ঢাকা, বুধবার 23 November 2016 ৯ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ২২ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ইয়াবার ছোবল

বাংলাদেশে বহুদিন ধরে নেশার বিভিন্ন সামগ্রীর বিস্তার ঘটলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশি বিস্তার ঘটেছে অতি ভয়ংকর এবং ধ্বংসাত্মক ট্যাবলেট ইয়াবার। বাস্তবে দেশের আনাচে-কানাচে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে ইয়াবা। খবর হিসেবে অনেক পুরনো এবং সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও বর্তমান পর্যায়ে কথা উঠেছে বিশেষ করে ইয়াবার ব্যাপক চোরাচালানের পরিপ্রেক্ষিতে। ইদানীং ক’দিন পরপরই চোরাচালানের অবৈধ পথে দেশে আনা ইয়াবার চালান ধরা পড়ছে। বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও পুলিশের বিভিন্ন অভিযানে আটক হচ্ছে এসব চালান। সংখ্যা বা পরিমাণের দিক থেকেও চালানগুলো চমকে ওঠার মতো। যেমন দৈনিক সংগ্রামের এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বিগত মাত্র ১০ মাসেই দুই কোটি পিসের বেশি ইয়াবার চালান আটক করেছে বিভিন্ন বাহিনী। সর্বশেষ গত রোববারও বিজিবি টেকনাফ থেকে ২১ কোটি টাকা মূল্যের প্রায় সাত লাখ পিস ইয়াবা আটক করেছে। এটাই ইয়াবার সবচেয়ে বড় চালান বলে জানানো হয়েছে। 
জানা গেছে, ইয়াবা বাংলাদেশে প্রধানত মিয়ানমার থেকে চোরাচালান হয়ে আসছে। বান্দরবান ও টেকনাফসহ বাংলাদেশ-মিয়ানমারের প্রায় ২৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের অন্তত ২০টি রুট দিয়ে ইয়াবা ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। বিস্ময়ের কারণ হলো, এত্ েঅভিযান এবং বার বার ধরা পড়া সত্ত্বেও চোরাচালানীরা কিন্তু থেমে নেই। তারা বরং নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করে চলেছে। যেমন বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের বরাত দিয়ে জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, এতোদিন যেখানে সড়ক পথে চোরাচালান করা হতো এখন সেখানে করা হচ্ছে নৌপথে। নতুন নতুন রুট বেছে নিচ্ছে চোরাচালানীরা। বড় কোনো জাহাজে পাঠানোর পরিবর্তে তারা পাঠাচ্ছে ইঞ্জিন চালিত ছোট ছোট নৌকায় এবং ট্রলারে করে, যাতে সহজে সীমান্তরক্ষীদের চোখে না পড়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, নাফ নদীর তীরবর্তী কোনো একই বিশেষ স্থানে বার বার পাঠানোর পরিবর্তে সাবরাং, মোগপাড়া এবং শিকদারপাড়ার মতো বিভিন্ন এলাকায় তারা চালান পৌঁছে দিচ্ছে। বেশিরভাগ চালান আসছে নাফ নদী দিয়ে। প্রসঙ্গক্রমে মিয়ানমার সরকারের নীতি ও ভূমিকাও তীব্রভাবেই সমালোচিত হচ্ছে। কারণ, বিজিবির সঙ্গে অনুষ্ঠিত প্রতিটি সেক্টর পর্যায়ের বৈঠকেই মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী চোরাচালান বন্ধের জন্য ব্যবস্থা নেয়ার অঙ্গিকার করেছে। মাসখানেক আগেও এ ধরনের সর্বশেষ বৈঠক হয়েছে দেশটির রাজধানী ইয়াঙ্গুনে। কিন্তু চোরাচালান বন্ধ করা দূরে থাকুক, মিয়ানমার বরং ইয়াবার কারখানা স্থাপনের ব্যাপারেই অনেক বেশি উৎসাহ দেখিয়ে চলেছে। দৈনিক সংগ্রামের আলোচ্য রিপোর্টের পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, নাফ নদীর অপর পাশে অবস্থিত মংদাও নামের শহরে এরই মধ্যে অন্তত ৩৭টি ইয়াবার কারখানা স্থাপিত হয়েছে। কারখানাগুলোতে উৎপাদনও চলছে রাতদিন। বাংলাদেশে প্রধানত এসব কারখানায় তৈরি ইয়াবাই পাঠানো হচ্ছে।
