ঢাকা, মঙ্গলবার 22 November 2016 ৮ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ২১ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নবনির্বাচিত আমীরে জামায়াতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অন্তরালে

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নবনির্বাচিত আমীর জনাব মকবুল আহমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের নতুন নতুন ষড়যন্ত্র নিয়ে একটি মহল উঠেপড়ে লেগেছে বলে মনে হয়। অনেকে বলছেন, আসলে যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী কোনো অপরাধ নয় বরং জামায়াতের আমীর নির্বাচিত হওয়াই তার প্রধান অপরাধ। জামায়াত সততার কথা, সত্যের কথা বলে। অন্যায়-অবিচার ও ব্যভিচারের বিরোধিতা করে এবং কুরআন-সুন্নাহ নির্দেশিত ইনসাফ ও সুশাসন ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয়। সৎ ও যোগ্য লোকের শাসনের কথা বলে এবং প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে শিক্ষা-প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সৎ, যোগ্য, নিষ্ঠাবান ও দেশপ্রেমিক লোক তৈরি করে। ধাপে ধাপে তাদের অগ্রগতি উক্ত মহলের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে বলে মনে হয়। এক একজন করে জামায়াতের শীর্ষ ও প্রতিভাবান নেতৃবৃন্দকে মিথ্যা ও বানোয়াট মামলায় জড়িয়ে, সকল নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে ফৌজদারি দণ্ডবিধি ও সাক্ষ্য আইনের সার্বজনীন বিধিমালার প্রয়োগ তাদের বেলায় বন্ধ রেখে এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেও তাদের পিপাসা মিটেনি। তারা ভেবেছিলেন এতে নেতৃত্বশূন্য হয়ে দলটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কিন্তু তা হয়নি। জনাব মকবুল আহমাদ প্রায় ছয় বছর ভারপ্রাপ্ত হিসেবে আমীরের দায়িত্ব পালন শেষে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমীর নির্বাচিত হয়ে দলের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছেন এবং শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রদত্ত তার ভাষণ দেশে-বিদেশে জামায়াতের নেতাকর্মীদের যেমন উজ্জীবিত করেছে তেমনি আলেম-ওলামা এবং সহযোগী রাজনীতিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও এর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এটি সহ্য করা তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়েছে। কাজেই জনাব মকবুলকে  ঠেকানো নয়, জামায়াতকে ঠেকানো তারা জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে নিয়েছে। এখন তারা তাকে রাজাকার বানাচ্ছেন এবং কোনো প্রকার সাক্ষী সাবুদ নয়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের বা পরিবারসমূহের অভিযোগের ভিত্তিতেও নয়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মিথ্যা ও বানোয়াট কল্পকাহিনীর ভিত্তিতে তাকে ফাঁসানোর অপচেষ্টা চলছে। আইসিটির একজন কর্মকর্তা ইতোমধ্যে বলেছেন যে, রাজাকারদের তালিকায় নাকি তার নাম পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী বিষয়টিকে হাস্যস্পদ বলে অভিহিত করেছেন। জনাব মকবুল আহমাদের পিতা একজন অবস্থাসম্পন্ন দানশীল ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন। মাসিক নব্বই টাকা বেতনের জন্য তিনি অথবা তার ভাই রাজাকারের চাকরি গ্রহণ করেছিলেন এটা পাগলেও বিশ্বাস করবে না। তার বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে তার গ্রাম বা ইউনিয়ন অথবা পার্শ্ববর্তী গ্রামের কোনোও লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এমন নজির নেই। সৎ জীবন-যাপনের অংশ হিসেবে তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে