ঢাকা, শুক্রবার 25 November 2016 ১১ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ২৪ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কাণ্ডারি হুঁশিয়ার

তৌহিদুর রহমান : মুসলিম মিল্লাতের সামনে-পিছনে, ওপরে-নীচে, ডানে-বামে, জলে-স্থলে এখন ঘোর অমানিশা। সহসা এই অমানিশা কেটে যাবে তার কোনো নাম-নিশানা পর্যন্ত আজ আর দেখা যাচ্ছে না। কবি তো বহু দূরে হলেও দেখতে পেয়েছিলেন ‘হেরার রাজতোরণ’। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির দিকে তাকালে মনে হচ্ছে প্রায় পাঁচশ’ বছর আগে থেকে চলে আসা মুসলমানদের এই দুর্দিন আর হয়তো শেষ হবে না। বহু দূরে তো দূরে থাক তারও পরে সামান্য আলোর ঝলকানিও আজ আর দেখা যাচ্ছে না। রাত ক্রমেই যেন গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে। সিরিয়া, মিশর, ইয়েমেন, আফগানিস্তান, ইরাক, আলজেরিয়া, সুদানসহ আফ্রিকা ও এশিয়ার প্রায় সব মুসলিম দেশ কোন না কোনভাবে খুব দ্রুত মহাদুর্যোগের দিকে ধাবিত হচ্ছে। একদিকে ইহুদি-নাসারাদের ভয়াবহ আক্রমণ অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বের সেক্যুলার ও স্বৈরচারী একনায়কতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনা আজ পুরো মুসলিম জাতিকে আড়ষ্ঠ করে ফেলেছে। শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ইত্যাদি সবকিছুই আজ খুব কৌশলে সেক্যুলারিজমের মোড়কে মুড়ে দেয়া হয়েছে। আন্তকলহ, ক্ষমতালিপ্সা, অর্থলিপ্সা, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, বিভিন্ন মতবাদ ও ইজম আজদাহার মতো গিলে ফেলেছে মুসলিম জাতিকে। এরপরেও সামাজিক পর্যায়ে যেটুকু তাহজিব তমদ্দুন এতোকাল টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছিল তাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে নিঃশেষ হতে চলেছে। পশ্চিমাবিশ্বে হাজার বছর আগে থেকেই পারিবারিক প্রথা ধ্বংস হয়েছে। তাদের মধ্যে অবাধ যৌনাচার ও পরিবার প্রথা উঠে গেছে বহু আগেই। বিয়ে ছাড়াই লিভ টুগেদার তাদের কাছে স্বতঃসিদ্ধ বিষয়। অথচ মুসলিম জীবনে বিয়ে ছাড়া নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা সম্পূর্ণ হারাম। কিন্তু অবাধ তথ্য প্রবাহের এই যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে আদর্শের সব ধরনের সীমানা প্রাচীর আজ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বিশ্বের সব পতিতালয় আজ মানুষের হাতের মুঠোয়। ইচ্ছা করলেই আজ আর আপনি আপনার সন্তানকে আটকে রাখতে পারবেন না। দৈহিকভাবে পতিতালয়ে যাওয়া আর মানসিক ও চাক্ষুষভাবে যাওয়া একই কথা। বর্তমান মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ইসলামী চিন্তাবিদগণ একথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, অনলাইনে থাকলে আপনার অনিচ্ছা সত্ত্বেও এমন কিছু অযাচিত উৎপাত আপনাকে আক্রমণ করবে যার থেকে রেহাই পাওয়া অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। পিতা-মাতা-সন্তান কারো কোন গোপন বিষয় আজ আর অন্যের কাছে গোপন থাকছে না। অথচ ইসলামে অন্যের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখার বিষয়ে জোর তাকিদ দেয়া হয়েছে। এমনকি পিতা-মাতার ঘরে তাদের অনুমতি ছাড়া প্রবেশ না করতে বলা হয়েছে। অথচ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে পিতার ঘরে পুত্রের অবাধ বিচরণ। আর তা পিতার অজান্তেই হতে পারে। একই কথা প্রযোজ্য মাতা, পুত্র, কন্যা সবার ক্ষেত্রে। আর নির্লজ্জ বেহায়াপনার কথা না হয় নাই বা বললাম- ভিডিও কল, ফেসবুক ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে এমন সব চ্যাটিং, ডেটিং, টকিং আর লুকিং চলছে যা কল্পনারও অতীত। হ্যাঁ, এগুলোর ভালো দিক অবশ্যই আছে, কিন্তু মানুষের মন সর্বদাই প্রবলভাবে নীচের দিকে ধাবিত হয়, যে কারণে ভালোর চেয়ে মন্দের প্রতিই মানুষ বেশি আকৃষ্ট হয়।
