ঢাকা, বুধবার 23 November 2016 ৯ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ২২ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আইন এবং প্রয়োগ দুটোই সমান্তরাল চলতে হবে

জিবলু রহমান : [পাঁচ]
জামিন অযোগ্য ধারার অভিযোগের আসামী ও ক্ষেত্র বিশেষে মামলার গুণগত কারণে বিচারকের বিচারসূলভ মন প্রয়োগের মাধ্যমে জামিন পেতে পারে। জামিন ক্ষমতা বৃহত্তর পরিসরে আদালতের বিচারসূলভ মন প্রয়োগে ইচ্ছাধীন ক্ষমতাকেই বুঝায়। এই ইচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের হাইকোর্ট, সুপ্রীম কোর্টের নজীরসমূহ অনুসৃত হয়। যেসব বিশেষ আইনে জামিন বিষয়ে কোন কিছু উল্লেখ থাকে না সেসব ক্ষেত্রে ফৌজদারী কার্য বিধির ২য় তফসিলের সর্বশেষ ছক অনুসরণ করতে হয়।
দুর্ধর্ষ ও ভয়ঙ্কর সব আসামী জামিন নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পরও বিচার হয় না তাদের জামিনদারদের। আদালতের কাছে শুধু মোটা অঙ্কের অর্থের প্রতিশ্রুতি দিয়েই এসব আসামীকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করেন জামিনদাররা। জামিনের নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও আসামীরা আদালতে অনুপস্থিত থাকছে বছরের পর বছর। একই সঙ্গে অনুপস্থিত থাকেন সংশ্লিষ্ট আসামীর জামিনদার-স্থানীয় ব্যক্তি ও আইনজীবীও। ফলে সরকারি কোষাগারে জমা হয় না তাদের প্রতিশ্রুত অর্থও। জামিনদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিধান থাকলেও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে কর্তৃপক্ষ। অর্থ আদায়ে সরকারি আইন কর্মকর্তারা (পিপি) কোনো আবেদন না করায় জামিনদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছেন না আদালত।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৫১৪ (১) ধারায় বলা হয়েছে, জামিনের মেয়াদ শেষে আসামীকে আদালতে হাজির করাতে ব্যর্থ হলে ও মুচলেকার অর্থ (জামিনদারের অঙ্গীকার) জমা না দিলে আইনজীবী ও স্থানীয় জামিনদারের সম্পত্তি ক্রোক করার বিধান রয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় অর্থ আদায় সম্ভব না হলে জামিনদারকে গ্রেফতার করে কমপক্ষে ছয় মাস সিভিল (দেওয়ানি) কারাগারে বন্দী করার বিধান রয়েছে। এছাড়া ৫১৪(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি পর্যাপ্ত কারণ দেখানো না হয় এবং অর্থ প্রদান না করা হয় তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অস্থাবর সম্পত্তি বা সে মারা গেলে তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির মধ্য হইতে অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও বিক্রয়ের জন্য ওয়ারেন্ট প্রদান করিয়া আদালত উক্ত অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা করিতে পারিবেন।’
আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে জামিনদার আইনজীবী কিংবা স্থানীয় জামিনদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন না। আইন অমান্যকারী আইনজীবী ও জামিনদারদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য লিখিত আবেদন করবেন পিপিরা। এরপর আদালত যা ভালো মনে করবেন সে মতো ব্যবস্থা নিবেন।’ জামিন পেতে হলে আসামীদের ও জামিনদারদের ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হয় বিদেশে। আমাদের দেশেও এ সংক্রান্ত বিধান করা দরকার। আর আইনজীবী জামিনদারদের ছাড়া জামিন মিলবে না আসামীর; এমন বিধানও সংস্কার করা দরকার। (সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর ৩০ মে ২০১৪)
