঁচায়, তারাই কিন্তু বার্মা/মিয়ানমার, কাশ্মীরে পাখির মতো মুসলমানদের হত্যা করা হলে টুঁ শব্দটিও করে না। এই ভ- ও ছদ্ম প্রগতিশীলতার নামে তারা কার পক্ষে এবং কার বিপক্ষে এজেন্সি চালায়, সেটা আর বলতে হয় না। নিপীড়িত মুসলমানগণ এখন হাড়ে হাড়ে শত্রু ও মিত্রকে চিনতে পারছেন।
লক্ষ্য করলে দেখা যাচ্ছে যে, বিশ্ব পরিস্থিতির সর্বত্র এখন মুসলিম নিধনের যজ্ঞ চলছে। আফগানিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। বিশ্বের যত সংঘাত, তার সিংহভাগই মুসলিম দেশে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের যত শরণার্থী ও রিফিউজি আছে, তারও সিংহভাগই মুসলিম নারী, শিশু, বৃদ্ধ। করুণ বেদনায় নির্যাতনের দিন অতিক্রম করছে মুসলমানরা। তথাকথিত গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীলদের দ্বারা মুসলমানদের বিপদ কমার বদলে বাড়ছে। মুসলমানদের মুক্তির জন্য প্রয়োজন ইসলামী চেতনা, এ কথাটা এখন সবচেয়ে বাস্তব সত্য। আন্তর্জাতিক পরিম-লের মতো বাংলাদেশের এই সত্য জ্বলজ্বল করছে। আসলে স্থান-কাল-পাত্র ভেদে প্রকৃত মুসলমানের মুক্তি ও নাজাতের জন্য ইসলামী চেতনার কোনোই বিকল্প নেই। কারণ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম ও ধর্মহীনতার দ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে এবং এরই ভিত্তিতে সূচিত হয়েছে প্রবল মেরুকরণ। ইসলাম, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, পবিত্র কোরআনসহ ইসলামের মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে মানুষকে তৎপর হতে হচ্ছে। ইসলাম ও নাস্তিক্যবাদ/ধর্মনিরপেক্ষতার লড়াইয়ের নতুন নতুন ক্ষেত্র ও মাত্রা তৈরি হচ্ছে। ইসলামের আলোকে ধর্মনিষ্ঠ বিশ্বাসী মানুষের মধ্যে নতুন বোধও জাগ্রত হচ্ছে। বিদ্যমান অগণতান্ত্রিকতা ও ইসলাম-বিরূপতার কবল থেকে মুক্তির জন্য বিশ্বব্যাপী আলাপ-আলোচনা ও তৎপরতাও চলছে। ধর্মহীন, সেক্যুলার ও ইসলাম বিরোধী অপশক্তি যেখানে ও যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন, তাদের সম্পর্কে সতর্কতা ও সাবধানতাও মানুষের মধ্যে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পবিত্র কোরআন, সুন্নাহ, ইসলাম ও ইসলামী ব্যক্তিত্ব, দল, রাজনীতি সম্পর্কে প্রতিপক্ষের আক্রমণ, নির্যাতন, বিষোদগার, হামলা, মামলা, শাস্তি জনসমর্থন পাচ্ছে না। জনগণ প্রবল মিথ্যাচার ও বিরোধিতার পর্বত অতিক্রম করেই পবিত্র সত্যের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এখানেই সত্যের শক্তি যে, মিথ্যা কখনোই সত্যেও উপর বিজয়ী হতে পারবে না।
প্রসঙ্গত বলে রাখা দরকার যে, ইতিহাসের সকল পর্যায়েই সত্যপন্থী হাক্কানি আলেম এবং বিভ্রান্ত আলেম বা ‘ওলামায়ে ছু’-এর মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য লক্ষ করা গেছে। সেই আকবর বাদশাহের মুঘল দরবারে মাওলানা আবুল ফজল এবং মাওলানা মাখদুম-ই-মুলকের মধ্যকার দ্বন্দ্ব কারও অজানা নয়। এখনও ক্ষমতা, সুবিধা, স্বার্থপন্থী বিভ্রান্তের অভাব নেই। তবে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নৈতিক সমর্থন নিয়ে সত্যপন্থী-হাক্কানি আলেম সমাজের কার্যক্রম ও তৎপরতাই মূলধারা। এমনিতে সাধারণত নিশ্চুপ থাকলেও বাংলাদেশের আলেমগণ সব সময়ই সমাজ ও রাজনীতিতে সচেতন ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। শিক্ষা, গবেষণা, ধর্ম প্রচার ইতাদি তাঁদের প্রধান কর্ম হলেও আলেমগণ সমাজ ও রাজনীতির বাইরে থাকেননি কখনওই। ধর্মের স্বাধীনতা এবং কোরআন-সুন্নাহর মর্যাদা রক্ষা করার জন্য তারা অতন্দ্র প্রহরী।
