ঢাকা, সোমবার 21 November 2016 ৭ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ২০ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পদ্মা-গড়াই বিধৌত বিস্তীর্ণ জনপদ কুষ্টিয়া

পদ্মা-গড়াই বিধৌত এক বিস্তীর্ণ জনপদের নাম কুষ্টিয়া। এক সময় কুষ্টিয়া মেহেরপুর এবং চুয়াডাঙ্গা নিয়ে কুষ্টিয়া জেলা গঠিত হয়। প্রথমদিকে এই জেলার নামকরণ করা হয় নদীয়া। বর্তমান কুষ্টিয়ার ইতিহাস অনেক প্রাচীন। কুষ্টিয়া প্রথম মহকুমা হয় ১৮৬০ সালে। ১৮২৮ সালে পাবনা জেলা প্রতিষ্ঠিত হলে কুষ্টিয়া থানা পাবনা জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। এর আগে মেহেরপুর কিছু অংশ বাদে বৃহত্তর কুষ্টিয়ার সিংহভাগ অঞ্চল রাজশাহী জেলার জমিদারী এলাকা ছিল। কুষ্টিয়া জেলা বিভাগপূর্ব নদীয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আরও পূর্বে বিভিন্ন সময় যশোর, ফরিদপুর প্রভৃতি জেলারও অংশবিশেষ ছিল। এ কারণে এর ইতিহাস ঐতিহ্য এবং লোকাচার স্বাভাবিকভাবে উল্লেখিত জেলাগুলোর সাথে ওতোপ্রোত। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কুষ্টিয়া অবস্থানগত দিক দিয়ে প্রাচীন অঞ্চল বলে স্বীকৃত। উত্থান-পতনের আবহমান ধারায় এর অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলছে। বিলুপ্ত হয়ে গেছে পুরাকীর্তি, নিদর্শন ও ঐতিহ্যের স্মারকস্তম্ভ।
প্রাচীন জনপদ হিসেবে কুষ্টিয়া নামকরণের সঠিক ইতিহাস ও সংশ্লিষ্ট কাহিনীও এখন পর্যন্ত অস্পষ্ট। জনশ্রুতি হিসেবে যে উপাখ্যানগুলো হাজির করা হয় তাও কতটুকু বাস্তবসম্মত তা বলা মুশকিল। যতদূর জানা যায়, ১৮২০ সালে প্রকাশিত হেমিলটনের ইন্ডিগো পেজেটিয়ারে ’কুষ্টি’ বানানে এ অঞ্চলের পরিচিতি পাওয়া যায়। এ প্রেক্ষিতে ’কুষ্টি’ থেকে কুষ্টিয়া শব্দটি আসতে পারেবলে অনেকের ধারণা। এর সপক্ষে কিছু যুক্তি হিসেবে দেখা যায় এখানে এক শ্রণীর লোক আঞ্চলিক ভাষায় এখনও কুষ্টিয়াকে ‘কুষ্টে’ বলে অভিহিত করে। অপরদিকে আরেকটি জনশ্রুতি আছে ‘কুষ্টা’ থেকে কুষ্টিয়া নামের সৃষ্টি হয়েছে। এ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণ কুষ্টা অর্থাৎ পাট হয় বলে এ নামের সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করা হয়। সৈয়দ মুর্তাজা আলী ও তার গ্রন্থ ‘আমাদের কথা’-তে একই ইঙ্গিত দেন।
তার ভাষায় ‘কুষ্টিয়া’ শব্দটি ফার্সি কুশতহ বা কুস্তি থেকে এসেছে। অনেকের মতে, কুস্তি খেলাকে ভিত্তি করেও কুষ্টি বা কুস্তি এবং সবশেষে কুষ্টিয়া নামের উৎপত্তি হয়েছে। এক সময় এ জনপদে নিপুণ খেলার প্রচলন যে ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায়। বর্তমান কুষ্টিয়া শহর পরিচ্ছন্ন নৈসর্গিক পরিবেশে অতি দ্রুত নাগরিক সভ্যতায় পদার্পণ করলেও এর অগ্রসরতার ইতিহাস বেশ মন্থর। জানা যায়, সম্রাট শাহজাহানের আমলে এ স্থানটি গড়ে উঠেছিল নৌবন্দর হিসেবে। কোম্পানী আমলে কুষ্টিয়ার কুমারখালী নদীবন্দর হিসেবে খ্যাত ছিল। প্রাচীন সভ্যতার অনেক নিদর্শন এ কারণে কুমারখালীতেই বেশি মেলে। ১৮৬০ সালে নীলকর হাঙ্গামার সূত্রপাত ঘটলে ছোট লাট পাবনার কৃষক সমাবেশে কুষ্টিয়াকে মহকুমা করার ঘোষণা দেন। এরপর ১৯৬২ সালে মহকুমার কর্মকা- আক্ষরিক অর্থে শুরু হলে এ অঞ্চলে প্রাসঙ্গিক প্রয়োজনে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগে। এর পরবর্তীতে ১৯৬০ সালে কলকাতার সাথে সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপিত হলে উন্নয়নে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। এ সময়ে পর্যায়ক্রমে গড়ে ওঠে ঐতিহ্যবাহী মোহিনী মিল, রেনউইক ও যজ্ঞেশ্বর মিল। ১৮৬৯ সালে কুষ্টিয়া পৌরসভা স্থাপনের মধ্য দিয়ে শহর উন্নয়নের কর্মকা- শুরু হয়। কুষ্টিয়া শহরটি ২৩.