ময়না তদন্ত : ময়না তদন্তের রিপোর্ট নিয়ে তেলেসমাতি বাংলাদেশে কম নয়। বিতর্কের শেষ নেই রিপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে। অথচ হত্যোা-আত্মহত্যোা কিংবা যেভাবেই মৃত্যু হোক এর কারণ নির্ণয়ে সুষ্ঠু ময়না তদন্ত রিপোর্টের বিকল্প নেই। কিন্তু রিপোর্ট প্রণয়নে ঘাপলা-দুর্নীতি-অসততার অভিযোগের কারণে জনমনে বিভ্রান্তি সুস্পষ্ট। রাজশাহীতে সালেহা হত্যোাকাণ্ডের পর ময়না তদন্তে মিথ্যা রিপোর্ট দেয়ার ঘটনা দেশে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। ফাঁসি হয়েছিল হত্যোাকারী ডাঃ ইকবালের। কারাদণ্ড হয়েছিল ময়না তদন্ত রিপোর্ট প্রণয়নকারী ডাক্তারের। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই বাংলাদেশে ময়না তদন্তের রিপোর্ট নিয়ে অবিশ্বাস সন্দেহ সংশয় রয়েছে। প্রতিটি ময়না তদন্তের রিপোর্ট প্রণয়ন হয় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞের দ্বারা। এ ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণের কিছুই করার নেই। এ কারণেই বিশেষজ্ঞদের যথাসম্ভব সতর্কতা গ্রহণ জরুরী। কিন্তু তাদেরকে কোনভাবে ‘ম্যানেজ’ করে যদি ময়না তদন্তের রিপোর্ট পাল্টে ফেলা যায় সেটা নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। ময়না তদন্তের রিপোর্ট একজন বিচারকের রায়ের চেয়ে কোন অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং অনেক সময় ময়না তদন্তের রিপোর্টের উপরও বিচারকের রায়ের অনেক কিছু নির্ভর করে। ময়না তদন্তের রিপোর্ট প্রণয়নে বাংলাদেশ এখনো যুগোপযোগী ও আধুনিক নয়। রিপোর্টকে আরো সুষ্ঠু, নির্ভুল এবং সময়োপযোগী করতে বিশেষ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।
পাবলিক প্রসিকিউটর : যে সব ফৌজদারী মামলায় সরকার বাদী অর্থাৎ পুলিশের রিপোর্টের ভিত্তিতে গৃহীত মামলাসমূহ পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রের পক্ষে যে বিজ্ঞ কৌসূলী নিয়োগ করা হয় তাকে পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) বলে। দেশের সকল জেলা ও মেট্রো দায়রা জজ আদালতের জন্য সরকার কর্তৃক আলাদা পিপি, স্পেশাল পিপি ও একাধিক সহকারী পিপি নিয়োগ দেয়া হয়। দায়রা আদালতসমূহে সকল প্রকার মামলা সরকার পক্ষে পরিচালনার গুরুদায়িত্ব তাদের ওপর অর্পিত। সরকারি কৌঁসুলি আদালতে পুলিশের কিংবা আসামীর প্রতিনিধিত্ব করেন না, তিনি নিছক রাষ্ট্রের স্বার্থে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন মাত্র। সরকারি কর্মচারী কর্তৃক দুনীর্তি, ঘুষ গ্রহণ রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী চরম অপরাধ। তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ আদালতে ঘুষের মামলা পরিচালনায় নিয়োজিত বিশেষ পিপি বিশেষ ভূমিকা রাখবেন-এটাই স্বাভাবিক। সরকার পক্ষে মামলা পরিচালনায় একজন পিপি কতিপয় বিশেষাধিকার ভোগ করেন। তিনি বিনা ওকালতনামায় রাষ্ট্রের পক্ষে মামলা চালাতে পারেন। তার অনুমতি ছাড়া বাদী/ সংবাদদাতা কিংবা ভিকটিমের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ দেয়া যায় না। তিনি এতে অনুমতি দিলেও উক্ত আইনজীবীকে তার নির্দেশ মেনে তার সাথে সমন্বয় সাধন করে চলতে হয়। সমন্বয় করতে না পারলে ফরিয়াদি পক্ষের আইনজীবীকে সরে দাঁড়াতে হয়। পিপি আদালতের অনুমতি নিয়ে মামলা নিষ্পত্তির পূর্বে কোন মামলা প্রত্যাহার কিংবা কোন কেসের এক বা একাধিক আসামী সম্পর্কে মামলা প্রত্যাহার করতে কিংবা কোন মামলার এক বা একাধিক চার্জ প্রত্যাহার