যাহোক, আলোকপাত করতে চাই মুসলিম বিশ্বের ঘনঘোর অন্ধকার নিয়ে। এখন লাখ লাখ উদ্বাস্তু জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে উত্তাল সাগর-মহাসাগর পাড়ি দিয়ে নিজেদের চৌদ্দ পুরুষের ভিটে-মাটি ছেড়ে পাড়ি জমাচ্ছে ইউরোপ আমেরিকায় শুধুমাত্র জানে বেঁচে থাকার আশায়। এর কারণ কি? প্রধান কারণ হচ্ছে মুসলিম জাতির নিজেদের মধ্যে অনৈক্য। গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত সিরিয়ার কথায় ধরা যাক, বর্তমানে এখানে কমপক্ষে সাত সাতটি গ্রুপ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং এদের নেতৃত্বদানকারী প্রত্যেকেই নিজেকে সিরিয়ার ভাবি-প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনে করছে। এবং এদের প্রায় সবাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পশ্চিমাবিশ্ব ও ইহুদিদের মদদপুষ্ট। অন্যদিকে সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট সমস্ত সিরীয়বাসীকে হত্যা করে হলেও ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এখানে একটা বিষয় খুবই পরিষ্কার যে, মুসলিম বিশ্বের প্রায় সব ধরনের অগণতান্ত্রিক সরকারকেই পশ্চিমাবিশ্ব গোপনে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে জঙ্গিবাদ দমনের নামে মুসলমান নিধনে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে যাচ্ছে। একদিকে আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিন প্রভৃতি দেশে প্রকাশ্যে বোমা মেরে নিরীহ মুসলমান হত্যা করছে অন্যদিকে জঙ্গিদের মদত দিয়ে একই কাজ তারা অন্যভাবে করছে। আমরা মুসলমানরা উভয় পক্ষই আসলে তাদের হাতের খেলার পুতুলে পরিণত হয়েছি। মনে রাখতে হবে মুখে এরা গণতন্ত্রের কথা বললেও বাস্তবে এরা চরম মুসলিম বিদ্বেষী। ইসলামের বিরুদ্ধে অগণতান্ত্রিক শক্তিকে তারা অনৈতিক সমর্থন দিতেও কুণ্ঠাবোধ করছে না। এক্ষেত্রে এরা দু’মুখো নীতিতে বিশ্বাসী। সব ধরনের হাতিয়ারে সজ্জিত করে চোরকে এরা চুরি করতে পাঠায় আবার চোরের সব তথ্য গৃহকর্তাকে দিয়ে বলে সজাগ থাকতে। জঙ্গি সংগঠন এবং অগণতান্ত্রিক সরকার দু’টোয় তাদের কাছে পুজনীয়। হোক সে সামরিক, অগণতান্ত্রিক বা স্বৈরচারী সরকার অথবা আইএস বা অন্য নামে।
বর্তমানে আইএস নিয়ে বিশ্বব্যাপী মহাতোলপাড় চলছে। মূলত আইএস তাদের অসংখ্য বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পৃথিবীতে ঝড় তুলেছে। আমাদের খতিয়ে দেখা দরকার আইএসের মদতদাতা কারা? বিভিন্ন সময় আইএস’র পক্ষে সহানুভূতিশীল হয়ে বিবৃতি দিচ্ছে কারা? আইএস’র অর্থদাতা, অস্ত্রদাতা কারা? আইএসের আশ্রয় প্রশ্রয়দাতা কারা? আইএস’র বিরুদ্ধে এতো যে অভিযোগ তার কোন সদুত্তর দিচ্ছে কেন না তারা? আইএস’র বর্তমান প্রধান একজন ইহুদি। অতএব আইএস কারা তা সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। তাই সতর্ক ও সাবধান হতে হবে আমাদের। মনে রাখতে হবে ইসলাম কখনো সন্ত্রাসবাদ সমর্থন করে না।