ভীতি ও আশংকার কারণ হলো, ইয়াবা ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানী ও জেলা শহর থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত। শুধু তা-ই নয়, ইয়াবার মরণ নেশার ছোবলে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে নানা বয়সের বাংলাদেশীরা। বলা যায়, গোটা জাতির জন্যই ইয়াবা ভয়াবহ সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রিকশাওয়ালা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা পর্যন্ত সবাই এরই মধ্যে ইয়াবার কবলে পড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। ছাত্রী এবং মেয়েরাও পিছিয়ে নেই। তারাও ছেলেদের মতোই নেশা করছে। ইয়াবার দাম যেহেতু যে কারো নাগালের অনেক বাইরে সেহেতু টাকা যোগানোর জন্য নেশাখোররা চুরি-ছিনতাই ও ডাকাতির মতো অপরাধের পথেও পা বাড়িয়েছে। অনেকে এমনকি নিজেদেরই বাবা-মায়ের অর্থ ও সোনা-গহনা চুরি করছে ইয়াবা কেনার জন্য। এভাবে বাংলাদেশের পুরো সমাজেই পচন ধরেছে। এখনই যদি প্রতিহত না করা যায় তাহলে স্বল্প সময়ের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যাবে বর্তমান প্রজন্ম। আগামী প্রজন্মও তাদের অনুসরণ করবে। ফলে দেশ ও জাতির উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির কোনো ক্ষেত্রেই তারা সামান্য অবদান রাখতে পারবে না। তেমন মেধা ও যোগ্যতাই থাকবে না তাদের।
একই কারণে ইয়াবাসহ মাদক সামগ্রীর বিরুদ্ধে অবিলম্বে দরকার সর্বাত্মক অভিযান চালানো। ইয়াবার চোরাচালান প্রতিহত করতে হবে যে কোনো পন্থায়। চাল-ডাল ধরনের পণ্যের মতো যেখানে-সেখানে ইয়াবা যাতে বিক্রি করা সম্ভব না হয় এবং ছাত্রছাত্রীসহ নেশাখোররারা যাতে সহজে ইয়াবা কিনতে না পারে তার ব্যবস্থা নিতে হবে সুচিন্তিতভাবে। নেশার ক্ষতি সম্পর্কে শিক্ষামূলক প্রচারণা চালাতে হবে গণমাধ্যমে। মিয়ানমারের সঙ্গেও কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ করে দেশটির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে সে দেশের সরকার যাতে ইয়াবা এবং অন্য কোনো নেশার সামগ্রী উৎপাদনকে প্রশ্রয় না দিয়ে বরং নিষিদ্ধ করে। বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্তের অপর প্রান্তে স্থাপিত ইয়াবার সকল কারখানা অবিলম্বে বন্ধ করে দেয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানাতে হবে। আমরা মনে করি, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, র‌্যাব ও পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনীকেও তৎপর করে তোলা দরকার, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে যাতে কোনো নেশার সামগ্রী ঢুকতে না পারে। একই ব্যবস্থা নিতে হবে ভারতীয় সীমান্তেও। কারণ, ভারত থেকেও ফেন্সিডিল ধরনের নেশার বিভিন্ন সামগ্রী বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। আসে ইয়াবার চালানও। সুতরাং মিয়ানমারের পাশাপাশি ভারতের ব্যাপারেও সতর্ক নজর রাখতে হবে। সব মিলিয়ে আমরা চাই, তরুণ প্রজন্মসহ বাংলাদেশের জনগণ যাতে নেশার ভয়াবহ ছোবলে আর ক্ষতবিক্ষত না হয়। পুরো সমাজেই যাতে পচন না ধরতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