ঢাকা, বুধবার 23 November 2016 ৯ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ২২ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খেল দেখিয়ে দিল ভারত

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী : বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল সড়ক যোগাযোগ চুক্তি (বিবিআইএন) নিয়ে ভারত বাংলাদেশকে এক মাদারির খেল দেখিয়ে দিয়েছে। কার্যত ভারতের এই প্রকল্প যে এক বিরাট ধোঁকা ছিল সেটা আবার নতুন করে প্রমাণিত হলো। এই সড়ক যোগাযোগ বা সড়ক পথ ব্যবহার করতে ভারত পূর্ণাঙ্গ চুক্তির আগেই বাংলাদেশের সড়কপথগুলো ফানা ফানা করে দিয়ে বাংলাদেশকে তাদের একটি প্রদেশের মতো ব্যবহার করতে শুরু করেছে। সেটিও বলতে গেলে একেবারে বিনামূল্যে। সুতরাং ভারত কলকাতা বা আগরতলা থেকে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে চলে যেতে পারছে তাদের সাত রাজ্য হয়ে নেপাল ও ভুটানে। অর্থাৎ চারদেশীয় সড়ক যোগাযোগের মাধ্যমে ভারতের যা আদায় করা বা লাভ লুটে নেয়া, সেটা নেয়া হয়ে গেছে ভারতের। এখন বিবিআইএন চুক্তি হলো কি না, তাতে ভারতের কিছুই আসে যায় না। বরং এই চুক্তি না হলেই ভারতের জন্য সেটা অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হবে।
কেন না, ভারত নেপালের ব্যাপক বাণিজ্যিক সুবিধা লাভ করে। নেপালের চাহিদার শতকরা ১শ’ ভাগ জ্বালানি তেল ভারত থেকে সরবরাহ করা হয়। আবার নেপালের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ পর্যন্ত বেশিরভাগ ভারতই সরবরাহ করে। এখান থেকে বেরুবার পথ নেপালের জন্য খুব সহজ নয়। নেপালের নিজস্ব সংবিধান সংশোধন করার চাপ হিসাবে ভারত যখন ৪ মাসেরও বেশি সময় ধরে নেপালকে অবরোধ করে রাখে, সকল ধরনের পণ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। তখন চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল তৎকালীন কেপি শর্মা ওলির সরকার। তিনি একটি বিকল্প পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিলেন। জ্বালানি তেল এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী অনেকাংশে আমদানি করার চেষ্টা করছিলেন চীন থেকে। কিন্তু ভারত তা মেনে নেয়নি বরং নেপালের প্রায় ৩ কোটি মানুষকে অবর্ণনীয় দুর্দশার মধ্যে ফেলে সংবিধান সংশোধনের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। কিন্তু ওলি সরকার ও নেপালের জনগণ সে চাপের কাছে মোটেও নতি স্বীকার করেননি। শেষ পর্যন্ত ভারতকে অবরোধ প্রত্যাহার করতেই হয়েছে। কিন্তু ভারতের যা লাভ হয়েছে, তা হলো নেপালের মানুষের ভারতের জন্য এক সময় যে ভালোবাসা ছিল তা ঘৃণায় রূপান্তরিত হয়েছে।
কিন্তু ওলি সরকারের এই অনমনীয় মনোভাবকে ধৃষ্টতা বলেই মনে করেছে ভারতের মোদি সরকার। শুধু মোদিই বা বলি কেন, ভারতের পূর্ববর্তী সরকারগুলো চেয়েছে যে, ভুটানের মতো নেপালও তাদের সম্পূর্ণ অনুগত হয়ে চলবে। কিন্তু পরিস্থিতি ঠিক ততোটা সহজ ছিল না বা নেই। নেপালের জনগণ সাহসী, কষ্টসহিষ্ণু এবং তাদের আত্মমর্যাদা অত্যন্ত প্রবল। আর সে কারণে ভারতের প্রচেষ্টা দাঁড়ালো কিভাবে কেপি শর্মা ওলি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায়। নেপালে বিষয়টা খুব কঠিনও নয়। এর আগে ভারতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শ্রী দুভেল জানিয়েছিলেন যে, নেপালের প্রথম গণতান্ত্রিক সরকার পুষ্প কমল দাহালকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য তারা ১ হাজার কোটি রুপি খরচ করেছিলেন। সেই লোকেরাই এখনও নেপালের রাজনীতিতে বহাল আছেন এবং ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছেন।