শিক্ষকতার জীবন বেছে নিয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে খুশিপুর গ্রামের আহসান উল্লাহকে হত্যার নির্দেশ দানের যে অভিযোগের কথা বলা হয়েছে তাও মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। আহসান উল্লাহর স্ত্রী সালেহা বেগম এবং তার ভাই মুজিবল হক এই অভিযোগের নিন্দা জানিয়েছেন। তারা বলেছেন যে, আহসান উল্লাহ তার সাত মাস বয়সী ছেলের অসুস্থতার খবর পেয়ে তাকে দেখার জন্য বাড়ি এসেছিলেন এবং পরে তিনি বাড়ি থেকে ছিলনিয়া বাজারে যান এবং সেখান থেকে ফেরত আসেননি। ধরে নেয়া হয়েছে যে তিনি মারা গেছেন; কিন্তু তার লাশ কোথাও পাওয়া যায়নি। এর সাথে জনাব মকবুল আহমাদের কোনো সংশ্লিষ্ট ছিল না। একইভাবে লালপুর গ্রামের হিন্দু পাড়ার আগুন দেয়া এবং ১১ ব্যক্তিকে হত্যা করার যে অভিযোগ এখন তার বিরুদ্ধে আনা হচ্ছে লালপুরের হিন্দু পাড়ার বাসিন্দারাও তাকে সর্বৈব মিথ্যা বলে অভিহিত করেছেন। তারা বলেছেন যে, জনাব মকবুল আহমাদ ও তার দল বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে তাদের সহযোগিতা করেছেন; বিপদে-আপদে সাহায্য করেছেন। তাদের পাড়ায় আগুন লাগানো অথবা হিন্দুদের হত্যা করার সাথে তার কোনো সংশ্রব নেই। তারা এও অভিযোগ করেছেন যে, জনাব মকবুল আহমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য কিছু কিছু লোক ও দল তাদের বিভিন্নভাবে ভয় ও প্রলোভন দেখাচ্ছে, কিভাবে সাক্ষ্য দিতে হবে বাতলিয়ে দিচ্ছে। রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য এটি একটি নির্লজ্জ প্রচেষ্টা।
গত শনিবার দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় ‘জামায়াত আমীর মকবুলের চিঠিতেই একাত্তরে হত্যার প্রমাণ’ শীর্ষক একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। রিপোর্টটিতে জামায়াতে ইসলামীর ফেনী মহকুমার প্যাড ব্যবহার করে মহকুমা আমীর হিসেবে জনাব মকবুল আহমাদ কর্তৃক রেডিও পাকিস্তান চট্টগ্রামে ভারপ্রাপ্ত ডিউটি অফিসার জনাব ফজলুল হককে স্বহস্তে ইংরেজিতে একটি চিঠি লিখেছেন বলে দেখানো হয়েছে। চিঠিটি রহস্যজনক। চিঠিতে ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ)-এর নেতা মাওলানা ওয়াজ উদ্দিনের চট্টগ্রাম যাবার তথ্য দিয়েতাকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সহায়ক শক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তার গতিবিধি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে ... ইত্যাদি ইত্যাদি। এখানে অনেকগুলো প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। এক. ১৯৭১ সালে ফেনী মহকুমা জামায়াতের কোনো আমীর ছিলেন না, এই পদও ছিল না। তখন পদটির নাম ছিল নাজেম এবং জনাব মকবুল আহমাদ নাজেম পদেও  ছিলেন না, অন্য এক স্থানীয় ব্যক্তি নাজেম ছিলেন। দুই. প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানের কিছু কালচার বা সংস্কৃতি থাকে এবং তা শুরু থেকেই গড়ে উঠে। জামায়াতে ইসলামীর কালচার হচ্ছে সরকারি, বেসরকারি অথবা আধা-সরকারি, যে ধরনের আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক পত্রই হোক না কেন ‘আসসালামু আলাইকুম’ দিয়ে তা শুরু করা হয়। এ ক্ষেতে তা নেই। তিন. রেডিও পাকিস্তান, চট্টগ্রামের ভারপ্রাপ্ত ডিউটি অফিসারকে তিনি পত্র লিখতে যাবেন কেন? চট্টগ্রামে কি তার সংগঠনের দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তি ছিলেন না?’ আরো কথা আছে ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামে রেডিও পাকিস্তানের কোনো আঞ্চলিক দফতর ছিল না। চট্টগ্রাম পোতাশ্রয়ে নোঙ্গর করা জাপানী একটি জাহাজের ট্রান্সমিশন যন্ত্রপাতি ব্যবহ৮ার করে প্রথমত এবং পরে কোলকাতা থেকে আরো যন্ত্রপাতি এনে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং প্রাথমিক অবস্থায় মেজর জিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। ব্যাপক গোলাগুলির কারণে মে মাসের ২৫ তারিখে বেতার কেন্দ্রটি কোলকাতায় স্থানান্তরিত হয় এবং যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা সেখানেই থাকে। কাজেই আগস্ট মাসে ফজলুল হকের রেডিও পাকিস্তান চট্টগ্রামের ভারপ্রাপ্ত ডিউটি অফিসার হিসেবে থাকার প্রশ্নটি অবান্তর। চতুর্থত তথাকথিত চিঠিটির হাতের লেখার সাথে আমীরে জামায়াত জনাব মকবুল আহমাদের হাতের লেখা, বাক্য গঠনপ্রণালী এবং নামের বানান কোনোটারই মিল নেই। তা হলে প্রশ্ন হচ্ছে তারা কেন এটা করলেন? নিশ্চয়ই বাঙ্গালকে হাইকোর্ট দেখানোর জন্য। বাঙাল বা বাঙালিদের ব্যাপারে অনেক কথা আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, “সপ্তকোটি সন্তানেরে হে বিমুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি” লর্ড মেক্লে গাঙ্গেয় উপত্যকার বাঙালিদের শঠ, প্রতিহিংসাপরায়ণ, পরশ্রীকাতর স্বার্থপর, প্রতারক, মিথ্যাচারী, লোভী প্রভৃতি বিশেষণে বিশেষায়িত করেছিলেন। আবার কোনো কোনো বিদেশী পন্ডিতের ভাষায় বাঙালিরা প্রতিভাবান ও দূরদর্শী “What Bengal thinks today, India thinks tommrow” এটা তাদেরই কথা। অর্থাৎ সব বাঙালিরা অমানুষ নয়, তাদের মধ্যে মানুষও আছে। জনাব মকবুল আহমাদের বিরুদ্ধে আনীত এ ধরনের অভিযোগ এরআগে ১৯৯১ সালের নির্বাচনের সময়ও ফেনীর অন্যতম নিন্দিত ব্যক্তি আওয়ামী লীগ নেতা জয়নাল হাজারী তুলেছিলেন। কিন্তু ফেনীবাসীর প্রতিবাদের মুখে তিনি পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে এতই যদি তার বিরুদ্ধে অকাট্য প্রমাণ থাকে তাহলে বিগত ৪৫ বছর ধরে কেন ফেনী অথবা অন্য কোথাও তার বিরুদ্ধে কোনো থানা অথবা আদালতে জিডি বা মামলা হয়নি? এখন কেন এই মিথ্যাচার?
কারণ অবশ্য আছে। প্রথমত আদর্শিক দীনতার প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দ্বিতীয়ত ইসলামভীতি এবং তৃতীয়ত দেশের বিদ্যমান অবস্থা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম সম্প্রতি ‘শান্তি হারানো এক দেশ’ শীর্ষক এক নিবন্ধে একটি কঠোর সত্য কথা বলেছেন। তার ভাষায়, “আওয়ামী লীগ সরকার জনপ্রিয় দাবিকে উপেক্ষা করে কোনো নির্বাচন ছাড়াই ২০১৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনা করছে। এর লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। প্রধান বিরোধী দলকে কোণঠাসা করতে এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রেফতার করেই যাচ্ছে সরকার। কোনো বিরোধী পক্ষকেই শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করতে দিচ্ছে না .... পরিহাস হচ্ছে যে, দলকে আওয়ামী লীগ ধ্বংস করতে চায় সেই দলটি হয়ে উঠতে পারে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী পর্দার আড়ালে অপেক্ষা করছে। বড় দুই দলের দুর্নীতি ও দলবাজিতে ত্যক্ত-বিরক্ত মানুষ জামায়াতের দিকে ঝুঁকছে। ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের আগে স্থানীয় নির্বাচনের প্রথম ভাগে জামায়াত অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে। ... পুনর্গঠিত জামায়াত যদি সৎ নেতৃত্বের দ্বারা পরিচীিলত হয়তাহলে গণেশ উল্টে যেতে পারে। আমি শুনেছি আওয়ামী সরকারকে অপছন্দ করে এমন বাংলাদেশীরা ইতোমধ্যেই বলতে শুরু করেছেন, “এছাড়া আমরা আর কোথায় যেতে পারি?” আমীরে জামায়াত জনাব মকবুল আহমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগের পেছনে তাদের অস্তিত্বের ভয়ই ভূমিকা পালন করছে বলে আমার বিশ্বাস।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