করতে আদালতে অভিপ্রায় পেশ করার অধিকার রাখেন। আদালত তার অভিপ্রায় যুক্তিসঙ্গত হলে তাতে অনুমতিও প্রদান করেন। এর থেকে বুঝা যায় যে, পিপি শুধু আসামী বা অপরাধীর সাজা করাতে খড়গহস্ত নন, তিনি নিরপরাধী মানুষের মানবাধিকার রক্ষায়ও যুগপৎ ভূমিকা রাখেন। কেননা আইনের মারপ্যাঁচে কোন নিরপরাধীর সাজা হওয়া একটি বিরাট রাষ্ট্রীয় অপরাধ। পিপিকে এ ব্যাপারে সজাগ থাকতে হয়। মোট কথা, পিপি আদালত অঙ্গনে রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় একজন নিবেদিতপ্রাণ অতন্দ্র প্রহরী। এমতাবস্থায় বুঝা যায়, একজন পিপিকে কতটুকু সৎ, চরিত্রবান, অভিজ্ঞ, নিষ্কলুষ, যোগ্যতাসম্পন্ন, নিরপেক্ষ ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব হতে হয়। এ জন্যও পিপি নিয়োগে আগেকার দিনে চরম সতর্কতা অবলম্বন করা হতো। বৃটিশ কিংবা পাকিস্তান আমলের গোলামী যুগেও এ পদটি দলীয়করণের অভিশাপ থেকে মুক্ত ছিল। তখন পেশাগত মর্যাদা, ন্যায়নিষ্ঠা, সততা ও অভিজ্ঞতার আলোকে গোপন রিপোর্টের ভিত্তিতে জেলা জজ, জেলা প্রশাসকের গোপন সুপারিশের ভিত্তিতে পিপি? জিপি পদে নিয়োগ দেয়া হতো। রিপোর্টে তাদের বংশ মর্যাদা পর্যন্ত প্রাধান্য পেত। স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে এ নিয়ম বিলুপ্ত হতে হতে পিপি/ জিপি-এর লিস্ট হওয়া শুরু হয় দলীয় কার্যালয়ে কিংবা এমপি-মন্ত্রীদের বাসভবনে। দলীয়করণের ফলে এ গুরুত্বপূর্ণ পদটিতে অভিজ্ঞের চেয়ে অনভিজ্ঞের, যোগ্যতমের চেয়ে অযোগ্যের, নির্দলীয়ের চেয়ে মতদ্বন্দ্বের প্রাধান্য বেশী হওয়ার অভিযোগ শুনা যাচ্ছে। এমনকি দলীয় আশীর্বাদের কারণে সেশন কোর্টে অতীতে তেমন দেখা যায়নি-এ ধরনের আইনজীবীকেও উল্লেখিত পদে অধিষ্ঠিত হতে দেখা যায়। রাজনৈতিক কারণে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং পিপি নিয়োগের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে অযোগ্য আইনজীবীরা পিপি’র দায়িত্ব পেলে মামলা পরিচালনার দিকে নজর না দিয়ে নজরানার দিকে অধিক মনোযোগ দিয়ে আসামীদের সুবিধা প্রদানে এগিয়ে আসবেন-এটাই স্বাভাবিক। তাই পিপি’র বা এপিপির পদটি যেন দলীয় কাউকে না দেয়া হয় সেজন্য আইন মন্ত্রণালয়কে ভূমিকা পালন করতে হবে। (সূত্রঃ পাবলিক প্রসিকিউটরের পদটি দলীয়করণের অভিশাপমুক্ত হোক, এডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান, দৈনিক ইনকিলাব ১৭  জুন ১৯৯৯)
আইন তৈরির প্রক্রিয়াকে আইন না মানা ও প্রয়োগ না হওয়ার সংস্কৃতির জন্যে দায়ী। আইন তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গে জনগণকে সম্পৃক্ত করা হয় না। কাউকে কিছু না জানিয়ে হঠাৎ করেই আইন তৈরি করা হয়। ফলে আইনে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটে না। আবার আইন তৈরির পরে জনগণকে অবহিতো করার কোনো উদ্যোগ নেয়া হয় না। এসব কারণেই মূলত আইন না মানার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
ইন্টারপোল : আইনভিত্তিক রায় ও এর প্রয়োগ তথা বিচার ব্যবস্থার পরিব্যাপ্তি দিনে দিনে বিশ্বজনীন হয়ে পড়ছে। আর এর একটি অন্যতম প্রধান নিয়ামক হলো ইন্টারপোল। এরই সূত্র ধরে উল্লেখ্য যে, ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন’ কথাটি সামনে রেখে বিশ্বের সকল দেশেরই শাসন ব্যবস্থা পরিচালিত হয়ে থাকে। অবশ্য এর নেপথ্যে থাকে বিচার বিভাগ। কেন না সৃষ্টি তত্ত্বে দেখা যায় যে, সব সময় ক্ষমতাধররা দুর্বল ও মজলুমের উপর অত্যাচার করে থাকে এবং তা এখনও কম-বেশি অব্যাহত আছে। এক্ষেত্রে সম্পদ বা জীবন কিছুই এদের হাত থেকে রেহাই পায় না। আর এই অত্যাচারী লোকদের বুক-পিঠ নেই। মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত হলেও অনেক সময় পশুর বৈশিষ্ট্যের নিচে নেমে যায়। তখন তার কাছে আপন পর কিছু থাকে না। আর এই সময়, যে কোনো অন্যায় করতে দ্বিধাবোধ করে না। এমনকি ধর্মীয় অনুশাসনও মানে না। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলে থাকেন এটি আদিম প্রবৃত্তি। আবার কেউ কেউ বলেন এটি সম্পূর্ণ পরিবেশগত। তাই এ নিয়ে কত চিন্তা-ভাবনা, কত গবেষণা। এর মধ্যে মনোবিজ্ঞানীরা বলেন যে মানুষ যখন কোনো অন্যায় করে, তখন মস্তিষ্ক সঠিকভাবে কাজ করে না। কেন না মানুষের মন এতো জটিল যে, কূলকিনারা এখনও মেলেনি। যাহোক, এটা তো আর চলতে দেয়া যায় না এবং এ সূত্র ধরে আদিকাল থেকে শাসন ও বিচার ব্যবস্থা সমান্তরালভাবে চলে আসছে। আর একটি কথা, স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী দেখা যায় যে, একজন দুর্বৃত্ত যখন কোনো জঘন্য অন্যায় করে, তখন পরিণাম চিন্তা করে না। আর ঘটনা ঘটানোর পর তার ভেতর অনুশোচনা আসে। অথচ তখন আর সময় থাকে না। এক্ষেত্রে জুরিস্প্রুডেন্স ছাড়বার পাত্র নয়। এটি তার মতো করে আইনের দাঁড়িপাল্লা নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে। এদিকে অপরাধী যতই কঠিন ও শক্তিশালী হোক না কেন, কৃতকর্মের জন্য পরবর্তীতে ভীত হয়ে পড়ে। অনেক সময় জীবন ভয়ে ভীত হয়ে দেশান্তরিত হয়; অর্থাৎ অন্য দেশে পালিয়ে যায়। তবে সংঘটিত অপকর্মের প্রকারভেদ আছে। আর সেই আবর্তে অনেকের রাজনৈতিক আশ্রয়ের কথা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু কতগুলো অপরাধ আছে, যা ক্ষমার অযোগ্য। অতীতে কোনো অপরাধী অন্য দেশে পালিয়ে থাকলেও তখন তেমন বিবেচনায় আনা হতো না। কিন্তু এর মাইলফলক সৃষ্টি হয় ১৯২৩ সালের দিকে। তখন এ প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিকভাবে একটি সংগঠন গড়ে উঠে, যার নাম Intentional Criminal Police Organisation সংক্ষেপে Interpol এখানে উল্লেখ্য যে, দেশের শাসন ব্যবস্থা (Executive Administration/Management) এবং বিচার ব্যবস্থা (Judiciary) দুটি ভিন্ন ধারায় চললেও একে অন্যের সম্পূরক হিসাবে বিদ্যমান। ইন্টারপোল হলো পুলিশ বাহিনীর একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন। ১৯২৩ সালের দিকে প্রায় বিশ্বের ৫০টি দেশ মিলে পুলিশ বিভাগকে আধুনিকীকরণ এবং অপরাধীদেরকে দ্রুত চিহ্নিত ও ধরার লক্ষ্যে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় এই আন্তর্জতাকি সংগঠনটি গড়ে তোলে। ইন্টারপোলের সদর দপ্তর ফ্রান্সের লিওনে অবস্থিত। উল্লেখ্য যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাজনৈতিক কারণে কিছুদিন এর কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও ১৯৪৬ সাল থেকে পুনরায় কার্যক্রম শুরু হয়। আর ইন্টারপোলের একটা সাধারণ পরিষদ রয়েছে। এর অধিবেশন একেক সময় একেক সদস্য রাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে সদস্য রাষ্ট্রের পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে ত্বরিত যোগাযোগ স্থাপন, অপরাধীদের সন্ধান, গতিরোধ, গ্রেফতার ইত্যাদির জন্য এই সংগঠন তথা কমিশনের যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন আঙ্গিকে কার্যক্রম চলে থাকে। বর্তমানে এর সদস্য রাষ্ট্র ১৮৮টির উপরে। আর বাংলাদেশ ইন্টারপোলের সদস্যপদ লাভ করে ১৯৭৬ সালে। এদিকে এর প্রধান প্রধান উদ্দেশ্য হলো, পুলিশ বিভাগ বা পুলিশ বাহিনীকে অপরাধীদেরকে ধরার ব্যাপারে পারস্পরিক সহযোগিতা করা; আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে আপ-টু-ডেট জ্ঞান ও প্রযুক্তির বিনিময় করা; এক দেশের অপরাধী অন্য দেশে যাতে সহজে গা ঢাকা দিতে না পারে, সে ব্যাপারে পারস্পরিক সহযোগিতা করা; সদস্যভুক্ত রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্ত কোনো আসামীকে স্বদেশে ফেরত দান; অপরাধ অনুসন্ধানের ব্যাপারে পারস্পরিক সহযোগিতা করা; বিশ্বের অপরাধ দমন জোরদার করা এবং বিশ্বজনীন নাগরিক জীবনে শৃঙ্খলা রক্ষা করা, ইত্যাদি। যাহোক, ইন্টারপোলের বাস্তব ভূমিকা দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। এক্ষেত্রে প্রশংসা কুড়িয়েছে অনেক এবং ইন্টারপোল এই বিশ্বে একটি সম্মানজনক অবস্থায় বিরাজ করছে। বর্তমানে কোনো অপরাধী তার অপকীর্তির জন্য অন্য দেশে পালিয়ে বাঁচবে, সেটা আজ সুদূরপরাহতো। এই তো কিছুকাল আগে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে সরাসরি জড়িত আসামীরা অন্য দেশে পালিয়েও নিস্তার পায়নি। তাদের ঠিকই ফাঁসির দড়ি গলায় পরতে হয়েছে। আর এটি সম্ভব হয়েছে ইন্টারপোলের সুবাদে। আর একটি কথা, অনেকে দুই বা ততোধিক দেশের পাসপোর্ট হোল্ডার। এর মধ্যে কিছু আত্মকেন্দ্রিক ও সুবিধাবাদী ব্যক্তি অপকর্ম করে থাকে। আর তারা চিন্তা করে সমস্যা বাধলে অন্য দেশের পাসপোর্ট দিয়ে বিদেশ পাড়ি জমাবে। যাহোক, ইন্টারপোল এখন ইন্টারনেটের নেটওয়ার্কের মতো সারা বিশ্বে বিদ্যমান। তাই কোনো নেতিবাচক কিছু করার আগে চিন্তা-ভাবনা করবেন। কারণ হয়তো ভাববেন ক্ষমতাবলে প্রকাশ্যে বা গোপনে নেতিবাচক কাজ করে বিদেশে পালিয়ে যাবেন। কিন্তু রেহাই পাওয়ার সুযোগ পাবেন না। সবারই তো চোখ-কান খোলা। ঠিক সময়ে আপনার হাতে আমলনামামূলক গ্রেফতারি পরোয়ানা ধরিয়ে দিবে। আর এক্ষেত্রে ইন্টারপোল পাইভোটাল রোল প্লে করে থাকে। (সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক ২১ ডিসেম্বর ২০১৫)
মোবাইল কোর্ট : আমাদের বিদ্যমান বিচারব্যবস্থায় অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ বিবরণী পেশ করতেই কেটে যায় লম্বা সময়। সাক্ষ্য হাজির করাও একটি দুরূহ বিষয়। ফলে মামলা প্রমাণ অত্যন্ত কঠিন কাজ। কিন্তু মোবাইল কোর্ট তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে কিছু কিছু অপরাধের বিচার করেন বিধায় এর কিছুটা সুবিধা রয়েছে। এর বিচার ত্বরান্বিত এবং অন্যদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক হয়। তবে অস্বীকার করা যাবে না এ ধরনের ত্বরিত বিচার ক্ষেত্রবিশেষে ন্যায়বিচারের পরিপন্থীও হতে পারে। বিচার-বিশ্লেষণের চেয়ে প্রাধান্য পেতে পারে আবেগ। তদুপরি সংশ্লিষ্ট অভিযুক্ত ব্যক্তি কিছু স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাজানো ঘটনায়ও ফেঁসে যেতে পারে। আর মোবাইল কোর্ট-ব্যবস্থায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ খুবই সীমিত বলে এ ধরনের আশঙ্কা উপেক্ষা করা যায় না। তা সত্ত্বেও আইনটি গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে। এর সুফলও দৃশ্যমান।
