ঢাকা, সোমবার 21 November 2016 ৭ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ২০ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

৮ মাসে ৫৬৫ মারাত্মক ম্যালেরিয়া আক্রান্তের মধ্যে ১৭ জনের মৃত্যু!

চট্টগ্রাম অফিস : চলতি বছরের জানুয়ারি-আগস্ট মাস পর্যন্ত সারা দেশে ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত হয়েছে ২১ হাজার ২শ ৩২ জন। তৎমধ্যে ৫৬৫ জন ছিল মারাত্মক ম্যালেরিয়া আক্রান্ত। তাদের মধ্যে ১৭ জনের মৃত্যু ঘটেছে। গতবছরের তুলনায় মৃতের সংখ্যা বাড়লেও মারাত্মক ম্যালেরিয়া আক্রান্তের হার ক্রমান্বয়ে কমেছে। ২০১৫ সালে ১ হাজার ২৩ জন মারাত্মক ম্যালেরিয়া আক্রান্তের মধ্যে ৯ জনের মৃত্যু ঘটে। তবে ২০১৪ সালে ২ হাজার ৬৩ জন মারাত্মক ম্যালেরিয়া আক্রান্তের মাঝে মৃত্যু ঘটে ৪৫ জনের। যা গত কয়েক বছেরর মধ্যে ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুর সংখ্যায় সর্বোচ্চ। ২০১৩ সালে ১১শ ৫৫ জন মারাত্মক ম্যালেরিয়া আক্রান্তের মধ্যে ১৫ জন, ২০১২ সালে ১৪শ ৫৭ জনের মধ্যে ১১ জন, ২০১১ সালে ৩ হাজার ৯৫ জনের মধ্যে ৩৬ জন, ২০১০ সালে ২৭ শ ২৬ জনের মধ্যে ৩৭ জনের মৃত্যু ঘটে। ২০১০ সালে ম্যালেরিয়া রোগে যেখানে ৫৫ হাজার ৮শ ৭৩ জন আক্রান্ত ছিল সেখানে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২১ হাজার ২শ ৩২ জন। রোববার (২০ নবেম্বর) চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক মিলনায়তনে স্বাস্থ্য বিভাগ, ব্র্যাক ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসুচি ও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত সাংবাদিকদের অবহিতকরণ সভায় এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। ব্র্যাকের সিনিয়র ম্যানেজার দিলীপ কুমার সাহা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০১৫ সালে ম্যালেরিয়া জনিত কারণে বিশ্বে ২১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ অসুস্থ এবং ৪ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ মারা গেছে, যাদের বেশিরভাগের বয়স ৫ বছরের নিচে। আফ্রিকার সাব-সাহারান ও এশিয়া মিলে মাত্র ১৫টি দেশেই ৮০ শতাংশ ম্যালেরিয়া জনিত মৃত্যু সংঘটিত হয়। বাংলাদেশে ২০০৮ সালে যেখানে ১৫৪ জন ম্যালেরিয়ায় মারা গেছে সেখানে ২০১২ সালে তা ১১ জনে নেমে আসে। ২০১৩ সালে বেড়ে ১৫, ২০১৪ সালে তা ৪৫ জনে দাঁড়ায়। তবে আশার কথা হচ্ছে ২০০০ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে বিশ্বে ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুর হার ৬০ শতাংশ ও অসুস্থতার হার ৩৭ শতাংশ কমেছে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. আলাউদ্দিন মজুমদারের সভাপতিত্বে ও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মহসিন চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত অবহিতকরণ সভায় অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি কলিম সরওয়ার, বিআইটিআইডি’র পরিচালক ডা. দেলোয়ার হোসেন, সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দীকি, ব্র্যাকের কর্মসূচি প্রধান ডা. মুক্তাদির কবির, বিশেষজ্ঞ বক্তা ছিলেন, জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. আবদুল্লাহ আবু সাঈদ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এম এ সাত্তার, ডা. অনুপম বড়ুয়া ও ডা. রাশেদা সামাদ। স্বাগত বক্তব্য দেন ব্র্যাকের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক সঞ্জয় কুমার পাল।