এটাও সত্য যে, বাংলাদেশে সত্যপন্থী আলেমগণের সামাজিক-রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও অবস্থানের ইতিহাস নতুন কোনও বিষয় নয়, বরং সুপ্রাচীন। সেই মোঘল সম্রাট আকবরের আমল থেকে আলেমগণ রাজনৈতিক বিষয়ে জড়িত। যে রাজনীতি বা সিদ্ধান্ত ধর্মের বিরুদ্ধে যায়, সেটাকে প্রতিরোধের জন্য আলেমগণ সুদূর অতীত থেকেই সদা-তৎপর ছিলেন এবং এখনও রয়েছেন। আকবর বাদশাহের ধর্মহীন দ্বীনি এলাহিকে প্রতিহত করার জন্য আলেমগণের অবদান স্মরণীয়। পরবর্তীতে মুজাদ্দেদ-ই-আলফেসানি ধর্মহীনতার বিরুদ্ধে লড়ে যুগ-সংস্কারকে পরিণত হয়েছেন। আলেম সমাজের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ইতিহাস হাজী শরীয়তুল্লাহ, দুদু মিয়া, তিতুমীর প্রমুখের জীবন ও কর্মের সঙ্গে জড়িত এবং ফরায়েজী ও ওয়াহাবী আন্দোলনের বিশুদ্ধবাদী-সংগ্রামী ঐতিহ্যের মধ্যেও পরিদৃষ্ট। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে বালাকোট, প্রথম স্বাধীনতার যুদ্ধ (১৮৫৭) ইত্যাদির মাধ্যমে ঔপনিবেশিক ইংরেজ শক্তিকে হটিয়ে স্বাধীন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতেও সামনের কাতারে ছিলেন আলেম সমাজ এবং তৌহিদী জনতা। বিশিষ্ট সাংবাদিক, দৈনিক আমার দেশ-এর প্রধান সহকারী সম্পাদক সঞ্জীব চৌধুরী একটি গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন: “আধুনিক বলে কথিত এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীর কল্যাণে এমন একটা মিথ্যা আমাদের সমাজে প্রায়-সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের আলেম সমাজের কোনও সক্রিয় ভূমিকা ছিল না। তারা হয় রাজাকার হয়েছে, নতুবা গোপনে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। অথচ ইতিহাস সাক্ষী, একাত্তরের রাজাকারদের মধ্যে টুপি-দাড়িওয়ালা লোকের চেয়ে দাড়ি কামানো ‘আধুনিক’ লোকের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল।” অতএব, ইসলামী লেবাস, ইসলামী বিশ্বাস, দাড়ি-টুপি দেখলেই ঢালাওভাবে স্বাধীনতাবিরোধী, মৌলবাদী, ধর্মান্ধ ইত্যাদি বলাটা তথ্যনিষ্ঠ নয়, বরং অন্যায়। একটি মহল তথাকথিত ধর্মহীন-প্রগতিশীলতার নামে ইসলামপন্থী ও আলেম সমাজের বিরুদ্ধে এহেন অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র করে চলেছে। এই ঘৃণ্য শ্রেণীটি অতি কৌশলে ইসলাম ধর্মকে আঘাত করে ধর্মহীনতাকে প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে এবং এরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকারের কাঁধে চেপে বসে এবং পশ্চিমের বিশেষ বিশেষ দেশের অর্থ ও অন্যবিধ সাহায্য নিয়ে ধর্মের বিরুদ্ধে নানা অপকর্মসমূহ সম্পাদন করছে। এরা দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে চায় এবং শান্তিপ্রিয়-ধর্মনিষ্ঠ আলেম সমাজ ও ধর্মভীরু মুসলিম জনগণকে উস্কে দিতে সচেষ্ট। এদের ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি। এরা দেশ ও মানুষের পবিত্র বিশ্বাসের মৌলিক শত্রু।
