ঢাকা, বৃহস্পতিবার 24 November 2016 ১০ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ২৩ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রতিষ্ঠা হোক বিভাগভিত্তিক স্বতন্ত্র নারী বিশ্ববিদ্যালয়

মোঃ আবুল হাসান/খন রঞ্জন রায় : প্রখ্যাত এক মনীষী বলেছিলেন, ‘নারী হেসে উঠার আগ পর্যন্ত পৃথিবী ছিল বিষণ্ন আর বাগান হয়েছিল জঙ্গল।’ এই বাস্তবতার নিরিখে বর্তমানে বিশ্বনারী জাগরণের জোয়ার বইছে। বাংলা সাহিত্যের দুই প্রধান দিকপাল কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। এ দু’কবির সাহিত্য কর্মে নারী আচ্ছন্নতা প্রখর। নারীকে উভয়ে দেখেছেন অসুর বিনাশিনী শক্তি হিসাবে, প্রেরণাদায়িনী মঙ্গলময়ী দাত্রী হিসাবে, মমতাময়ী মা হিসাবে। ‘অর্ধেক মানবী তুমি, অর্ধেক কল্পনা’ অথবা, ‘এ বিশ্বে যা কিছু সৃষ্টি চিরকল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’
পৃথিবীতে যা কিছু প্রাকৃতিক তার অধিকাংশ উপাদানই নারীর প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত। মানুষের চিন্তা, দর্শন, সাহিত্য, বিজ্ঞান- সবকছিুতেই নারীর উপস্থিতি সমুজ্জ্বল। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকেই প্রকাশ্যে বা নিভৃতে সূচিত হচ্ছে নারীর অবদান। প্রাচীন সময় থেকেই সভ্যতা বিকাশের প্রশ্নে বড় ভূমিকা রেখে চলেছে নারী। শিল্পকলার গভীরে, নারীর অনন্য অবস্থান। নারী কখনও নদী, কখনও প্রকৃতি, কখনও কোমলতার প্রতীক, কখনও সৌন্দর্য্যরে। যুদ্ধবিগ্রহ, হানাহানির ঘটনাও কম নেই পৃথিবীতে। প্রাণহানি কিংবা রাজার সিংহাসন ছাড়ার ঘটনাও আছে। শান্তির প্রতীক হিসেবে নারীর সরব উপস্থিতির অসংখ্যা স্বাক্ষর রয়েছে। পৃথিবীর সব উন্নয়নমূলক কাজে রয়েছে নারীর অবদান। শিক্ষা তাদের করেছে অধিকার সচেতন। এখন নারীরা ঘরসংসারের দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের মেধা ও মননের পরিচয় দিচ্ছে। রাখছে কৃতিত্বের স্বাক্ষর। নারী শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, সমাজ সংস্কারক, বিপ্লবী, সংগঠন হিসেবে অসমান্য অবদান রাখতে সক্ষম হচ্ছে। অথচ চাকরির ক্ষেত্রে যেমন বিচারপতি, সচিব, রাষ্ট্রদূত, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এমনকি পুলিশ প্রশাসনে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত নারীর সংখ্যা বাড়েনি। সচিবালয়ে কর্মরত নারীর সংখ্যা শতকরা মাত্র ৮ দশমিক ৭ ভাগ। একটি জাতির উন্নতি, অগ্রগতি, অবনতি নির্ভর করে তাদের সন্তান-সন্ততির শিক্ষা-দীক্ষার ওপর এবং এই শিক্ষা অধিকতর নির্ভর করে তাদের মায়েদের ওপর। মা যদি শিক্ষিত বুদ্ধিমতী ও সচেতন হন তাহলে নিঃসন্দেহে তাদের সন্তানরাও ওইসব গুণের অধিকারী হবে। একটি জাতির উন্নতি ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে নারীসমাজের সুষ্ঠু শিক্ষার বিষয়টি সর্বাধিক গুরত্বপূর্ণ। মাদাম মেরী কুরী ইতিহাসে প্রথম নোবেল জয়ী নারী। শুধু তাই-ই না, তিনি দু’বার নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ১৯০৩ সালে পদার্থ বিজ্ঞানে হ্যানরী বেকেরেলের সাথে যৌথভাবে। এরপর ১৯১১ সালে পুনরায় এককভাবে রসায়নে। নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে দ্বিতীয় নারী বার্থা ভন সার্টনার। বার্থা ১৯০৫ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। সেলমা লুগার্লেফই ১৯০৯ সালে নারী হিসেবে সাহিত্যে প্রথম নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। মাদার তেরেসাকে বিশ্বশান্তির পায়রা বলে অভিহিত করা হতো। ১৯৭৯ সালের ১৭ অক্টোরব তিনি তার সেবাকার্যের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১১ সালের শান্তির নোবেল বিজয়ী তিন জনই নারী। তাঁরা হলেন, লাইবেরিয়ার প্রেসিডেন্ট, এলেন জনসন সারলিক, লাইবেরিয়ার শান্তিবাদী কর্মী লেমাহ জিবোয়ি এবং ইয়েমেনের নারী অধিকার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মী ও সাংবাদিক তাওয়াককুল কারমান।