ইসলামের শত্রুরা খুব কৌশলে মুসলমানদের অনৈক্যের সুযোগ নিচ্ছে এবং একশ্রেণীর সেক্যুলার ইসলাম বিদ্বেষী তথাকথিত আরবি নামধারী মুসলমানদের দিয়ে ছলে-বলে, কলে-কৌশলে মুসলমান নেতৃত্বকে খতম করে দিচ্ছে। এটা খুবই ঠাণ্ডামাথার কাজ- ঠিক এক সময় এভাবে অনেক কম্যুনিস্ট নেতৃত্বকে খতম করে দেয়া হয়েছিল। এখন একই অস্ত্র তারা প্রয়োগ করছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে।
পৃথিবীর সর্ব প্রান্তেই বলা যায় এখন মুসলমানদের উপর চরম নিপীড়ন চলছে। কিন্তু অতীতের অত্যাচারের চিত্র আর বর্তমানের অত্যাচারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্নতর। এখন পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক যদি কোন প্রকৃত মুসলমান তার জাতির নেতৃত্ব দেয়ার জন্য কাজ শুরু করে তবে তাকে যে কোন অজুহাতে খতম করে দেয়া হচ্ছে। মুসলিম মিল্লাতের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হচ্ছে এখানে কখনো কখনো ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের সংকট দেখা দিয়েছে প্রকটভাবে। জুলুমের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে কখনো কখনো নেতৃত্ব একদম নিঃশেষ হয়ে গেছে। তখন মনে হয়েছে মুসলিম জাতি আর হয়তো পৃথিবীর বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না, তাদের নেতৃত্ব দেয়ার মতো হয়তো পৃথিবীতে আর কেউ থাকবে না। বর্তমান সময়ে বিভিন্ন দেশে বেছে বেছে প্রকৃত ঈমানদার মুসলমানকে খতম করে দেয়া হচ্ছে। এটা ইহুদিবাদের চক্রান্তের ফল।
যাহোক, এর থেকে পরিত্রাণের উপায় একটাই আর তা হচ্ছে, মহাগ্রন্থ আল কুরআন ও সুন্নাহ্র দিকে মনোনিবেশ করা। সেই সাথে মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা, হানাহানি ভিভেদ দূর করা, ধৈর্য্য ধারণ করা, বন্ধু বাড়ানো আর মহান আল্লাহর সাহায্য কামনা করা।
মনে রাখতে হবে এখন যারা জীবিত আছে তাদের একমাত্র অভিভাবক হলেন মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন। মহান আল্লাহ্ বলেন, ‘যদি তারা সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে তোমরা যেনে রেখো, আল্লাহ্ তায়ালাই হচ্ছেন তোমাদের অভিভাবক, কত উত্তম অভিভাবক আল্লাহ্ তায়ালা, কত উত্তম সাহায্যকারী। (আনফাল-৪০), আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌম ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ্ তায়ালার হাতেই; তিনিই জীবন দেন, তিনিই মৃত্যু ঘটান, আল্লাহ্ ছাড়া তোমাদের কোন অভিভাবক নেই, নেই কোন সাহায্যকারীও। (তওবা-১১৬), তোমরা আসমান ও জমিনে কোথায়ও আল্লাহ্ তায়ালাকে অক্ষম করে দিতে পারবে না, বস্তুত আল্লাহ্ তায়ালা ছাড়া তোমাদের কোন অভিভাবক নেই, নেই কোন সাহায্যকারীও (আনকাবুত-২২, আশ শুরা-৩১)।’
ঈমানদারগণ তাদের জান মাল সবই আল্লাহর নিকট বিক্রি করে দিয়েছে। ‘আমি তোমাদের জান এবং মাল কিনে নিয়েছি জান্নাতের বিনিময়ে।’ (সূরা তাওবা)। মুসলমানরা তো মানব রচিত ভঙ্গুর কোন আদর্শে বিশ্বাসী নয় যে তারা ব্যর্থ হবে। আল্লাহ তায়ালাই বিপদে আপদে সর্বাবস্থায় তাদের একমাত্র সাহায্যকারী। আল্লাহ্ বলেন- ‘আল্লাহ্ তায়ালাই তোমাদের রক্ষক ও সাহায্যকারী (আলে ইমরান-১৫০), যদি আল্লাহ্ তায়ালা তোমাদের সাহায্য করেন তাহলে কোন শক্তিই তোমাদের পরাজিত করতে পারবে না। (আলে ইমরান-১৬০)’
আর এ কারণেই মুসলমানরা সর্বাবস্থায় একমাত্র আল্লাহ্ তায়ালার কাছেই সাহায্য কামনা করে থাকে। যারা আল্লাহ্র শিখানো পন্থায় ডাকে তারাই হলো আল্লাহ্র দলের লোক। ‘তোমরা নামাজ এবং ধৈর্য্যরে মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর (আল- বাকারা-১৫৩), তোমরা বিনয়ের সাথে ও চুপিসারে তোমাদের প্রতিপালককে ডাক, নিশ্চয়ই তিনি সীমালংঘনকারীকে পছন্দ করেন না।...তোমরা ভয় ও আশা নিয়ে আল্লাহ্ তায়ালাকেই ডাক, অবশ্যই আল্লাহর রহমত নেক লোকদের নিকটেই রয়েছে (আরাফ-৫৫, ৫৬), হে রাসূল, আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছে এমন কোন সম্প্রদায়কে তুমি পাবে না যে, তারা এমন লোকদের ভালবাসে যারা আল্লাহ তায়ালা ও তার রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে, যদি সে আল্লাহর বিরোধী লোকেরা তাদের পিতা, ছেলে, ভাই কিংবা নিজেদের জাতি গোত্রের লোকও হয়, এই ব্যক্তিরাই হচ্ছে সেসব লোক যাদের অন্তরে আল্লাহ্ তায়ালা ঈমান এনে দিয়েছেন, এবং নিজস্ব গায়েবি মদত দিয়ে তিনি তাদের শক্তি বৃদ্ধি করেছেন...এরাই হচ্ছে আল্লাহ্ তায়ালার নিজস্ব বাহিনী, আর হ্যাঁ আল্লাহর বাহিনীই বিজয়ী হয় (মুজাদালা ২২)।’ যারা আল্লাহ্র দলের লোক হয়ে আল্লাহ্র দিকে মানুষদের ডাকে তারা কখনো হতাশ হয় না। ‘তোমরা হতাশ হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না, তোমরাই বিজয়ী হবে যদি তোমরা মুমিন হও (আলে-ইমরান: ১৩৯)।’ এই সমস্ত লোকেরাই আল্লাহ্র অনুগ্রহ পাওয়ার উপযুক্ত লোক। ‘অবশ্যই আল্লাহ্ তায়ালা তাদের সাথে রয়েছেন যারা আল্লাহ্কে ভয় করে চলে, সর্বোপরি তারা হবে সৎকর্মশীল (নাহল ১২৮), যারা সৎ পথে চলবে আল্লাহ তায়ালা তাদের সৎ পথে চলার তৌফিক আরো বাড়িয়ে দেন এবং অন্তরে খোদাভীতি দান করেন (মুহাম্মাদ-১৭) ...কিয়ামতের দিন তাদের এমন এক জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার তলদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরকাল থাকবে (মুজাদালা-২২)।’ আর যারা আল্লাহর দেয়া বিধান অবহেলা করে বা অস্বীকার করে মানবরচিত বিধান বাস্তবায়নের জন্য  নিজেদের জানমাল খরচ করে আল্লাহ তাদের হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন ‘কাফেররা যেন এটা মনে না করে, আমি তাদেরকে যে ঢিল দিয়ে রেখেছি এটা তাদের জন্য কল্যাণকর হবে, আমিতো তাদের অবকাশ দিয়েছি যেন তারা গুনাহের বোঝা আরো বাড়িয়ে নিতে পারে আর তাদের জন্যই রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি (আলে-ইমরান: ১৭৮), তুমি কখনো মনে করো না এ জালেমরা যা কিছু করছে তা থেকে আল্লাহ্ তায়ালা গাফিল রয়েছেন, আসলে তিনি তাদের সেদিন আসা পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে রেখেছেন যেদিন তাদের চক্ষু স্থির হয়ে যাবে (ইবরাহীম-৪২)।’ অন্যদিকে মহান আল্লাহ্ তায়ালার সাথে বিদ্রোহ ঘোষণা করার পরও বান্দাদেরকে সঠিক পথ চেনার, বোঝার জন্য অবকাশ দিয়ে থাকেন। ‘আল্লাহ্ তায়ালা মানুষদের নাফরমানির জন্য যদি সাথে সাথেই পাকড়াও করতেন, তাহলে এ জমিনে বিচরণশীল কোন একটি প্রাণীকেও তিনি ছেড়ে দিতেন না, কিন্তু আল্লাহ্ তায়ালা তাদের এক বিশেষ সময় পর্যন্ত অবকাশ দেন, অতঃপর যখন সে সময় এসে হাজির হয়, তখন তারা মুহূর্তকালও বিলম্ব করতে পারে না, তারা তাকে একটুখানি এগিয়েও আনতে পারে না (আন নাহল-৬১)।’ এই সুযোগ পাওয়ার পরও যখন হিদায়াত অনুসরণ না করে বরং আল্লাহ্ ও তার বিধান বাস্তবায়নকারীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়, আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের লাঞ্ছিত, অপমানিত করার চেষ্টা করে, তখন মহাপরাক্রমশালী আল্লাহও তাদেরকে দুনিয়া থেকে লাঞ্ছিত, অপমানিত, অপদস্ত করে বিদায় করার জন্য কৌশল অবলম্বন করেন। ‘তারাও যখন ষড়যন্ত্র করল আল্লাহ্ তায়ালাও কৌশল অবলম্বন করলেন, আর আল্লাহর কৌশলই উত্তম কৌশল (আলে- ইমরান ৫৪), যারা এর আগে অতিবাহিত হয়ে গেছে তারা বড় বড় ধোঁকা প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিল, কিন্তু যাবতীয় কলা-কৌশলতো আল্লাহ্ তায়ালার জন্যই, তিনিই জানেন প্রতিটি ব্যক্তি কি অর্জন করে (আর রা’দ-৪২), সে শহরে ছিল নেতা গোছের এমন নয়জন লোক, যারা আমার জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়াতো, সংশোধনমূলক কোন কাজই তারা করত না। একদিন তারা একজন আর একজনকে বললো তোমরা সবাই আল্লাহ্র নামে কসম কর যে, আমরা রাতের বেলায় তাকে ও তার ঈমানদার সাথীদেরকে মেরে ফেলব, অতঃপর তদন্তে এলে আমরা তার উত্তরাধিকারীকে বলব, তার পরিবার পরিজনকে হত্যা করার সময়তো আমরা সেখানে উপস্থিত ছিলাম না, আমরা অবশ্যই সত্য কথা বলছি। তরা যখন সালেহ আঃ কে হত্যা করার জন্য এই চক্রান্ত করছিল, তখন আমিও তাকে রক্ষা করার জন্য এমন এক কৌশল বের করলাম, যা তারা বিন্দুমাত্রও বুঝতে পারেনি। তুমি দেখ তাদের কী পরিণাম হয়েছে, আমি তাদের ও তাদের জাতির সবাইকে ধ্বংস করে দিয়েছি (আন-নামল ৪৮-৫১) এরা আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। আমিও একটি কৌশল অবলম্বন করেছি। অতএব তুমি সেই কৌশল দেখার জন্য কাফিরদেরকে কিছুকাল অবকাশ দিয়ে রাখো (আত-তারিক ১৫-১৭)।’ এবং তার প্রিয় বান্দাদের মাধ্যমে আল কুরআনের বিধানকেই চূড়ান্ত বিজয় দান করেন। ‘এ লোকেরা আল্লাহর নূরকে এক ফুঁৎকার দিয়ে নিভিয়ে দিতে চায়, অথচ আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর এই নূরের পূর্ণ বিকাশ ছাড়া অন্য কিছুই চান না, যদিও কাফিরদের কাছে এটা অপ্রীতিকর। তিনিই মহান আল্লাহ্ যিনি সুস্পষ্ট হেদায়াত ও সঠিক জীবন বিধান সহাকারে তার রাসূলকে পাঠিয়েছেন, যেন সে এই বিধানকে দুনিয়ার সকল মতবাদের ওপরে বিজয়ী করে দিতে পারেন, মুশরিকেরা এ বিজয়কে যত দুঃসহই মনে করুক না কেন (আত্ তাওবা ৩২-৩৩, আস সফ ৮-৯)।’
ধৈর্যধারণকারী ও তওবাকারীরাই দুনিয়া ও আখিরাতে সফলকাম। হে ইমানদারগণ তোমরা আল্লাহর দরবারে তওবা কর, একান্ত খাঁটি তাওবা, আশা করা যায় তোমাদের মালিক তোমাদের গুনাহখাতা মাফ করে দেবেন, এবং এর বিনিময়ে তিনি তোমাদের প্রবেশ করাবেন এমন এক জান্নাতে যার তলদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হবে, সেদিন আল্লাহ্ তায়ালা নবী ও ঈমানদারদের অপমানিত করবেন না, (আত্ তাহরিম ৮)। যারা অঙ্গীকার করে তা পূর্ণ করবে এবং বিপদে অভাব-অনটনে ও হক-বাতিলের সংগ্রামে ধৈর্যধারণ করবে তারাই সৎ ও সত্যাশ্রায়ী এবং তারাই মুত্তাকী। (বাকারা-১৭৭) এবং আমি অবশ্যই যারা ধৈর্যের পথ অবলম্বন করবে তাদের প্রতিদান তাদের সর্বোত্তম কাজ অনুযায়ী দেবো। (আন্ নাহল-৯৬) নিশ্চিতভাবেই এর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে বেশি বেশি ধৈর্যশীল ও বেশি বেশি কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য। (সূরা সাবা-১৯) হে ঈমানদারগণ! ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য গ্রহণ করো, আল্লাহ্ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। (আল-বাকারা: ১৫৩ আয়াত)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