মুসলিম তৌহিদী জনতা ও আলেমগণ সাম্প্রতিক বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে নানা ইস্যুতে সরব হন বলে আমরা লক্ষ্য করেছি। তাঁদের আপত্তির মধ্যে রয়েছে নারীনীতি, শিক্ষানীতি, ফতোয়া এবং সংবিধানের পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয়। ধর্মের খেলাপ করে এসব করা হচ্ছে অভিযোগ করে এগুলো তাঁরা মানতে চান না। বিষয়গুলো একদিকে যেমন ধর্মীয় দর্শন ও চিন্তাধারার বিষয়, অন্যদিকে ধর্মীয় বিধান ও আইনের সঙ্গেও জড়িত। অন্যদিকে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, এসব বিষয়ের পক্ষে সরকারের হয়ে যারা বেশি কথা বলছেন, তাঁরা ধর্ম বা ধর্মীয় আইনের লোক নন, তাঁরা রাজনীতির লোক। আর আলেমগণ ধর্মীয় দর্শন ও আইনের ব্যাখ্যায় এর বিরোধিতা করছেন। এখানে ধর্মের সঙ্গে একটি বিশেষ দল-গোষ্ঠী-আদর্শ-মতবাদ-শ্রেণীর রাজনীতির সুস্পষ্ট একটি দ্বন্দ্ব-সংঘাত তৈরি হচ্ছে। এছাড়াও আবেগপ্রবণ ইস্যু দিয়ে ধর্মকে অমর্যাদাকর পরিস্থিতিতে নিপতিত করার ফলেও রাজনীতিতে মেরুকরণ ঘটছে।
১৯৯৬ পর্যায়েও এমন একটি উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। তখন আলেমগণ যথেষ্ট তৎপরতা চালিয়ে ছিলেন। ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র অগ্নিগর্ভ অবস্থা দেখা গিয়েছিল। তখন বর্ষীয়ান আলেম শায়খুল হাদীস মাওলানা আজিজুল হকসহ অনেকেই কারা নির্যাতন ভোগ করেন। সেসব ঘটনাবলী তৎকালের ক্ষমতার পালাবদলে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। ইসলামী জনতার পক্ষে কাজ করার এমন ইতিহাস আরো আছে। ভবিষ্যতেও ইসলামের বিরুদ্ধে আঘাত ও অপমানকে প্রতিহত করার সম্ভাবনা আলেম ও তৌহিদী জনতার মধ্যে রয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৌহিদী জনতা ও আলেমগণের শক্তি-সামর্থ্য ও ভূমিকাকে কখনোই খাটো করে দেখা উচিত নয়। বরং তাদেরকে বাংলাদেশের অন্যতম সামাজিক-সাংস্কৃতিক শক্তিই বলেতে হয়, যারা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিস্তর প্রভাবের অধিকারী। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক বা বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর মতোই তৌহিদী জনতা এবং আলেম শ্রেণীও রাজনীতি সচেতন এবং রাজনৈতিক শক্তি-সামর্থ্যরে অধিকারী। বরং ক্ষেত্র বিশেষে এদের ভূমিকা ও শক্তি অনেক বেশিই লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, তথাকথিত নাম ও কণ্ঠস্বর সর্বস্ব কোনও কোনও রাজনৈতিক নেতা বা ‘মহাপন্ডিত বুদ্ধিজীবী’ তাঁদের আলোচনায় ৫০ বা ১০০ জনকে টেনে আনতে না পারলেও গ্রাম-গঞ্জের অতি সাধারণ একজন আলেমও দিনে বা গভীর রাতের ওয়াজের স্টেজে বক্তব্য দিতে দাঁড়িয়ে  হাজার হাজার মানুষকে টেনে আনতে পারেন। ফলে বাস্তবতার বিবেচনায় আলেমগণের সামাজিক শক্তি-সামর্থ্য, গণসমর্থন ও রাজনৈতিক আন্দোলনকে হাল্কাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এখন আলেম সমাজ তাদের শক্তি ও সামর্থ্য কত দক্ষতা, বিচক্ষণতা ও দূরদৃষ্টির সঙ্গে কাজে লাগিয়ে ধর্ম-সমাজ-আদর্শ-মূল্যবোধের সাফল্য অর্জন করতে পারেন এবং ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মহীনতার রাজনীতির কবল থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনতাকে উদ্ধার করতে পারেন, সেটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বাংলাদেশে আলেমগণের রাজনৈতিক শক্তির বেশ কিছু শক্ত ভিত্তি রয়েছে। যেমন: আলেমগণ সক্রিয় ও অ্যাক্টিভিস্ট শ্রেণী। তাঁরা মসজিদের ইমাম, মোয়াজ্জিন, মাদ্রাসা-মক্তবের শিক্ষক এবং খানকার পীর হিসাবে খুবই সক্রিয় বা অ্যাক্টিভ। প্রতিনিয়ত তাঁরা লোকজনের সঙ্গে কথা-বার্তা বলেন, যোগাযোগ রাখেন এবং সমাজের মধ্যখানে অবস্থান করেন। নানা পেশা ও শ্রেণীর মানুষও নানা কাজে-প্রয়োজনে তাঁদের কাছে আসেন। পুরো বছরই তাঁরা ধর্মীয় কারণে দেশব্যাপী সফরে থাকেন। ফলে তাঁদের জনসংযোগের শক্তি অনেক বেশি। মানুষকে প্রভাবিত করার ক্ষমতাও তাঁদের অধিক। তদুপরি আলেম সমাজের ইমেজও যথেষ্ট স্বচ্ছ আর শ্রদ্ধাপূর্ণ। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগ উচ্চারিত হলেও কোনও আলেমের বিরুদ্ধে মসজিদ-মাদ্রাসার অর্থ তছরুপের অভিযোগ শোনা যায় না। তাঁরা আপ্রাণ চেষ্টা করে প্রতিষ্ঠান গড়তে চান; ছাত্রবাসের শিক্ষার্থীদের বই-পুস্তক-খাবারের সুব্যবস্থা করতে চান, নিজের অর্থনৈতিক-ভাগ্য বদলাতে চান না। তাঁদের সততা ও কৃচ্ছ্রতার উদাহরণ সর্বজন বিদিত। সামান্য সংখ্যক ধর্ম ব্যবসায়ী, মাজার-পূজক ও বিদআতিকে বাদ দিলে বাংলাদেশের মূলধারার আলেমগণ উজ্জ্বল ঐতিহ্য, ব্যক্তিত্ব, শ্রদ্ধা ও সম্মানের অধিকারী। হাটহাজারি, পটিয়া, লালখান বাজার, সিলেট, রাজশাহী, কুমিলা, মোমেনশাহী, কিশোরগঞ্জসহ সমগ্র দেশের দিকে তাকালে এই সত্যই প্রতিভাত হয়। পাশাপাশি এটাও প্রমাণিত যে, তাঁরা সাহসী, সত্যনিষ্ঠ এবং নির্যাতনের সামনে অকুতভয়। অতএব তাঁদের রাজনৈতিক তৎপরতা যথেষ্ট আদর্শবাদী, নিষ্ঠাবান এবং সামাজিক-রাজনৈতিক গতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সকল মত ও পথের কথা শুনতে হয়। আর বাংলাদেশের মতো ধর্মভীরু মানুষের দেশে ধর্ম ইত্যাদি স্পর্শকাতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয় বহু ভাবনা-চিন্তার পর। এ কারণেই দেখা গেছে যে, অতীতের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ধর্ম সম্পর্কে কোনরূপ সংঘর্ষে যান নি। বরং তাঁরা ধর্ম ও ধর্মনেতাদের সঙ্গে যথেষ্ট সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। শেরে বাংলা, মওলানা ভাসানী, সোহ্রাওয়ার্দী, শেখ মজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমানের রাজনীতি উদার ও গণতান্ত্রিক পথে এগিয়েছে; কিন্তু কখনওই তাঁদের রাজনীতি বা কর্মসূচি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম বা আলেম সমাজের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়নি। মওলানা ভাসানী তো বাম ধারার রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতা করেও ধর্মকে সামনে রেখেছিলেন। ধর্মের সাম্যবাদী দিকটিকে তিনি খুবই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। ইসলামী পরিভাষা থেকে ‘মজলুম’ শব্দটিকে গ্রহণ করে তিনি সেই শব্দটিকে সমাজ ও রাজনীতিতে এমন মজবুতভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, ‘সর্বহারা’ বা ‘প্রলেতারিয়েত’ শব্দগুলো পর্যন্ত কমিউনিস্টরা বাজারে চালাতে পারেনি। অতএব, বাংলাদেশের রাজনীতির অতীতের শিক্ষা মূলত  ধর্মের প্রতি সম্মান জানানোর শিক্ষা। ইসলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ইসলামী দল-নেতা-আদর্শের প্রতি আনুগত্য জানানোর শিক্ষা। এই শিক্ষাকে ভুলে হিংসা, চরিত্রহনন, হত্যা, হামলা, মামলা, নির্যাতন করা হলে এদেশের মানুষ সেটা মেনে নেবে বলে মনে হয় না।