আর তাই ভারত ঠিক করলো যে করেই হোক কেপি শর্মা ওলি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে। ওলি ক্ষমতাসীন ছিলেন মাওবাদী দাহালের সমর্থনে। সেখানে ওলির ভুল ছিল দাহাল দীর্ঘ ৮ বছর যে গেরিলা যুদ্ধ করেছিলেন, সেই যোদ্ধাদের বিচার প্রক্রিয়া তিনি শুরু করেছিলেন। এতে দাহালের রাজনীতি প্রচ-ভাবে ধাক্কা খায়। ফলে পুষ্প কমল দাহাল ওরফে প্রচ- এবং ভারতীয় তাঁবেদার বলে দীর্ঘকাল ধরে পরিচিত নেপালের কংগ্রেসের সাথে হাত মিলিয়ে ওলি সরকারের পতন ঘটান এবং নিজে ১১ মাসের জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। বাকি ১১ মাস রাষ্ট্র পরিচালনা করবে নেপালী কংগ্রেস। এরকম গোঁজামিলের চুক্তির মধ্যে আদর্শের অভাব আছে। সে অভাব কাটিয়ে ওঠা খুব সহজ নয়। কিন্তু একটা বিষয় খুবই সত্য আর তা হলো নেপালী মানুষের আত্মমর্যাদা। তারা ভারতের চাপের কাছে কিছুতেই নতি স্বীকার করতে রাজি নয়। কিন্তু ভারত নেপালে ব্যবসা বাণিজ্য কুক্ষিগত করে রেখেছে। সেখান থেকে বের হওয়া নেপালের জন্য খুব সহজ নয়।
আর ভুটান স্বঘোষিতভাবেই ভারতের আশ্রিত রাষ্ট্র। পারতপক্ষে ভারত ভুটানে অন্য কোনো দেশের পণ্য ঢুকতে দেয় না। একটা ম্যাচ বাক্স থেকে শুরু করে ডিম পর্যন্ত ভুটানকে কিনতে হয় ভারত থেকে। বিবিআইএন চুক্তি বাস্তবায়িত হলে খুব স্বাভাবিকভাবেই নেপাল ও বাংলাদেশ ভুটানে পণ্য রফতানি শুরু করতে পারত। তাতে ভারতের বাণিজ্য স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হতো। ভুটানের পার্লামেন্ট বলি, আর আপার হাউজই বলি সবই ভারতের অঙ্গুলি হেলনে চলে। বিবিআইএন চুক্তির শর্ত হচ্ছে যে, এই চুক্তি সকল রাষ্ট্রকেই অনুমোদন করতে হবে। ভারত, নেপাল, বাংলাদেশ এই চুক্তি অনুমোদন করেছে। আর বাংলাদেশের উপর দিয়ে শত পথে ভারত নামমাত্র মূল্যে সহস্র মাইল পথ সাশ্রয় করে পণ্য পরিবহণ করে যাচ্ছে। অর্থাৎ চুক্তি বাস্তবায়নও হয় নাই। কিন্তু এর সবটুকু সুবিধা ভারত আদায় করে নিচ্ছে। বাংলাদেশকে না যেতে দিচ্ছে ভুটানে, না যেতে দিচ্ছে নেপালে। ফলে বাংলাদেশের লাভের খাতায় শূন্য পড়েছে। সম্প্রতি ভুটানের আপার হাউজ বা জাতীয় কাউন্সিল মোটরযান আইন অনুমোদন করতে অস্বীকার করেছে। একথা কেউ বিশ্বাস করবে না যে, ভুটান নিজে নিজেই এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। বরং একথা সবাই বিশ্বাস করবে যে, ভারত ভুটানকে দিয়ে এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করিয়েছে। তাহলে বাংলাদেশ যে কাছাখোলা নীতির মাধ্যমে ভারতকে সবকিছু উজাড় করে দিয়ে দিল, তার বিনিময়ে কি পেল? এর আগেও এই চুক্তির অনুমোদনে ভুটান ৬ মাস সময় নিয়েছিল। কিন্তু ৬ মাস পর হুট করেই তারা এই চুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বসল। তারা