মোবাইল কোর্ট আমাদের বিচার বিভাগীয় ধারণায় কোনো অভিনব তত্ত্ব নয়। আলোচ্য আইন আর তার পূর্বসূরি দুটো অধ্যাদেশের আগেও ফৌজদারি কার্যবিধির ২৬০ ধারা ও অন্য কিছু আইনে এ ধরনের বিচারব্যবস্থা চালু ছিল। তা ছিল মোটরযান অধ্যাদেশ, বিশুদ্ধ খাদ্য আইন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি চুরি-সংক্রান্ত আইনের ক্ষেত্রেও। আর এ ধরনের বিচার হচ্ছে অভিযুক্ত আদালতে হাজির হওয়া বা তাকে সোপর্দ করার পরিবর্তে আদালত অকুস্থলে তার সম্মুখে উপস্থিত হয়ে বিচার করা। এসব আদালত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ফৌজদারি বিচার কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। ২০০৭ সালে বিচার বিভাগ পৃথককরণের পরও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং অপরাধ প্রতিরোধ কার্যক্রম অধিকতর দক্ষতার সঙ্গে সম্পাদন করার উদ্দেশ্যে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদেরই মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য ক্ষমতায়ন করে একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ২০০৯ সালে নির্বাচিত সংসদ এর কলেবর আরও কিছুটা বৃদ্ধি করে একে আইনে রূপ দেয়।
সম্প্রতি খাদ্যে ভেজাল, জনস্বাস্থ্য হানিকর কার্যক্রম, বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি চুরি, পরীক্ষায় নকল ইত্যাদি অনেক জনস্বার্থ পরিপন্থী কার্যক্রম প্রতিরোধে মোবাইল কোর্ট ত্বরিত পদক্ষেপ নিয়ে জনগণের নজরে আসতে সক্ষম হয়েছেন। একই আবরণে পরিবেশ আদালতগুলোও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়ে চলছেন। কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, এ আদালতগুলো জনপ্রিয় এবং কার্যকরী। তবে বিতর্কও রয়েছে এর কাজ নিয়ে। (সূত্রঃ দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ২২ জুলাই ২০১৫)
আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে দণ্ড বিধানের বিষয়টি বেশ জটিল হচ্ছে। মূলত রাজনৈতিক সভা, সমাবেশ ও মিছিলকে কেন্দ্র করে এ ধরনের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এ জাতীয় ক্ষেত্রে প্রকৃত অপরাধী চিহ্নিতকরণে পুলিশও অনেক ক্ষেত্রে ভুল করে। ম্যাজিস্ট্রেট তো কিছুটা দূরেই থাকার কথা। এ কথা অস্বীকার করা যাবে না অগ্নিসংযোগ, নাশকতা ইত্যাদি কার্যক্রম বেশ কিছুকাল আমাদের জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছিল। এমনটা আর ঘটবে না, তাও জোর দিয়ে বলা চলে না। এসব ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা অসংগত নয়। তবে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে অভিযোগ বিচার-বিশ্লেষণ না করলে অবিচারের আশঙ্কা থেকে যায়। তাঁরা রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট বলে চিহ্নিত হতে পারেন। আর প্রশাসন ও পুলিশকে দলীয়করণের অভিযোগ তো নতুন বা একেবারেই অমূলক নয়। এজাতীয় ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় সংযত না হলে সেসব অভিযোগ আরও জোরদার হবে।
কারাদণ্ড ও জরিমানা উভয়ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্র্টের দণ্ড বিধানের ক্ষমতাও যথেষ্ট। এ ক্ষমতার কতটা প্রয়োগ করা হবে, সেটা নির্ভর করছে তাঁদের সুবিবেচনার ওপর। আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ যেখানে নেই, সেখানে দণ্ড প্রয়োগের মাত্রা সীমিত হতে পারে। আর এ সীমারেখা টানতে পারেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট স্বয়ং। অবশ্য তা হবে প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র। তবু ক্ষেত্রবিশেষে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসামীকে গুরুদণ্ড দেওয়া প্রয়োজন অনুভব করলে তিনি তাঁকে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সোপর্দ করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিতে পারেন। আর ক্ষেত্রবিশেষে দণ্ড তো তিনি দিতে পারেনই।