বাংলাদেশের মতো একক ধর্মের প্রাধান্যমূলক দেশে প্রধান ধর্মের সঙ্গে রাজনীতির দ্বন্দ্ব ও সংঘাত বিশেষ ক্ষতির কারণ হিসাবে চি‎িহ্নত হবে। কেননা এরূপ দ্বন্দ্ব চলমান রাজনীতি ও সমাজ প্রগতির জন্য সহায়ক নয়। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে, উন্নয়ন ও অগ্রগতি সাধন করতে হলে, প্রধান ধর্ম, ধর্মীয় রাজনীতি, দল ও ধর্মনেতা আলেমদের বাদ দিয়ে কাল্পনিকভাবে কতিপয় ধর্মহীন-স্বপ্নবিলাসীকে নিয়ে সেটা করা যাবে না। কারণ, সংখ্যাত্ত্বিকভাবেই বাংলাদেশে ইসলাম একটি বৃহত্তর, কার্যকরী, গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী অংশ। ফলে ধর্ম, ধর্মীয় দল ও ধর্মনেতাদের সঙ্গে সংঘাতের পথে যাওয়া সঠিক কাজ হবে কিনা, সেটা যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখা দরকার।  ইসলামবিরোধী আন্তর্জাতিক শক্তি, বিদেশী প্রভু ও মতবাদের অনুসারীগণ কর্তৃক এদেশে ধর্মের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক কিছু করতে গেলে হিতে বিপরীত হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মভীরু জনতা, ইসলামী আন্দোলন ও আলেম সমাজ তাঁদের সংগ্রামী-অতীত ঐতিহ্যানুসারে প্রবলভাবে জেগে ওঠবেন। সেটা সামাল দেওয়া বাস্তবিকই কঠিন কাজ হবে।
বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলন ও আলেম সমাজ অতীতের ঐতিহ্যের কারণে যেমন প্রবলভাবে রাজনীতি সচেতন, বর্তমানেও কাশ্মীর, মিয়ানমার, সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনায় তেমনিভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও নতজানু নীতির তীব্র বিরোধী। বিশ্বের বিদ্যমান উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে তাঁদের বর্তমান ভূমিকা কোন পথে অগ্রসর হয়, সেটা একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের বিষয়। বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন তীব্র মুসলিম-বিদ্বেষীকে ক্ষমতায় বসায় এবং পশ্চিমা বন্ধুদের নিয়ে বিশ্বব্যাপী মুসলিম নিধনে মদমত্ত হয়, তখন উম্মাহর প্রয়োজনে তৌহিদী জনতা ও আলেম সমাজকেও সতর্ক ও তৎপর হতে হয়। বাংলাদেশ, বিশ্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার সমাজ ও রাজনীতির দিকে তাকিয়ে মুসলিম জনতা ও ইসলামের মৌলিক বিধানসমূহ রক্ষাকল্পে সমাজের বৃহত্তর অংশকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার প্রয়োজনীয়তাও অনুভূত হয়। মার্কিন নির্বাচন-পরবর্তী উতপ্ত বিশ্ব পরিস্থিতিতে ইসলামী আদর্শ ও চেতনার নতুন গতিই মুসলিম ও ইসলামের বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্র ও আক্রমণকে নস্যাৎ করতে পারবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