আমাদের দেশে শান্তিতে ড. ইউনূস নোবেল পুরস্কার পেলেও নারীরা এই প্রতিযোগিতায় বহুদূর পিছিয়ে আছেন। কিন্তু বাংলাদেশে নারীদের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণের ফলে শিক্ষায় ব্যাপক এগিয়ে গেছে বাংলাদেশে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার বৃদ্ধি ও এক্ষেত্রে জেন্ডার বৈষম্য হ্রাস বাংলাদেশ ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। ৪০ বছর আগে ছেলেদের তুলনায় ৫০ শতাংশ মেয়ে স্কুলে যেতো কিন্তু এখন বিদ্যালয়গামী ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের হার বেশি। উচ্চ শিক্ষায় মেয়েরা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে মেয়েদের সংখ্যা ছেলেদের তুলনায় বেশি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষকের হার প্রায় ৭৫ শতাংশ। জেন্ডার সমতা অর্জনের লক্ষ্য ছাড়িয়ে গেছে। প্রাথমিক পর্যায়ের ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির ক্ষেত্রে ব্যবধান কমে মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল-এর টার্গেট পূরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এখন নির্ধারণ হয়েছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা।
শিক্ষাক্ষেত্রে প্রাথমিক স্তরে ৫০.১৩ শতাংশ, মাধ্যমিক স্তরে ৫২.২ শতাংশ, উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ৪১.৬৪ শতাংশ ছাত্রী রয়েছে। প্রাথমিক, নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের এই উচ্চ হারের মূলে রয়েছে তৃণমূলে বালিকা বিদ্যালয় ও মহিলা কলেজের মানসম্মত শিক্ষা। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে নারী শিক্ষার্থী মাত্র ১৪ শতাংশ। এই হার বৃদ্ধির জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস ২০১২ এ স্লোগান নির্ধারণ করা হয় ‘নারীর ক্ষমতায়নে উচ্চ শিক্ষা’। শিক্ষা কাঠামোর গ্রামীণ নারীদের সম্পৃক্ততায় আমূল পরিবর্তন না আনলে উচ্চশিক্ষা সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন বিশ্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ছে। আঞ্চলিকভাবে যেমন আমাদের প্রতিযোগিতা করতে হবে, তেমনি আন্তর্জাতিকভাবেও শিক্ষাব্যবস্থা সাজাতে হবে। বিশ্বপ্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশে অমিত সম্ভাবনার দেশ। বাংলাদেশের মানুষ পৃথিবীর অন্য যে কোনো দেশের মানুষের চেয়ে উন্নত মানসম্পন্ন, গুণসম্পন্ন, ধৈর্য্যশীল, পরিশ্রমী, সাহসী, মেধাবী। গ্রামীণ মেধাবী নারীদের উচ্চ শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই তাদের কাক্সিক্ষত সেবাপ্রাপ্তির মাধ্যমে দেশের সার্বিক অগ্রগতি নিশ্চিত হবে।
সরকার প্রতি জেলায় একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এইটি মহতী উদ্যোগ। গ্রামীণ নারীদের উচ্চ শিক্ষায় এগিয়ে নিতে তাদের শিক্ষা সুযোগ আরো বাড়াতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে তাদের নিরাপত্তা ও প্রত্যাশিত সুযোগ-সুবিধা। বাংলাদেশের বিভাগভিত্তিক স্বতন্ত্র নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সম্ভব হলে উচ্চ শিক্ষায় বিশ্বব্যাপী গ্রামীণ নারীদের উন্নয়নে নির্ভরশীল ভূমিকা রাখতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