এখন প্রশ্ন এসেছে, অভিযুক্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দোষ স্বীকার না করলেও বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা নিয়ে শাস্তি দেওয়া প্রসঙ্গে। এটাও কোন ক্ষেত্রে কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা দেখার বিষয়। নাবালিকা বিয়ে করতে বর সেজে বিয়ের আসরে বসে থাকলে অপরাধ স্বীকার না করলেও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সে বর, বরকর্তা আর ক্ষেত্রবিশেষে অন্যদেরও দোষী ভাবতেই পারেন। দণ্ডবিধানও অপ্রাসঙ্গিক নয়। ইভটিজিংসহ এ রকম আরও কিছু সামাজিক বিষয়াদিতে নিরপেক্ষ সাক্ষী পাওয়া সম্ভব। তবে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে এ ক্ষমতাটি জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এ রকম অভিযোগের নিরপেক্ষ সাক্ষী পাওয়া কঠিন হওয়ার কথা। অপরাধী চিহ্নিত করার জন্য তথ্যপ্রযুক্তি এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানেও হতে পারে। এর অপব্যবহার সম্পর্কেও আমরা শঙ্কিত। তাই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর আইনের এ প্রস্তাবিত সংশোধনী কঠিন একটি দায়িত্ব অর্পণ করবে। এ ক্ষেত্রে তাঁদের যথেষ্ট সংযত ও বিচক্ষণ আচরণ করতে হবে। অন্যথায় একটি গ্রহণযোগ্য, প্রশংসনীয় ও জনকল্যাণকর আইন বিতর্কিত হবে। অতীতের অনেক অর্জন যাবে বৃথা।
দেখা যায়, মোবাইল কোর্র্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জনগণের একটি অংশ দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন। এটা অনাকাক্সিক্ষত। তবে বিষয়গুলোর গভীরে যাওয়া আবশ্যক। অতি সম্প্রতি নরসিংদীতে এ রকম ঘটেছে প্রায় পাঁচ শ’ গ্যাসলাইন বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে। এসব লাইনের সুফলভোগীরা বলছেন, তাঁরা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি লাইনের জন্য ২০-৩০ হাজার টাকা করে দিয়ে তা নিতে পেরেছেন। হতে পারে টাকার পরিমাণ কম বা বেশি। কিংবা সবাই তা করেনওনি। তবে গ্যাস কোম্পানির লোকদের সক্রিয় সহযোগিতা ব্যতিরেকে এ রকম সংযোগ দেওয়া কি সম্ভব? পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে এসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা দরকার। গ্যাস কোম্পানির যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে লাইন দেওয়া হয়েছে, তাঁরাসহ স্থানীয় সহযোগীদেরও গ্যাস চুরির সহযোগিতার অভিযোগে সংক্ষিপ্ত বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন। দন্ডিত হোক তারাও। তা না হলে সৎ লোকেরা অন্যায়ে বাধা দেওয়ার মনোবল হারিয়ে ফেলবে। আর এটা অসম্ভব এমনটা বলা যাবে না। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির লাইনের ক্ষেত্রেও এ রকমই ঘটে থাকে। অবশ্য বেআইনি সংযোগ দেওয়া হয়েছে বলে এ রকম চলতে থাকবে, এমনটা নয়।
জনকল্যাণকর অনেক কাজে স্থানীয় জনগণ মোবাইল কোর্টকে ব্যাপক সহায়তা করে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ও সুফলদায়ক। ত্বরিতই প্রতিকার মেলে বলে ছুটে যায় তাদের কাছে। সে ক্ষেত্রে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের এটা করার কথা আবেগবর্জিত ও ন্যায়নিষ্ঠভাবে। আইনপ্রণেতারা আইন প্রণয়ন করবেন। আর সরকারি কর্মকর্তারা তা বাস্তবায়ন করবেন পক্ষপাতহীন, ন্যায়নিষ্ঠ, আবেগবর্জিত হয়ে। মোবাইল কোর্ট আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। [সমাপ্ত]
[email protected]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