প্রটোকল ইমপ্যাক্ট এসেসমেন্ট এগ্রিমেন্ট, দেশীয় আইন এবং ভুটানের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়নি বলে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে বলেছে- তাদের অবকাঠামোগত সুবিধাও ততোটা নেই। আবার ভুটানে বিদেশী যানবাহনের আনাগোনায় তাদের পরিবেশগত কি সংকট তৈরি হবে, সেটি নির্ণয় করতে হবে। এছাড়া বিদেশী যানবাহনের আগমনে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির উপরও প্রভাব পড়তে পারে।
এগুলো সবই ভুয়া যুক্তি। অথচ বাংলাদেশ সরকার সরল বিশ্বাসে আশা করেছিল যে, শিগগিরই তারা ভারতের উপর দিয়ে নেপাল ও ভুটানে বাণিজ্য শুরু করতে পারবে। এর আগে ১৯১৪ সালে সার্কের অধীনে এ ধরনের একটি চুক্তি সম্পাদনের প্রস্তাব উঠেছিল। কিন্তু তখন পাকিস্তান তাতে সময় নিয়েছিল। এবার সার্ক আওতার বাইরে গিয়ে চারদেশীয় সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করার উদ্যোগ নিল ভারত। কারণ এই সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যে যদি পাকিস্তান যুক্ত থাকে তাহলে ভারতের আরো প্রতিদ্বন্দ্বী বাড়ে। সেটি ভারত হতে দিতে চায়নি। সেই কারণেই পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে সার্ক আওতার বাইরে তারা এই চুক্তির নামে বাংলাদেশ ও নেপালকে ধোঁকা দিয়ে বসল। চারদেশীয় সড়ক যোগাযোগ চুক্তি যদি বাস্তবায়ন হতো তাহলে নেপাল শুধু কোলকাতা বন্দর নয়, প্যারাদ্বীপ ভিশাখাপট্টম প্রভৃতি গভীর সমুদ্র বন্দর পর্যন্ত তারা পণ্য পরিবহণের জন্য এগিয়ে যেতে পারত। এর লক্ষ্যও ছিল ভারতের কোলকাতা, আগরতলা, শিলিগুঁড়ি, গোয়াহাটি, শিলং এবং বাংলাদেশের বেনাপোল, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ঢাকা আর ভুটানের ফুয়েন্টশোলিং ও পারো আর নেপালের কাকরভিটা পর্যন্ত সংযোগ স্থাপিত হতে পারত। কিন্তু ভারত ভুটানকে দিয়ে সেই পথ আপাতত রুদ্ধ করে দিল।
এবার বাংলাদেশের তাহলে কি করণীয় রইল। বসে বসে বুড়ো আঙ্গুল চোষা ছাড়া তাদের আর কিছু করার থাকল না। এখানকার সরকার নতজানু এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভাষায় ভুটানের মতোই ভারতের অনুগামী। তার নিদর্শন হচ্ছে পাকিস্তানে এবার সার্ক শীর্ষ সমম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। ভারত তাতে যেতে অস্বীকার করে। আর ভারতের অনুগামী দেশ হিসাবে ভুটান ও বাংলাদেশ প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সেটি অস্বীকার করে বসে। অথচ সার্কের প্রতিষ্ঠাতাই বাংলাদেশ। সেইটুকু মর্যাদা ধরে রাখার চেষ্টাও তারা করেনি। ভারত চেয়েছিল নেপাল সার্ক সম্মেলন বন্ধ করে দিক। কেন না, নেপাল বর্তমানে সার্কের প্রধান। এদিকে আবার ভারতীয় পন্ডিতরা বাংলাদেশ ও নেপালকে পরামর্শ দিচ্ছেন যে, সার্কের কথা ভুলে যান। বরং বিমসটেকে আসুন। অথচ বিমসটেক এখন পর্যন্ত সংগঠন হিসাবে দাঁড়াতেই পারেনি। অথচ গত ৩০ বছরে সার্ক একটি শক্ত ভিত্তি রচনা করেছিল। আর সেই বাংলাদেশ ভারতের যুপকাষ্ঠে নিজেকে বলি দিয়ে বসল। এভাবে হয়তো একদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌত্বই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