সভায় জানানো হয়, দেশে ১ কোটি সাড়ে ৩২ লাখ জনগোষ্ঠী ম্যালেরিয়া রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে তিন পার্বত্যজেলা উচ্চপ্রবণ, কক্সবাজার জেলা মধ্যপ্রবণ ও চট্টগ্রামসহ ৯টি জেলা নি¤œপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত। সারা দেশের ১৩টি জেলার ম্যালেরিয়া প্রবণ উপজেলা ৭১টি। উচ্চ ও মধ্যপ্রবণ এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী ৩৪ লাখ ৪০ হাজার। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে সবচেয়ে বেশি ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হয়েছে বান্দরবানে, ১০ হাজার ৮০৩ জন। এরপর রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি যথাক্রমে ৭ হাজার ১২৬ জন ও ১ হাজার ৮১৮ জন। কক্সবাজারে ১ হাজার ১০৪ জন, চট্টগ্রামে ২২২ জন।
সভায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, মারাত্মক ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগীগুলোকে দেরীতে হাসপাতালে আনার কারণে অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যু ঘটছে। সাংবাদিকরা হলেন সামাজিক চিকিৎসক, তাদের লেখনীর মাধ্যমে সমাজে ম্যালেরিয়া বিষয়ে সম্যক ধারণা প্রদানও চিকিৎসা বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো গেলে ম্যালেরিয়া নির্মূল হবে। সচেতনতাই পাড়বে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার শূন্যের কোটায় নিয়ে আসতে। ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুর ঝুঁকি হ্রাসে পার্বত্যাঞ্চলের ঝুম চাষীদের মাঝে কীটনাশকযুক্ত মশারীর ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
সভায় ম্যালেরিয়া বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার, মশার ফলে সৃষ্ট রোগব্যাধি সম্পর্কে মিডিয়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার, কক্সবাজারের হোটেল-মোটেলে যেভাবে জোয়ার-ভাটায় পর্যটকদের জন্য সতর্কবার্তা বিলি করা হয় তেমনি তিন পার্বত্যজেলাসহ উচ্চ ও মধ্যপ্রবণ জেলা গুলোতে পর্যটকদের জন্য ম্যালেরিয়া বিষয়ে সতর্কবার্তা প্রচারের উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। এ ছাড়া নিয়মিত মশারি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়।
ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৬৮ লাখ ৪৫ হাজার ৪৩৭টি দীর্ঘস্থায়ী কীটনাশকযুক্ত মশারি বিতরণ করা হয়েছে। তৎমধ্যে বর্তমানে ৩৭ লাখ ২১ হাজার ৫৩২টি কীটনাশকযুক্ত মশারি কার্যকর আছে। ২০১৭ সালে আরও ২০ লাখ কীটনাশকযুক্ত মশারি বিতরণ করা হবে। দীর্ঘস্থায়ী কীটনাশকযুক্ত মশারিগুলো মশার কামড় হতে আত্মরক্ষা ও ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকরী বলে সভায় জানানো হয়।
২০১৮ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকার শতকরা ১০০ ভাগ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য যথোপযুক্ত ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, শতভাগ ম্যালেরিয়া রোগীকে মানসম্পন্ন পদ্ধতিতে দ্রুত রোগনির্ণয় ও তাৎক্ষণিক কার্যকরী চিকিৎসা নিশ্চিতকরণ, ২০২০ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়া নির্মূলকরণে কর্মসূচির বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনা জোরদারকরণ, ম্যালেরিয়া নির্মূলকরণে রোগতাত্ত্বিক ও কীটতাত্ত্বিক নিরীক্ষণ, পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া জোরদারকরণ, ম্যালেরিয়া নির্মূলকরণে প্রচার, যোগাযোগ ও সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণের কার্যক্রম বৃদ্ধিকরণ জাতীয় পরিকল্পনার উদ্দেশ্য বলে মূল প্রবন্ধে জানানো হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