৫৫ উঃ অক্ষাংশ থেকে ৮৯.০৯ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। গড়াই নদী এ জেলার দুঃখ বলে পরিচিত। দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে শিলাইদহে রবীন্দ্র কুঠিবাড়ী, ছেউড়িয়ার লালন শাহ’র মাজার, লাহিনীপাড়ায় মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা ও স্মৃতিসৌধ, আটিগ্রামে কবিদাদ আলীর মাজার, করায় কবি আজিজুর রহমানের বাস্তুভিটা, কুষ্টিয়া পৌরসভায় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিজয় ভাস্কর্য, শহরের কোটপাড়ায় বার শরীফ দরবার আরুয়াপাড়ায় গোলাপ শাহ’র মাজার, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং বর্তমান ক্ষয়িষ্ণু কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যবাহী মোহিনী মিল বর্তমানে বন্ধ। কুষ্টিয়া জেলা ৬ থানা, ৬০ ইউনিয়ন এবং ৩ পৌরসভা নিয়ে গঠিত।
এ জেলার মোট জনসংখা প্রায় সাড়ে ৫ লাখ। এই জনপদ উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত। বলা যায়, বিমাতাসুলভ আচরণের নির্মম শিকার। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত কুষ্টিয়াতে সরকারী পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালিত হয়নি। প্রাচীন এই জেলা শহরে মাত্র একটি প্রধান সড়ক। যানজটে শহরবাসীর জীবন অতিষ্ট। দুটো প্রধান মিল মোহিনী মিল ও কুষ্টিয়া টেক্সটাইল মিল বন্ধ দীর্ঘদিন থেকে রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া সড়কের নির্মাণ কাজ একযুগেও শেষ হয়নি। কুষ্টিয়াবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও সেটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের করুণ দশা। হাসপাতালটি নিজেই রোগী-অসুস্থ।
বাউল সম্রাট লালন শাহ : শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কুষ্টিয়া অঞ্চলের রয়েছে বিস্তৃত এক অতীত ইতিহাস। এই ইতিহাস বেশ প্রাচীন, বৈচিত্র্যময় এবং নিঃসন্দেহে বাংলা শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এক সম্পূরক উপাদান। যে সমস্ত মনীষীদের অসামান্য অবদানে সুদীর্ঘকালব্যাপী সমৃদ্ধ হয়েছে এই ক্ষেত্রটি তাদের নাম উল্লেখ করতে গেলে সর্বাগ্রে বাউল কবি লালন শাহের কথা বলতে হয়। লালন শাহ বাংলা গানের ভূবনে এক মুকুটহীন মহাসম্রাট। বাউল সঙ্গীতের ইতিহাসে লালন শাহের গানেই প্রথম ব্যক্তিপ্রাণের স্পর্শ অনুভূত হয়। এর কারণ তিনি তার গানে নিপীড়িত মানুষের বেদনার কথা ফুটিয়ে তুলেছিলেন। সমাজের বর্ণ ও শ্রেণী বৈষম্য, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিপীড়ন ইত্যাদির বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ছিলেন। তিনি তার গানে মানুষকে সকল সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠার আহ্বান জানিয়েছেন।
মূলত: বাউল গান হিসেবে পরিচিতি পেলেও তার কিছু কিছু রচনা ভাব ভাষা আঙ্গিক ও বিষয়বস্তুর বিচারে অতি উঁচুমানের গীতি কবিতার পর্যায়ে পড়ে। ঊনবিংশ, শতাব্দীর এক বিস্তৃত কালজুড়ে রচিত তার এ সমস্ত কবিতা ও গান রচনায় পথিকৃৎ হিসাবে বাংলা সাহিত্যের ভিত মজবুত করেছিল। ভাবুক ও রসজ্ঞ প-িতজনদের কাছে সর্বজনীন সাহিত্যের সবগোত্রীয় লালন শাহের গীতিকবিতা ও গানগুলোর আবেদন আজকের দিনেও অক্ষুণ্ন। লালন শাহের গানও আজ সমগ্র দেশবাসীর অক্ষয় সম্পদ বলে বিবেচিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