ঢাকা, বৃহস্পতিবার 24 November 2016 ১০ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ২৩ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খুলনায় সওজ’র ৮৩ কোটি টাকার কাজ আওয়ামী ঠিকাদারদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা

খুলনা অফিস : খুলনায় সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) ৮৩ কোটি টাকার কাজ আওয়ামী সমর্থিত ঠিকাদারদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশাল অংকের এ কাজ আওয়ামী লীগের ঠিকাদার সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগে জানা গেছে। সওজ’র কতিপয় কর্মকর্তার সহযোগিতায় পুরো বিষয়টি ধামাচাপার চেষ্টাও করেছে ঠিকাদার সিন্ডিকেট। এমনকি মিডিয়াকেও ম্যানেজের চেষ্টা করা হয়। এদিকে খুলনায় একের পর এক টেন্ডারবাজি হলেও টেন্ডারবাজদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ না নেয়ায় তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। দুই-একটি ঘটনায় রি-টেন্ডার হলেও টেন্ডার সন্ত্রাসীরা থেকে যায় ছোঁয়ার বাইরে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা বাইপাস সড়ক নির্মাণের ৮৩ কোটি টাকার টেন্ডার দাখিলের শেষ দিন ছিল গত সোমবার। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, রেঞ্জ ডিআইজি অফিস, সড়ক শাখার সার্কেল অফিস এবং অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ে সিডিউল দাখিলের স্থান ছিল। কিন্তু ঠিকাদার সিন্ডিকেট প্রথম থেকেই বিশাল অংকের এ কাজ বাগিয়ে নিতে তৎপর ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রভাবশালী ওই সিন্ডিকেট সাধারণ ঠিকাদারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে সিডিউল কিনতে এবং জমা দিতে বাধা প্রদান করেন। যার ফলশ্রুতিতে তাদের পরিকল্পনা মাফিক মাত্র তিনটি দরপত্রই জমা পড়ে। যা নিয়ম রক্ষা ছাড়া আর কিছুই নয় বলে অভিযোগ সাধারণ ঠিকাদারদের।
সাধারণ ঠিকাদারদের অভিযোগ, সড়ক ও জনপথ বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তার সহযোগিতায় ঠিকাদার সিন্ডিকেট সহজেই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়। বিনিময়ে তারাও মোটা অংকের আর্থিক সুবিধা পেয়েছে। এছাড়াও এ সংবাদ ধামাচাপা দিতে সাংবাদিকদের দিয়ে বিভিন্ন পত্রিকাও ম্যানেজ করার চেষ্টা করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি ধামাচাপা দেয়া সম্ভব হয়নি। বিষয়টি জানাজানি হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেননি বলে সূত্র জানিয়েছে। টেন্ডার সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং উল্লিখিত কাজের পুনঃদরপত্র দাবি করেছেন সাধারণ ঠিকাদাররা।
এ ব্যাপারে সওজ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ বলেন, সড়ক ভবনে শান্তিপূর্ণভাবে সিডিউল জমা নেয়া হয়েছে। এখানে কোন অনিয়ম হয়নি। সিন্ডিকেটের ব্যাপারে ঠিকাদাররা লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত করা হবে। তবে কোন সিন্ডিকেট হয়েছে কি না তা আমার জানা নেই।
এদিকে, একের পর এক শতশত কোটি টাকার টেন্ডারবাজি হলেও মিলছে না কোন প্রতিকার। বিভিন্ন সময় টেন্ডার সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়রি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করা হলেও কখনই কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলশ্রুতিতে টেন্ডারবাজরা রয়েছে বহাল তবিয়তে। তবে বড় বড় দাগের অধিকাংশ টেন্ডার সন্ত্রাসের নেপথ্যে কথিত গডফাদার ও রাঘব বোয়ালরা থাকে বলে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (পিপিএ), ২০০৬ ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর), ২০০৮ যথাযথভাবে অনুসরণ না হওয়ায় খুলনায় দরপত্র নিয়ে সিন্ডিকেট চক্রের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে খুলনাঞ্চলের উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের মান।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি), খুলনা ওয়াসা, খুলনা গণপূর্ত অধিদপ্তর-১ ও ২, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় অধিদপ্তর (এলজিইডি), শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ) এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ খুলনার সরকারি-বেসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই চলছে টেন্ডারবাজি। গত ৯ নবেম্বর কেসিসির আহ্বানকৃত নগরীর বয়রা গোয়ালখালি মেইন রোড উন্নয়নে যশোর রোড থেকে মুজগুন্নি মহাসড়ক পর্যন্ত ৪ কোটি ১৫ লাখ টাকার কাজ কৌশলে ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এভাবে কয়েকটি সিন্ডিকেট চলতি বছর কয়েকশ’ কোটি টাকার টেন্ডার দফারফা করে নিয়েছেন। সম্প্রতি খুলনা কেবল শিল্প লিমিটেড’র দরপত্র বক্স খুলনা বিটিসিএল কার্যালয় থেকে ছিনতাই করা হয়। ওই ঘটনায় একজন ঠিকাদার খুলনা থানায় সাধারণ ডায়রি করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২ ফেব্রুয়ারি খুলনায় টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটের ডরমেটরি ও জুটশেড ভবন নির্মাণের ১০ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ আওয়ামী লীগ নামধারী ঠিকাদাররা ভাগবাটোয়ারা করে নেয়ার অভিযোগ ওঠে। আগের রাতেই যুবলীগ নামধারীরা সাধারণ ঠিকাদারদের কাছ থেকে সিডিউল ছিনিয়ে নেয়। গণপূর্ত বিভাগ গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর খুলনার ইনস্টিটিউটের জন্য দু’টি ভবন নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করে। এর আগে ১৩ জানুয়ারি খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) ২২ কোটি ৯ লাখ টাকার টেন্ডার সিডিউল জমা দিতে সাধারণ ঠিকাদারদের সশস্ত্র বাধা দেয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। খুলনার শিরোমণি শিল্পাঞ্চল মেইন রোডের ৯ কিলোমিটার রাস্তার পুনঃনির্মাণের প্রকল্পটির গত বছরের ১০ ডিসেম্বর উন্মুক্ত টেন্ডার আহ্বান করে কেডিএ। টেন্ডার সিডিউল জমা দেবার শেষ দিন সকাল থেকেই কেডিএ ভবনের চারপাশে অর্ধশতাধিক অস্ত্রধারী সাধারণ ঠিকাদারদের সিডিউল জমা দিতে বাধা দেয়। তবে প্রকল্প পরিচালক কেডিএ’র সহকারী প্রকৌশলী মোরতোজা আল মামুন ওই সময় বলেছিলেন, ‘অফিস কক্ষের বাইরে কেউ কাউকে বাধা দিয়েছে কি না তা তার জানা নেই।
একইভাবে গত ২৮ জানুয়ারি খুলনা সিটি করপোরেশনে (কেসিসি) প্রায় ৮ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে অ্যাসফল্ট প্লান্ট স্থাপন প্রকল্পের টেন্ডারটি ক্ষমতাসীন দলের নামধারী ঠিকাদার সিন্ডিকেটে দফারফা করে নেয়। প্রথম দু’দফা পুনঃদরপত্রের পর তৃতীয় বারও কতিপয় কর্মকর্তার যোগসাজশে আওয়ামী লীগ নামধারী নেতার প্রতিষ্ঠানকে কাজটি পাইয়ে দেয়া হয়। যথারীতি প্রকল্প পরিচালক ও কেসিসি’র নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল আজিজ ওই সময় বলেন, অস্ত্রের মহড়া ও সিন্ডিকেট বা সিডিউল জমা দিতে বাধার কোন অভিযোগ তার কাছে আসেনি।
এদিকে, গত ২৫ এপ্রিল বয়রাস্থ খুলনা আঞ্চলিক বন কর্মকর্তার কার্যালয়ে টেন্ডার বক্স ছিনতাইয়ের অভিযোগ ওঠে আওয়ামী লীগ নামধারী ঠিকাদার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে বন কর্মকর্তা আব্দুস সালাম খালিশপুর থানায় সাধারণ ডায়রিও করেন। সিআরসিডব্লিউ প্রকল্পের আওতায় বিশ্ব ঐতিহ্যের সুন্দরবন রক্ষায় স্মার্ট পেট্রলিংয়ে ব্যবহৃত ডিজেল ক্রয়ের দরপত্র আহ্বান করে বন মন্ত্রণালয়। ২৫ এপ্রিল সাধারণ ঠিকাদাররা দরপত্র জমা দিতে গেলে সিন্ডিকেটের ঠিকাদাররা বাধা দেয়। একপর্যায়ে সিন্ডিকেট সদস্যরা টেন্ডার বক্স নিয়ে পালিয়ে যায়। খুলনার বন সংরক্ষক মো. জহির উদ্দিন আহমেদ ওই সময় বলেন, কিছু লোক দুষ্টুমি করে টেন্ডার বাক্স নিয়ে গিয়েছিল, পরে আবার ফিরিয়ে দেয়।
সূত্র জানিয়েছে, খুলনার দৌলতপুরে বিভাগীয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরে কোন টেন্ডারই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয় না। দরপত্র আহ্বান করা মাত্রই তা সিন্ডিকেটের দখলে চলে যায়। এভাবে এ দপ্তরে কোটি কোটি টাকার টেন্ডার সন্ত্রাস হয় বলেও সাধারণ ঠিকাদারদের অভিযোগ।
গত ২২ মার্চ খুলনা ওয়াসার পানি সরবরাহ প্রকল্পের পাম্প স্থাপন ও ভবন নির্মাণের প্রায় ১৫ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ আওয়ামী লীগের নামধারী নেতারা ভাগবাটোয়ারা করে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা থেকে আসা টেকনো কনসালটেন্সি নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা দরপত্র জমা দিতে গেলে তাদের আটকে রাখা হয়। সেখান থেকে ছাড়া পেয়ে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ সদর দফতরে রাখা বক্সে দরপত্র জমা দেন তারা। ওয়াসা’র এই কাজের জন্য নয়টি সিডিউল বিক্রি হলেও জমা পড়ে মাত্র তিনটি। খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আবদুল্লাহ পিইঞ্জ ওই সময় বলেন, ঠিকাদারদের বাধা দেয়ার অভিযোগ করেনি কেউ।
এর আগে ২০১৪ সালের ২ ডিসেম্বর খুলনা ওয়াসা’র আঞ্চলিক ভবন নির্মাণ কাজের প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকার দরপত্র ক্ষমতাসীন দলের নেতারা ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। এছাড়াও গত বছরের ১৬ অক্টোবর খুলনা ওয়াসার প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট প্রকল্পের নির্মাণ কাজও সিন্ডিকেট দখলে নেয়।
তবে বড়বড় কাজে সিন্ডিকেট হলেও নিরাপত্তার কারণে কর্মকর্তারা কথা বলতে সাহস পান না। আবার সিন্ডিকেট হলে কোন কোন কর্মকর্তা আর্থিক লাভবান হন, আর এ কারণেও তারা মুখ বুজে থাকেন।
কেসিসি’র সদ্য বিদায়ী ভারপ্রাপ্ত মেয়র আনিছুর রহমান বিশ্বাস বলেন, সিডিউল বিক্রি ও জমাদানে বাধাসহ টেন্ডার সংক্রান্ত কোন অভিযোগ পেলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। ইতোপূর্বেও এ ধরনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে কয়েকটি দরপত্র বাতিল করে পুনরায় টেন্ডার দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র দাখিল ও কাজের সুযোগ থাকলে নির্মিত কাজের গুণগত মান ভাল হয়। সিন্ডিকেট হলে ঠিক এর বিপরীত হয়। তাছাড়া সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সার্বিক উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। নিজ এলাকার ও দেশের উন্নয়নের স্বার্থে ওই চর্চা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার বলেও মনে করেন তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